“পনেরো-ষোলো বছর আগেকার কথা। বি এ পাস করিয়া কলিকাতায় বসিয়া আছি। বহু জায়গায় ঘুরিয়াও চাকুরি মিলিল না।” প্রথম লাইনটা পড়েই বিমল আবার হারিয়ে যায় নিজের জগৎএ, পৃথিবীর সব দুঃখ যেন মিলে যাচ্ছে বিমলের জিবনের সাথে। তিন মাস হোল বিমল এম এ পাস করে বসে আছে, না বসে নেই সে অনেককিছুই করে কিন্তু পয়সা উপার্জন করে না।

আমাদের সমাজে পয়সা উপার্জন করাকেই বাস্তুত পক্ষে বসে না থাকা বা কিছু করা বলে। ‘আরণ্যক’ বহুবার পরা হয়ে গেছে বিমল এর, আজ হঠাৎ কি মনে হল দুপুরবেলা খাওয়ার পর আবার খুলে বসলো কিন্তু প্রথম একটা লাইন এর বেশি পরতে পারল না। গত কয়েকদিন ধরে যাই বিমল পরতে গেছে সবকিছুতেই নিজেকে খুজে পেয়েছে। তাই এখন আর গল্পের বই এ নিজেকে ডুবিয়ে রাখতে চায় না সে। চোখের এক কোনায় বিমেলর ভাবনা ফুটে ওঠে, ঠিক একই ভাবে এতদিন সবকিছুর মধ্যে সে নিজেকে খুজে পেতো কিন্তু সেটা অন্য আঙ্গিকে। কিন্তু এই কিছু দিন হলো বিমলএর ভাবনার দিক পরিবর্তন হয়েগেছে, এটাই বধহয় সাহিত্যের কৌশল। লেখার মধ্যে নিজেকে খুজে পাওয়া, সময় অনুযায়ী যা শুধু প্রেক্ষাপট পরিবর্তন করে।

বিমলের স্বপ্ন ছিল মাস্টার্স হয়ে যাওার পর গবেষণা করবে, কারন নিজের পড়ার বিষয় ভাললাগার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে গত পাঁচ-ছয় বছরে। সে নিজেও জানে পড়াশোনায় সে কোনদিনই খুব ভাল ছিল না, কিন্তু তাকে কেউ খারাপ বলতে পারেনি কোনদিন।

এই সময় গুলোতে বিমল খুব ভাল করে বুঝে গেছে যে তার জীবন নিয়ে চিন্তা করার লোক’এর কমতি নেই। ব্যাপারটা সত্যি খুব রহস্যজনক যে হঠাৎ করে এই কিছুদিন এ তার জীবন নিয়ে এত চিন্তাশীল বাক্তিরা কিভাবে উদ্ভব হল!

মাস চারেক আগের কথা এম এ পরীক্ষার ঠিক আগে, সূজয় প্রায় ধোরে নিয়ে গিয়ে বিমলের ফর্ম ভরিয়েছিলো ‘নেট’ পরীক্ষার। বিমল নিজে আনেকবার মনে মনে এই কথা ভেবাছে যে ‘সূজয়’ই তার একমাত্র বন্ধু যে সবসময় তার ভাল চায়। ক’জন ছেলেই বা এরকম বন্ধু পায় জীবন এ। ভালো বন্ধু পাওয়াটাও জীবনের একটা বড়ো সাফল্য। ‘পাস কোরতে না পারলে ফর্ম এর টাকা তোর কাছ থেকে নেবো’ এই কোথার উত্তর’এ সূজয় হাসতে হাসতে বলেছিল ‘তা নিস’।

সত্যি অনেক ভেবেচিন্তে পয়সা খরচ করতে হয় বিমলকে, সূজয় এর প্রতি মাসে বরাদ্দ ২০০০ টাকা, তাও কোনো কোনো মাসে হয়ে ওঠে না। বাবা’র কাছে চাইতেও আর ভাল লাগে না। এম এ অবধি’তো পড়ালেন। এই শহর এ কতো ছেলের বাবারা’তো পড়াতেই পারে না তাদের ছেলেদের, সেইদিক দিয়ে বিমল কতো ভাগ্যবান। সে জানে বাবার পাঠানো প্রত্যেক টাকায় লেগে আছে রক্ত’জল করা পরিশ্রম। কিন্তু কোই বাবাতো কোনোদিন বলেনি ‘বিমল তোর কিছু হবে না। তুই একটা Hopeless, তিন মাস হোল এম এ পাস করলি কিছু না কোরে বসে থাকলে হবে ইত্যাদি, এই কথাটা সবথেকে বেশি শুনতে হয় তাকে এখন।

‘চাকরির জন্য পড়াশুনো কর, খাট’ বিমল এর জীবন পৃথিবীর সবথেকে বিরক্তিকর কথা বধহয় হয়ে উঠেছে এটা। যারা বলে তারা কি কেউ ‘চাকরি জন্য খাট’ এই কথাটা যারা বলে তারা কি নিজেদের জন্য কোনোদিন খেতেছে? সন্দেহ আছে বিমল এর। ‘সমাজের সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে আমাদের জন্য একটা নোংরা পৃথিবী রেখে এখন বাসে উঠে সিনিয়র সিটিজেন এর সীট দাবি করে। আবার ওনাদের জন্য আমদের জেনেরেল সীট ছেরে দিতেও হয়, নাহলে পাসে দাড়িয়ে থাকা লোকের হিংসেতে নাগরিক কর্তব্য মাথাচারা দেয়’ সূজয় এর এই বিখ্যাত উক্তি আনেক বার বিমল শুনেছে, অনেক আলোচনার মঝে।

বিমল খুবভালো করেই জানে যে তার বাবা চায় সে গবেষনা করুক। পিএইচ,ডি পাক। বিমল গত সাত বছর বাড়ির বাইরে থেকে এই কথাটা খুব ভালো করে বুঝে গেছে যে ‘মন থেকে কেউ যদি কারো জন্য কিছু করে সে কোনোদিন মুখ খুলবে না, সেই মুখ খোলে যে সারাজীবন শুধু অন্যের কাছ থেকে নিয়ে গেছে’।

‘ভগবান দেখো যদি এইবারেই নেট না হয়ে যায়, তাহলে সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে, নাহলে সেই সবার মতন চাকরির পরীক্ষার জন্য একই লাইনে দৌরতে হবে’ রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে প্রতিদিন একটাই দাবী থাকে ভগবানের কাছে এখন বিমলের। ঠিক তখনই বড়মামার ফোন এল বিমলের মোবাইলে, ‘হ্যাঁ বাড়োমামা বলো’ ফোন টা রিসিভ করেই বিমল উত্তর দিলো, ‘কাল সকালে একবার এইদিকে আসিস তো’ এই রকমই কিছু একটা বলবে জানাছিলো বিমলের, ‘ঠিক আছে’ বলা শেষ নাহতেই ফোন কেটে দিলেন।

বড়োমামার বাড়ী খুব একটা দূর না হওয়ায় আনিচ্ছা সত্তেও অনেক কাজে বিমলকে ওই বাড়ী যেতে হয়। হঠাৎ করে বিমলের মনে পরে গেলো নেট পরীক্ষার আগের রাতটা বিমল ঐ বাড়ীতেই ছিলো, কারন ওখান থেকে পরীক্ষার সেন্টারটি কাছে হতো। পরীক্ষা দিতে যাওয়ার আগে মামাকে প্রনাম করে বেরোবে ভেবেছিলো বিমল প্রণাম করতে গিয়েওছিলো কিন্তু করা হয়নি, কারন বিমলকে দেখেই বাড়োমামা বলেছিলো ‘ আমিতো জানতাম নেট খুব কঠিন পরীক্ষা দেখ কি করতে পারিস’|

বিমল সহসা মামার কথার কনো উত্তর করেনা বিমল কিন্তু সেদিন আস্তে করে বলেছিলো ‘একবারে তো হবেনা দিয়ে দেখি, বেপারটা বুঝতে পাড়ব’, ‘তাহলে কি পরীক্ষা বারবার দেয়? তোর ধরনা একদম ভুল’ এটাই ছিলো বড়োমামার পরবর্তী প্রতিক্রিয়া কনও উত্তর না দিয়ে বিমল সোজা বেরিয়ে আসে ঘর থেকে, মাথাটা আর ঝুঁকতে চায়নি বিমলের। বাসে যেতে যেতে বিমল ভাবছিলো সত্যি কি খারাপ কিছু করেছে ফর্মটা ফিলাপ করে? কিন্তু পার্থ স্যার’তো বলেছিলেন যে ‘বিমল এখন থাকেই নেট এর জন্য পরা শুরু করো, পরীক্ষা দিতে থাকো, আমি নিজে তিনবারের বার পাশ করেছি’ ওনার কথা শুনেই বিমল সূজয়কে বলেছিলো নেটের ফর্ম ভরবি?

তারপর সুজয় প্রায় জোর করেই বিমলকে নিয়ে যায়! ফর্ম এর ছয়শ টাকা পার্থ স্যারই বিমলকে দেয় পরদিন ক্লাসএর পর! বিমল সেদিন অনেকদিন পর কাউকে প্রণাম করে বলেছিলো ‘ স্যার আমার জীবনে একটা বড়ো আক্ষেপ ছিলো যে আমি কারো ভালো ছাত্র হতে পারিনি আজ মনে হচ্ছে আমার এই আক্ষেপটা একটু ঘুচল যদিও বিমল সেটা ফেরত দিয়ে দেয় কিছু দিন পরেই।

বিমল এখানে পরতে আসার পর থেকেই, তার প্রতি বড়মামার একটাই কথা থাকতো, ‘কিছু একটা চাকরি জোগাড় করতেই হবে বেচে থাকতে হলে’ চাকরি পাওয়াটাই কি জীবনের একমাত্র উদ্দেশ? এই প্রশ্নটাই নিজেকে আনেকবার করেছে বিমল কিন্তু সঠিক উত্তর খুজে পায়নি। মাঝে মাঝে মেনে নিতে হয়েছে হ্যা! চাকরিই জীবনের মূল লক্ষ্য এতো পড়াশুনো এতো মোটা মোটা বই পড়া সব চাকরি পাওয়ার জন্য। বিমলের বিষয় ছিলো ভূগোল, পৃথিবী সৃষ্টির আদি-অনন্ত থিওরি গুলো যখন স্বপ্নিল চোখে ভাসত, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন প্রকার শিলা সৃষ্টির কারন যখন ঠোটে ভাসতো বিমলের, তখনতো তাকে কেউ বলেনি সরকারি চাকরি পেতে এই পরার দাম আনেকটাই কম!

বা যখন সে বিরক্তি সত্তেও পরতে বাধ্য হয়েছিলো এই পৃথিবীর পিছনে ফেলেআসা ইতিহাস, প্যালিওজোইক, মেসোজোইক, ক্যাম্ব্রিয়ন, তখনতো কেউ বলেনি এগুলো তাকে শুধু পাশ করার জন্যই পরতে হবে। চাকরি পেতে হলে তাকে সেই গতানুগতিক জিবনকেই বাছতে হবে, যেখানে শেখার কিছুনেই শুধু নিজেকে প্রমান করতে হবে তুমি কতোটা বাকীদের থেকে ভাল! তাহলে এখন কেনো? যখন সে বিষয়টাকে এতো ভালোবেসে ফেলেছে। যে বিষয়টা পরতে এখন প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছে করে সেটেকে কিভাবে ছেড়েদেবে বিমল? খুজে পায়না কনো উত্তর। তাই আজও বাদ্ধহয়ে বড়মামার সবকথা হযম করতে হয়। কথা বলারতো কনো সুজগই নেই বঝানতো দূরের কথা।

কোনোকিছুর বিল দেওয়ার জন্য বা ওষুধ ফুরিয়ে গেছে, আনার জন্য হয়তো ডেকেছেন আজ, যেতে যেতে ভাবছিলো বিমল। ঠিকতাই ‘এ মাসেই টেলিফোন বিলটা জমা দিয়ে আয়তো’ বাড়ী ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলো বিমল।

বিলের রসিদ ফিরিয়ে দিয়ে চেয়ার এর উপর টেলিগ্রাফ টা হাতেনিয়ে পাতা ওলটাচ্ছিল বিমল, ‘কি যে করিস সারাদিন কে জানে? থাকিশ তো একা’ বিমল ভেবেছিলো আজ বড়মামাকে বলবে ‘সে তিনটে টিউশন ধরেছে, গতোমাসে বাড়ি থেকে একটাকাও নেয়নি’। কিন্তু মন থেকে ইচ্ছেই হলনা কথাটা বলতে। গতমাসে পার্থ স্যার এই তিনটে টিউশন ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন ‘কিছুতো করতে হবে, টাকাতো এমনি আসবেনা, সব স্বপ্নের একটা পথ থাকে সেটা পেরতে গেলে কিছুতো সময় লাগবে! আর সেই সময়টাতে বাচতে গেলে টাকাতো লাগবে’ এই কথাটা হয়তো বিমলের জীবনের শোনা এখনো অবধি শ্রেষ্ঠ একটা লাইন।

মোবাইলটা ভাইব্রেট মুডে কোরে রাখে বিমল সবসময় তাই পকেটকে একটু ঝাকিয়ে আবার চুপ হয়ে গেল বিমলের আরেক প্রিয় সাথি তার মোবাইল। নিশ্চয়ই কোম্পানির কনো মেসেজ হবে, পকেট থেকে বেরকরে মোবাইলটা অন করতেই দেখল চারটে মিশ কল হয়ে আছে সূজয়ের, বিল দেওয়ার সময় লাইনে দাড়িয়ে থাকার সময় আসছিলো তাই হয়তো টের পায়নি।

ইনবক্স খুলে দেখলো মেসেজটাও সূজয়ের| ওপেন করেতেই যে টেক্সট টা ফুটে এলো ‘ ভাই কাপিয়ে দিয়েছিস, জে আর এফ পেয়েছিস’ পার্থ স্যার একবার বলেছিলেন ‘জে আর এফ পেলে মাসে তিরিশ হাজার টাকা দেওয়া হয় শুধু গবেষণা করার জন্য’। বিমলের ঘোর কাটলো বড়মামার কথা শুনে ‘এইভাবে কি সারাজীবন থাকবি নাকি, কি করবি কিছু ভাবলি? বিমল কিছুক্ষন মামার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল “আবার নিজেকে প্রমান করবো” পেপার টা চেয়ারের উপর রেখে বিমল সোজা বেরিয়ে গেলো পার্থ স্যার কে প্রণাম করতে। যিনি তার উপর আস্থা রেখেছিলেন। বলেছিলেন ‘স্বপ্নের পথে হাটতে থাকার নামই বাঁচা, যার স্বপ্নের পথ যতো ছোট তার জীবনের মূল্যও ততো ছোট’।

গেট পার হতেই পিছন থেকে মামীর  গলার আওয়াজ পেলো ‘বাবা কিছু খেয়েজা’ বিমল না থামেই জবাব দিলো ‘পরে মামী এখন উড়ান ভরতে হবে’।

 

~ উড়ান ~

Print Friendly, PDF & Email
4 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments