‘আচ্ছা শুনছো, আমি একটু বাজার থেকে ঘুরে আসছি। কি আনতে হবে?’ হরনাথ বাবু বললেন।

‘উফফ! এতবার তো বলি।  কিছু যদি মনে থাকে। ‘আওয়াজটা এলো রান্নাঘর থেকে। হরনাথ বাবু ঢোঁক গিললেন, ‘এই সেরেছে’। এটা হারানাথ বাবুর সবসময়ের জ্বালা। কিছুতেই মনে রাখতে পারেন না এই জিনিষপত্তরের লিস্ট। সংসার করা তো  কমদিন হলোনা, প্রায় ২৮ বছর। কিন্তু, তাও এই বাজার করার লিস্ট নিয়ে সবসময় স্ত্রীর মুখঝামটা খেতে হয়। একদিন তো ভুল করে হারানাথ বাবু পরপর দুদিন একই বাজার নিয়ে এলেন। সে কি কান্ড। হরনাথ বাবু লিস্ট বানানো শুরু করেছিলেন কিছু দিনের জন্যে। লুকিয়ে লুকিয়ে। পাচ্ছে গিন্নি টের পেয়ে  মজা ওড়ায়ে। এমনিতেও রেটিরেমেন্টের পরে স্ত্রী-ছেলে দুজনেই কথায় কথায় বলে, বাবা বুড়ো হয়ে যাচ্ছ।ভালোই চলছিল, কিন্তু সেদিন ভুলবশতঃ লিস্টটা বানানো হয়নি। বাজার যেতে দেরী হয়ে যাচ্ছিলো। আসলে, বাজারের আগে হরনাথ বাবু মোড়ের মাথায় চা-দোকানে একটু চা-সিগারেট খান সকালে। তার সঙ্গ দেওয়ার ২ -৩জন বন্ধুও থাকে। ওই একটু আড্ডা -গুজব, দেশের-দশের খবর আর কি। তা,এই আড্ডাটা তো লুকিয়ে। কারণ, আগে সকালে অফিস যাওয়ার তাড়া থাকতো। তার মধ্যে আড্ডার জন্যে বাজার আনতে দেরী হচ্ছে শুনলে গিন্নি তো তেলেবেগুনে জ্বলে উঠবে। তাই সেদিন জলদি করে বাড়ি থেকে বেরোনো। আর লিস্ট বানানোর সময় হয়নি। তার ওপরে সেদিন ভোটের চর্চা বন্ধুদের সাথে। পুরোনো লিস্টের কথা বেমালুম ভুলে একই জিনিস কিনে নিয়েছিলেন হরনাথ বাবু। ব্যাস, ঘরে কুরুক্ষেত্র! বৌ খেপে গজগজ করতে করতে তাদের ছেলে, নীল কে ফোন করে বললো, ‘বাবু, তোর বাবার মাথাটা গেছে। এদিকে নাকি সংসারে টানটান অবস্থা। আর ওদিকে উনি এতো শাক-সবজি নিয়ে এসেছেন যেটা কালকেও নিয়ে এসেছিলেন। ভাবতে পারিস, একি বাজার পরপর দুদিন। আর বলছে, ভুলে গেছে যে কালকে বাজারে কী কিনেছিলো। কি করি বল তো? তুই তোর বাবাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যা। আমার ভয় হচ্ছে যে মাথাটা একদম গেছে।’

হরনাথ বাবু কি লজ্জাটাই না পেয়েছিলেন সেদিন। তার ছেলে তখন MBA পড়ছে। কলেজের হোস্টেলে থাকে বেঙ্গালুরুতে । তার সাথে আরো দু-তিন জন বন্ধুও থাকে তারা ও নাকি খুব হেসেছে তার কীর্তি শুনে । ছেলের ওপর দুম করে খুব রাগ হয়ে গেলো । কি দরকার ছিল সবাইকে বলার । যাই হোক, সেদিন থেকে হরনাথ বাবু ঠিক করেছেন, আর এই সব লিস্টের চক্করে থাকবেন না। জিজ্ঞেস করে করে বাজার করবেন। দরকার হলে দু-তিন বার বাজার যাবেন । একটু হাঁটাও তো ভালো ।

তা, যাই হোক! মুশকিলটা হচ্ছে, এখন প্রত্যেক দিন গিন্নিকে জিজ্ঞেস করে বাজার করতে যেতে হয়। বেশির ভাগ দিন ঠিক উতরে যায়, কিন্তু আজকে মনে হচ্ছে না । আজকের দিনটাই বাজে মনে হচ্ছে । সকালে উঠেই হরনাথ বাবু দেখলেন তার খবরের কাগজটা উল্টো করে রাখা আছে। মনটাই খিচিয়ে গেলো। আজকের দিনটা কি বাজে যাবে নাকি? হড়বড়িয়ে হরনাথ বাবু একটা সটান প্রণাম মেরে দিলেন ঠাকুরের সামনে । ‘কালী মা, আজকের দিনটা একটু দেখো ‘।

আসলে , হারানাথ বাবুর এটা খুব বাজে অভ্যাস । কয়েকটা জিনিস হবে কি হবেনা, তার ওপরে একটা ভবিষ্যদ্বাণী বানিয়ে নেন। ওটাকেই দিনের লক্ষণ  মেনে নেন । যেমন, যখন ছোটবেলায় স্কুল যাওয়ার পথে যদি চারটের বেশি কাক দেখতে পেতেন, তাহলে বুঝতেন দিনটা ভালো যাবে। একদিন ক্লাস সিক্সে যখন রেজাল্ট আনতে যাচ্ছিলেন বাবার সাথে, কিছুতেই  তিনটের বেশি কাক দেখতে পাননি । বুক এমনিতেই দুরদুর করছিলো। ব্যাস, যেমনি ভাবা ,ওমনি ফল। অঙ্কে ফেল । সেই বাবার কুখ্যাত গাট্টা খেয়ে সেদিনটা মুখ বেজার করে কাটলো । এই চিহ্নগুলো কিন্তু পাল্টাতেই থাকে । মানে, ওনার  মনে নেই কখন কাক গোনা ছেড়ে দিয়ে, তার জায়গা জবা গাছ নিয়েছিল । যেদিন ঘরের জবা গাছে ফুল ফুটেছে , সেদিনটা ভালো । যেদিন ফোটেনি  সেদিনটা বাজে । অমনি একদিন ফুল ফোটেনি , ফুটবল খেলতে খেলতে বাঁ পাটা ভেঙে ছিল । আবার কিছুদিন পরে , সেটা বদলে গেছিলো চায়ের  কাপে । নিজের বাড়িতে ৬টা কাপ , তার মধ্যে একটাকে মনে মনে অপয়া  চিহ্নিত করেছিলেন । ব্যাস,  যেদিন গিন্নি ওই কাপে চা দিতো , তার মানে  দিনটা গেলো । নিজের মনেই এই সব নিয়ে  হাসতেন, কিন্তু খুব মানতেন । যেদিনকে তার ছেলে , নীল,  ১২ পাস করলো , সেদিন সকালে উঠেই  দেখেছিলেন ৬টা জবা আর চারটে গোলাপ ফুটেছিলো ঘরের বাগানে । যাই হোক , এখন কিছু করে , ব্যাপারটা খবরের কাগজে এসে দাঁড়িয়েছে । দরজার নীচ দিয়ে কাগজওয়ালা কাগজটা গলিয়ে দিয়ে যায় , কিন্তু যেদিন আনন্দবাজার পত্রিকা লেখাটা ওপরে থাকে , সেদিনটা ভালো , যেদিন অন্য দিকটা দিয়ে  ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে যায় , সেদিনটা খারাপ । তা , আজকে ওমনি একটা খারাপ দিন ।

তাই সকাল থেকেই একটু বিমর্ষ হয়েছিলেন হরনাথ বাবু। তার মধ্যে আবার গিন্নির মুখঝামটা । ধুর, কিছুই ভালো লাগে না!  চিৎকার করে গিন্নিকে বললেন, ‘বলবে তো বলো । নাহলে যা পাবো, তাই নিয়ে আসবো।’

‘হ্যাঁ। যেন আমি যা বলবো, তাই নাকি অক্ষরে অক্ষরে নিয়ে আসবে । সে যায় বলি, শেষে তো মনে কিছুই থাকবে না ।’ চিৎকারের জবাব হুঙ্কারে এলো ।

একটু সেধিয়ে গেলেন । বাজে দিনটাকে আরো বাজে করার কোনো যুক্তি নেই । বললেন, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে । একবার বলে দাও । আমার দেরী হচ্ছে ।’

‘একটু মাছ নিয়ে আসবে । আর সরষে গুঁড়ো । আর রাতে নারকেলের তরকারি বানাবো । একটু নারকেল । আর, হ্যাঁ, মিষ্টি নেই ঘরে । ওহ, আর একটু গুড় নিয়ে আসবে ।’ গিন্নি গড়গড় করে বলে গেলো ।

‘আচ্ছা । ঠিক আছে ।’ বলে হনহন করে বেরিয়ে গেলেন । আর বেরোতেই, পা টা পড়লো গোবরের ওপর । যা শালা! এবারে একদম মনটা খিচিয়ে গেলো । হে, ঠাকুর । রক্ষা করো । একটু দেখো । পা মুছলেন রাস্তায়। পরে জল দিয়ে ধুয়ে নেবো বরং।

দোকানে ঢুকেই দেখলেন নকুল বাবু আর মৃনাল বাবু দাঁড়িয়ে আছেন। ‘কি হে! কি হলো পায়ে?’

পা মুছতে মুছতে হরনাথ বাবু বললেন, ‘আর বলবেন না, দেশটা পুরো ডগায় গেলো । রাস্তার ওপরে এতটা গোবর ।’

নকুল বাবু চায়ে আয়েশ করে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘এভাবে কি আর দেশ চলে । সকাল সকাল রাস্তায় গোবর । কারোর কোনো গরজ নেই । সবাই শুধু খাওয়াখাই করেই মরলো ”

মৃনাল বাবু চশমাটা খুলে মুছতে মুছতে বললেন, ‘আমার ছেলে তো আমেরিকাতে থাকে। আগের বার পুজোতে এসে বললো, এই দেশটা পুরো আস্তাকুঁড় । ও আমেরিকাতে থাকার পর এখানে এসে বললো, বাবা, আগে বুঝতাম না এতো নোংরাতে থাকি আমরা । বেসিক সিভিক সেন্সটা নেই, এখন বুঝতে পারি । সব জায়গায় নোংরা আর পলিউশন ।’

হরনাথ বাবুও সিগারেটটাই একটা সুখটান দিয়ে বললেন, ‘ আরে দূর, মশাই । আমেরিকা ছাড়ুন । আমার ছেলে তো বাঙ্গালোরেই থাকে । সেই বলে বেঙ্গলটা পুরো জাহান্নামে গেছে ।’

নকুল বাবু বললেন, ‘আমার ছেলে তো বলে বেঙ্গল হচ্ছে ওল্ড ম্যান’স প্লেস । আমার বৌমা তো আসতেই চায় না । বলে, মুম্বাইর লিফেস্ট্যালের পরে, বাঙালির এই কাঠি করার স্বভাবটা আর ভালো লাগে না।’

মৃনাল বাবু ও বললেন, ‘হ্যাঁ । আমার বৌমা ও তাই বলে । বলে বাবা, তুমি মাকে নিয়ে এখানে চলে এসো।’

নকুল বাবু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘সেটাই তো জ্বালা । ওই যে বলে না, আমার এই দেশেতেই জন্ম, যেন এই দেশেতেই মরি! এই বয়েসে মনে হয় এই নোংরা, পলিউশন, খাওয়া-খাই এটাই সয়ে গেছে । এখন ছেড়ে আর কোথাও যাওয়ার কথা ভাবতেই পারি না ।’

মৃনাল বাবু, ‘সেটাই । এই কথাটা কি আমাদের ছেলেরা বুঝতে পারবে । মাটির টান বলে কথা ।’

হরনাথ বাবু বললেন, ‘তাও আপনারা শান্তিতে মরতে পারবেন । ছেলের বিয়ে হয়েছে । মৃনাল বাবু, আপনার তো নাতিও হলো । আমার ছেলেটাকে দেখুন । এখনো বিয়ের নাম নেই ।’

নকুল বাবু বললেন, ‘আজ কাল কি ভালো মেয়ে পাওয়া সহজ? কতো কাঠখড় পড়াতে হয় ।’

মৃনাল বাবু বললেন, ‘আচ্ছা হরদা, আপনি তো প্রায় দুই বছর থেকে পাত্রী দেখছেন । সত্যি কি একটা মেয়েকেও মনে ধরছে না?’

হরনাথ বাবু বললেন ‘আরে, শুধু কি আমার মনে ধরলে চলবে । মিসেসের ও মনে ধরতে হবে । নীলকেও পছন্দ করতে হবে । আর, মেয়েটার ও মনে ধরতে হবে । আর তার মা-বাবার। তিন-চারটে সম্বন্ধ এগিয়ে ছিল । কিন্তু এর মন, তার মন নিয়ে কথাগুলো আটকে গেছে । এখন তো আর সম্বন্ধ ও আসছে না । কি যে আছে ছেলেটার কপালে, কে জানে?’

নকুল বাবু একটু আহা -উহু করে বললেন, ‘আচ্ছা, ছেলের কোনো ওই কি বলে যেন, গার্লফ্রেইন্ড, নেই?’

হরনাথ বাবু বললেন,’ হলে তাও একটা হিল্লে হতো । সেও তো জিজ্ঞেস করেছি । কখন ও কিছু বলেনি ।’

এমন সময়ে ঘড়িটা দেখেই বুঝলেন আজ দেরী হয়েছে । আড্ডাটা অসমাপ্ত রেখেই হনহন করে বাজারের দিকে হেঁটে গেলেন হরনাথ বাবু । মনটা আবার চিন্তাগ্রস্ত । সত্যি কবে যে ছেলেটার বিয়ে হবে । নিজেই নিজের ওপর তিতিবিরক্ত হয়ে গেলেন । কি যে ভাবছি, যা ভগবান চাইবেন, তাই হবে । এই বলে বাজারে ঢুকেই একটু থতমত খেলেন । কি কি আনতে বলেছে? মাছ আর মিষ্টি? ফুলকপি, পটল ও বলেছিলো নাকি? এই সেরেছে । তা, ঠিক মনে করতে না পেরে সব কিছুই অল্প অল্প নিয়ে গুটিসারে বাড়ির দিকে ফিরলেন ।

বাড়িতে ঢুকে থলি রেখে বললেন, ‘শুনছো । একটু চা হবে নাকি?’

‘হ্যাঁ, হবে হবে ।’ স্ত্রীর গলায় উৎফুল্লুটা শুনে বেশ অবাক হলেন হরনাথ বাবু । গিন্নি তার দিকে হাসতে হাসতে পুজোর থালা নিয়ে এগিয়ে আসছে । এক মুখ হেসে বললো, ‘যেন, আজকে একটা দারুন ব্যাপার হয়েছে ।’

‘কি হয়েছে?’

‘আজকে ঠাকুরঘরে পুজো করছিলাম । মা কালীর পায়ে যে জবা ফুলটা দিয়েছি, সেটা আরতি শেষ হওয়ার পরে, ঠিক আমার সামনে এসে পড়লো ।’

‘ওহ! তারপর?’ জিজ্ঞাস করলেন হরনাথ বাবু।

‘দূরতেরিকা । তুমি কিছুই বোঝো না । আরে, এটা তো মায়ের পায়ের ফুল । মা নিশ্চই খুব সন্তুষ্ট হয়েছে । আজকে মনে হচ্ছে দিনটা খুব ভালো যাবে ।’

স্ত্রীর কথায় একটু অবাক হলেন হরনাথ বাবু । বললেন, ‘আমার তো দিনটা খুব খারাপ যাবে বলে মনে হচ্ছে ।’

‘তোমার তো সবসময়তেই মনে কু ডাকে । তুমি মানুষটাই ওরকম । সব কিছুতেই বাজে দেখতে পাও । শোনো, আজ বিকেলে আমরা একটু কালী মন্দির যাবো । তুমি আমাকে নিয়ে যাবে ।’

আর কথা বাড়ালেন না হরনাথ বাবু, বললেন, ‘আচ্ছা!’

স্নান করে খাওয়া-দাওয়া করে বেশ মন দিয়ে পুজো করলেন হরনাথ বাবু। দুপুরে ভাত খেয়ে একটু বিছানাতে হেলান দিয়ে শুলেন মনে মনে ভাবলেন, নেহাতই আজকে বৌয়ের মনটা খুশি, নাহলে বাজারটা নিয়ে নিশ্চই খুব শোনাতো । মনে হচ্ছে আজকে দিনটা ঠিকঠাক কাটবে । মা কালীর পা থেকে ফুল পড়েছে । আমার বাজে দোষটা কেটে গেলো । এ সব ভাবতে ভাবতে একটু পাশ ফিরে শুতেই মোট করে আওয়াজ এলো । সঙ্গে সঙ্গে ঘুমটা চটকে গেলো । চশমাটা কোথায়?

যেই ভাবা, সেই হাত দিয়ে হাতড়িয়ে দেখলেন আর এলো চশমার ডান্ডিটা হাতে । গেলো রে । চশমাটা গেলো । এখন গিন্নিও মনে হয় ঘুমোচ্ছে, এখন ডেকে লাভ নেই । বিকেলে দেখবো তখন । এই বলে, চশমাটা সরিয়ে রেখে ভাবলেন, না, এখনো দোষটা কাটেনি । দিনটা বাজেই যাচ্ছে। । নিজেই নিজেকে নিয়ে বিরক্ত হলেন । কী যে সবসময় কুলক্ষণ -সুলক্ষণ ভাবা । আরে, কথায় বলে না, রাখে হরি, মারে কে । যা হওয়ার সেটাই হবে। আমি আর ভালো -বাজে ভেবে কী করবো? আমার হাতে তো কিছু নেই ।

মনটা একটু শান্ত হলো হরনাথ বাবুর । ভাত -ঘুমটা গিন্নির ডাকে ভাঙলো । কি আবোল-তাবোল স্বপ্ন দেখছিলেন কে জানে । চোখ খুলে দেখলেন সামনে চায়ের কাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন গিন্নি । বললেন,’ওঠো! এতো বেলা অব্দি ঘুমোলে চলবে? দিন তো প্রায় শেষ। রাতে আর ঘুম আসবে না।’

‘হ্যাঁ । জানো চশমাটা ভেঙে গেলো । বোধহয় ওটার ওপর শুয়ে গেছিলাম ।’ আস্তে আস্তে করে চশমাটা এক হাতে আর এক হাতে ডান্ডিটা নিয়ে দেখালেন ।

‘ওমা! তোমার সত্যি কান্ড -জ্ঞান নেই । দেখি, ইস, পুরো ভেঙে গেছে । একটু দেখে শুতে পারো না ।’

‘আরে, আমি কী ইচ্ছে করে ভেঙেছি নাকি? বললাম তো ভুল করে এটার ওপর শুয়ে গেছি ।’

‘আচ্ছা । চা খেয়ে জামাকাপড় পরে রেডি হয়ে যাও। দেখি, চশমার দোকানে ঠিক হয় কী না?’

বিকেলে বেরোলেন গিন্নির সাথে । বিনা চশমাতে দেখতে খুব অসুবিধা। সামনে, দূরে সব কিছুই ঝাপসা দেখাচ্ছে । তা, যাইহোক, ঘরের সামনেই রিকশা পাওয়া গেছে । আগে চশমার দোকান।

‘আরে, কাকু। কেমন আছেন? অনেকদিন তো এদিকে আসেন নি ।’ ভোম্বল দোকান থেকেই বললো। ভোম্বল তার ছেলে, নীলের, সাথে একী ক্লাসে পড়তো । ওর বাবার দোকান ছিল, এখন ওই চালায় ।

‘ভালো। ভালো । তুই কেমন আছিস?’ রিকশা থেকে নেমে দোকানে ঢুকলেন হরনাথ বাবু এবং তার স্ত্রী।

‘এই আর কী। নীল কেমন আছে? ও তো বাঙ্গালোরেই থাকে?’

‘হ্যাঁ। ওই আর কী, চলছে । আচ্ছা, শোন্ না, বাবা, খুব অসুবিধায় পড়েছি । দেখ না, চশমাটা ভেঙে গেছে।’

‘দেখি দেখি’ বলে চশমাটা হাতে নিলো ভোম্বল।চশমার দিকে তাকিয়ে হাঁক পাড়লো, ‘এই কে আছিস? কাকু -কাকিমার জন্যে কোল্ড ড্রিঙ্কস নিয়ে আয়।’

‘আরে না না । কিছু খাবো না বাবা । এই চা খেয়ে বেরোলাম বাড়ি থেকে ।’ হরনাথ বাবুর স্ত্রী বললেন ।

চশমাটা নিয়ে এদিক-ওদিক দেখে ভোম্বল বললো, ‘কাকু, চশমার ফ্রেমটা গেছে। একটু স্ক্রু দিয়ে ফিটিং করতে হবে, জোড়া -তালে চলবে । একটা নতুন করবেন নাকি? এটা তো একদম গেছে।’

‘হ্যাঁ । ওর তো চোখের পাওয়ারটাও প্রায় এক বছরের ওপর চেক হয়নি । দেখ না বাবা, একটা নতুন চশমা করিয়ে দে। ‘ হরনাথ বাবু বুঝলেন গচ্ছা গেলো হাজার টাকার। কিন্তু, গিন্নি ঠিক বলেছে । চশমাটায় একটু ঝাপসা দেখাচ্ছিল বটে ।

‘কাকু, ডাক্তারবাবু কাল দুপুরে আসবেন। আমি এই চশমাটা কোনোমতে কাজ চালাবার মতো ঠিক করে কাল সকালে আপনার বাড়িতে পৌঁছে দেব। আপনি যদি বলেন কাল দুপুরের আপয়েন্টমেন্টটা করে দিচ্ছি। আপনি এসে চোখের পয়ারটা চেক করিয়ে নেবেন আর নতুন চশমার অর্ডারটা দিয়ে যাবেন।’

হরনাথ বাবু গিন্নির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মনে হচ্ছে আজ সন্ধ্যেটা ঝাপ্সাই দেখতে হবে।’ ভোম্বলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে । টিকেট কেটে রাখো।কালকে আসবো।’

পুরো সন্ধ্যেটা মার । খালি সবকিছু ঝাপসা । এমন কী মা কালীর মন্দিরে দাঁড়িয়েও মায়ের মুখটা দেখতে পেলেন না। ঝাপসা তো । গিন্নি কিন্তু পুজো দিয়ে খুশি। বললো, ফুচ্কা খাবে । তারপরে দোসাও খাওয়া হলো । বেশ ভালোই লাগছিলো সন্ধ্যেটা। অনেকদিন পরে দুজনে বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছে।খুব বেশি ভিড়ও নেই। ফুচকা, দোসা খেয়ে মনটাও তৃপ্ত ।আবার এদিকে গিন্নির টিভি সিরিয়ালের সময় হয়ে যাচ্ছে। অতএব রিকশাতে চেপে বাড়ি।

বাড়ি যেতে যেতে গিন্নি বললো, ‘শুনছো! আজকে অনেকদিন পরে মনটা এতো খুশি খুশি লাগছে। ইশ, বাবু এখানে থাকলে আরো ভালো হতো ।’

‘সে আর কী করবে। এখন তো আর ও আসতে পারবে না। গেলে আমাদেরকেই যেতে হবে।’ বললেন হরনাথ বাবু।

‘মাঝে মাঝে খুব কষ্ট হয়।জানি ভালো চাকরির জন্যে এটা করতেই হতো।তাও মাঝে মাঝে নিজেকে বোঝাতে পারিনা।’

‘চলো, আমরাই যাই ঘুরে আসি বেঙ্গালোর থেকে।’

‘সেটাও ঠিক পোষায় না। ও তো বন্ধুদের সাথে থাকে। কখন যে ও বিয়ে করবে? একটু মতিগতি স্থির হয়। তাহলেও নিজের বাড়িও নেবে। আমরাও যাবো যখন ইচ্ছে হবে।’

‘মানে, তুমি নিজের সুবিধের জন্যে চাও ওর যেন বিয়ে হয়।’ হো=হো করে হাসতে লাগলো হরনাথ বাবু। ‘আজকে পুজোতে বললে নাকি ছেলের বিয়ের কথা?’

উত্তর দেওয়ার আগেই ফোন বাজলো গিন্নির। নীলের ফোন । ‘এখন ফোন করছে? ৮টাও বাজেনি? অফিস থেকে জলদী ফিরলো নাকি?’ নিজের মনেই প্রশ্ন গুলো করলেন হরনাথ বাবু।

‘হ্যালো, বাবু। বল।’

‘মা, তোমরা কোথায়?’

‘আমরা একটু বাজারে এসেছি। বল ।’

‘আরে না, ঠিক আছে। তুমি বাড়ি এসো। ভিডিও কল করবো।’

‘আচ্ছা।’ ফোনটা কেটে দিলেন হরনাথ বাবুর গিন্নি।

‘কি বলছিলো বাবু?’ হরনাথ বাবু জিজ্ঞেস করলেন।

‘কে জানে। বললো, ভিডিও কল করবে। মনে হয় মনখারাপ বোধহয়।’

ঘরে পৌঁছে হরনাথ বাবুর গিন্নি জলদি জলদি জামা -কাপড় ছেড়ে হাত-পা ধুয়ে ফোনটা নিয়ে বসে গেলেন।

‘আঃ! আমি কি এক কাপ চাও পাবো না?’ হরনাথ বাবু বললেন। একবার ফোন শুরু হওয়া মানে পাক্কা কুড়ি মিনিট কথা হবে মা -ছেলের। আজকে আবার তার চশমা ভাঙার গল্প হবে।

‘এতই যদি চা খাওয়ার ইচ্ছে তো বাইরে যেয়ে খেয়ে নিও।’

ঘড়ির দিকে তাকালেন হরনাথ বাবু । ৮টা বাজছে। আধঘন্টার মধ্যে আবার একবার বেরোবেন আড্ডা মারার জন্যে। ঠিক আছে, আর এক কাপ চা বেশি খেয়ে নেবেন।

ফোন ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে।

‘মা, বাবা কোথায়?’

‘দাঁড়া, এখানেই আছে । শুনছো, ছেলে ডাকছে।’

হরনাথ বাবু এসে দাঁড়ালেন। ছেলের মুখটাও বুঝতে পারছেন না খালি চোখে। আজকেই চশমাটা ভাঙতে হলো ।’ছেলেকে দেখে বললেন, ‘আজকে চশমা ভেঙে গেছে আমার।’

‘উফফ, বাবা। কি যে করো? তুমি তো এখন বেরোবে। সাবধানে হাঁটা-চলা করবে। তুমি তো পরিষ্কার দেখতে পাওনা চশমা ছাড়া। আচ্ছা, শোনো, আমার একটা কথা আছে তোমাদের সাথে।’ নীল এতো ভূমিকা করে বললো যে হরনাথ বাবু দাঁড়িয়ে গেলেন। কি বলবে ছেলেটা?

‘তোমাদের মোনামী কে মনে আছে?’

‘কে মোনামী?’ হরনাথ বাবুর গিন্নি জিজ্ঞেস করলেন।

‘আরে, ওই যে তোমরা যাদের বাড়ি গেছিলে। ধুর, তোমাদের কিছুই মনে থাকে না।’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ । ওই তো যে মেয়েটাকে আমরা পছন্দ করেছিলাম। ওদের বাড়িও গেছিলাম। কিন্তু মেয়ে তো বাইরে কোথায় চাকরি করে। কথাও এগোয়নি, দেখাও হয়নি। কারণ অন্য জায়গাতেও বোধয় কথা-বার্তা চলছিল।’ হরনাথ বাবু মনে করে বললেন।

‘যাক, মনে পড়েছে তোমাদের। ব্যাপারটা একটু আলাদা। ও বাঙ্গালোরে চাকরি করে। আর তোমরা যেমনি পাত্রী খুঁজছিলে চতুর্দিকে, ওরাও পাত্র খুঁজছিলো। তোমরা ভাবলে ওরা ব্যস্ত, ওরা ভাবলো তোমরা। তাই, তোমাদের মধ্যে কথা-বার্তা হয়নি।’ ছেলের মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেছে ততক্ষণে।

হরনাথ বাবু মুচকি হাসলেন। তার গিন্নিও। মনে হচ্ছে, ভালো খবরটা আসছে। কিন্তু মেয়েটার মুখটা ঠিক মনে পড়ছে না। প্রায় এক বছর আগের ব্যাপার। সত্যি, বয়েসটা হচ্ছে।

‘মা, বাবা, শোনো, আমি এতো জানতাম না। আমি যে নতুন অফিস জয়েন করেছি, মোনামী এখানেই চাকরি করে। কথায়-কথায় এসব জানতে পারি।তো, ভাবলাম তোমরা যখন পছন্দ করেই নিয়েছো, আমারও একটা নৈতিক কর্তব্য আছে সেটা পালন করার। মানে, বুঝতে পারছো তো।’

‘বাবু, জানিস, আজকেই আমি তোর বাবাকে সকাল থেকে বলছিলাম, আজকের দিনটা ভালো। তোর বাবা তো..’ একটু চুপ করে গেলেন হরনাথ বাবুর স্ত্রী, ‘ছাড়, তাহলে কি আমরা কথা বলতে পারি মোনামী আর তার মা-বাবার সাথে?’

‘সেগুলো তোমাদের ব্যাপার।আমি এতো জানি না।যেটা আমার বলার সেটা বলে দিলাম। আচ্ছা, মা, বাবা, রাতে আবার কল করবো।’ বলেই ফোনটা কেটে দিল নীল।

হরনাথ বাবু স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমার ভালোটা আমার সব মন্দের ওপরে বুঝলে। তোমার ভালো দিন আমাদের সবার ভালো দিন। চা-টা খেয়ে আসি তাহলে।অনেক কাজ বাকি আছে।’

 

~ রোজনামচায় ভালোবাসা ~

Print Friendly, PDF & Email
0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments