কি মশাই কি ঠিক করলেন?’ মডারেটর প্রশ্নটা করলেন সদানন্দবাবুকে। সদানন্দবাবু একইভাবে তাকিয়ে রইলেন। এবার মডারেটর তাকালেন শ্রীমতী শান্তির দিকে। মুখ ফিরিয়ে নিলেন তিনিও। মডারেটরের চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। বললেন ‘ আরে কেউ ত কিছু বলুন। বরফটা ত গলাতে হবে’। শান্তি ঝাঁঝিয়ে বললেন ‘আমি নতুন কিছু ঠিক করি নি’। মডারেটর সদানন্দবাবুকে জিজ্ঞাসা করলেন ‘আপনারও কি ঐ একই কথা?’ সদানন্দবাবু নিরুত্তর। মুখে একটা বিরক্ত আর নির্লিপ্ত ভাব। শান্তি মুখে রাগ নিয়ে বলে উঠলেন ‘আমি আর এসবের মধ্যে নেই।’ মডারেটর বললেন ‘কেন বলুন ত? আপনাদের সমস্যাটা কী?’ সদানন্দবাবু বললেন ‘ নয় বছর পর খেয়াল হয়েছে আমার এখানে থাকা যায় না।’
রোষকষায়িত নেত্রে একবার সদানন্দবাবুর দিকে দৃষ্টিপাত করে চোখ সরিয়ে নিলেন, যেটা সদানন্দবাবু দেখেও দেখলেন না। মডারেটর এবার হেসে ফেললেন। বললেন ‘দেখুন বরফ গলাতে হবে। কিছু ত বলুন’। শান্তি বললেন ‘ নটা বছর কি করে যে কাটিয়েছি আমিই জানি।’ মডারেটর ঘাড় বেঁকিয়ে বললেন ‘ আপনি অভিযোগ করেছেন আপনার ওপর শারীরিক আর মানসিক অত্যাচার হয়েছে। সেটা কি রকম?’
শান্তি তাকিয়ে রইলেন থমথমে মুখ নিয়ে। মডারেটর বলে চললেন ‘ দেখুন, ডিভোর্স চাই বললেই ত হাতের নাড়ুর মত ডিভোর্স পাওয়া যায় না, সাক্ষ্য প্রমাণ চাই। আচ্ছা বলুন ত আপনি কী থানায় গিয়েছিলেন অত্যাচারের রিপোর্ট লেখাতে’? শান্তি বললেন ‘গিয়েছিলাম, ওরা রিপোর্ট নেয় নি’।
-‘আপনি কোন অভিযোগ নিয়ে থানায় গিয়েছিলেন?’
টেবিলের ওধার থেকে খিঁক করে একটা হাসি চাপার আওয়াজ হল। মুখে হাত চেপে সদানন্দবাবু ওদিকে মুখটা ঘোরালেন। মডারেটর ভদ্রলোকের মুখে মুচকি হাসি, শান্তির নাক রাগে ফুলে উঠল।

বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা চলছে। শ্রীমতী শান্তি আদালতে মামলা দায়ের করেছেন। বিয়ের নয় বছর কেটে গেছে। দুজনেই মাঝবয়সী। ভারপ্রাপ্ত বিচারক প্রথমে দুই জনের মিল করার চেষ্টা
করেছিলেন – একসাথে বেড়াতে পাঠানোর প্রস্তাবও নাকচ হয়ে গেছে। এখন মডারেটরের কাছে কেস পাঠিয়ে দিয়েছেন। মডারেটরের কাছে আজ দ্বিতীয় তারিখ। কামরায় টেবিলের দুই ধারে সদানন্দবাবু আর শ্রীমতী শান্তি উপস্থিত। ওঁরা নিঃসন্তান।

মডারেটর বললেন ‘কী মানসিক অত্যাচার হয়েছিল আপনার ওপর?’
‘আমার দিকে তাকানোর ই সময় নেই। শুধু খেটে যাও সারাদিন। একটু সুখ সোয়াস্তি নেই।’ সদানন্দবাবু বললেন ‘এসব রাগের কথা। সব গিন্নীরাই বলে।’ শান্তি বললেন ‘ সব লোকগুলোই একরকম’। মডারেটর বললেন ‘ মানসিক কোন অত্যাচার অসহ্য লাগছিল? নটা বছর ত কাটিয়েই দিলেন’। শান্তি বললেন ‘ আমার কোন অধিকার নেই, স্বাধীনতা নেই সংসারে।’ মডারেটর সদানন্দবাবুর দিকে চেয়ে বললেন ‘কি মশাই , কি শুনছি’?
-‘ওকেই জিজ্ঞাসা করুন, আমি বলতে পারব না।’
মডারেটর শান্তিকে বললেন ‘ একটু খুলে বলুন ত ব্যাপার কী?’ শান্তি রাগী রাগী মুখে কোন কথা বললেন না। মডারেটর ঘড়ির দিকে চেয়ে বললেন ‘ঠিক আছে পরের দিন এসে বলবেন খন। আজ আসুন আপনারা’।
একরাশ বিরক্তি নিয়ে তক্ষুনি উঠে পড়লেন সদানন্দবাবু। ফটাস ফটাস করে বেরিয়ে গেলেন।

দু মাস পরে পরবর্তী তারিখ। আবার মডারেটরের সামনাসামনি টেবিলে দুজন। মডারেটর জিজ্ঞাসা করলেন ‘ আপনারা এখন আছেন কোথায়?’ শান্তি বললেন ‘আমি আছি বাপের বাড়ি।’ ‘আমি আছি একই জায়গায়, নিজের বাড়ি’ বললেন সদানন্দবাবু। মডারেটর বললেন ‘দেখুন, আজ বেশি সময় নষ্ট না করে বলে ফেলুন দেখি- আদপে কী হয়েছিল? আপনাদের ঝগড়াটা কিসের?’ সদানন্দবাবু মুখ বেঁকালেন। শান্তি বললেন ‘ আমাকে স্বস্তিতে থাকতে দিতেন না উনি। আমার কোন স্বাধীনতা নেই সংসারে। আমার কোনো সাধের কোনো খেয়ালই করে না।।’ বুলিগুলো কতকটা উকিলের শেখানো। সদানন্দবাবু বললেন ‘ কাতলা মাছের বদলে রুই মাছ আনলেই সেটা অত্যাচার।’ শান্তি অনুযোগের সুরে বললেন ‘ সন্ধ্যাবেলাটা একটু নিশ্চিন্তে টিভি দেখার উপায় নেই। সঙ্গে সঙ্গে রিমোট নিয়ে নেবে আর খেলা দেখতে শুরু করে দেবে।’ মডারেটর এবার ভ্রূ কুঁচকে তাকালেন প্রথমে শান্তি তারপর সদানন্দবাবু র দিকে। সদানন্দ বললেন ‘খেলা কী রোজ থাকে?’
‘ এই প্রথমবার শুনলাম আপনার মুখে ঝগড়াটা আসলে কিসের। টিভি দেখা আর রিমোট- তাই ত?’ দুজনেই নিরুত্তর। মডারেটর শান্তির দিকে একটু ঝুঁকে বললেন ‘ কি আর কোন কারণ আছে ঝগড়ার?’ সদানন্দ আর শান্তি র মুখ চাওয়া চাওয়ি হল একবার। শান্তির মুখটা একটু সহজ দেখাচ্ছে আজ। মডারেটর হেসে বললেন ‘ আপনাদের তার মানে টিভির রিমোট নিয়ে ঝগড়াটা। আরেকটা টিভি আর কেবল কানেকশন আনিয়ে নিন; পারবেন না? ‘ সদানন্দ বললেন ‘ আমিও কি চেয়েছি নাকি এই নিয়ে আদালতে আসতে? আমার ভাইপো ত ওনাকে বেশ ভালবাসে। পরশুদিনই বলছিল টিভি আর কেবল কানেকশন করিয়ে দেবে আরেকটা।’ মডারেটর বললেন ‘ কি দিদি, আপত্তি নেই ত?’ শান্তির মুখে একটা হাসির রেখা দেখা গেল। মাথা নীচু করে ঘাড় নাড়িয়ে সম্মতি জানালেন।
-‘ঠিক আছে মামলা মিটিয়ে দিচ্ছি আর বিচারককে আমি রিপোর্ট পাঠিয়ে দেব। আপনারা পরের সপ্তাহে এসে সই করে দিয়ে যাবেন। আপনি কিসে এসেছেন সদানন্দবাবু?’
-‘ দু চাকা, মানে বাইক’।
-‘ দুজনে একসাথে বাইকে ফিরবেন। আর আলাদা নয়। একসাথে থাকবেন। পরের দিনও একসাথে আসবেন-ঠিক?’
দুজনেই মাথা নেড়ে একসঙ্গে কামরা থেকে বেরিয়ে গেলেন। মডারেটর কিছু লিখে নিয়ে ফাইলটা বন্ধ করলেন।

Print Friendly, PDF & Email
0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments