অধ্যায়-২

শিহাব ভাইয়াদের বাসা থেকে পাঁচ ছয়টা বিল্ডিং পরেই বউয়ের বাড়ি।এক সময় এই মেয়ে ভাইয়ার ক্লাস এইটের স্টুডেন্ট ছিল।সেখান থেকেই পরিচয়,তারপর প্রেম এখন বিয়ে।যদিও এখন সে আর এইট পাশ স্টুডেন্ট নয়,এবার সে এইচএসসি পাশ করেছে।আমি আর আমার ফুপাতো ভাই জাহিন বউয়ের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে।জাহিন আমার ৩ বছরের ছোট,একটু সরল ধরনের কিন্তু গাধাও বলা যায়।কলিং বেল টিপতে যাচ্ছিলাম,এমন সময় জাহিন বলল:আপু,তোমার জন্য ওরা লাঠি রেডি রাখতে পারে,সাবধান!এমনিতেই ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে,তার ওপরে এমন কথা!জাহিনকে ধমক দিয়ে বললাম:চুপ!কলিং বেল বাজতেই চৌদ্দ পনেরো বছরের একটা মেয়ে এসে দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে,ঢুকতে বলাতো দূরের কথা,এমন ভাবে তাকিয়ে আছে মনে হচ্ছে এলিয়েন দেখচ্ছে।পরে মোটা শোটা এক ভদ্রমহিলা এসে বললেন:অঅঅঅঅ,ভিতরে আসো।ইনি মরিয়ম বেগম বউয়ের মা।ওনার অঅঅঅঅ,শুনে আমার ভয় ৩ গুন বেড়ে গেল।মরিয়ম বেগমের দুই মেয়ে ঝর্ণা মণি,স্বর্ণা মণি।এই বাড়িতে এমন একটা মানুষও দেখিনি যারা মণি বাদ দিয়ে শুধু ঝর্ণা বা স্বর্ণা বলে ডাকেন।এই মণি নিয়ে আমাদের বাড়িতে যে হাসাহাসি চলে তা যদি ওনারা কোনো ভাবে জানতে পারেন আজকেই তাহলে আমার শেষ দিন।ঝর্ণা মণি আমাদের বউ।এখানে সবাই যে আমাকে মনে মনে পিষছে,তা ভালো করেই বুঝলাম।মরিয়ম বেগম একটু পর পর ওনার ননদ,জা না হয় বোন কে নিয়ে এসে বলছেন:এই যে ও হইল সাবা।কি আর করার ভদ্রতার খাতিরে শুধু সালাম দেয়া ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না।এ বাড়ির অবস্থা ভালো করেই টের পাচ্ছি!অনেকক্ষণ পর বউ আসল।শাড়িটা দিলাম ওর হাতে।

ঝর্ণা: এইটা কি কালার? আমি না রক্ত লালের কথা বললাম।

আমি:জর্জেটের মধ্যে গোল্ডেন আর সিলভারের কাজ করা অন্যগুলো ভালো লাগে নি।

ঝর্ণা: কিন্তু,,,

তখনই পাশ থেকে ঝর্ণার মা বললেন: ঝর্ণা,কোনো কথা বইলো না,আল্লাহ্ কপালে যা রাখছে তাই!

আমি এই চিড়িয়াখানায় আর থাকতে পারছিলাম না।বললাম:আমরা তাহলে আসি?

মরিয়ম বেগম বললেন: না,না আগে পার্লারে যাও।ঝর্ণারে কিভাবে সাজাবে,শাড়ি পরাবে সব বলে দিয়ে আসবা।

আমি: ভাবী যে ভাবে সাজতে চায়,সাজবে।আমি কী বলব?

মরিয়ম বেগম: না,না এই সব আমি শুনব না।পরে ঝামেলা করবা!

ভালো করে বুঝতে পারলাম কথা বলে কোনো লাভ হবে না।ভাবী চল বলে ঝর্ণা, আমি আর জাহিন বের হলাম।মনে মনে প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিল জুঁই অপুর ওপর!এমনিতেই নিজে অনুষ্ঠানে আসে নি,উল্টো ফোন করে বলে কিচ্ছু খাবি না,বউকে হলুদও দিবি না!যেভাবে আছিস উঠে চলে আয়।যত অপমান এখন আমাকে সইতে হচ্ছে।

পার্লারে গিয়ে বললাম:ভাবী তোমার কিছু কি বলার আছে?

ঝর্ণা অনেকটা ভেঙ্গচি কাটার ভঙ্গি করে বললো:তুমিই বলো।

এত অপমান আর সহ্য করতে পারছিলাম না।পার্লারে কথা বলেই তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে যাই।

ফুপু:কী সাবা?শাড়ি পছন্দ হয়েছে ওদের?

আমি হুম বলে ভেতরে চলে গেলাম।

ফুপু আর ভাইয়া আমার পাশে এসে বসলো।

ভাইয়া: কী হয়েছে?চেহারা দেখে হাট্টিমাটিম টিমের মতো লাগাচ্ছে কেন?

আমি বললাম: আমি কিন্তু বিয়েতে যাবো না।বলতে বলতেই আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে,গলা ভারী হয়ে আসছে।অথচ ভাইয়ার বিয়েতে যাওয়ার জন্য আমিই সবচেয়ে বেশি উৎসুক ছিলাম।মনে মনে বারবারই বলছি:কেন এলাম আমি?না এলেই ভালো হতো!

অথচ এই আমি যদি জানতাম আজকে থেকে আমার জীবনের গল্পটা এভাবে পাল্টাবে,আমার স্বপ্ন,আশা,ছোট,বড়,ইচ্ছা,আকাঙ্ক্ষা এভাবে বদলাবে,তাহলে সাত বছর আগের সেই দিন থেকে তৈরি হতাম।প্রতিদিন একটু একটু করে তৈরি হতাম আজকের জন্যে!

Print Friendly, PDF & Email
0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments