স্নিগ্ধা চৌধুরীর পৈতৃক বাড়িটা কলকাতা শহর ছাড়িয়ে বেশ কিছুটা উত্তরে গিয়ে গঙ্গার ধারে একটা নিরিবিলি জায়গায়। উঁচু পাঁচিল ঘেরা প্রচুর গাছ পালা ভরা একটা বিশাল জমির মাঝে প্রায় দেড়শ বছরের পুরনো বাড়িটা দাঁড়িয়ে। বাড়ির আয়তনের তুলনায় লোক সংখ্যা স্বল্প হলেও আজও একটা একান্নবর্ত্তী পরিবার এখানে বাস করে।
একান্নবর্ত্তী পরিবারের অংশ হলেও স্নিগ্ধা কিন্তু মূল বাড়িতে থাকে না। বাড়ির বাম পাশে গাছ গাছড়ার আড়ালে যে আউট হাউস টা প্রায় অদৃশ্য, সেখানেই তার দিন রাত কাটে। পেশায় স্কুল টিচার, বয়স চল্লিশের কোটায়, বিয়ে করেনি। এ নিয়ে বাড়ির লোকেদের এক সময় মাথা ব্যাথা ছিল, কিন্তু আজ সকলেই মেনে নিয়েছে।
কোনো অজ্ঞাত কারণে স্নিগ্ধার জীবন মাঝে মধ্যেই কিছু আশ্চর্য অলৌকিক ঘটনায় জড়িয়ে পড়ে। বহু অদ্ভুত অভিজ্ঞতা তার জীবনে ঘটেছে যার হয়তো ব্যাখ্যা আছে কিন্তু তার খোঁজ স্নিগ্ধা আজও পেয়ে ওঠেনি। যেমন মাস তিনেক আগের কথাই ধরা যাক। স্কুল থেকে কয়েকদিনের জন্য এক্সকার্সন এ গোয়ায় গিয়েছিল কয়েক জন টিচার এবং ছেলে মেয়েরা। এক ঘেয়ে দিন পঞ্জির বাইরে কটা দিন ভালোই কাটলো স্নিগ্ধার। ফেরবার পথে মুম্বাই থেকে দুরন্ত এক্সপ্রেস ধরেছিল সকলে।
যারা ট্রেনে ওই রাস্তায় সফর করেছেন তারা জানেন কত গুলো ভারি সুন্দর সুন্দর স্টেশন পরে ট্রেন ছোটনাগপুর মালভূমিতে ঢোকার পর। স্টেশন গুলি একেবারেই নির্জন। লাল মোরামে ঢাকা প্লাটফর্ম। আশে পাশে বাড়িঘর দেখা যায় না বললেই চলে। বিশালাকৃতির গাছ পালা ঘেরা মনোরম দৃশ্য। আর জায়গার সুন্দর নামগুলো বাঙালি ভ্রমণকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকে।
তবে দুরন্ত এক্সপ্রেস এসব কোনো স্টেশনেই দাঁড়ায় না। তবে সেদিন দাঁড়িয়েছিল একটা এরকমই স্টেশনে। হয়তো সিগনাল পাচ্ছিল না। এ.সি টু টায়ার-এর সাইড লোয়ারটাতে বসে হাঁ করে চারদিকের সৌন্দর্য গিলছিলো স্নিগ্ধা। ট্রেনের ভেতরে বসেও অনুভব করার চেষ্টা করছিল বাইরের আবহাওয়াটা কেমন।
ওর জানলার সামনে প্লাটফর্ম, তারপর আর দুটো লাইন তারপর আবার একটা প্লাটফর্ম হয়ে স্টেশন শেষ। দূরের প্লাটফর্মের গায়ের ফেনসিং ঘেঁসে একটা বিশাল গাছ। তার নীচে দুটি ছেলে দাঁড়িয়ে। বছর আটেক বয়স হবে। খলি গা, হাফ প্যান্ট পরা। হঠাৎ একটি ষোলো-সতেরো বছরের মেয়ে কোত্থেকে এসে ছেলে দুটিকে কি বলে, তারপর পিছন ফিরে চলতে শুরু করে।
