কিরীটী বাবু রিটায়ার করেছিলেন বছর ছয়েক আগে । সময়টা সম্ভবত উনিশ শ সত্তরের দশকের প্রথম দিকের কথা । রেলে কাজ করতেন তিনি, সেই সুবাদে কাছেপিঠে বেশ কয়েকটি জায়গায় বেড়াতেও গেছিলেন । হাওড়া স্টেশন মোটেও অজানা জায়গা নয় তাঁর এবং তাঁর স্ত্রী গীতা দেবীর কাছে। আসা যাওয়ার পথে অনেকবারই আসতে হয়েছে সেই স্টেশনে । এমন কি তাঁর নিজের চাকরি জীবনে তিনি বছর তিনেক সেই স্টেশনের বেশ কাছাকাছি একটি আপিসে কাজও করেছেন ।

তখন দুপুর গড়িয়ে সবেমাত্র বিকেল হতে চলেছে, তিনি সেসময় একটি চা-ওয়ালা-কে ডেকে মাটির ভাঁড়ে দুটি চা নিয়েছেন । গীতা দেবীর এত তাড়াতাড়ি চা খাওয়ার ইচ্ছে ছিল না, তাই দু-চার-কথা স্বামীকে শুনিয়েছেন, তারপর যাই হোক, তিনিও চায়ের ভাঁড়টি নেন । বকর বকর করে কথা বলার অভ্যাসটা তাঁর একটু বেশীই । আর কিরীটী বাবু এই একটা ব্যাপারে আদর্শ স্বামী, কারণ তিনি শ্রোতার ভূমিকায় এক্কেবারে চমৎকার । যথারীতি, চায়ের সাথে সাথে গীতা দেবীর ম্যারাথন কথা-বলা শুরু হয়ে যায় । তিনি বলে যাচ্ছেন আর কিরীটী বাবু শুনে যাচ্ছেন । আর কখনো কখনো মাঝে মধ্যে দু-এক-বার ‘হ্যাঁ’, ‘না’, ‘ঠিকই-তো’ বলে যাচ্ছেন, অনেকটা শূন্যস্থান পুরন করার মত ।

মিনিট দশেক পরে, একটি বছর পঁচিশের ছেলে পরনে ধপধপে পরিষ্কার পাজামা পাঞ্জাবী, পায়ে পালিশ করা চামড়ার চটি, হাতে এইচ.এম.টি-র ঘড়ি, কাছে এসে এক-গাল-হেসে তাদের দুজনকে প্রণাম করে । দুজনাই তাকে ঠিক চিনতে পারলেন না । তখন সেই ছেলেটি তার নিজের পরিচয় দেয়, যে সে নিশীথ, তাঁদের বড় মেয়ের আসানসোলের বাড়ির ঠিক পাশের বাড়িরই ছেলে, সে বলে যে, গীতা পিসি আর পিসেমশায় কে আসানসোলের বাড়িতে সে বেশ কয়েক বার দেখেছে । পিসির ছোট ভাই শম্ভুনাথ-কাকু, কাকিমা, তাদের চার ছেলে-মেয়ে সবারই নাম, খবরাখবর সে গড় গড় করে বলে দেয় এক নিমেষেই। আর দাদু …

পুরোটা নিশীথ বলার আগেই পিসিমা, মানে গীতা দেবী, তাঁর বাবার কথা জানতে চাইলেন খুব আগ্রহের সাথে ।

… “সেই জন্যেই তো খুঁজতে খুঁজতে এখানে আমার ছুটে আসা।” এই কথা গুলি নিশীথ তড়িঘড়ি বলে উঠে । সে আরও জানায়, “দাদু তো পি জি তে ভর্তি আছে, দাদুর শরীর মোটেও ভাল নেই, কাকু আর তাঁর ভায়রা-ভাই এবং আমি আর আমার-ভাই আমরা চার জন দাদুকে নিয়ে এসেছি কোলকাতায় ।”

পিসিমা ও পিসেমশায়ের আর ট্রেন ধরা হল না । তারা তিন জনা বাইরে এসে ট্যাক্সি ধরে, চললেন পি জি হাসপাতালের দিকে । নিশীথ তাঁদের কে নিয়ে পি জি হাসপাতালেই আসে । বাইরে বসার জায়গাতে পিসিমাকে বসিয়ে রেখে, সে আর পিসেমশায় দুজন মিলে যায়, ঠিক কোথায় গেলে তারা দাদুর সাথে দেখা করতে পারবে, সেটা জানার জন্যে । কিরীটী বাবুকে সাথে নিয়ে দু-এক-জায়গায় সে দাদুর নাম বলে জিজ্ঞাসাও করে । কিন্তু হাসপাতালের লোকেরা কেওই ঠিক করে বলতে পারে না সেই নামের কোন পেসেন্টের ব্যাপারে । ইতিমধ্যে আর একটি বছর কুড়ি বাইশের ছেলে আসে তাদের কাছে, সে প্রথমেই টুক করে প্রণাম করে, আর বলে, “কেমন আছেন পিসেমশায়?” আর তারপর পরিচয় দেয় যে সে নিশীথের ছোট-ভাই, নাম বাচ্চু ।

“শম্ভু কাকু এখন পেসেন্টের কাছে, এখন এক্স রে আর সি-টি-স্ক্যান করানর জন্য নিয়ে গেছে ।” বাচ্চুকে পেয়েই নিশীথ তাড়াতাড়ি তাকে বলে উঠে, “তুই পিসেমশায় কে দাদুর কাছে নিয়ে যা, আমি ততক্ষণে পিসিমাকেও ডেকে আনছি।” এই বলে নিশীথ, বাচ্চুকে কিরীটী বাবুর কাছে রেখে, তড়িঘড়ি চলতে শুরু করে। ঠিক সেসময় কিরীটী বাবু একটু জোর দিয়েই বলে উঠেন, “আরে আরে নিশীথ, দাঁড়াও বাবা, সবাই মিলে এক সাথেই যাবো ।” ততক্ষণে তিনি নিশীথ কে মানুষের ভিড়ে, মুহূর্তের মধ্যে হারিয়ে ফেলেন। ঠিক তেমনি ভাবেই যে বাচ্চু কে নিশীথ পরিচয় করিয়ে দেয় কয়েক সেকেন্ড আগে, সে বাচ্চু-কেও আর তিনি খুঁজে পেলেন না । যেন ম্যাজিকের মত উধাও হয়ে গেল তারা দুজনাই ।

ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁর মনের অবস্থা এক্কেবারে দিশেহারার মতো, তিনি মনে মনে তখন একটিই কথা বলতে থাকেন, “এক্ষণই গীতাকে আগে খুঁজতে হবে। আগে গীতাকে খুঁজতে হবে ।” আর সেই জন্য তিনি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলতে শুরু করেন যেখানে নিশীথ পিসিমাকে বসিয়ে রেখে আসে সেইখানে যাওয়ার জন্য । সেখানে আসতে তার বেশ কিছুটা সময় লেগে যায় । বিরাট সেই হাসপাতাল তার উপর মানুষের ভিড়ের মধ্যে একা প্রায়-সত্তরের কাছাকাছি বয়সের একটি মানুষ দিশে হারার মত খুঁজে যাচ্ছিলেন । উপরে, নিচে, ডানদিকে, বাঁদিকে খুঁজতে খুঁজতে তিনি সেই জায়গা টিতে এসে পৌঁছান যেখানে তাঁর গীতা বসেছিল । বেশ কয়েকজন মানুষকে যারা ওখানেই বসেছিল তাদের কে তিনি জিজ্ঞাসাও করেন গীতার ব্যাপারে । দু এক জন বলে একটি পাজামা পাঞ্জাবী পরা কোন ছেলের সাথে গীতা দেবীকে বাইরে চলে যেতে লক্ষ্য করেছে । এবং সেই ছেলেটির বয়েস প্রায় পঁচিশ বছরের মতই হবে । বেশ কয়েক মিনিট ধরে নিশীথ এবং বাচ্চুর তৈরি করা সেই অলীক জগতের থেকে তিনি যেন ছিটকে বেরিয়ে আসেন । তিনি বেশ বুঝতে পারেন, এতক্ষণ ধরে যা যা হয়েছিল তা সবই ভুয়ো, সাজানো । গভীর ঘুম ভাঙ্গার পরই কয়েক-সেকেন্ড যেরকম একটা আচ্ছন্ন-অবস্থা হয়, তাঁর মনের অবস্থাটাও ছিল ঠিক সেই রকম ।

সেই সময় এই একটাই প্রশ্ন তাঁকে অস্থির করে তুলে, “এবার আমি গীতা কে কোথায় খুঁজবো?” ততক্ষণে নিশীথ পিসিমাকে সাথে নিয়ে একটি রিকশাতে বসে চলে যায় বেশ কিছুটা দূরে, কারণ সে পিসিমাকে তাঁর বাবার সাথে দেখা করিয়ে দেবার কথা বলেছিল । কিরীটী বাবু তখন পাগলের মত সেই বিরাট বিল্ডিং গুলির বিভিন্ন দিকে খুঁজছেন আর একবার করে ঠিক সেই জায়গাটিতেই ফিরে ফিরে আসছেন যেখানে ছোট কালো ব্যাগটি পাশে রেখে গীতা বসেছিল । তাকে বসিয়ে রেখে নিশীথ আর তিনি চলে গেছিলেন অস্তিত্ব-বিহীন-রুগীর খোঁজ করতে । তাঁর মাথা আর মোটেও কাজ করছিল না । দম দেওয়া খেলনা পুতুলের মত তিনি তখন উপর, নিচ, চারিদিক খুঁজে বেড়াচ্ছেন ।

ওদিকে রাস্তার পর অন্য ছোট-রাস্তা তারপরে গলি আবার কোন গলি যেদিকে রিকশাতে করে নিশীথ পিসিমাকে নিয়ে যাচ্ছিল সেই দিকটা দেখে পিসিমা বার বার তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, “বাবা, এই দিকে কোথায় হাসপাতালের ঘর আছে?” নিশীথ পিসিমাকে ভুজংভাজাং দিয়ে বোঝানোর জন্য বিভিন্ন ভাবে মিষ্টি করে কথা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলে যায় । পিসিমার এতক্ষণে যেন কেমন কেমন সন্দেহ হতে শুরু হয় । তিনি একটু উঁচু গলাতেই রিকশাওয়ালা কে জিজ্ঞাসা করেন, “হ্যাঁ বাবা, এই দিকে কোথায় হাসপাতালের ঘর আছে?” রিকশাওয়ালা আর কোন উত্তরই দিতে পারে না । এবং এক জায়গায় রিকশাওয়ালা আচমকা দাঁড়িয়ে পড়ে । যেমনি সে প্যাডেল ছেড়ে পা মাটিতে নামিয়ে রেখে দাঁড়িয়ে পড়ে, ঠিক তখনই সেই নিশীথ রিকশা থেকে নেমে দৌড় দেয় পিছন দিকে । সামনেই একটু দূর থেকে একজন লোক পাশের দোকানে দাঁড়িয়ে থাকা লোক-জন কে বলে উঠে, “ধরুন ধরুন, ঐ ছেলেটাকে ধরুন, পালাল পালাল ।” পিছনে পিছনে কয়েক জন ছুটে যায় ।

পিসিমার মনের অবস্থা সেসময় যেন মাঝ দরিয়াতে নৌকা দিশা হারিয়ে ফেলার মত । তিনি যথারীতি কান্নাকাটি শুরু করে দেন । এদিকে যে লোকটিকে দেখে সেই রিকশাওয়ালা ভয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, আর সঙ্গে সঙ্গে সেই নিশীথ নামের ছেলেটিও পালিয়ে যায়, সেই লোকটি কাছে আসেন । তিনিই ছিলেন রিকশাটির আসল মালিক, নাম হরেন বাবু, সেই জায়গার কাছাকাছিই তাঁর বাড়ি । তিনি তো কাছে এসেই সেই রিকশাওয়ালাকে খুব করে বকুনি দেন, সে যদি আর কখনো ওই রকম সব লোকদের সাথে মেলামেশা করে তাহলে তিনি তাঁর রিকশা তাকে আর চালাতে দেবেন না সেকথা সাফ জানিয়ে দেন । আর তারপর তিনি গীতা দেবী কে আশ্বাস দিয়ে বলেন, “দিদি, আপনার কোন চিন্তা নেই, এ অঞ্চলে আমাকে সবাই চেনে, আমি এখুনি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি, আপনাকে যেখান থেকে এই রিকশাওয়ালা নিয়ে এসেছে ঠিক সেখানেই সে পৌঁছে দেবে ।”

গলির দুপাশের বেশ কয়েকজন দোকানি ছুটে আসে এবং পিসিমাকে আশ্বস্ত করে । আর বলে, যে তারা সবাই হরেন বাবুকে চেনে সুতরাং তাঁর আর কোন অসুবিধে হবে না । একটি দোকান থেকে এক ভদ্রমহিলা বেরিয়ে এসে পিসিমার সাথে রিকশাতে বসে এবং বলে, “চলুন মাসিমা আপনাকে আমি ঠিক মেসো-মশায়ের কাছে পৌঁছে দেব, আপনার কোন চিন্তা নেই । আসুন।” পিসিমার প্রায় মেয়ের বয়েসেরই সেই ভদ্রমহিলা ।

রিকশা আবার চলতে শুরু করে, দুইজন মহিলা ধীরে ধীরে দু একটি করে কথা বলাও শুরু করে । কয়েক মিনিট পরেই সেই ভদ্রমহিলা গড় গড় করে কতই না কথা বলে যায় তার নোতুন পরিচিত মাসিমার সাথে । রিকশাওয়ালাকে সাথে নিয়ে সেই ভদ্রমহিলা তার কথা-মতই হাসপাতালের ঠিক সেই জায়গায় এসে মেসো-মশাইকে খুঁজে বের করে । মাসিমা দুহাত দিয়ে জড়িয়ে তাকে আদর করেন আর প্রান ভরে আশীর্বাদ করেন ।

*****

~ Aleek ~

Print Friendly, PDF & Email
Previous articleবিপন্নতা
Next articleরোজনামচায় ভালোবাসা
Chandrayee Bhattacharyya(Pathak)
বাড়ি বাঁকুড়া জেলার মন্দির-নগরী বিষ্ণুপুর শহরে, জন্ম সেখানেই। বাবার চাকরিসূত্রে গুজরাতে আসা। আর তার জন্যই স্কুল কলেজের পড়াশুনা গুজরাতের কাঠিয়াবাড় প্রান্ত থেকে। বর্তমানে ফার্মাকোলজি নিয়ে পোস্ট গ্রাজুয়েশন করে বরোডা সিটির একটি এম এন সি তে কর্মরত। মাতৃভাষা বাংলার সাথে শিশু অবস্থা থেকে কখনই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। নিজের পড়াশুনোর মাধ্যমে ইংরেজি, হিন্দি এবং গুজরাতি শেখার সাথে সাথেই বাংলা বইও পড়তে ভালো লেগেছে বরাবরই।
0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments