দোতলায় স্তোত্র পাঠ হচ্ছে। বাড়ির বাইরে থেকেই তা শোনা যাচ্ছে। গলাটা হাল্কা কাঁপিয়ে স্বর কখনো সপ্তমে উঠছে আবার চকিতে নেমে আসছে। একটা সুরও আছে। বহুদিনের অভ্যাস আর অধ্যাবসায়ের ফল। মন দিয়ে শুনলে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র আর দেব দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কন্ঠের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ পাওয়া যাবে। ঘর ভর্তি গুণগ্রাহী আর ভক্ত। সাধারণ লোক যেমন আছেন তেমন অনেক কেউকেটাও রয়েছেন। কারো চোখ আধবোজা, কারো বা পুরো বন্ধ। ধাতব মূর্তির সামনে থালায় থরে থরে ভক্তদের আনা ফুল, ফল মিস্টি সব সাজান রয়েছে। সারা ঘরে মিস্টি ধূপের গন্ধ। স্তোস্ত্র পাঠ শেষ হয়ে খানিক বাদে আরতি শুরু হল। এক হাতে প্রদীপ আর এক হাতে ঘণ্টা। নৃত্যের ছন্দে শরীরটা দুলছে আর থেকে থেকে ‘মা’ ‘মাগো’ ডাক। ভক্তিরসে গদগদ ভক্তরাও ওই ডাকে গলা মেলাচ্ছে। কিছুক্ষণ এরকম চলার পর পুজো শেষ হল। এবার সাষ্টাঙ্গে প্রণাম। গুরুকে অনুসরণ করে ভক্তরাও উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল। বসেই ঘর ভরে গিয়েছিল, শোবার জায়গা থাকার কথা নয়। তবু তার মধ্যেই সারতে হবে। ফলে দেবতার শ্রী চরণের প্রয়োজন হল না। সামনের লোকের চরণ পিছনের লোকের মাথায় জায়গা করে নিল। মনে ভক্তিভাব থাকলে এসব ছোটখাট ব্যাপার গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। আর তাছাড়া প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই তো ঈশ্বর রয়েছেন ফলে এক ঈশ্বরের চরণই তো অন্য ঈশ্বরের মাথায় পড়েছে। প্রণাম শেষে সকলে প্রসাদী ফুল আর সন্দেশ নিয়ে মাথায় হাত ঠেকালেন। এবার কিছুক্ষণের বিরতি। তারপর শুরু হবে প্রশ্নোত্তরের আসর। যার যা সমস্যা আছে এক এক করে গুরুর কাছে জানাবে আর গুরু তাঁর অলৌকিক ক্ষমতাবলে সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার পথ বাৎলাবেন। এটাই গুরুর তালতলার আস্তানার রোজকার চিত্র।

গুরু কিন্তু সন্ন্যাসী নন। আদ্যন্ত গৃহী মানুষ। বয়স ষাট পার হয়ে গেলেও শরীরে তার বিশেষ ছাপ পড়েনি। ফর্সা সুন্দর চেহারা। ধুতি আর পাঞ্জাবী পরেন। ভাল নাম শ্যামল গাঙ্গুলী। ভক্তরা বাবা বলেই ডাকে। বহুদিন থেকেই আধ্যাত্মিক লাইনে গৃহত্যাগী সন্ন্যাসীদের আর একচেটিয়া অধিকার নেই। অনেক গৃহী বাবাই এখন এর শরিক। এঁদের অনেকের আবার স্ত্রী, পুত্র-কন্যাও আছে। তবে শ্যামল গৃহী হলেও অকৃতদার। শিক্ষিত হওয়ায় তার কদর একটু বেশি। অবিবাহিত নারীপুরুষদের অধিকাংশেরই একটা বয়সের পরে স্বভাবে কর্কশ রুক্ষ ভাব এসে যায়। এই মানুষটি কিন্তু সদা হাস্যময়। অন্তত দর্শনার্থীদের কাছে এটাই তাঁর পরিচিত ছবি। দর্শনার্থী রোজই আসে। যার সমস্যা কিছু কমে (যে ভাবেই হোক ) সে আবার আসে। সঙ্গে করে নিয়ে আসে আরো কিছু সমস্যা ক্লিষ্ট মানুষ। এ ভাবেই লোক আসায় কখনও ভাঁটা পড়ে না। প্রচুর ভক্ত থাকলেও অন্যান্য বাবাজীদের মত এনার কোন ছায়া সঙ্গী বা চেলা নেই। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে কারো প্রবেশাধিকার নেই। বহুদিন থেকে তাঁর কাছে আসছে এরকম লোকও শুধু এইটুকু বলতে পারবে যে, ভাইয়েদের সংসারে তিনি একান্তে একটা ঘরে সাধন ভজন আর পড়াশুনা করে দিন কাটান। আর এমন এক মহাপুরুষ তাঁর বাড়ির লোকেদের কাছে উপযুক্ত মর্যাদা পান না। বিশেষ কিছু ভক্ত তাঁর বাড়িতে দেখা করতে গিয়ে বাড়ির লোকেদের ব্যবহারে সেটা টের পেয়েছে। এটাই স্বাভাবিক। মহাপুরুষকে পাশের মানুষেরা চিরকালই চিনতে ভুল করেছে।

বাবা, আত্মীয় পরিজন এবং ভক্তদের পরস্পরের থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখার চেষ্টা করেন। সেইজন্যই তালতলার এই দু কামরার ফ্ল্যাটটা ভাড়া করেছেন। প্রথম দিকে ভাড়ার টাকাটা দিতে বেশ কষ্ট হত। এখন গুণগ্রাহীরাই সে দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে। এখানেই সারাদিন চলে তাঁর আধ্যাত্মিক কর্মশালা। দিনের শেষে ফিরে যান বেহালার বাড়িতে। এখানকার কারোর বেহালার বাড়িতে যাওয়াটা তিনি পছন্দ করেন না। ঠিক তেমনই আত্মীয়দেরও এ বাড়িতে আসাটা তাঁর কাম্য নয়। এক জায়গার লোক অন্য জায়গার ব্যাপারে অন্ধকারে থাকে। কিন্তু পুরোনো কিছু লোক যখন বাড়িতে গিয়ে দামী কিছু উপহার দেওয়ার আবদার করে তখন মানা করে তাদের মনে কষ্ট দিতে পারেন না। বাড়িতে আসতে বলতেই হয়। আর গোলটা তখনই বাঁধে।

বাড়ির অন্য লোকেদের না থাকুক, ভাগ্নে শুভর কিন্তু মামার ব্যাপারে কৌতূহলের শেষ নেই। খোঁজ খবর করে ঠিক তালতলার আস্তানাটা বার করেছে।

কে এই বাবা আর কেনই বা এত লুকোচুরি ? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে অনেকটা পিছনে যেতে হবে। সতীনাথ গাঙ্গুলী ইম্পিরিয়াল রেকর্ড ডিপার্টমেন্টে কাজ করতেন। চাকরি সূত্রে দেশ বিদেশের অনেক বিদগ্ধ মানুষের সান্নিধ্যে এসেছিলেন। নিজেও তখনকার পত্র পত্রিকায় ইতিহাস বিষয়ক অনেক নিবন্ধ লিখেছেন। তাঁর বাড়িতে পড়াশুনার একটা পরিমণ্ডল ছিল। তাঁর সন্তানেরাও সরস্বতীর অনুকম্পা থেকে বঞ্চিত হয়নি। মেয়েদের প্রত্যেককে একটা করে পাশ দেওয়ার পরে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেরা সকলে স্নাতক। ছোটটি তো এম এ। কলেজে অধ্যাপনা করে। আজকের দিনে হয়ত এটা বলার মত এমন কিছু ঘটনা নয়, কিন্তু আজ থেকে ষাট সত্তর বছর আগে মধ্যবিত্ত পরিবারে এমন চিত্র খুব বেশি দেখা যেত না। শ্যামল সতীনাথের সেজ ছেলে। স্কুলে মেধাবী ছাত্র হিসাবে বেশ নাম ছিল। কিন্তু পরের ধাপগুলোতে নিজের সুনাম অখুন্ন রাখতে পারেনি। বিএ পরীক্ষায় পাশ কোর্সে কোনক্রমে উৎরোয়। ফলে এম এ তে সুযোগ পায়নি। একবার প্রাইভেটে এম এ পরীক্ষা দিয়েছিল কিন্তু পাশ করতে পারেনি। ওই সময় বিএ পাশ ছেলের কিছু না কিছু চাকরি জুটে যেত। কিন্তু ছোটখাট চাকরি করতে মন সায় দেয়নি। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হওয়া হল না। কলেজের শিক্ষকতাও এম এ পাশ না করলে হবে না। বার দুয়েক সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দিয়েও লাভ হয়নি। এদিকে অন্য ভাইয়েরা সকলেই সুপ্রতিষ্ঠিত।

বাস্তব যাই হোক না কেন মনের ভেতর বহুদিনের লালিত উচ্চাশা কিন্তু থেকেই গেছে। এই মানসিক দ্বন্দ্বই শ্যামলকে ধীরে ধীরে মিথ্যাচারের দিকে নিয়ে গেল। লোকের কাছে নিজের এমন একটা পরিচয় রাখতে শুরু করল যা সে মনে মনে হতে চেয়েছিল কিন্তু হয়ে উঠতে পারেনি। প্রথম দিকে কলেজের অধ্যাপক এবং পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বলে নিজের পরিচয় দিতে শুরু করল। এই মিথ্যে পরিচয়ের সুবাদের কিছু টিউশানি পেত, যা ছিল তার একমাত্র উপার্জন। বিশ্ববিদ্যালয়ও আবার এক থাকত না। উত্তর ও মধ্য কোলকাতার লোকেদের কাছে শ্যামল ছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আর দক্ষিণ কোলকাতার লোকেদের কাছে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। অধ্যাপনার বিষয়টা অবশ্য অন্ধকারেই থাকত। মিথ্যে পরিচয়, সুন্দর চেহারা আর মিষ্টভাষী হওয়ার জন্য অচিরেই কোলকাতার অনেক নামী দামী লোকের সাথে তার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। এদের মধ্যে বহু লব্ধপ্রতিষ্ঠ ডাক্তার ও বড় পুলিশ অফিসারও ছিলেন। ওর এমন এমন লোকেদের সাথে ঘোরাফেরা ছিল যা প্রকৃত অধ্যাপকেরও ঈর্ষার কারণ হতে পারে। মিথ্যার ওপর ভর করে গড়ে ওঠা যে কোন সম্পর্কই হল তাসের ঘর। সহজেই ভেঙ্গে যায়। এক্ষেত্রেও যে ভাঙ্গেনি তা নয়, তবে অনেকটা পরে। এই ভঙ্গুর সম্পর্ক বেশ কিছুদিন টিকেছিল। কারণ, শ্যামল এদের একের প্রয়োজনে অন্যকে ব্যবহার করত। তাতে প্রত্যেকেই উপকৃত হত অধ্যাপক শ্যামলের মাধ্যমে। ডাক্তারের প্রয়োজনে পুলিশের সাহায্য পাইয়ে দিত আর পুলিশের প্রয়োজনে ডাক্তারের। ফলে নিজের প্রয়োজনে উভয়েরই সাহায্য পেত। এতে সম্পর্কের একটা ভারসাম্য থাকত। এইজন্যই শ্যামলের ব্যাপারে কোন সন্দেহ কারো মনে জাগেনি। আর বাড়িতে শ্যামলের কোন কদর না থাকলেও এই সম্পর্কগুলো প্রয়োজনে ব্যবহার করতে আত্মীয়রা কখনও কোন দ্বিধা বা সংকোচ করেনি।

যুবক শ্যামলের সাথে একসময় ভালবাসায় জড়িয়ে পড়ে মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে রত্না। একটা বিয়ে বাড়িতে প্রথম আলাপ। সৌম্য দর্শন অধ্যাপকের প্রতি রত্নাই প্রথমে আকৃষ্ট হয়। শ্যামলও রত্নার আকর্ষণকে উপেক্ষা করতে পারেনি। ফলে স্বাভাবিক নিয়মেই ধীরে ধীরে সম্পর্কে গভীরতা বাড়ে। শ্যামল মেলামেশাটা খুব গোপনে করার চেষ্টা করত। তবে রত্নার আবার এত লুকোচুরি ভাল লাগত না।

একদিন থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করেছিল—আচ্ছা, এত আড়াল আবডালের কি আছে ? আমরা দুজনেই প্রাপ্ত বয়স্ক। তুমি ভাল চাকরি কর। দুদিন বাদে আমরা বিয়ে করব। সমস্যাটা কোথায় ?

বাস্তবটা আর রত্নাকে কি করে শ্যামল বলবে। সমস্যা বাড়ির লোকজন। আয় বলতে তো সামান্য কটা টিউশনি। তাতে নিজেরই চলে না। এর পরে প্রেম করছে শুনলে বাড়ি থেকে দূর করে দেবে।

অবশ্য রত্না নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে শ্যামলকে চিন্তা মুক্ত করল।

—বুঝতে পেরেছি, যদি কোন ছাত্র দেখে ফেলে এই ভয় তো !

শ্যামল বোকার মত ঘাড় নেড়েছিল। লুকিয়ে চুরিয়ে হলেও ওরা মাঝে মাঝেই এদিক সেদিক ঘুরতে যেত। একবার তো ইডেনে ক্রিকেট খেলাও দেখতে গিয়েছিল। সময়টা বেশ ভালই কাটছিল।

একদিন একথা সেকথার মাঝে রত্না জিজ্ঞেস করল—বিয়ের ব্যাপারে কিছু ভেবেছ ?

শ্যামল আমতা আমতা করে বলল- আর একটু সময় দাও। একটু সামলে নি, তার পরে বিয়ে নিয়ে ভাবা যাবে। আমি তো আর পালিয়ে যাচ্ছি না।

একটু বিরক্ত হয়েই রত্না বলল-নিজেদের বাড়ি আছে, ভাল চাকরি কর, সংসারে তেমন কোন দায় দায়িত্ব তোমার ওপর নেই, তোমার আবার সামলাবার কি আছে ?

শ্যামল যে নিজেই সংসারের দায়। যদি ভবিষ্যতে কোন ভাবে ভাগ্য ফেরে তার জন্যে অপেক্ষা করা ছাড়া ওর কাছে যে আর কোন পথ নেই।

রত্নার মা বাবা নেই । বাড়িতে কেবলমাত্র ও আর ওর দাদা। ওর দাদা বাবু, পুলিশে সাব-ইন্সপেক্টার। বোনের ব্যাপারটা জানে। কখনও আপত্তি করেনি। কারণ, হবু ভগ্নীপতিকে ও পুলিশের অনেক বড় বড় অফিসারের সাথে ঘুরতে দেখেছে। এও জেনেছে যে ভদ্রলোক অধ্যাপক। বোনের পছন্দকে মনে মনে তারিফ করে। বোনের জন্য এমন পাত্র সে যোগাড় করতে পারত কিনা সন্দেহ আছে।

একদিন রাতে খেতে বসে বাবু বোনকে বলল—হ্যাঁরে, এবার বিয়ের ব্যাপারে শ্যামলের সাথে কথা বল। বিয়ে বলে কথা। হাতে একটু সময় নিয়ে দিনক্ষণ ঠিক করতে হবে। কত কাজ বল তো, আর লোক বলতে তো আমরা দুজন।

–দাদা, ও মানুষটা ভাল, কিন্তু বিয়ের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেই কিরকম যেন এড়িয়ে যায়।

— সেকিরে ? এ কথা তো আমায় বলিসনি কখনও। এত ভাল কথা নয়।

বাবু একদিন শ্যামলের সাথে যোগাযোগ করে বিয়ের ব্যাপারে কথা বলতে যায়। বিয়েতে অস্মমতি না জানালেও দিন ক্ষণের ব্যাপারে শ্যামল নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে চায়নি। এরপর সে একদিন শ্যামলের বাড়িতেও গিয়েছিল। সেখানে গিয়ে জানতে পারে যে রত্নার ব্যাপারে বাড়ির লোকজন কিছুই জানে না। আর এও বুঝতে পারে যে শ্যামলের ব্যাপারে তারা অত্যন্ত বিরক্ত। বিষণ্ণ মনে বাড়ি ফিরে আসে।

এবার শ্যামলের ব্যাপারে খোঁজ খবর নেওয়া শুরু করে। পুলিশের লোক হওয়ার ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই প্রকৃত তথ্য জানতে পেরে যায়। নিজেকেই সে ধিক্কার দেয়। অনেক আগেই তার খবর নেওয়া উচিৎ ছিল। চিটিং বাজির জন্য হাজতবাস করিয়ে ওকে চরম শিক্ষা দেবে। কিন্তু সিদ্ধান্তটা পাল্টাতে হল  কারণ, তাতে রত্নারও সম্মানহানি হবে। তবে একেবারে তো ছেড়ে দেওয়া যায় না। একদিন শ্যামলকে ডেকে পাঠিয়ে সকলের সামনে চুড়ান্ত অপমান করে মনের জ্বালা মেটাল। আর তার প্রকৃত রূপটা বড়কর্তাদের জানিয়ে দিল। এটাই যথেষ্ট ছিল। খবরটা দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ল শ্যামলের পরিচিত মহলে। এতদিন ধরে তিলে তিলে গড়ে ওঠ সম্পর্কগুলো মুহূর্তে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। অনেকে বিভিন্ন সময়ে শ্যামলের দ্বারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উপকৃত হয়েছিল বলে বোধহয় তাকে আরো বড় কোন বিপদের সম্মুখীন হতে হয়নি।

যা ঘটেছে সেটাই স্বাভাবিক। তবু এই সম্পর্কগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় শ্যামল মানসিক ভাবে ভীষণ ভেঙ্গে পড়ল। বিশেষ করে রত্নাকে হারানোটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না। তার পরিচয়টা মিথ্যে হতে পারে কিন্তু ভালবাসাটা তো মিথ্যে ছিল না। হৃদয়ের সবটা দিয়েই সে রত্নাকে ভালবেসেছিল। অভাব, বাড়ির অনাদর, অবজ্ঞা, সব কিছুই ভুলিয়ে দিত রত্নার সান্নিধ্য আর ভালবাসা। অনেক স্বপ্নও দেখত। আর্থিক দিকটা একটু সামলে নিতে পারলে একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে শুরু করবে তাদের সোনার সংসার। গড়তে চেয়েছিল দুজনের ভালবাসার একটা ভাল বাসা। স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল। জমার ঘরে শুধুই শূন্য।

দৈন্য, বাড়িতে অশান্তি, রত্নার প্রত্যাখ্যান সবে মিলে জীবনটা একেবারে বিষিয়ে উঠে ছিল। পৈতে হওয়ার পর থেকেই শ্যামল সকাল সন্ধ্যায় ঠাকুর ঘরে গিয়ে আহ্নিক করত। এটা তার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। বিরক্তিকর জীবনের থেকে ক্ষণিকের মুক্তি পেতে ওই পুজোর সময়টা আরো বাড়িয়ে দিল। থাকত চিলেকোঠার ঘরে। ঠাকুর ঘরটা তারই সংলগ্ন। গীতা, উপনিষদের মত নানা ধর্মগ্রন্থ যোগাড় করে এনে রাতে ঘুম না এলে গুন গুন করে আওড়াত। এইভাবে ধীরে ধীরে আধ্যাত্মিক লাইনের অনেক কিছু তার কণ্ঠস্থ হয়ে গেল। কাটলো কয়েকটা বছর।

এই দুঃসময়েতেও সৌম্যদর্শন মিষ্টভাষী যুবকটি নানাভাবে নতুন কিছু মানুষের মন জয় করেছে। তবে এবার আর প্রফেসর পরিচয়ে নয়। পরিচয়টা অনেকটা এইরকম—শিক্ষিত শাস্ত্রজ্ঞ একজন মানুষ, যে জীবনে বহু ভাল ভাল চাকরির সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও তাতে যোগ দেয়নি। কারণ, সমাজ সেবাই তার ধ্যান জ্ঞান। একই কারণে বিয়েটাও আর করা হয়নি। জীবন ধারণের প্রয়োজনে সামান্য কটা টিউশনি করে।

এবার শুধু কথায় নয় কাজ দিয়ে লোককে কাছে টেনেছে। কখনও হাসপাতালে রাত জেগে, কখনও শ্মশানে গিয়ে, আবার কখনও কারো বাড়ির কোন অনুষ্ঠান একা সামলে দিয়ে লোকেদের মন জয় করেছে। তালতলায় কয়েকটি ছেলেকে পড়াবার সুবাদে ওই অঞ্চলেই গড়ে তোলে তার নতুন কর্মক্ষেত্র। বাড়ির থেকে জায়গাটা অনেকটা দূরে হওয়ায় তার অতীতের ঘটনা এখানে কারো জানার কথা নয়। আর দুর্ভাগ্যক্রমে এক আধজন যদি সেরকম বেরিয়েও যায় তাহলেও এতদিন পরে সেই ঘটনা শ্যামলের এই নতুন প্রিয়জনদের বিশ্বাস করান সহজ হবে না।

পরিচিত জনের বাড়িতে গীতাপাঠ, চণ্ডীপাঠ, সরস্বতী পুজো, লক্ষ্মী পুজো এমনকি কালী পুজোও করতে শুরু করেছে। উদাত্ত কণ্ঠে বিশুদ্ধ সংস্কৃত উচ্চারণে যখন পুজো পাঠ করে তখন উপস্থিত সকলে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকে। এ সবের মধ্যে দিয়ে তার সময়টা যেমন সুন্দর কাটে তেমন আয়ও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। না চাইতেই লোকে বেশ কিছু টাকা প্রণামী হিসেবে জোর করে দিয়ে দেয়। এছাড়া যোগাযোগ বাড়ার ফলে বেশ কিছু নতুন টিউশনিও পেয়েছে। জীবনে হারিয়ে যাওয়া জিনিসগুলো সব এক এক করে ফিরে আসছে, আর সঙ্গে কিছুটা হলেও এসেছে স্বাচ্ছল্য। এলনা শুধু রত্না। ওই একটা যায়গায় রয়ে গেল এক বিশাল শূন্যতা।

সময় সব ক্ষতেই প্রলেপ দেয়। মনের থেকে মুছতে না পারলেও রত্নার বিরহ জ্বালা সময়ের সাথে সাথে ধীরে ধীরে কিছুটা প্রশমিত হল। আর তাছাড়া এখন সব সময়েই সে কিছু না কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকে। অতীত নিয়ে হিসেব নিকেশ করার মত অবসর সময় খুব একটা থাকে না। গৃহ শিক্ষকের থেকে পুজোর লাইনে তার নামটা একটু বেশি ছড়াল। বিভিন্ন বাড়িতে সে পুজো করত ঠিকই কিন্তু প্রথম থেকেই অত্যন্ত সচেতন ভাবে লোকের মনে পুরোহিতের থেকে নিজেকে অনেক উঁচুর সারিতে বসাতে সক্ষম হয়েছিল। পুরোহিত পুজো করে পয়সার জন্য। শ্যামল একজন শিক্ষিত, জ্ঞানী, হৃদয়বান মানুষ। পুজো কখনও তার পেশা হতে পারে ! আপদে বিপদে যেমন লোকের পাশে গিয়ে দাঁড়ায় তেমনই অনুরোধ এড়াতে পারে না বলে পুজোগুলোও করে। মানুষের মনে যবে থেকে তার এই ভাবমূর্তিটা গেঁথে দিতে পেরেছিল তবে থেকে তাকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। পারিশ্রমিকের অঙ্কটাও না চাইতেই পুরোহিতের থেকে অনেকটাই বেশি পেত। পূজো মানেই মহিলাদের মধ্যে কাজ, তাই চরিত্রটা ঠিক রাখতে হবে। মনের ভেতর যতই তোলপাড় হোক না কেন তা কোনভাবেই প্রকাশ করা চলবে না।

 

এত সম্পদ, এত আধিক্যের মধ্যেও নিজেকে বড় নিঃস্ব মনে হচ্ছে। এ শূন্যতা অর্থ, যশ কোন কিছু দিয়েই পূর্ণ হওয়ার নয়। আজ যদি রত্না থাকত!

 

ডাক্তারির সাথে আধ্যাত্মিক লাইনের কিছু মিল আছে। ডাক্তারিতে এম বি বি এস করে অনেকেই ইতি টেনে দেয়। আবার উচ্চাকাঙ্ক্ষী কেউ কেউ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হওয়ার চেষ্টা করে। আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রেও সাধারণ পুজো পাঠের গণ্ডী পেরিয়ে কেউ কেউ নিজেকে গুরুর আসনে বসাতে সক্ষম হয়। এই গুরুরা কেউ ধ্যান যোগ বিশেষজ্ঞ, কেউ ভবিষ্যতটা গড় গড় করে বলে দেন আর বিপদ আপদ থেকে বাঁচার দারুণ সব শেকড় কবচ পাথর দেন, কেউ আবার মানুষের বর্তমান সমস্যার থেকে উদ্ধার পাওয়ার নানা পথ বাৎলান। এছাড়া আরো নানান প্রক্রিয়ায় মানুষ এই লাইনে নাম করে। সন্ন্যাসীর গেরুয়া বসনকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করলেও এদের কেউই কিন্তু ভুল করেও গৃহত্যাগ করে বনে জঙ্গলে যায় না। ডাক্তারের মত এদের পসারও এক এক জনের এক এক রকম। কেউ কেউ তো আমেরিকা, ইংল্যান্ডের মত দেশেও আপন সম্মোহনী শক্তির দ্বারা হাজার হাজার মানুষকে নিজের অনুগামী করতে সক্ষম হয়েছেন। এ এমনি ভেল্কী যাতে শিক্ষিত অশিক্ষিত সব একাকার হয়ে যায়। তবে গুরু হওয়া অত সহজ নয়। হতে চাইলেই হওয়া যায় না। যে কোন সময় পা পিছলোতে পারে। শ্যামলের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছাত্র জীবন থেকেই ছিল। কিন্তু সাফল্য আসেনি। মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে অপূর্ণ বাসনা চরিতার্থ করতে গিয়ে সে খুইয়েছে তার সবকিছু। ভুলের থেকেই মানুষ শিক্ষা নেয়। সে হাল ছাড়েনি। জীবনের ওই দুঃসময় যখন সে কাটিয়ে উঠতে পেরেছে তখন প্রতিষ্ঠা তাকে পেতেই হবে। একটু সাবধানে এগোতে হবে। যে লাইনটা এখন সে নিয়েছে তাতেও যুগ যুগান্ত ধরে মিথ্যারই রমরমা। মিথ্যাকে মূলধন করে চারিদিকে চলছে আধ্যাত্মিক ব্যবসা। স্বামী বিবেকানন্দর মত মহাপুরুষ কয়েক শতাব্দীতে হয়ত এক আধজন আসেন।

এই আধ্যাত্মিক ভোজবাজিতে শ্যামল ধরে ছিল অপেক্ষাকৃত নিরাপদ দিকটা। জ্যোতিষ চর্চার সে কিছুই জানে না। ফলে ভবিষ্যতদ্রষ্টা সে হয়নি। ভবিষ্যৎবাণী না মিললে নাম যশ তো হবেই না বরং বিপদে পড়ার একটা সম্ভাবনা থাকে। ইদানীং সে লোকের আপদে বিপদে এগিয়ে যেত আর পুজো পাঠ করেও বেশ নাম কামিয়েছে। এই দুটো মিলিয়েই সে ধীরে ধীরে তৈরি করল তার ভবিষ্যতের পথ। ঠাকুরের ফুল, চরণামৃত, মন্ত্রপাঠ, ইত্যাদি দিয়ে তার ব্যবসার শুরু। থুড়ি, ব্যবসা বলাটা ঠিক হবে না। কারণ, এসবের বিনিময়ে ও কারো কাছে কিছু চাইত না। এই না চাওয়াটাই লোকের চোখে ওকে করে তুলেছিল এক মহান মানুষ। এমন এক মানুষ যার বিষয় সম্পত্তিতে কোনরকম আসক্তি নেই। খুব সচেতন ভাবেই এই ইমেজটা ও গড়ে তুলেছিল। এই ভাবেই মানুষের কাছে শ্যামল ক্রমশ হয়ে উঠল এক যোগী পুরুষ-বাবা-গুরুদেব। লোকেরা তাদের দুঃখ, কষ্ট, সমস্যা নিয়ে শ্যামলের কাছে আসে। কিছুদিন আগে হলে পাশে থেকে সাহায্য করার চেষ্টা করত। এখন সে সিদ্ধ পুরুষ। শারীরিক ভাবে এখন আর যেতে হয় না। পুজোর আসনে বসে আশীর্বাদ বা আশীর্বাদ পুষ্ট ফুল জল বা প্রসাদেই সমস্যার সমাধান হয়। দুঃখ, কষ্টের মধ্যে জীবনের অনেকটা কাটার ফলে শ্যামল জানত যে মানুষের অধিকাংশ সমস্যাই সাময়িক। একটা সময়ের পরে ওগুলো আর থাকে না। আবার হয়ত নতুন কিছু সমস্যা আসে। দুরারোগ্য ব্যাধির মত অল্প কিছু সমস্যা আছে যার থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন। এই ধরণের সমস্যা নিয়ে লোকে এলে শ্যামল বুদ্ধি করে এড়িয়ে যেত। খুব চাপাচাপি করলে বড়জোর হতভাগ্য মানুষগুলোর গায়ে মাথায় একটু ফুল বেলপাতা ঠেকিয়ে পুরোটাই ঈশ্বরের ওপর ছেড়ে দিত। শ্যামলের কর্মশালা ছিল সেই সব সমস্যা নিয়ে যার থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। সংসারের স্বাভাবিক নিয়মেই এগুলো মিটে যায়। কখনও হয়ত কিছুটা সময় লাগে। তবু মন মানে না। অনেকেই তার মত মানুষের শরণাপন্ন হয়। আর তখনই শুরু হয় শ্যামলের খেলা।

শ্যামলের আধ্যাত্মিক জীবনে আত্মীয় পরিজনের প্রবেশাধিকার না থাকলেও ভাগ্নে শুভকে কিছুতেই ঠেকান যায় না। মাঝে মাঝেই চলে আসে। যদিও শ্যামল জানে যে শুভ আদৌ মনে কোন ভক্তিভাব নিয়ে আসে না, তবু তাকে খেদাতে পারে না। তার একটা কারণ শুভকে সে ভালবাসে, আর তার থেকেও বড় কারণ হল, ওকে ঘাটালে বিপদ হতে পারে। তাই একরকম বাধ্য হয়েই ভাগ্নের সামনেই বুজরুকি কারবারগুলো চালাতে হয়। মানুষ যখন সমস্যা, দুঃখ, কষ্ট থেকে মুক্তির জন্য মামার চরণে বসে থাকে তখন শুভ দূরে দাঁড়িয়ে মুচকি মুচকি হাসে। সবে পড়াশোনা শেষ করেছে। বেকার ছেলে, হাতে অফুরন্ত সময়, তাই খানিকটা সময় কাটাতেই মামার এই ফ্ল্যাটে মাঝে মাঝে চলে আসে। সময়টা ভালই কাটে।

একদিন বিকেলবেলা, লোকজন তখনও তেমন আসেনি, ভাগ্নেকে ডেকে শ্যামল জিজ্ঞেস করল—এদের চিনিস ? তোদের দিকেই থাকে, পানিহাটিতে বাড়ি।

শুভ আড়চোখে একবার দেখল। সামনে দুজন সুশ্রী মেয়ে বসে আছে আর পাশে বোধহয় ওদের মা। মেয়ে দুটির তিরিশের কমেই বয়েস। মামার কাছে জানতে পারল লেখাপড়ায় দুজনেই বিএ পাশ করেছে কিন্তু সাংসারিক জীবনে বিয়ের গণ্ডিটা তখনও পার করে উঠতে পারেনি। এটাই ওদের বাবা মায়ের মাথা ব্যাথার কারণ। কিছুদিন হল আসছে। এমন মেয়েদের বিয়ে না হওয়ার কোন কারণ নেই। দেখলে অপছন্দ হওয়ার কথা নয়। হয়ত ঠিকভাবে চেষ্টা হয়নি অথবা অন্য কোন কারণে হয়ত যোগাযোগটা হয়ে ওঠে নি। অগত্যা মামার শরণাপন্ন হয়েছে।

শ্যামল দু শিশি মন্ত্রপূত জল দুজনকে দিয়ে বলল—সকালবেলা স্নান সেরে ঠাকুর নমস্কার করে চার পাঁচ ফোঁটা করে প্রতিদিন খাবে। ফল ফলতে বাধ্য।

এত জোর দিয়ে বলল কারণ মামাও শুভর মত বুঝেছিল যে এই মেয়েদের বিয়ে হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। হলও তাই। প্রথমে ছোট আর তার কিছুদিন পরে বড়র বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। বাবা, মা ও দুই মেয়ে এসে শ্যামলের পায়ে আছড়ে পড়ল।

মা আঁচল দিয়ে গুরুর পা মুছতে মুছতে বলল—বাবা আপনার জন্যই সব হল। অনুষ্ঠানের দিনগুলোতে আপনার পদধূলি থেকে আমাদের বঞ্চিত করবেন না।

–আমি আবার কি করলাম রে ! সবই তেনার ইচ্ছে।

স্মিত হেসে খুব অমায়িক ভাবে শ্যামল কথাটা বলল।

–না বাবা, কথা ঘোরাবেন না। আপনি ছাড়া এ বিয়ে হবে না।

হঠাত করে কেউ কথাটা শুনলে ভাববে পাত্র বোধহয় শ্যামল।

–পাগলী কোথাকার। ঠিক আছে শরীর ভাল থাকলে যাব।

ভদ্রমহিলা খুবই আহ্লাদিত হয়ে আবার একবার ঢিপ করে প্রণাম করে বাড়ি ফিরে গেলেন। সেই বিয়েতে পদধূলি দিয়ে শাল, ধুতি, রঙিন টিভি ছাড়াও শ্যামল পেয়েছিল মোটা প্রণামী। এমন জোরাজোরি করল যে বাধ্য হয়ে নিতে হল। না হলে ওরা কষ্ট পাবে যে।

আর এক দিনের কথা। শুভ তালতলার ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখে যে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। এ সময়ে দরজা তো রোজ খোলাই থাকে। কড়া নাড়ল।

ভেতর থেকে মহিলা কন্ঠ ভেসে এল—কে ?

শুভ নাম বলল। উত্তর এল—একটু দাঁড়ান।

মিনিট দুয়েক বাদে বছর পঞ্চাশের এক প্রৌঢ়া দরজাটা একটু ফাঁক করে বললেন—ভেতরে আসুন।

শুভ ভেতরে ঢোকার সাথে সাথেই দরজা আবার বন্ধ হয়ে গেল। ভদ্রমহিলা সামনের বারান্দায় একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বললেন—এখানে বসুন।

তারপর মামা যে ঘরে আছে সেই ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন।

ব্যাপারটা শুভর খুব সুবিধের ঠেকল না। মামা গুলতাপ্পি দিয়ে ধর্মের কারবার করে এটা তার জানা। কিন্তু মামার নারীঘটিত কোন সমস্যা এতদিন তার চোখে পড়েনি। এবার তাহলে এই লাইনটাও ধরেছে।

ঘরের দরজা বন্ধ। আগেকার দিনের খড়খড়ি লাগান দরজা। অনেক ফাঁক ফোকর আছে। কৌতূহল সামলাতে না পেরে শুভ দরজায় উঁকি দিল। যা দেখল তাতে তার ভিরমি খাওয়ার উপক্রম হল। ভিতরে একটি তরুণী মাটিতে শতরঞ্চির ওপর চিত হয়ে শুয়ে আছে। তার পেটের কাছে কাপড় অনেকটা সরানো। পেটটা লাল হয়ে আছে। দূর থেকে রক্তই মনে হচ্ছে। মেয়েটির উন্মুক্ত পেটে মামা হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। মামার হাতের তালুও লাল। মামার পাশে সেই প্রৌঢ়া বসে রয়েছে। ভয়ানক কান্ড। মামা এবার ধনে প্রানে মরবে। যে কোন সময় বিপদ হতে পারে। আর মামা মার খেলে ভাগ্নেও ছাড়া পাবে না। শুভ একবার কেটে পড়ার কথা ভাবল। কিন্তু পুরো ব্যাপারটা দেখার লোভও ছাড়তে পারছে না। বিপদ মাথায় নিয়েও আবার দরজায় চোখ রাখল। অনেকক্ষণ লক্ষ করে আর ভেতরের কথোপকথন কিছু কিছু শুনে শুভ যা উদ্ধার করল তা হল—মেয়েটি অন্তঃসত্তা। প্রৌঢ়া তার মা। মা আর মেয়ে বাবার কাছে এসেছে গর্ভস্থ সন্তানের মঙ্গল কামনায়। বাবা বিমুখ করেননি। যা রক্ত ভেবেছিল, তা আসলে সিঁদুর। পাশে একটা কৌটোয় রাখা রয়েছে। মামা মেয়েটির পেটে পুজোর সিঁদুর যত্ন করে লেপে দিয়েছে। ক্রিয়া কর্মের শেষে মা আর মেয়ে বাবার একটা করে পা ভাগে নিয়ে বহুক্ষণ তাতে মাথা ঘষল।

শেষে মা কিন্তু কিন্তু করে জিজ্ঞেস করলেন—বাবা, আপনি অন্তর্যামী। বলুন না ছেলে হবে না মেয়ে ?

শুভ আগেও দেখেছে এখন আবার দেখল মামা কি নিপুন দক্ষতায় এইসব অশান্তির প্রশ্ন পাশ কাটায়। ছেলে বা মেয়ে কোনটাই বলা যাবে না কারণ, উল্টোটা হলেই বিপদ।

‘জানি কিন্তু বলব না’ গোছের মুখ করে মামা বলল—ছেলে না মেয়ে এসব নিয়ে কখনও ভাবে। যেটি আসছে মায়ের ইচ্ছেয় তোদের ঘর আলো করে দেবে। এবার সাবধানে বাড়ি ফিরে যা।

শুভ পরে জেনেছে যে মেয়েটি যথাসময়ে একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেয়। যেহেতু অন্তঃসত্তা হওয়া ছাড়া বাকি সবই মামার কৃপায় হয়েছে তাই মামার সেবার নিমিত্ত রকমারি সামগ্রী আসে, যার মধ্যে প্রণামীটা বেশ বড় অঙ্কের ছিল। তবে টাকা মামা কখনও হাতে নেন না। বড় একটা প্রণামীর বাক্স আছে, ওতেই ভক্তরা যা দেওয়ার দেয়। এইভাবে ধীরে ধীরে দামী উপহারে তালতলা আর বেহালার ঘর ভরে গিয়েছে। লুকিয়ে একদিন মামার ব্যাঙ্কের পাশ বইটা দেখে শুভর চোখ কপালে উঠে গেল। সেভিংসেই রয়েছে ছ লাখ টাকা। না জানি ফিক্সড এ আরো কত আছে। জীবনের সমস্ত ঝড় ঝাপটা সামলে মামা এখন একজন সফল মানুষ। সে কি হতে পারত ! শিক্ষক, অধ্যাপক বা বড়জোর একজন আমলা। এত সম্পত্তি আর প্রতিপত্তি যে কোন প্রতিষ্ঠিত লোকেরও ঈর্ষার কারণ হতে পারে। সত্যিই মামার জবাব নেই।