স্নিগ্ধার অলস দৃষ্টি হঠাৎ সজাগ হয়ে ওঠে। দূরে যে মেয়েটি যাচ্ছে ওর মাথার খোঁপায় একটা ফুলের থোকা লাগানো রয়েছে। ফুলের থোকাটা সাধারণ না। এক গুচ্ছ হলুদ ফুল আর কিছু সবুজ পাতা দিয়ে যত্ন করে বানানো থোকাটা। তার চেয়েও বড় কথা , অবিকল এই একই রকম ফুলের থোকা স্নিগ্ধা দেখেছে। আজ থেকে প্রায় পনের বছর আগে। কোথায় দেখেছে সেটা ভাবার সময় এটা নয়। স্নিগ্ধা হঠাৎ একটা কান্ড করে বসে।
ওর সামনের সিটে সহকর্মী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু আরতি। “আমরা এখানেই নামবো। তাড়াতাড়ি চল” – এই বলে আরতি কে এক ঠ্যালা দেয় স্নিগ্ধা।
খুব চকিতে সব ঘটে। সকলের অনেক বাধা, যুক্তি তর্ক কোনো কিছুই কাজ করে না স্নিগ্ধার ওপর। কিছুটা ওর স্বভাব জানে বলেই বাকিরা ওকে নামতে দেয় ওখানে। আরতি না নামলেও স্নিগ্ধা জোর করতো না। কিন্তু বন্ধুকে ওই নির্জন জায়গায় একা ছাড়তে পারেনি আরতি।
কপার্টমেন্টের দরজা থেকে বেশ নিচু প্লাটফর্মটায় ওরা নামতেই গাড়িটা ছেড়ে দেয়। যেন ওদের নামার প্রতীক্ষায় ছিল। ট্রেনের আওয়াজ আস্তে আস্তে মিলিয়ে যেতেই বোঝা যায় চার পাশ কি চরম নিস্তব্ধ। দুপুর গড়িয়ে তখন বিকেল হতে চলেছে।
প্লাটফর্ম নিস্তব্ধ হলেও স্নিগ্ধার উত্তেজনা তখন চরমে। ওভার ব্রিজ ব্যবহার না করে লাইন আর প্লাটফর্ম টপকে স্টেশনের বাইরে আসে ওরা। যে মেঠো পথটা স্টেশন থেকে গেছে , সেই পথ দিয়েই বহুদূরে মেয়েটিকে দেখা গেল। বাক্যব্যয় না করে ছুট লাগলো স্নিগ্ধা। আরতির মুখে কথা নেই। শুধু অনুসরণ করছে।
গ্রামের মানুষদের হাঁটার গতি শহরের মানুষদের চেয়ে সাধারণত বেশি হয়। বহুক্ষণের চেষ্টায় স্নিগ্ধা ও আরতি ওই মেয়েটিকে ধরে ফেলল।
কোনো ভনিতা না করেই স্নিগ্ধা মেয়েটিকে তার মাথায় লাগানো ফুলের থোকাটির কথা জিজ্ঞাসা করে। মেয়েটি যে ভাষা ব্যবহার করছিল তা দেহাতি হিন্দি ধরণের। প্রথমে বুঝতে অসুবিধা হলেও পরে স্নিগ্ধা ওর কথা বুঝতে পারে। মেয়েটি জানায় এই ফুল তাদের বাড়ির বাগানেই হয়। আর থোকাটা তার স্বামী তাকে বানিয়ে দিয়েছে। স্নিগ্ধা বলে একবার তারা বাড়ি গিয়ে সেই ফুলের বাগানটা আর তার স্বামীকে দেখতে চায়। কিছুটা অবাক, কিছুটা সন্দিগ্ধ হয়েও মেয়েটা রাজি হয়ে যায়। সে জানায় তার স্বামী আজ বাড়ি নেই। দূরের গ্রামে গেছে। তবে তারা বাড়ি গিয়ে তার ফুলের বাগান দেখে আসতে পারে। একটু হতাশ হয়েও স্নিগ্ধা রাজি হয়ে যায়।
বাড়ী বলতে একটা খুবই অস্থায়ী ধরণের কুটির দাঁড়িয়ে আছে বেড়া দিয়ে ঘেরা একটা বড় জায়গার মধ্যে। সংসারের ব্যবহার্য জিনিস নেহাতই সাধারণ। মাটির বাসন কোসন, কিছু মলিন জামা কাপড় এসবই চোখে পড়ল। বাড়ির পিছুন দিকটায় একটা চৌকো জায়গায় সেই হলুদ ফুলের বাগান। ফুল গুলো বেশ উজ্জ্বল, অন্য কোথাও এরম ফুল দেখেনি সেটা আরতিও স্বীকার করল। মেয়েটির স্বামী কাল সকালে ফিরবে। স্নিগ্ধা জানায় তারা আবার কাল আসবে। মেয়েটিও রাজি হয়ে যায়। আর দেরী করে না ওরা , ফিরতে শুরু করে স্টেশনের দিকে।
স্টেশনের যেদিকটা ওরা গেছিলো সেদিকে বসতি চোখে পড়ে না। যা কিছু আছে তা অন্য পারে। রাত্রিবাস করার মতো একটা খুবই সাধারণ মানের সরাইখানা আছে। সরকারি কাজে লোকজন এলে সেখানেই ওঠে। তারই একটা ঘরে ঠাঁই নেয় দুই বন্ধু।
এতক্ষন পর আরতি স্নিগ্ধাকে প্রশ্ন করার সুযোগ পায়। আরতির মনের অন্ধকার দূর করার জন্য স্নিগ্ধা তার অতীতের কিছু ঘটনা বলে যেতে থাকে।
আজ থেকে প্রায় পনের বছর আগে কুমায়ুন হিমালয়ে বেড়াতে গেছিলো স্নিগ্ধা। কুমায়ুনের পরিচিত জায়গা গুলো ছাড়াও স্নিগ্ধারা কতগুলো স্বল্প পরিচিত স্থানেও কিছুদিন কাটায়। এমনি একটা জায়গায় স্নিগ্ধার একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছিল।
পাহাড়ি জায়গা, অত্যন্ত নির্জন। গাছপালা, বনবাদার আর কিছু জায়গায় কিছু সুন্দর সুন্দর ফুলের গাছ ছিল। একদিন ভোরে স্নিগ্ধা একা একা বার হয় জায়গাটা ঘুরে দেখার জন্য। হাঁটতে হাঁটতে সে একটা বন্য বাগানে চলে আসে। লম্বা লম্বা ঘাস, কিছু ফুল কমলাটে রঙের, দূরে পাহাড় চূড়া – খুব ভালো লেগে যায় স্নিগ্ধার জায়গাটা।
নির্জন স্থান। বেশ কিছুক্ষণ বসে ছিল সে। হঠাৎ সেখানে একটি অল্প বয়সী ছেলেকে দেখে সে। গ্রাম্য ছেলে, বছর বারো বয়স, কিন্তু ছেলেটিকে কুমায়ুনের লোক বলে মনে হয় না স্নিগ্ধার। গায়ের রঙ কালো, মুখের গড়নও অন্যরকম। জিজ্ঞাসা করলে বলে সে দূরের এক গ্রাম থেকে এসেছে। সেই নির্জন স্থানে কিছু সময়ের মধ্যে দুজনের বেশ ভাব জমে যায়। ছেলেটা সরল মনে অনেক কথা বলে। স্নিগ্ধা তাকে এটা ওটা জিজ্ঞাসা করে। বেশ কিছুক্ষণ কাটানোর পর স্নিগ্ধা চলে আসবে বলে ছেলেটিকে বিদায় জানায়। ছেলেটির বোধ হয় স্নিগ্ধাকে বেশ পছন্দ হয়ে ছিল। সে বলে কাল যদি স্নিগ্ধা একই সময় এখানে আবার আসে তো সে তাকে একটা জিনিষ দেবে। স্নিগ্ধা ওর কথায় বেশ মজা পায়। কথা না দিলেও, স্নিগ্ধা বলে যে সে চেষ্টা করবে।
পরের দিনও স্নিগ্ধা সেখানে গিয়েছিল কৌতহলবশতঃ। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর আগের দিনের মতো ছেলেটা হঠাৎ কোত্থেকে উদয় হয়। স্নিগ্ধা এসেছে দেখে তার চোখ আনন্দে চক চক করে ওঠে। আর স্নিগ্ধাকে সে যেটা দেয় সেটা হলো একটা হলুদ ফুলের থোকা। পাতা দিয়ে সাজানো, আজকের মেয়েটির মাথায় যে থোকা ছিল অবিকল তার মতো। এত বছরেও স্নিগ্ধা ঐ থোকার কথা ভোলেনি, কিন্তু অন্য কোথাও ওই ফুল ও দেখেনি। এমনকি কুমায়ুন হিমালয়েও না।
তাই আজ আর সে স্থির থাকতে পারেনি। কোনো রহস্য এর পেছনে আছে এবং তাকে সেটা জানতেই হবে এই জন্য সে ট্রেন থেকে নেমে পড়ে।
ঘটনার যোগ সূত্রে আরতিও ভাবনার জালে জড়িয়ে পড়ে। দুজনেই ক্লান্ত ছিল, রাতে কোনো রকমে মুখে কিছু দিয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে।
পরদিন সকালে দুজনেরই আর তর সইছিলো না। তবুও ওরা একটু দেরি করেই রওনা করে মেয়েটির বাড়ির দিকে।
গতকাল উত্তেজনায় চার দিকটা নজর পড়েনি। আজ সকালে দেখে ওদের মনে হলো জায়গাটা ওরা যা ভেবেছিল তার চেয়েও বেশি নির্জন। বসত গ্রাম বলে কাছাকাছি কিছু নেই। আর রেল লাইন পেরিয়ে ওরা যেদিকে যাচ্ছে সেদিকে আদৌ কোনো বসতি আছে বলে মনে হয় না। আছে চাষের জমি, মাঠ ঘাট আর কিছু দূর পেরিয়ে জঙ্গল।
লাইন পেরিয়ে পথ চলতে থাকে স্নিগ্ধারা। ভাদ্র মাসের শেষ। ভোর বেলায় একটা হিমেল ভাব আছে।
দুই বন্ধুতে গল্প করতে করতে পৌঁছয় কালকের কুটিরের সামনে। চার পাশ টা আজ ভালো করে খেয়াল করে। যে জমিটার ওপর ওরা বাসা বেঁধেছে তার পিছন থেকে শুরু হয়েছে একটা ঘন জঙ্গল। চার পাশেও বড় বড় গাছ ঘরটাকে ছায়ায় ঘিরে রেখেছে।
বেড়ার মধ্যে মাটিতে বসে থাকা একটা যুবককে দেখতে পায় ওরা। বেশ সুন্দর ছিপছিপে চেহারা, কালো রং, পরনে একটা নীল লুঙ্গি, আদুল গা। স্নিগ্ধা ওর মুখ আর চোখ ভালো করে দেখে। পনেরো বছর পেরিয়ে গেলেও চিনতে কষ্ট হয় না এই ছেলেটিকেই কিশোর অবস্থায় দেখেছিল স্নিগ্ধা।
বেড়ার ভিতর ঢুকে যায় স্নিগ্ধা। জিজ্ঞাসা করে ওকে – “চিনতে পারছ আমায়?”। ছেলেটি ওর মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। সে দৃষ্টিতে হ্যাঁ ও নেই, না ও নেই। কিন্তু বোকা নয়, বোঝদার মানুষের দৃষ্টি। স্নিগ্ধা মনে করে হয়তো বা কিশোর বয়সের স্মৃতি ম্লান হয়ে গেছে। মনে করানোর জন্য যত রকম ঘটনা হয় সব তাকে বর্ণনা করে স্নিগ্ধা। ছেলেটি তখন ও চুপ। ইতিমধ্যে ওর স্ত্রী পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে।
এত বোঝানোর পর ও কোনো উত্তর নেই দেখে সবাই চুপচাপ। নিস্তদ্ধতা ভাঙে এক পঞ্চম কন্ঠস্বর। ওরা চমকে দেখে বাড়ির পিছন থেকে বেরিয়ে এসেছে একটি বুড়ো মানুষ। বয়স হয়তো আশির কাছাকাছি। চুল সাদা, শরীর সামান্য ঝুঁকে পড়লেও, কণ্ঠস্বর দৃঢ়। বুড়োমানুষটি জোরের সাথে স্নিগ্ধাকে বলে যে এই ছেলেটি কোনো দিন পাহাড়ে যায়ইনি তো স্নিগ্ধা কি ভাবে ওকে দেখবে। ওরা এই বিহার, উড়িষ্যার আসে পাশেই ঘুরে বেড়ায়, যেখানে মনে ধরে সেখানে দুদশ মাস থেকে যায় ছোট ঝুপড়ির মতো বানিয়ে। স্নিগ্ধা বারে বারে ওই হলুদ ফুল দিয়ে বানানো থোকার কথা বলতে থাকে, কিন্তু বুড়োটি বেশ কৌশলের সাথে তার সব যুক্তি কেটে দেয়। বুঝিয়ে দেয় ওরম ফুলের থোকা যেকোনো কেউই করতে পারে। আশ্চর্য ব্যাপার যে যুবকটি বা তার স্ত্রী এ ব্যাপারে একটি কথাও বলে না।
গোটা ব্যাপারটাই একটা পন্ডশ্রম হলো ভেবেও আরতি ও স্নিগ্ধা অনেক্ষণ বসে বসে গল্প করে ওদের সঙ্গে। বেশি আলোচনা হয় ওদের জীবন নিয়ে।
বুড়ো মানুষটি আসলে একজন সাধু প্রকৃতির লোক। এই ছেলেটিকে বহু ছোট বেলায় ওর মা- বাবা এই সাধুর সঙ্গে পাঠিয়ে দেয়। হয়তো বাড়িতে খাওয়া জোটাতে পারতো না। মেয়েটি সাধুর কাছে আরও পরবর্ত্তি কালে আসে। সে অনাথ। সাধু সময় হলে ওদের দুজনের বিয়ে দেয়। ওরা সাধুকে গুরুজী বলে মানে। তিন জনে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। দুজনে মিলে সাধুর যথাসাধ্য সেবা করে, এই ভাবেই দিন চলে।
বেলা অনেক গড়িয়ে গেছিলো। এবার ওরা দুজনে উঠে পড়ল। সাধু সপরিবারে বেড়ার কাছে এলো ওদের বিদায় জানানোর জন্য। আরতি হঠাৎ ওই যুবক- যুবতীর নাম জিজ্ঞাসা করলো। ওরা কিছু বলার আগেই এবারও উত্তর এলো ওই সাধুর কাছ থেকে। যুবকের বাপ মায়ের দেওয়া নাম আজ কারও মনে নেই। দুজনেরই নতুন করে নামকরণ করে দেন সাধু বাবা। যুবকের নাম প্রভারক্ষ্য, ওর স্ত্রীর নাম বরুধিনি।
নাম দুটি শুনে বেশ আশ্চর্য্যই হয় আরতি ও স্নিগ্ধা। ওদের মনের ভাব বুঝতে পেরে সাধু বাবা জানান যে তিনি সদাই ঈশ্বর চিন্তা, শাস্ত্র পাঠ ইত্যাদি নিয়ে থাকেন, তাই এই দুটি পৌরাণিক নামকরণই করেছেন। আর কথা হয় না, ফেরার পথে পা বাড়ায় আরতি ও স্নিগ্ধা।
বিভিন্ন চিন্তা ও হতাশা নিয়ে ফিরতে থাকে ওরা। অন্যমনষ্ক হয়ে প্রভারক্ষ্য ও বরুধিনি নাম দুটো বিড় বিড় করে দু চারবার উচ্চারণ করে আরতি। তারপর আপন মনেই বলে – “কোথায় যেন শুনেছি”।
ফেরার পথে স্টেশন এ খোঁজ নেয় ওরা। সন্ধ্যা নাগাদ একটা প্যাসেঞ্জার ট্রেন এখানে থামে, যেটা কাল ভোরে টাটানগর পৌঁছাবে। দুটো টিকিট কেটে নেয় ওরা।
দুপুরে খাওয়ার পর শুয়ে স্নিগ্ধা চুপচাপ চিন্তা করছিল। সে কিছুতেই মানতে পারছিল না তার এত বড় ভুল হচ্ছে। সেই মুখ ছেলেটার, সেই চোখ, সেই ফুলের থোকা। পনেরো বছর আগের স্মৃতি আর বর্তমান আলো আঁধারীর মতো তার মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। মাথা ক্লান্ত হয়ে কখন চোখ বুঁজে গিয়েছিল জানে না, ঘুম ভাঙে আরতির ঠেলাঠেলিতে। প্রচন্ড উত্তেজিত আরতি। স্নিগ্ধাকে ঠেলে তুলে নিজের মোবাইল ফোনের দিকে ইঙ্গিত করে সে।
“এখানে নেট খুব উইক। অনেক কষ্টে ডাউনলোড করলাম পৌরাণিক তথ্যটা।“ এক সায়ে উত্তেজিত কণ্ঠে আরতি যা বলে যায় তার সারার্থ এই রকম। প্রভারক্ষ্য সত্যি একটি পৌরাণিক চরিত্র। এক সাধুর সাহায্যে সে চোখের নিমেষে হিমালয় গিয়েছিল। সেখানে গিয়ে তার সঙ্গে যে মেয়েটির দেখা হয়েছিল তার নাম বরুধিনি।
এই অবধি বলে হাঁপায় আরতি। “ কি ভাবে সেই সাধু প্রভারক্ষ্য কে চোখের নিমেষে হিমালয়ে পাঠিয়েছিল জানিস?” প্রশ্ন করে আরতি। স্নিগ্ধা মাথা নাড়ায়। এবার আরতি যা বলে সত্যি চমকপ্রদ। ওই সাধু নানা গাছপালা, ফুলফলের গুণাগুণ ব্যবহার করার যোগ বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। কোনো এক ধরণের গুল্মের ফুলের নির্যাস মন্ত্রপূতঃ করে প্রভারক্ষ্যর পায়ে লাগিয়ে মনে মনে তাকে হিমালয়ের কথা চিন্তা করতে বলে। আর প্রভারক্ষ্য তৎক্ষণাৎ হিমালয় পৌঁছে যায়। কিন্তু কথা ছিল সেই নির্যাস শুকিয়ে গেলে সে আর ফিরতে পারবে না। ঠিক তাই হয়। প্রভারক্ষ্য আর ফিরতে পারেনি। সেখানেই তার দেখা হয় বরুধিনির সাথে।
সব শুনে স্নিগ্ধার চোখ চক চক করে ওঠে। সে কিছু বলতে গেলে আরতি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে “ তুই কি তাই ভাবছিস যা আমি ভাবছি? ওই হলুদ ফুলগুলো হয়তো সেই….”। কথা শেষ করতে দেয় না স্নিগ্ধা। আরতির হাত ধরে টেনে তোলে তাকে। মুখে বলে “শিগগিরি চল”। ঊর্ধ্বস্বাসে ছুটছিলো ওরা। সূর্য দিগন্তের দিকে দ্রুত এগোচ্ছে, পথ আর শেষ হয় না। উত্তেজনার হৃদপিণ্ডের শব্দ দুজনেই শুনছে। এসে গেছে প্রায়, একশো গজ, পঞ্চাশ গজ, পঁচিশ গজ এবার বেড়ার সামনে।
এত ছোটার অভ্যাস নেই কারোর। পা গুলো টন টন করছিল। সেসব গ্রাহ্য না করেই বেড়া ঠেলে ঢোকে ওরা। “সাধু বাবা”, “প্রভারক্ষ্য”,” বরুধিনি” ডাক ছাড়ে ওরা। কোনো সাড়া আসে না। “আশ্চর্য্য, গেল কোথায় সব?” বলে আরতি। স্নিগ্ধা হঠাৎ ইশারা করে বাড়ির চারপাশটা আরতিকে দেখায়। সকালে দেখেছিল ছোটখাটো কিছু সংসারের জিনিস মাটির এদিক ওদিক ছড়িয়ে আছে। এখন সব পরিষ্কার। বাড়ির ভেতরে থেকেও কোনো আওয়াজ নেই। ওরা ধীর পদে বাড়ির ভেতরে ঢোকে। সব ফাঁকা। কেউ নেই, কিছুই নেই। বোঝা যাচ্ছে ওরা চলে গেছে। কিন্তু কেন? হঠাৎ স্নিগ্ধার চোখ যায় ঘরের দেওয়ালে বেঁকে তেরে লেগে থাকা একটা পুরোনো ভাঙাচোরা ফ্রেমে আটকে থাকা ছবির দিকে। এটা নিতে ভুলে গেছে ওরা।
চুপচাপ এসে স্নিগ্ধা ছবিটার দিকে তাকায়। পাহাড়ি জায়গার ছবি। কোনো পুরোনো ক্যালেন্ডার থেকে বাঁধানো হয়েছিল বোধ হয়। স্নিগ্ধার মনে হয় এই ক্যালেন্ডারটা সেও বোধ হয় দেখেছে। আরেকটু ভালো করে দেখতেই বিস্ময়।
এই জায়গাটাই সে দেখেছে। এই সেই জায়গা। কুমায়ুনের সেই পাহাড়। যেখানে দেখা হয়েছিল তার কিশোরেটির সাথে। হৃদপিণ্ডের ধ্বক ধ্বকানি আবার বেড়ে ওঠে স্নিগ্ধার। এক ঝটকায় আরতির হাত ধরে ঘর থেকে বেরিয়ে বাড়ির পিছন দিকে হলুদ ফুলের বাগানটির দিকে ধায় সে।
একটা মানসিক ধাক্কা খেলো ওরা। গোটা ফুলের বাগানটা নিঃশেষ। হলুদ ফুলতো দূরের কথা, গাছ গুলোকেও শিকড় থেকে উপড়ে তুলে ফেলে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মাটি দেখে বোঝা যায় স্বল্প সময় আগেরই ঘটনা।
দুজন স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বাগানের সামনে। পাশের বিশাল গাছগুলো ঝুঁকে যেন ওদের দেখছে। একটা অস্বস্তিকর হিমেল হাওয়া।
শেষ বিস্ময় তখনও বাকি ছিল। ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাগানের পাশে পড়েছিল একটা মাটির মালসা। ওরা সেটার কাছে যায়। কোনো একটা হলুদ রঙ গোলা হয়েছিল মালসায়। না হলুদ রঙ নয়, হলুদ ফুল গুলোর রসই তৈরি করা হয়েছিল ওতে। ফুলের বেশ কিছু ছিবড়ে এদিক ওদিক ছিটিয়ে পরে রয়েছে। কি হয়েছিল ওই ফুলের নির্যাস দিয়ে, বোঝাটা হয়তো খুব একটা শক্ত নয়। মালসার পাশেই মাটিতে তিন জোড়া পায়ের ছাপ হলুদ রঙের। ছাপ গুলো শুকিয়ে গেছে। শুকিয়ে গেছে মালসাতে গোলা ফুলের নির্যাসও।

অঞ্জন আচার্য্য।
কলকাতা, ২২/০৪/২০১৯

Print Friendly, PDF & Email
0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments