পর্ণশ্রীর প্রতিদিনের যাতায়াতের পাড়াটা আজ কেমন যেন থমথমে। গোলির মোড়ে জটলা, যেটা এই সময়ে রোজ চোখে পড়ে না। এটা অঞ্জনের প্রতিদিন অফিস যাতায়াতের পথ। এই পাড়াতেই তার নোতুন কারখানা গড়ে উঠেছে। একটি বেসরকারি সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মচারী অঞ্জন। এই সংস্থাটি যে ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশটি তৈরী করতে চলেছে তার প্রযুক্তিতে অঞ্জনের অবদান প্রায় সবটাই। কারখানার জমি ঠিক করা, বিদেশ থেকে অত্যাধুনিক যন্ত্র নিয়ে আসা, কারখানা উৎপাদনের উপযুক্ত করে সাজানো এবং নোতুন কারিগরদের উৎপাদনের ব্যপারে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সবটুকুই নিখুঁত ভাবে অঞ্জনকে করতে হচ্ছে।

এই সংস্থাকে ঠিক মতো গড়ে তোলাই এখন তার ধ্যান-জ্ঞান। পুরুষ কারিগর ছাড়াও কারখানার বেশীর ভাগ কর্মচারীই মহিলা। অঞ্জন জানে এই যন্ত্রাংশ উৎপাদনে মেয়েদের স্বাভাবিক দক্ষতাকে কাজে লাগালে অনেক বেশী ভাল ফল পাওয়া যাবে। কারখানার পাড়া থেকেই বেশীরভাগ মহিলা কর্মচারীদের নিয়োগ করা হয়েছে ফলে এলাকায় অঞ্জন খুবই চেনা মুখ এবং জনপ্রিয়। অসিতবাবু এলাকার রাজনৈতিক নেতা এবং অঞ্জনকে ভালবাসেন কারণ এলাকার ছেলেমেয়েরা চাকরী যাতে পায় এই ব্যপারে অসিতবাবুর বিশেষ অনুরোধ ছিল অঞ্জনের প্রতি আর অঞ্জন তাঁকে হতাশ করেনি। সামনের মোড়টা ঘুরতেই অসিতবাবুর সঙ্গে দেখা হলো।

“কি ব্যপার অসিতবাবু, পাড়ায় কি কিছু হয়েছে?” জিজ্ঞেস করলো অঞ্জন।

“আর বলবেন না, একটি মেয়ে মারা গেছে…সুইসাইড। আরে মশাই আমার খুবই চেনা।”

“বলেন কি! কেন সুইসাইড? কি হয়েছিল?”

“পুরোটা আমিও ঠিক জানিনা। তবে শুনেছি বাড়িতে নানা রকম অশান্তি ছিল। এইতো…ওখানেই যাচ্ছি। দেখি কি ব্যপার। ভিষন খারাপ লাগছে।” বললেন অসিতবাবু।

অঞ্জনের এই সময় কি করা উচিৎ ভেবে না পেয়ে অফিসের দিকে এগিয়ে চললো।

বিশাখা আর অনিন্দ্যর বিয়ে হয়েছে বছর দুয়েক হলো। বিশাখার মা-বাবার এই বিয়েতে খুব একটা মত ছিল না। নিজেরা যে উচ্চ বর্ণের ব্রাহ্মণ পরিবার এ ব্যপারে তাঁরা ছিলেন একটু বেশী সজাগ এবং বিশাখার ব্যক্তিগত মতামতকে তাঁরা মোটেই কোন মুল্য দিতে চাননি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনিন্দ্য আর বিশাখা নিজেদের জায়গায় অনঢ় ছিল বলে বিয়েটা নির্বিঘ্নেই হয়েছিল। বিশাখার বাবা একটি সংস্থায় চাকরী করেন কিন্তু কারখানাটি অনেকদিনই রুগ্ন ফলে কর্মীদের অবস্থাও তথৈবচ। একমাত্র সন্তান বিশাখার বিয়েতে বাবা অবশ্য কার্পণ্য করেননি কিছুমাত্র। কিন্তু তারপর থেকে সংসার চলেছে অতি কষ্টে। মাথার ওপর বেড়েছে দেনা।

আজ রবিবার। অনিন্দ্যর অফিস ছুটি। বেলায় ঘুম থেকে উঠে সবেমাত্র খবরের কাগজের পাতা উল্টোতে শুরু করেছিল। বিশাখা ঘরে ঢুকে মোড়াটা টেনে নিয়ে বসলো ড্রেসিং টেবিলের সামনে। নিস্তব্ধতা ভেঙে বিশাখাই শুরু করলো:

“একটা কথা ছিল তোমার সঙ্গে।“

“হ্যাঁ বলো।“ কাগজ থেকে চোখ না সরিয়েই অনিন্দ্য সাড়া দিলো।

“গতকাল দুপুরে মা ফোন করেছিল…বিকেলে একবার বাড়িতে যেতে বললো। গিয়েছিলাম।“

“কোন প্রবলেম?” জিজ্ঞেস করলো অনিন্দ্য।

“হ্যাঁ…কি যে করবো বুঝতে পারছি না।“

“সমস্যাটা কি?”

“বাবার কারখানা ক্লোজার নোটিশ ঝোলাতে চলেছে।“

“সেকি…কবে থেকে?”

“শুনছি দু-চার দিনের মধ্যেই।“

“কি বলছো!”

“আমি আর ভাবতে পারছি না। একবার যাবে নাকি বাড়িতে? আমরা গেলে যদি একটু মনে জোর পায় বাবা।“

“একটু পরে তোমার বাবাকে বরঞ্চ আগে একটা ফোন করি। তারপরে বিকেলে দুজনেই যাবো।“

“ঠিক আছে যা ভাল বোঝ করো।“ বিশাখার গলা ছিল থমথমে।

এর সাতদিন পরে বিশাখার বাবার কারখানার দরজায় ক্লোজারের নোটিশ ঝোলানো হলো। এক চরম অনিশ্চয়তা নিয়ে বিশাখার বাবার দিনগুলো ক্রমাগত সঙ্গিন হতে থাকলো। আত্মীয় স্বজন বলতে যাঁরা আছেন তাঁরা প্রথম টেলিফোনে বা স্বশরীরে কেউ কেউ এসে সহানুভুতি জানালেন কিন্তু সেটা অল্পদিনের জন্যেই স্থায়ী হয়েছিল। দুটো মানুষের সংসার চালানোর জন্যে প্রয়োজন হয় টাকা এবং আর কিছু নয়। টাকাটা থাকলে বাকী সবকিছু ঠিক থাকে। বিশাখার বড়মামা খবর পেয়ে নিজের দিদিকে ফোন করে খবর নিয়েছেন কিন্তু আর্থিক স্বাচ্ছলতা যথেষ্ট থাকা সত্বেও এই আর্থিক বিপদের খানিকটা ভাগীদার হবেন এমন কথা তিনি দেননি। বিশাখার ছোটমামার চাকরীটা বিশাখার বাবার যোগাযোগে হয়েছিল। ছোটমামা এসেছিলেন দিদির কাছে, এক সপ্তাহের বাজারটা করে দিয়ে গেছেন।

এইভাবে দুটো মাস কেটে গেল। বিশাখার বাবা চেষ্টার ত্রুটি করছেন না নতুন করে কিছু করার। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের যেরকম চাকরীর আকাল, তাঁর এই বয়েসে নতুন চাকরী পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। এমাসে টেলিফোনের বিল বাকী পড়েছে। যেকোন দিন লাইন কেটে দেবে। অনিন্দ্যর কাছ থেকে টাকা নিয়ে মার হাতে দুহাজার টাকা দিয়ে এসেছে বিশাখা। অনিন্দ্যর থেকে টাকা নিতে বিশাখার বাবার ভিষন সম্মানে বাধছে কিন্তু চরম অভাবের মুহুর্তে তিনি দিশাহীন। সিক্ত চোখে মা হাত পেতে নিয়েছেন সেই টাকা। তিনি জানেন এই টাকা অনিন্দ্য দিয়েছে, বিশাখা তো চাকরী করে না। মেয়ের রোজকারের টাকা হলেও কথা ছিল। সকলের পক্ষেই এই বিপদসঙ্কুল অবস্থাটার নিয়মিত খবর নেওয়াটাও অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়াচ্ছে…খবর নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোথাও যেন একটা কমিটমেন্টের দায় থেকে যায়।

টাকার কমিটমেন্ট মানে তো ফেরৎ পাবার আশা ছেড়ে শুধু দিয়ে যেতে হয় এখন। ফেরৎ হয়তো পাবোনা কোনদিন এটা মনে মনে মেনে নেওয়া কঠিন। এখানে টাকাটাই মুখ্য। সম্পর্ক বা দুঃসময়ের ভাগীদার হওয়াটা গৌন। এই অস্বস্তি থেকে মুক্তি পাবার একটিই পথ সবার জানা…যতোটা সম্ভব দুঃস্থের খবর না রাখা। এর ওপরে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। পাওনাদাররা তাগাদা বাড়াতে বাড়িতে আসছে। তাদের ভয় বেড়েছে…এখন তো লোকটা বেকার, টাকাটা একেবারে মার গেল না তো! বিশাখার বড়মামা তো এই জাতীয় মানষিক যন্ত্রনায় দিন অতিবাহিত করছেন। বিশাখার বিয়েতে তিনি ফিক্সড ডিপজিট ভেঙে বিশাখার বাবাকে দুলাখ টাকা ধার দিয়েছিলেন। সর্ত ছিল ব্যাঙ্কে টাকাটা থাকলে যে সুদ তিনি পেতেন সেই সুদ সমেত টাকাটা ফেরৎ দেবার অঙ্গীকার বিশাখার বাবাকে করতে হয়েছিল।

চাকরী যতোক্ষণ ছিল সে অঙ্গীকার যথাযত পালন করেছেন প্রতি মাসে এ কথা তিনি হলফ করে বলেন কি করে। কোন কোন মাসে হঠাৎ কোন আশাতীত খরচ ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছে। বিয়ে পৈতে অন্নপ্রাশণ একটা না একটা তো লেগেই থাকে। সম্মান রাখতে অনেক সময় ক্ষমতা না থাকলেও উপহারটি উপযুক্ত দিতে হয়। ফলে কোন কোন মাসে শ্যালকের হাতে ই.এম.আই অনিয়মিত জমা পড়েছে এটা বলাই বাহুল্য। এক ভয়ঙ্কর ভীতি ক্রমশঃ বিশাখাকে গ্রাস করতে থাকলো আর তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে থাকলো বিশাখা আর অনিন্দ্যর ব্যক্তিগত সম্পর্কে। বিশাখা জানে অনিন্দ্য যা রোজকার করে তার থেকে দু-চার হাজার টাকা অনিন্দ্য বিপাশাকে দিতেই পারে প্রতি মাসে যেটা বিপাশা তার বাবার হাতে তুলে দেবে। একদিকে দুটো মানুষ চরম অভাব অনটনে দিন কাটাচ্ছে আর অন্য একদিকে তার স্বামী টাকা ইনভেস্ট করে কোথায় আরো ভালো রিটার্ন পাওয়া যায় সেই ভাবনায় দিনের অনেকটা সময় কাটাচ্ছে।

বিপাশা দেখেছে বাড়িতে মাঝে মাঝে কারা সব আসে না না ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান নিয়ে। তার কিছু কিছু কাগজে বিপাশাও সই করে। এছাড়া আছে অনিন্দ্যর অনেকগুলো মোটা অঙ্কের ফিক্সড ডিপজিট। বিশাখা ভাবছে চোখের সামনে এই চরম দুর্ভোগ দেখেও অনিন্দ্য নিজে থেকে কেন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে না। কেন বিপাশাকে ছবিটা তুলে ধরতে হবে বার বার। বিকেলে মার কাছে গিয়েছিল বিপাশা। মা মনে হলো খুব আশা করেছিল মেয়ে হাতে সামান্য হলেও কিছু টাকা দেবে। হাতে আজ তাঁর পাঁচটা টাকাও নেই। যা থাকে কপালে, আজ রাত্রে অনিন্দ্যর সঙ্গে বিপাশা একটা প্রস্তাব নিয়ে কথা বলবে। মনে হয় অনিন্দ্য তাকে ফেরাবে না।

“তুমি যদি কিছু না মনে করো একটা কথা বলবো?” রাত্রে শুতে যাবার আগে বিশাখা কথা বলছিল অনিন্দ্যর সঙ্গে।

“মনে করবো কেন, বলো না কি এমন কথা।”

“আমার একটা কথা রাখবে?”

“কথাটা না শুনেই রাখি কি করে।” একটু মৃদু হেসে বললো অনিন্দ্য

“আমি জানি তুমি চেষ্টা করলেই রাখতে পারবে।”

“তাহলে বলে ফেলো।”

“না, তুমি কথা দাও আমাকে নিরাশ করবে না।”

“আচ্ছা বেশ, কথা দিলাম।” একটু ভ্রুকুটি করে বললো অনিন্দ্য ।

“তুমি কিন্তু আমাকে কথা দিলে।”

“আরে, হ্যাঁ রে বাবা, দিলাম।”

“আমাকে প্রতি মাসে দু-চার হাজার টাকা দাও না গো।”

”প্রতি মাসে দিই তো তোমাকে।”

“না না, ওটা তো সংসারে লাগে। ওটা ছাড়া আর একটু চাই আমার। খুব দরকার।”

“বুঝতে পেরেছি কেন দরকার।”

“বুঝতে যখন পেরেছো তখন দাও। আমি তোমার কাছে ভিক্ষে চাইছি অনিন্দ্য।” বিপাশার বাকরুদ্ধ হয়ে আসে কান্নায়।

বিপাশাকে বুকে টেনে নিয়ে সান্তনা দেয় অনিন্দ্য।

“তোমার একটু কদিন অসুবিধে হবে কিন্তু আমার মুখের দিকে চেয়ে এটুকু তুমি করো। একটু সেভিংস কম হবে কিছুদিন, কিন্তু দুটো মানুষতো বাঁচবে।”

অনিন্দ্য কথা দিলো মাসের প্রথমেই চার হাজার টাকা সে বিপাশার হাতে তুলে দেবে। আর এই টাকার কথা কেউ জানবে না, এমনকি অনিন্দ্যর মা-ও না। তিন চার মাস বেশ কাটছিল এইভাবে।

গতকাল হঠাৎ অনিন্দ্য বিপাশাকে বললো, “একটা কথা আমি ভাবছিলাম।”

কি কথা?” জিজ্ঞেস করলো বিশাখা।

“আচ্ছা জগু তোমাদের বাড়িতে গিয়ে সপ্তাহের বাজারটা তো করে দিতে পারে।”

জগু অর্থাৎ জগন্নাথ অনিন্দ্যদের বাড়িতে কাজ করে। অনেকদিনের পুরোণো লোক।

“কেন জগু কেন করবে বাবা নিজেই তো বাজার যায়।” একটু সন্দিগ্ধ হয়ে জিজ্ঞেস করলো বিশাখা।

“না, বলছিলাম, দুদিন অন্তর নিজে বাজার যাওয়ার কি দরকার। বয়েস তো হয়েছে। তাছাড়া বাজারটা হয়ে গেলে আমি হিসেব করে দেখেছি আরো দুহাজার টাকা দিলে ওঁদের চলে যাওয়া উচিৎ।”

“টাকাটা হঠাৎ কমিয়ে দিলে মাকে আমি কি বলবো।”

“তোমার মতো করে বুঝিয়ে একটু বলবে। আফটার অল এতোগুলো করে টাকা প্রতি মাসে… ।”

বিশাখার কানে কথা গুলো বড্ড কঠিন শোনালো। বিশাখা উপলব্ধি করছে এই মুহুর্ত থেকে অনিন্দ্য তার কাছে কেমন এক অচেনা মানুষ। টাকার বিয়োগ ব্যথা কষ্ট দিচ্ছে অনিন্দ্যকে। বিশাখার বাবা-মার অনাহারের কষ্ট সেখানে এতোটা গুরুত্বপুর্ণ নয়।  বিশাখা কিন্তু এ কথা মাকে বলতে পারেনি। কদিন একটু চুপ চাপ থাকার পর অনিন্দ্য বিশাখাকে চাপ দিতে থাকে টাকা কমানোর কথা বিশাখা যাতে তার মাকে বলে। রোজই এখন অনিন্দ্যর সঙ্গে কোন না কোন কারণে বিশাখার কথা কাটাকাটি হয়ে থাকে আর সেই ঝগড়ার মুল কেন্দ্র অনিন্দ্যর শ্বশুর বাড়িতে টাকা পাঠানো। পরিবেশটা হালকা করার না না প্রচেষ্টা বিশাখা চালিয়ে যায়। এই তো গতকাল দুপুরে বিশাখার মা বিশাখাকে না খাইয়ে ছাড়েননি। মা কেমন মাছের কালিয়া রেঁধেছিলেন বিশাখা সেই গল্প শোনাচ্ছিল অনিন্দ্যকে।

“এখন আবার মাছের কালিয়া-টালিয়াও রান্না হচ্ছে তাহলে।” অনিন্দ্য বলতে থাকে, “এখন একটু এই সব খরচা গুলো কম করলে ভাল হয় না? আমাকে তো মাশুলটা গুনতে হচ্ছে। এই জন্যেই বলেছিলাম জগু গিয়ে বাজারটা করে দিক। বাজে খরচাটা তাহলে একটু কমতো।”

“তিন টুকরো মাছে কতো হাজার টাকা খরচ বাড়ে অনিন্দ্য?”

“দুবেলা রোজ খেলে সেটা একটা অবশ্যই ভাল অঙ্ক। সেটা অন্যের টাকায় করা যায় কি?”

“তোমার কি ধারনা আমার মা বাবা এতোটা বেআক্কেলে যে তোমার দেওয়া সাহায্যে তাঁরা ফুর্তি করে বেড়াচ্ছেন? এতো ছোট মন তোমার।”

“কি বললে, আমার মন ছোট? আর আমিই তোমাদের সংসার ঠেলছি। বাঃ কি সুন্দর। এই ছোট মনের মানুষের ওপর চাপটা কমিয়ে একটু অন্য চেষ্টা করলে ভাল হয় না?”

রাগে অপমানে বিশাখা তখন মাটিতে মিশে গেছে। সারা শরীর তার কাঁপছে।

“ঠিক আছে, তুমি কয়েকটা দিন আর অপেক্ষা করো অনিন্দ্য। আমি একটা চাকরীর চেষ্টা করছি। তোমাকে আর আমি কষ্ট দেবো না।”

“তুমি করবে চাকরী? কে দেবে তোমাকে চাকরী এই বাজারে? চাকরী কি হাতের মোয়া?”

“সেটা আমাকে বুঝতে দাও। তোমাকে অসুবিধেয় না ফেললেই তো হলো?”

এর পরে কয়েকদিনের মধ্যে একটি ঘটনার সুত্র ধরে অবস্থাটা চরমে পৌঁছলো। অনিন্দ্যর এক কাকা একদিন এসে উদয় হলেন তাদের বাড়িতে। দিনটা ছিল রবিবার। সেই কাকা এবং অনিন্দ্যর মা সরাসরি বিপাশার ঘরে এসে কৈফিয়ৎ চাইলেন: “তুমি নাকি বৌমা অনিন্দ্যর কাছ থেকে প্রতি মাসে টাকা নিয়ে তোমার বাড়ির সংসার চালাচ্ছো? এতো বড় অন্যায়। ও বেচারা সারা মাস খাটে, ওর তো একটা ভবিষ্যৎ আছে। এতোগুলো করে টাকা এইভাবে চলে যাচ্ছে…ওর কথাটাও তো একটু ভাববে। একি অন্যায় কথা।”

বিপাশা কানে এ কি শুনছে! এই টাকার কথা তো এদের জানার কথা না। অনিন্দ্য আর বিপাশা ছাড়া এই বাড়ির কোন তৃতীয় ব্যেক্তির কানে এ কথা কে তুললো। অনিন্দ্য চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে কাকার পাশে। বোঝা যাচ্ছে এই কথা নিজের মার সঙ্গে অনিন্দ্যই আলোচনা করেছে। বিপাশা অনুরোধ করেছিল আর কটা দিন অপেক্ষা করতে অনিন্দ্যকে। তারপরে অনিন্দ্যর ঘাড় থেকে প্রতিমাসে চার হাজার টাকার বোঝা সে হালকা করে দেবে। কিন্তু বিশাখা বুঝতে পারেনি যে টাকা ততোক্ষণে অনিন্দ্যর সুক্ষতম অনুভুতিকে ভোঁতা করে দিয়েছে।

কোন রকম অপেক্ষা না করে বিশাখা তার কর্তব্য ঠিক করে ফেলে। কাউকে না জানিয়ে বন্ধু চিত্রার সঙ্গে দেখা করে। চিত্রা পাড়াতেই থাকে…একই স্কুলে দুজনের পড়াশুনো। চিত্রাকে বাবার কারখানায় ক্লোজার এবং তার ফলে যে ভয়াবহ অর্থ সংকট দেখা দিয়েছ সেটা যথা সম্ভব সবিস্তারে জানালো বিশাখা। কিন্তু অনিন্দ্যর থেকে টাকা নিয়ে বাবা-মার সংসার টেনে চলার চেষ্টা করতে গিয়ে যে পারিবারিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে সে ঘটনাটা বিপাশা সাবধানে এড়িয়ে গেল চিত্রার কাছে। চিত্রা চাকরী করে।

পাড়াতেই তার কাজের জায়গা। নতুন একটি কারখানা গড়ে উঠেছে এই পাড়াতেই। কারখানার বেশীর ভাগ কর্মচারী মহিলা এবং প্রায় সবাই এই পাড়ারই বাসিন্দা। কারখানার সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অঞ্জন সান্যাল চিত্রাকে খুব স্নেহ করেন। চিত্রাও কাজ শিখছে ভাল ফলে অঞ্জন সান্যালের সুনজরে পড়েছে চিত্রা। চিত্রার যোগাযোগেও এই কারখানায় অনেক মেয়েই চাকরী করছে। চিত্রা রবিবারে বাড়িতে ছিল। একটা টেলিফোন করে বিশাখা পৌঁছে গেল চিত্রার বাড়িতে।

“চিতু তোদের ওখানে আমার একটা কিছু হয় কিনা দেখ না রে। চাকরীটা আমার বড্ড প্রয়োজন। তোর বস তো তোকে খুব পছন্দ করে।”

“পছন্দ করে আবার কি? কি যে যা তা বলিস না। লোকটা বিবাহিত, একটা আধ দামড়া ছেলে আছে।”

“আমি সে কথা বলিনি। তুই কাজ করিস ভাল, অল্প দিনের মধ্যে ডিপার্টমেন্টের দায়িত্ব নিয়েছিস। বসের চোখে পড়াটা তো স্বাভাবিক।”

“ওরা তো লোক নিচ্ছে অনেকদিন থেকে। সব তো প্রায় নেয়া হয়ে গেল। এতোদিন ধরে কি করছিলি তুই? আমিই তো পাঁচজনকে ঢুকিয়েছি। আমার যোগাযোগে, তা নেই নেই করে, অন্ততঃ বারোজন ইন্টারভিউ দিয়েছে।”

“লক্ষ্মীটি  চিতু আমার একটা ব্যবস্থা করে দে। আমার মা-বাবা প্রায় অনাহারে দিন কাটাচ্ছে।”

“কেন, অনিন্দ্য আর তুইতো একটু দেখাশুনো করতেই পারিস।

“সে অনেক কথা… বাদ দে। এখন কথা দে, আমার ইন্টারভিউর ব্যবস্থা শুধু নয় চাকরীটা করে দিতে হবে।”

“আমি কি কথা দেবার মালিক? ইন্টারভিউর ব্যপারটা আগে ফাইনাল করি। তারপরে প্রাণপণ চেষ্টা করবো যাতে চাকরীটা তোর হয়।”

“হ্যাঁ রে কোন এক্সপেরিয়েন্সের দরকার থাকবে নাকি?”

“কোন এক্সপেরিয়েন্সই কাজে লাগবে না। আমাদের স্যার, অঞ্জনবাবু ভিষন ভাল ট্রেনার। তার ওপর তুই আবার ডানা কাটা পরী। ট্রেনিং তোর ভালই হবে। আর তোর রূপের জোরেই ইন্টারভিউ উৎরে যাবি।”

“এই, লোকটার কি এই সবের দোষ আছে নাকি। পরের বোউ নিয়ে টানাটানি করে?”

“আরে না রে না। একদম ভদ্র মানুষ। কাজ ছাড়া কোনদিকে তাকায় না। কিন্তু খুবই বুদ্ধিমান লোক। সবার ব্যক্তিগত সুবিধে-অসুবিধের খবর রাখে। অঞ্জনবাবুই কোম্পানীর সব। নিজে অসম্ভব কাজের লোক।”

“তাহলে আমি কবে খবর পাবো? একটু তাড়াতাড়ি করিস চিতু। বড্ড বিপদের মধ্যে আছি। মাথার ঠিক নেই আমার।”

“একটু ধৈর্য ধর, আমি কালকেই কথা বলবো স্যারের সঙ্গে।”

চারদিন পরে চিত্রার টেলিফোনে জানতে পারলো বিশাখা, তার ইন্টারভিউর দিন কবে ঠিক হয়েছে। এই চারদিনে অনিন্দ্য বুঝতে পারে বিশাখা এমন কিছু ভাবছে যা সে গোপন করছে অনিন্দ্যর কাছে।

“তুমি কি চাকরী করার ধান্দা করছো নাকি? আমি কিন্তু তোমাকে পরিস্কার জানাচ্ছি, চাকরী-টাকরী তোমার করা হবে না। সারাদিন তুমি বাইরে থাকবে আর মা সারাদিন হাঁড়ি ঠেলবে ওসব হবে না। আমি এটা হতে দেবো না।” অনিন্দ্যর ভাষায় ছিল স্পষ্ট কর্তৃত্ব।

“তুমি যা করলে তারপরে এ কথা তোমার মুখে সাজে না । আমাকে কথা দিয়ে মার কাছে গিয়ে সব বলে এলে, ভাল মানুষ সাজতে। আর কাকাকে বাড়িতে ডেকে আমাকে এক জোট হয়ে অপমান করলে। এখন এসে খবরদারী করছো। তোমার লজ্জা করে না? আমি কি করবো না করবো তোমার বলার কোন অধিকার নেই। আর তাছাড়া দুটো প্রাণী, তারা আমার মা-বাবা। এই বিপদে আমি না দেখলে তাঁদের কে দেখবে।”

“আমি যেমন টাকা দিচ্ছিলাম তেমনই দেবো। মার সঙ্গে আমি বুঝে নেবো। কিন্তু চাকরী করা তোমার হবে না। মা-ও চায় না তুমি চাকরী করো।”

বিশাখা বুঝতে পারে এর পরে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। তার কর্তব্য তাকেই স্থির করতে হবে। অনিন্দ্যর কাছ থেকে বাবা-মার সংসার চালানোর খরচ আর নিতে থাকলে সেটা চরম অপমানজনক হবে এবং অশান্তি বাড়তেই থাকবে। কিন্তু বিশাখা কি করবে। চাকরী করা নিয়ে যে প্রতিকুল অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে ক্রমশঃ তার কোন সমাধান বিশাখার জানা নেই।

ইন্টারভিউর দিন সকাল সাড়ে নটায় বিশাখাকে পৌঁছতে হলো। কারখানা তার বাড়ি থেকে হাঁটা পথ। সিনিয়র এক্সিকিউটিভের ঘরের বাইরে প্রায় আধ ঘন্টা তাকে বসতে হলো। খুব নার্ভাস লাগছে বিশাখার। চাকরীর জন্যে ইন্টারভিউতে কখন বসেনি সে। যদি চাকরীটা না হয় তাহলে কি করবে বিশাখা! চিতু বলেছে লোক নেয়া প্রায় শেষ। যদি না বলে দেয়।

একজন মহিলা বিশাখাকে ডেকে ঘরের ভেতরে যেতে বললো। চেম্বারের ভেতরে টেবিলের উল্টোদিকে বসে আছেন একজন সুন্দর চেহারার ভদ্রলোক। চেয়ারে বসেই যা লম্বা দেখাচ্ছে তাতে মনে হয় তাঁর দৈর্ঘ ছ’ফুটের বেশ কিছুটা ওপরে। গায়ের রঙ বেশ ফরসা, চোখে সরু ফ্রেমের চশমা। বিশাখা ঘরে ঢুকতেই উঠে দাঁড়িয়ে স্বসম্মানে তাঁর উল্টোদিকের চেয়ারে বসতে অনুরোধ করলেন।

“জল খাবেন?” সন্দেহ নেই, ভদ্রলোক সুকন্ঠের অধিকারী। ঘরটা গম গম করে উঠলো। নার্ভাসনেসটা গলা শুনে আরো বাড়লো বিশাখার। বেল দিয়ে কাউকে একটা জল দিতে বললেন ভদ্রলোক।

“আপনি আপনার কোন CV পাঠিয়েছিলেন কি? বোধহয় না। তাহলে আমার কাছে থাকতো।”

“না, আমি কিছু পাঠাইনি তো।” গলা দিয়ে স্বর প্রায় বেরতেই চাইলো না বিশাখার।

“আগে কোথাও কোন কাজ করেছেন? কোন অভিজ্ঞতা?”

“আজ্ঞে না।” এর মধ্যে জল এসে যেতে গলাটা একটু ভিজিয়ে বাঁচলো বিশাখা।

“আপনি থাকেন কোথায়?”

“এখান থেকে খুব কাছে…হাঁটা পথ।”

“জিওম্যাট্রিক ড্রইং সম্মন্ধে কোন ধারনা আছে?”

“আজ্ঞে না।”

“আপনি কি সায়েন্সের ছাত্রী?”

“হায়ার সেকেন্ডারিতে সায়েন্স ছিল।”

“গ্রাফ প্লট করেননি ক্লাসে?”

“হ্যাঁ করেছি।”

“ও আচ্ছা তাহলে তো ভাল।”

ধরে যেন প্রাণ এলো বিশাখার।

“আমাদের এখানে অফিসের শুরুটা ঠিক থাকে ছুটিটা ঠিক থাকে না। কোন অসুবিধে আছে কি? বিবাহিতা মহিলাদের অনেক সমস্যা থাকে, তাই জিজ্ঞেস করছি।”

“না আমার কোন অসুবিধে নেই।”

“কাজ আমরা সব শিখিয়ে নিই কিন্তু যিনি শিখবেন তাঁর ফুল কোঅপারেশনটা আমাদের চাই। হাউএভার, আমাদের রিক্রুটমেন্ট প্রায় শেষ হয়ে গেছে। আমি দেখছি কি করতে পারি। আপনি চিত্রার মাধ্যমে যোগাযোগ করেছেন, তাই তো?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ।”

“আমি নোট করে রাখছি, খবর দেবো।”

“একটা কথা বলবো স্যার?” বিশাখা অনেকটা সাহস সঞ্চয় করে এবার বলে ফেললো।

“হ্যাঁ নির্দ্বিধায় বলুন।”

“স্যার আমার চাকরীটা ভিষন প্রয়োজন। একটু দয়া করে দেখবেন।”  বিশাখার গলায় ছিল কুন্ঠা।

অঞ্জন ঠিক এই মুহুর্তটার জন্যে প্রস্তুত ছিল না।

“আমি চেষ্টা করবো। বুঝতেই পারছেন লোক নেয়ার পালা প্রায় শেষ হয়ে গেছে। আমরা এবার কিছু স্কিল্ড লোক নেবো যারা কেউই মহিলা নয়। একাজ গুলো মহিলাদের দিয়ে করানো যায় না। তাই চান্সটা কমে গেছে। তাও আমি বলছি, চেষ্টা করবো।”

“স্যার একটু দেখবেন।”

শেষের দিকে বিশাখার গলা ধরে এলো। একটা কান্না বেরিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছিল। বিশাখা সামলে নিলেও অঞ্জনের চোখ এড়ায়নি।

তারপরে দুটোমাস কেটে গিয়েছিল। অনেক চাকরীর আবেদন আর অনুরোধের ভীড়ে বিশাখার চাকরীর স্বকরুণ অনুরোধ কখন, কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল অঞ্জনের খেয়াল নেই। নোতুন উৎপাদন সংস্থার নিজস্ব কিছু সমস্যা থাকে যা টার্গেটে পৌঁছতে দেয় না সহজে। বিদেশী মেশিনের সঙ্গে ভারতীয় শ্রমিকদের পরিচয় এবং অভ্যস্ত হতে সময় লাগে ফলে কাজ এগোচ্ছিল ধীরে। ফলে আকাঙ্খিত মুনাফা আসতে দেরী হচ্ছিল। মালিক পক্ষের দিক থেকে মানষিক চাপ ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকছিল অঞ্জনের ওপর।

রাস্তায় অসিতবাবুর কাছে পাড়ায় এক মহিলার সুইসাইডের খবরটা মাথায় নিয়ে অঞ্জন সান্যাল কারখানায় পা রেখেই বুঝলো থমথমে ভাবটা কারখানাকে বেশ প্রভাবিত করেছে। চিত্রা কাঁদো কাঁদো মুখে দাঁড়িয়ে আছে। একটা জটলা চলছিল। অঞ্জনকে ঢুকতে দেখে সবাই কাজের জায়গায় চলে গেল। দাঁড়িয়ে রইলো শুধু চিত্রা।  অঞ্জন যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে চিত্রাকে জিজ্ঞেস করলো, “কি ব্যপার, এখানে দাঁড়িয়ে?”

“স্যার…”  কথা আটকে গেল চিত্রার…ও কাঁদছে।

“কি হয়েছে? কাঁদছো কেন?”  অঞ্জন আসন্ন একটা দুঃসংবাদ আঁচ করতে থাকে।

“স্যার বিশাখা নেই।”

“বিশাখা? বিশাখা কে?” অঞ্জন অস্বস্তি জড়ানো কন্ঠে জিজ্ঞেস করে।

চিত্রা কথা বলতে পারছে না।

“কে বিশাখা? আমি বুঝতে পারছি না চিত্রা। আমি কি তাকে চিনি?”

“স্যার যার আপনি শেষ ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন।” কাঁদতে কাঁদতে বললো চিত্রা।

“সেকি! কখন ঘটলো? কি হয়েছিল মেয়েটির?”

অঞ্জন সব শুনেছিল চিত্রার কাছে। শুনেছিল বিশাখার ওপর চরম নির্যাতনের কথা। বিশাখার বাবা-মাকে টাকা পাঠানোটা অনিয়মিত হয়ে গিয়েছিল। টাকার অঙ্কও নেমে গিয়েছিল পঞ্চাশ ভাগ। আর তার জন্যে চলতো অসহ্য লাঞ্ছনা। ইদানিংকালে অনিন্দ্য বিশাখার গায়ে হাত তুলতো। তবুও বিশাখার আশা ছিল চিত্রা যখন আছে চাকরীটা হয়ে যাবে। কিন্তু চাকরী হওয়ার আশা ক্রমশঃ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়েছিল। চাকরী বা টাকা একটা সাহস যোগায়। সাহস যোগাবার মতো আর কিছু ছিল না বিশাখার। নিজের সঙ্গে লড়াইয়ে সে হার মানতে বাধ্য হলো।

কিন্তু একি করলো অঞ্জন। ওতো একটু চেষ্টা করলেই বিশাখার চাকরীটা করে দিতে পারতো। ওকে তেমন কোন জবাবদিহি করতে হতো না। একেবারে ওর লোক দরকার ছিল না তাও নয়। হ্যাঁ, কটাদিন দেরীতে হলেও ক্ষতি হয়তো ছিল না। কিন্তু কয়েকটা দিন অপেক্ষা করার কথা বিশাখাকে বলা তো হলো না। চাকরীর আশা মাথায় রেখে বিশাখা নিশ্চয়ই অপেক্ষা করতো। এতো কাজ আর দায়িত্বের ভীড়ে সে বিশাখাকে চেষ্টা করবে বলে যে কথা দিয়েছিল সেটা নিতান্তই ছিল কথার কথা। কিন্তু শুধু ওই কথা দেওয়াটুকু আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছিল বিশাখা। অঞ্জন তো মনে করতেও পারছিল না: কে বিশাখা।

একটু আগে বিশাখার নিথর দেহটা এসেছিল ওদের বাড়ির দরজায়। অঞ্জন যেতে পারেনি লাশকাটা ঘর থেকে ফেরা বিশাখার নির্যাতনে ছিন্নভিন্ন দেহের সামনে। এক ভয়ঙ্কর অপরাধ বোধ তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। বিশাখার বিষাদে ছাওয়া চোখের ভাষা অঞ্জন পড়তে পারেনি সেদিন কিন্তু বিশাখা কসুর করেনি তার ভাষা অঞ্জনকে পড়াতে…ওযে বাঁচতে চেয়েছিল।

পুলিশের যাতায়াত বেড়েছিল বিশাখার শ্বশুর বাড়িতে। অঞ্জন শুনেছিল অনিন্দ্য আর ওর মাকে পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে। অঞ্জন ভাবে ওর নিজের অপরাধই বা কম কি। অঞ্জন, হ্যাঁ অঞ্জনই পারতো বিশাখাকে বাঁচাতে কিন্তু বিশাখার প্রয়োজনকে অঞ্জন তেমন গুরুত্ব দেয়নি। মামুলি কথা দিয়ে শেষ পর্যন্ত নিরাশ করেছিল বিশাখাকে।

অঞ্জন বিশাখার পরিত্যক্ত পরিবারের দুই বৃদ্ধ আর বৃদ্ধার প্রতিমাসের সুস্থ হয়ে বেঁচে থাকার দায়-ভার নয়, এক সীমাহীন শূণ্যতার ভাগীদার হয়েছিল নিজের অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করতে। অঞ্জনের অফিসে অসিতবাবু এসেছিলেন একদিন দুপুরবেলা। অঞ্জন সেই সময় হিমশিম খাচ্ছিলো একটা কাজ নিয়ে। খুব অনিচ্ছা সত্বেও দেখা করলো অঞ্জন, অসিতবাবুর সঙ্গে।

“কেমন আছেন মশাই, একেবারে ডুমুরের ফুল? দেখাই পাওয়া ভার।” অসিতবাবু আজ একটু হালকা মেজাজে।

“না না, ও কথা কেন বলছেন। নতুন ইউনিট তো, অনেক সমস্যাই একে একে মেটালে হয় না। কোন কোন সময় সব এক সঙ্গে দেখা দিচ্ছে।“

“আরে আমি মজা করছিলাম। শুনলাম বিশাখার মা-বাবার সমস্ত দায়িত্ব নাকি আপনি কাঁধে নিয়েছেন? এ এক মহৎ কাজ মশাই। টাকা থাকলেই সবাই এতো বড় দায়িত্ব নেয় না।“

“এটা আপনি আমার সম্মন্ধে একটা অন্যায় কথা বললেন অসিতবাবু।“ একটু সিরিয়াসলি কথাটা বললো অঞ্জন।

“অন্যায় কি বলছেন মশাই ? কজন পরের এই দায়িত্ব নিতে পারে।“

“জানেন অসিতবাবু আমার বেকার মা আর বাবা এখনও আমার পরিবারের একজন।“ অঞ্জন বলতে থাকে।  “জন্ম থেকে আমি অন্ততঃ তাই জানি। দায়িত্ব এই শব্দটির মধ্যে স্পষ্ট একটি লায়াবিলিটির গন্ধ আছে। এটা আপনি মানেন কি? আমার মা-বাবা আমার যে কারণে লায়াবিলিটি নন একই কারণে আপনার কি মনে হয় না যে বিশাখার মা ও বাবা আমার লায়াবিলিটি নন? আমাকে এতোটা ছোট করবেন না, দোহাই আপনার। আমি বিশাখার মা-বাবার দায়িত্ব নেবার মতো অপরাধ করতে পারবো না। তাঁদের সর্বশূণ্যতার খানিকটা ভাগ নেয়ার চেষ্টা করছি। এটাকে দায়িত্ব বলবেন না।“

“আপনি এক আশ্চর্য লোক মশাই। এতো বছর নিপীড়িত মানুষের হয়ে কথা বলে শুধু গলাই ফাটিয়েছি, শিখেছি কম। আর কতো সহজে একটা কঠিন সত্য শিখলাম আপনার কাছে। আমাকে মাপ করবেন।”

অফিসের চওড়া টেবিলের সামনে সেই চেয়ারটায় মাঝে মাঝেই এসে বসে বিশাখা। দুটি ডাগর কালো চোখে বাসি হয়ে শুকিয়ে আছে সামান্য কাজল ধোয়া চোখের জল… চেয়ে থাকে অঞ্জনের দিকে…ঠোঁটে একটা হালকা হাসির ছোঁয়া, মিলিয়ে গিয়েও মেলায়নি। বিশাখার ক্লান্ত হাসি জানে… অঞ্জন এখন পড়তে পারে বিশাখাদের চোখের ভাষা।

শেষ

 

~ পলাতকা ~

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

*