আজ জন্মাষ্টমী। বিশেষ দিন। তালতলার ফ্ল্যাটে সাজো সাজো রব। তবে কৃষ্ণের জন্মদিন উপলক্ষে নয়। আর এক মহাপুরুষ আমাদের বাবাও তো আজকের দিনেই পৃথিবীতে এসেছিলেন। যদিও শুভ আর বাড়ির সকলে জানে যে এটাও একটা মস্ত গুল। আসলে সাদামাটা দিনের থেকে কোন বিশেষ দিনে জন্ম হলে গুরুত্বটা অনেক বেড়ে যায়। তাই অনেক চিন্তা করেই দিনটা ঠিক করা। ভক্তদের কাছে বাবা কৃষ্ণের অংশ। অন্যান্য দিনে সাধারণত একটা শিফটেই ভক্ত সমাগম হয়। আজ সকাল থেকেই ফুল, ফল, মিষ্টি , কাপড় আর বিবিধ উপহার নিয়ে ভক্তের ঢল নেমেছে। বাবা সকাল আটটায় এসেছেন। আজ ভক্তরা সব পা ধোয়াবে বলে আবদার করেছে। এদের মনে ব্যাথা দিতে খারাপ লাগে, তাই পুজোর পর চেয়ারে গিয়ে বসেছেন। চরণ যুগল বড় একটা কাঁসার থালার মধ্যে রয়েছে। তাতে ভক্তরা ক্রমাগত জল ঢেলে যাচ্ছে। জল কিন্তু থালা উপচে বাইরে কখনও পড়ছে না। কারণ, বাবার পা ধোয়া জলেরও অনেক মাহাত্ম। তাই এর অসম্ভব চাহিদা। থালায় জমা জল সঙ্গে সঙ্গে শিশিতে ভরে ভক্তদের কাছে চালান হয়ে যাচ্ছে। আসলে এ জল তো রোজ পাওয়া যায় না। বিশেষ বিশেষ দিনে বাবা অনুমতি দেন।

এই রকম বিশেষ দিনগুলোতে বাবার একজন সহকারীর দরকার হয়। শুভ এই ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করলেও মামা তার ব্যাপারে কোন আগ্রহ দেখায়নি। ওর চাইতে ভক্তরা অনেক নিরাপদ। তারা অনেক নিষ্ঠার সঙ্গে এ কাজ করে আর কোন জিনিস খোয়া যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে না। দুজন মহিলা ভক্তদের আনা সব উপহার সামগ্রী ঘরের একধারে গুছিয়ে রাখছেন। প্রণামীর টাকায় বাক্স ভরে গেছে এখন বড় থালাতে তা রাখা হচ্ছে। দুপুরে ঘণ্টা খানেকের মত বিরতি। বাবা তখন অন্নগ্রহণ করবেন। তারপর কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে বিকেলের শিফট চালু হবে। অনেকেই গুরুর জন্য বিভিন্ন পদ রান্না করে এনেছেন। যদি গুরু অনুগ্রহ করে তা গ্রহণ করেন এই আশায়। গুরু কাউকেই বিমুখ করেননি। তাঁর নির্দেশে সকলের আনা খবার থেকেই একটু করে পাথরের একটা বড় পাত্রে তুলে রাখা হচ্ছে। বাকিটা প্রসাদ হিসেবে ভক্তরা খাবে।

বিকেল প্রায় ছটা পর্যন্ত ভক্তদের আসা, যাওয়া, অনুরোধ, আবদার সব চলল। সাতটার মধ্যে তালতলার ফ্ল্যাট ফাঁকা হয়ে গেল বা বলা যায় ফাঁকা করা হল। খুব কাছের দু একজন ভক্ত কেবল রয়ে গেলেন। তাঁরা জিনিসপত্র সব গোছগাছ করে গুরুদেবকে গাড়িতে করে বেহালার বাড়িতে পোঁছে দিয়ে এলেন। সব মিটিয়ে বাড়ি ফিরতে একটু দেরী হয়ে গেল।

ক্লান্ত শ্যামল বিছানায় আধ শোয়া হয়ে ঘরের চারপাশটা একবার দেখল। কোন জিনিসের অভাব নেই। আজকের আনা জিনিসগুলো ওরা একপাশে গুছিয়ে রেখে গেছে। প্রণামীর টাকাটা এখনও গুনে দেখা হয়নি। কয়েক হাজার তো হবেই। অর্থ, সম্পদ যা ওর জমেছে তাতে একটা কেন কয়েকটা জীবন কেটে যাবে। আর এত মানুষের শ্রদ্ধা, ভালবাসা পাওয়া কি কম কথা। এতদিন যা তার স্বপ্ন ছিল আজ তা বাস্তব।

হঠাত টেবিলের দিকে চোখ গেল। একটা থালায় খাবার ঢাকা রয়েছে। ঢাকা না খুলেই বলে দিতে পারে ওর মধ্যে কি আছে। অত্যন্ত অভক্তিতে রাখা রোজকার বরাদ্দ কয়েকটা রুটি আর তরকারি। পাশে বসে যত্ন করে খাওয়াবার বা একসাথে বসে খাওয়ার কেউ নেই। এমনকি দুটো সুখ দুঃখের কথা বলার মতও বাড়িতে একজনও নেই। বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। এত সম্পদ, এত আধিক্যের মধ্যেও নিজেকে বড় নিঃস্ব মনে হচ্ছে। এ শূন্যতা অর্থ, যশ কোন কিছু দিয়েই পূর্ণ হওয়ার নয়। আজ যদি রত্না থাকত!

 

~ আজ যদি রত্না থাকত ~
Print Friendly

LEAVE A REPLY

*