উফ্ ! ঐ এক ফোন ¦ দিনে এখন কতবার বাজবে তার ঠিক নেই ¦ সবে তো তিনটে দিন হয়েছে ¦

সবাই সব জানে, তাও…প্রায় দৌড়ে এসেই ফোনটা ধরে অপূর্বা ¦ –” হ্যাঁ পিসি বল ¦”

–“কি রে ? কোথায় আছিস এখন ?”

–“এই তো উল্টোডাঙ্গার বাড়িতে ¦ তোমরা ভাল আছ তো ?”

–” বৌদির কাছে শুনলাম সব ¦ কি ছেলেমানুষি বল তো দেখি এটা ¦ যত তাড়াতাড়ি পারিস মিটমাট করে ফিরে যা ¦ ছেলে টা কে নিয়ে এইভাবে একা একা আছিস ¦ ওর ও তো খারাপ লাগে ¦

–“বাবুন কে নিয়ে তুমি ভেবে না পিসি ¦ ও আমার কাছে ভালই থাকে ¦ আর ফিরে তো যাবোই শেষ অবধি ¦ মানুষ টা কে একা ছেড়ে দিতে পারলে কবেই দিতাম ¦ কিন্তু সে আর পারব না ¦ বেশ বুঝছি ¦”

–” ফিরবি যখন আর দেরী করিস না ¦ এদিকে তোর মা….”

কথা গুলো ধুপধাপ আওয়াজে চাপা পড়ে যায় ¦ সিঁড়ি দিয়ে বাবুন নেমে আসছে ¦

–” মা দেখো আমি কী শিখেছি !” দৌড়ে এসে অপূর্বা কে জড়িয়ে ধরে পিছন থেকে ¦

–“শোন না পিসি, এখন রাখছি ¦ আর তোমরা চিন্তা কোরো না এত ¦ তোমাদের মেয়ে যথেষ্ট বড় হয়েছে ¦ ভাল মন্দ বোঝে ¦ ”

ফোন নামিয়ে রেখেই ছেলের হাত খানা ছাড়িয়ে নেয় ¦ ওর দিকে ফেরে ¦ হাতের মধ্যে দুটো কয়েন নিয়ে কিছু একটা দেখানোর জন্য উত্সাহী ¦ অপূর্বা জানে এরপর কী করতে হবে ¦

–” এ তো দুটো কয়েন ¦ এগুলো দিয়ে কী হবে ?”

–“ম্যাজিক দেখাব একটা, তুমি দেখবে ভাল করে ¦”

এরপর সেই দুটো কয়েন নিয়ে শুরু হয় তার খেলা দেখানো ¦ কখনো কয়েন ভ্যানিশ করছে ¦ আবার পরক্ষনেই আঙ্গুলের ফাঁকে এনে দেখাচ্ছে সেটা এখানেই ছিল ¦ বিস্ময় মাখানো মায়ের চোখ দুটো ওকে আরও বেশী আনন্দ দেয় ¦ মনে মনে নিজেকে ম্যাজিসিয়ান ভেবে নেয় ¦ অপূর্বা ও ছেলের খুশির কথা ভেবে ওর কাঁচা হাতে দেওয়া চাল গুলোকে অনায়াসে এড়িয়ে যায় ¦

একজন ম্যাজিসিয়ানের এখানেই স্বার্থকতা ¦ যুক্তি দিয়ে তো সবাই সবকিছু ব্যাখ্যা করতে পারে ¦ কিন্তু তাতে আনন্দ থাকে না, বিস্ময় থাকে না ¦ তাই যতদিন সেটা অজানা থাকে, অধরা থাকে, ততোদিন ই ম্যাজিকের অস্তিত্ব ¦ মানুষের জীবনে ও এরকম কত অসাধারণ কিছু ঘটে যার ব্যাখ্যা তার কাছে থাকে না ¦ তাতেই জীবন এত সুন্দর হয়ে ওঠে ¦ তবু কোথাও কোথাও ব্যতিক্রম থাকে বইকি ¦

অপূর্বার ঘোর কাটে মেঝেতে পড়ে যাওয়া একটা কয়েনের আওয়াজে ¦ নিজের ভুলে বাবুন নিজেই হেসে ওঠে ¦ অপূর্বা ছেলে কে কাছে টেনে নেয় ¦ জড়িয়ে ধরে অনেক চুমু খায় ¦

–” কাল ই আমরা বাবার কাছে ফিরে যাব ¦ ”

রাতে শুয়ে ঘুম আসেনা কিছুতেই ¦ একটা চাপা উত্তেজনা মনকে ছেয়ে ফেলেছে ¦ কালকে ফিরে গিয়ে কী দেখবে সে ? উজান তার জন্য কান্নাকাটি করে চোখ মুখ ফুলিয়েছে ? নাকি…সুমির ভাল হয়ে ওঠার খবরে এই তিনটে রাত বেশ ভাল করে ঘুমাতে পেরেছে…

উত্তেজনা টা একটু একটু করে মিলিয়ে যেতে লাগল ¦ আর সেই জায়গা দখল করল একটা চাপা কষ্ট, বিষাদ ¦ একার ঘরে কষ্ট রা বাঁধন ছাড়া ¦ চোখের জল আটকানোরও কেউ নেই ¦ অপূর্বা ও আটকাল না ¦

প্রায় এক সপ্তাহ আগের কথা ¦ সন্ধ্যের দিকে উজানের ফোন আসে একটা ¦ সুমির অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে ¦ ড্রিঙ্ক করে গাড়ী চালাচ্ছিল ¦ বাইপাসে লরির সাথে ধাক্কা লাগে ¦ স্টিয়ারিং এ লেগে ওর বুকে আর পেটে আঘাত নাকি খুবই গুরুতর ¦ খবর টা দিয়েছিল কোন একজন কমন ফ্রেন্ড ¦ অপূর্বা ঠিক চেনে না ¦.

খবর টা পাওয়ার পর থেকে দুদিন উজান আর কোন কথা বলেনি ¦ শুধু অপূর্বা র মুখের দিকে তাকিয়ে খাবার টুকু মুখে তুলেছে ¦ কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি দূরত্ব অনেক ¦ চাইলেই বেরিয়ে পড়া যায় না ¦ ওই দুটো দিন কিভাবে কেটেছে অপূর্বা ই জানে ¦ মানুষ টা কে এত ভেঙ্গে পড়তে ও কোনোদিন দেখেনি ¦

সুমি ওর জীবনে এসেছিল অনেক দিন আগে ¦ তখন সুমির বিয়ে হয়ে গেছে ¦ মা বাবা হারানো মেয়েটা ছিল বড্ড বেশি খামখেয়ালী ¦ কাছের লোক থেকেও নেই ¦ তখন বন্ধু হিসেবেই উজান কে আঁকড়ে ধরে ¦ কিন্তু শেষ অবধি এই বন্ধুত্ব টা কে আর টিকিয়ে রাখা যায়নি ¦ উজানের নরম মন আর আবেগে ভরা সত্ত্বাটা সুমি কে ভাসিয়ে দেয় ¦ বন্ধুত্ব প্রেমে পরিণত হয় ¦
অনেক রাত কেটেছে শুধু ফোনের ওপারের গলাটুকু শুনে ¦

কখনো কখনো সকালে উঠে একইসাথে একই সময়ে দেখা স্বপ্ন শেয়ার করেছে অবাক হয়ে ¦ অনেক নাম না জানা দুজনের জীবনে ঘটে যাওয়া মুহূর্ত ওদের কাছে ধরা দিয়েছে অসাধারণ হয়ে ¦ দুজনের মধ্যে অদৃশ্য বন্ধন টা কোথায় সেটা খুঁজতেই চলে গেছিল প্রায় তিনটে বছর ¦ একটা নিষিদ্ধ প্রেম উজান কে ঈশ্বরের কাছে মাথা নত করতে বাধ্য করেছে বারবার ¦ তিনটে বছর কেটেছে একটা অন্ধ বিশ্বাস কে আঁকড়ে ধরে — তাদের মিলন অবশ্যম্ভাবী ¦

কাঁদতে কাঁদতেও হঠাত্ হাসি পেয়ে যায় অপূর্বা র ¦ সত্যি ! মানুষ এখনো এসবে বিশ্বাস করে ! কিন্তু সে তো নিজেও তাদেরই একজন ¦ উজানের সাথে তার দেখা হওয়া, দুজনে দুজনের কাছে আসা, বিয়ে, এসব ই তো একরকম ম্যাজিকই ¦ সুমি আর উজানের অদৃশ্য বাঁধনের বিশ্বাস টাও আস্তে আস্তে মিলিয়ে যায় কোথায় ¦

তবু সবকিছুর পরেও কোথাও একটা থেকে গেছে পুরনো সম্পর্কের রেশ ¦ উজানের নতুন জীবনেও সুমি এসে নাড়া দিয়েছে বার বার ¦ ওর বিশ্বাস খানা এখনো উজান কে ঘিরে আবর্তিত হয় ¦ অপূর্বা র রাগ হয়, অভিমান হয় ¦ সবটা বুঝেই হয়তো উজান আর কোন জবাব দেয় না ¦ কিন্তু অস্বীকারও করে না ¦ বিশ্বাস টা ওর মনেও কি ধিকি ধিকি আগুনের মতো হয়ে জ্বলছে ? ভেবে কূলকিনারা করতে পারে না অপূর্বা ¦

সেটা সত্যি প্রমাণিত হয় সেদিন ¦ সকালে উঠে দেখে উজান পাশে নেই ¦ এত সকাল সকাল গেল কোথায় ¦ হঠাত্ পাশের রুম থেকে বোতলে জল ভরার আওয়াজ আসে ¦ ঘুম চোখে কোনরকম এ এগিয়ে যায় ডাইনিং হল টার দিকে ¦ অবাক হওয়ার আর কিছু বাকি থাকে না ¦ উশকোখুশকো চুলে প্যান্ট শার্ট পড়ে রেডি হয়েছে উজান কোথাও একটা যাওয়ার জন্য ¦

–” কী হয়েছে তোমার ?”

এত তাড়াহুড়োর মধ্যেও হঠাত্ কিছু সময়ের জন্য স্থির হয়ে যায় সে ¦ কাছে এসে অপূর্বা র হাতটা বুকের কাছে তুলে নেয় ¦ ঠোঁট দুটো কাঁপছে ¦ চোখ লাল ¦ সারা রাত না ঘুমানোর ছাপ চোখে মুখে ¦

–” আমায় ক্ষমা কোরো অপূর্বা ¦ আমাকে যেতেই হবে ¦”

–” কী হয়েছে সেটা তো বলবে ? তুমি এরকম করছো কেন ?”

–” রাতে একটা খুব খারাপ স্বপ্ন দেখেছি ¦ সুমি একবার আমার সাথে দেখা করতে চাইছে ¦ বলছে ওর সময় নাকি প্রায় শেষ ¦ ”

কথা টা শেষ হওয়ার আগেই অঝোরে কান্নার স্রোত নেমে আসে গাল বেয়ে ¦ এতটা অসহায় উজান কে কোনোদিন দেখেনি অপূর্বা ¦ হাত দুটো আরও শক্ত করে চেপে ধরেছে ¦ যেন অপূর্বা আজ তার ভাগ্য নির্ধাতা ¦ একটু সামলে নিয়ে বাকি টুকু কোনরকম এ শেষ করে উজান

–” আমকে ওর কাছে একটা বারের জন্য যেতে দাও তুমি ¦ শুধু এইবারটা ¦ আমি কথা দিচ্ছি আর কোনোদিন চাইবোনা এমন টা ¦ হয়তো এবারেই সব শেষ হয়ে যাবে ¦ আমি ভীষণ ভাবে অনুভব করতে পারছি ¦ ”

উজানের কষ্টে নিজেরও বুক ভিজেছে বুঝতে পারে অপূর্বা ¦ এখানে মান অভিমান এর কোন জায়গা নেই ¦ সে না বলতে পারবে না ¦ আবার হ্যাঁ করলেও তার এতদিনের যুক্তি দিয়ে ঘেরা সম্পর্কের গন্ডী টা ভেঙ্গেচুরে যাবে ¦

–” কিভাবে যাবে কোথায় যাবে সব জানতো ?”

–” নীলাদ্রি নিয়ে যাবে আমাকে ¦ ওর সাথে কথা হয়েছে ¦”

স্ত্রী হয়েও যেন আটকানোর অধিকার হারিয়েছে অপূর্বা ¦ সুমি উজানের সম্পর্কটাই আজ সবথেকে বড় সত্যি ¦

–” সাবধানে যেও ¦ নিজের খেয়াল রেখো ¦ আর কী হল ফোন করে খবর দিও ¦ ”

এই কটা কথার জন্যই যেন অপেক্ষা করছিলো এতক্ষণ ¦ কয়েকটা মুহূর্ত…অপূর্বা দেখল দরজা খুলে একটা মানুষ ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে গেল ¦ এই বাড়ি ঘর অপূর্বা বাবুন — সব বুঝি মিথ্যা !

তবু উজান চলে যেতেই কষ্টটা কে চাপা দিয়ে তার বুকের ভিতর জমা হল বিন্দু বিন্দু রাগ ¦ তারপর অভিমান ¦ এ যেন তার ও পরীক্ষা ¦ কেন একটা অন্ধ বিশ্বাসের স্রোতে উজান ভেসেছে সেটাই এতদিন ভেবেছে অপূর্বা ¦ আজ যদি এই বিশ্বাস সত্যি প্রমাণিত হয়…না না এমনটা হতে পারে না ¦ মানুষ কত খারাপ স্বপ্ন দেখে, তার একটাও কি আজ অবধি সত্যি হয়েছে ? কই তার তো এরকম কিছু মনে পড়েনা ¦

সেদিন ই বাবুন কে নিয়ে উল্টোডাঙ্গার বাড়িতে চলে আসে অপূর্বা ¦ ওই বাড়িটা ওর কাছে রাগ দুঃখ কষ্ট অভিমান ভোলানোর জায়গা ¦ একা একা কিছুটা সময় পাওয়া যায় ¦ কখনো কখনো নিজের কাউন্সেলিং এর ও দরকার ¦
পর দিন বিকেলে ফোন উজানের —

–” হ্যালো অপূর্বা ”

–” কালকে সারাদিন কি একবার একটা খবর দেওয়া যেত না ?”

–” তুমি রাগ করেছ, বুঝতে পারছি¦ আমি ফিরছি আজকেই ¦ সুমি এখন ভাল আছে খানিকটা ¦ ইমপ্রুভ করছে আস্তে আস্তে ¦ ”

হায় রে তোমার স্বপ্ন ¦ পরীক্ষায় জয়ী হওয়া অপূর্বার মন তখন চাইছে পৃথিবীর সব অন্ধ বিশ্বাস আর ফ্যান্টাসিকে ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিতে ¦ সব স্বপ্নের সূত্র হাতড়ে বেড়ানো মানুষগুলোকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে সত্যি টা কে দেখিয়ে দিতে ¦ একটা স্বস্তির নিশ্বাস পড়ে ¦ সুমি উজান দুজনেই আজ তার কাছে পরাজিত ¦

ভাবতে ভাবতে অনেক রাত হয়েছে ¦ তবু ঘুম আসে না ¦ অপূর্বা র চোখ যায় দেওয়ালের তাকে রাখা দুটো বইয়ের দিকে ¦ খুব শখ করে কিনেছিল সে ¦ সাজিয়েও রেখেছে পাশাপাশি ¦ একটা সিগমণ্ড ফ্রয়েডের আর একটা জে. অ্যালান হবসন এর¦ স্বপ্ন নিয়ে লেখা দুটো বই ¦

প্রথম জন তাকে ব্যাখ্যা করছে একটু নাটকীয় ভাবে যেখানে স্বপ্ন মানে কিছু অপূর্ণ ইচ্ছা, ভালো লাগা মিশে থাকা আকাঙ্খিত কিছু মুহুর্তের হাতছানি ¦ আর দ্বিতীয় জনের কাছে সেটা হল আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে মেপে বের করে আনা অলীক এবং ‘Distorted brain activity’ ¦ সময় যত এগিয়েছে মানুষের যুক্তি দিয়ে বিচার করার ক্ষমতা বেড়েছে ¦ অপূর্বা অ্যালান হব্সন এর অনুসারী ¦ তাই ওর জীবনে ‘co incidence ‘, ‘ magic’ খুব কম ¦

কঠিন বাস্তবটাই বেশি ¦ তবু সেটা সত্যি ¦

 

~ স্বপ্নের হাতছানি ~

Print Friendly, PDF & Email

2 COMMENTS

  1. I really really loved this story. I’ve been reading from Hatpakha for a while and this story is one of my favorites. 🙂 I will look forward to read more from you.

LEAVE A REPLY

*