আমাদের অফিসে কড়াধাতের এক সাহেব এলেন গোলমেলে এক দায়িত্ব নিয়ে; প্রোডাকসান, পারচেজ, সেলস, ডেলিভারি সব ব্যাপারেই তিনি মাথা ঘামানোর অধিকার রাখতেন| আসলে খরচ কমানোটাই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল| প্রতি কথায় বন্দুক যোগাড় করে গুলি মারতে বলাটা তাঁর মুদ্রাদোষ ছিল| সাহেবের নির্দেশ ছিল, যে কোনও সমস্যার কথা তাকে যেন জানানো হয় আর যে কোনও খরচের মামলা যেন তাঁর টেবিলে তোলা হয়| এর অন্যথা হলে গোলাগুলির সামনে পড়তে হত| ধমক ধমক বকুনির পরে আবশ্যিক ভাবে যে কথাটা শুনতে হত তা হল – “বন্দুক নিকালকে ইনকো গোলি মার দো”|

কোনও একটা ‘পার্টস’ এর অভাবে হয়ত কাজ আটকে গেছে, এদিকে ‘ডেলিভারি-সংক্রান্তি’ উপস্থিত| প্রোডাকসানের সৃষ্টিধর বাবুর সঙ্গে আলোচনাটা এরকম হত – “স্যার, অমুক জিনিসটা এখনও আসেনি|”

“কেন আসেনি?”

“সাপ্লায়ার বলছে পুরো ‘লট’টা রেডি নেই, আরও দু’চার দিন লাগবে”|

“কেন? কি হয়েছে?”

“ওদের ওখানে কি সব গোলমাল চলছে তাই লেবাররা কাজে আসেনি|”

“বন্দুক নিকালকে গোলি মার দো|” তারপর বিনা বন্দুকে ফোনেই ‘ফায়ারিং’ শুরু হত|

পেতলের (ব্রাস) কিছু যন্ত্রাংশ ব্যবহার হত বিভিন্ন কাজে| শেতলবাবু (সবাই ডাকত পেতলবাবু) খুব সস্তায় ওসব জিনিস নিয়মিত দেন; আর পয়সার তাগাদা কখনই করেন না| তাই পেতলবাবু খুব তাড়াতাড়ি সাহেবের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠে ছিলেন| কিন্তু বস্তাভর্তি ছাতাপড়া পেতল মাঝেমাঝে গুণধরবাবুর গলায় আটকে যেত| একবার গুণধরবাবু দু’চার খানা ছাতাপড়া সবজেটে নমুনা নিয়ে সাহেবের ঘরে ঢুকলেন, পেছনে পেছনে পেতলবাবু|

একঝলক দেখেই সাহেবের প্রশ্ন – “এগুলো কি? কে এনেছে?”

গুণধরবাবুর উত্তর – “সব পেতলবাবুর সাপ্লাই; ‘রাস্ট’ পড়ে গেছে স্যার|”

“গোলি মার দো|”

“সে নাহয় মারলাম, কিন্তু ওদিকে সৃষ্টিধরবাবুর কাজ আটকে গেল যে|”

গুণধরবাবুর অভিযোগ একটু লম্বা হয়ে গেছিল – আজকাল পেতলবাবু প্রায়ই এমন করেন, বললেও শুনতে চাননা, সস্তা করতে গিয়ে সৃষ্টিধরবাবুর কাজ বেড়ে যাচ্ছে, বাজারে কোম্পানির বদনাম হয়ে যাবে, ইত্যাদি|

‘সস্তা’ কথাটা এলার্ম বাজাল সাহেবের মাথায়, সাহেব সজাগ হলেন – “গোলি মারো| লেকিন গুণধরবাবুর, আপনার এত অভিজ্ঞতা, এটা জানেন না – ‘রাস্ট’ পড়ে লোহায়, পেতলে নয়|” তারপর কেমিস্ট্রি পড়াতে শুরু করলেন গুণধরবাবুকে| আলোচনার মোড় ঘুরে যেতেই পেতলবাবু বুঝে গেলেন মামলা তাঁর দিকেই হেলে আছে| ভদ্রতাবশতঃ কিছুক্ষন অপেক্ষা করলেন| যখন আলোচনা কেমিস্ট্রি ছেড়ে গুণধরবাবুর মুল্যহীন অবাস্তব কাগুজে কাজকর্মের সমালোচনার দিকে গড়াল তখন বললেন – “যা করার তাড়াতাড়ি করুন, বন্দুকে রাস্ট পড়ে যাচ্ছে| ‘চালান’টা সই করে আমাকে ছেড়ে দিন| সেই ডোমজুড় ফিরতে হবে তো| সন্ধ্যে হয়ে গেলে আবার বউ গুলি মারবে|”

প্রসঙ্গতঃ, সন্ধ্যের পর সাহেবের বাড়িতে নাকি প্রচুর গোলাগুলির আওয়াজ শোনা যেত, মহিলা কন্ঠে| লোকে বলত, অফিসের পয়সা বাঁচানোর চক্করে দুপুরবেলা সাহেবর বেলুনে যে গ্যাস ভর্তি করে দেন আরও বড় সাহেবরা, সন্ধ্যেবেলা বাড়িতে সেই একই কারণে গোলাগুলি আর জবাবদিহির মাঝে পড়ে গ্যাস বেলুন ফুটো হয়ে যায়|

দর কষাকষির সময় সাহেব শুরু করতেন দশলক্ষ পিস্ বা দশ টন দিয়ে, সস্তা হবে বলে| দামে পোষালে গোটা কতক নমুনা হিসেবে পাঠাতে বলতেন| ‘সুচ্যাগ্র মেদিনী’র পরে বিশ্বরূপ দর্শন হয়ে থাকে; কিন্তু উল্টোটা শুনে সাপ্লায়ার গাঁইগুঁই করলে সাহেব আশ্বাস দিতেন – “এ তো স্যাম্পল তৈরি হয়ে ‘টেস্টিং’-এ যাবে; জিনিসটা ‘প্রোডাকসান’-এ এলে সামলাতে পারবেননা|” সাপ্লায়ারের দিক থেকে আগেভাগে ব্যবস্থা নেওয়া যে কত জরুরি, তা বুঝিয়ে ছাড়তেন শেষ পর্যন্ত| জানা নেই, পুরানো সাপ্লায়াররা ফোন রেখেই ‘গোলি মারো’ বলত কিনা, কিন্তু বাজারে নতুন পা রাখা উঠতিরা ঘোল খেয়ে যেত|

চাঁদনীবাজারের চিন্তাহরিবাবুর যোগাড়ে বলে নাম আছে, নিয়মিত তালিকার বাইরে কিছু চাইলে তিনিই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য লোক| একবার ছোট্ট একটা জিনিসের দরকার পড়ল, বাজারে যার দাম তিন চার টাকা কিন্তু পাওয়া যায় না সহজে, খুব চালু নয় বাজারে| সাহেব চিন্তাহরিবাবুকে ধরলেন – আপাতত গোটা দশেক নমুনা চাই, কিন্তু প্রোডাকসান শুরু হলে মাসে মিনিমাম বিশ হাজার| চিন্তাহরিবাবুর পানমশলা ছাড়া অন্য নেশা ছিলনা, কিন্তু সেদিন অদ্ভুতভাবে ‘গুলি’ (নেশার জিনিস, বন্দুকের নয়) খেয়ে গেলেন তিনি| সাহেবের চিন্তাহরণ করতে গোটা কুড়ি পাঠিয়ে দিয়েই হাজার দশেক যোগাড় করে ফেললেন| তারপর সাহেব আর দেখা দেন না, ফোন ধরেন না| কখনও কখনও নিজেই ফোন ধরে একটা বিকৃত গলায় বলেন – “সাহেব তো নেই, এলে বলে দেব|” চিন্তাহরিবাবু এসেছিলেন বা ফোন করেছিলেন এই খবর পেলে সাহেবের অবধারিত উত্তর হত –“বন্দুক নিকালকে গোলি মার দো|”

বেশ কয়েক মাস পরে কয়েকটা ছুটকো জিনিস আনতে এক নতুন ছোকরাকে চাঁদনীবাজার পাঠানো হল| ইতিহাস না জেনেই সে পৌঁছল চিন্তাহরিবাবুর দোকানে, জিনিসটা পেয়েও গেল| প্যাকেট হাতে নিয়ে ছেলেটা টাকা দিল, বিল চাইল| চিন্তাহরিবাবু বামহাতে নোটটা ধরে ডান হাতে বিল বই টেনে নিয়ে তারিখ, বিবরণ, দর-দাম ইত্যাদি লেখার পর জিজ্ঞাসা করলেন – “নাম?”

“……লিমিটেড|”

লেখা থামিয়ে কটমট করে তাকালেন চিন্তাহরিবাবু| ‘আঁখিয়ো সে গোলি’ মারলেন বোধহয়| দু সেকেন্ডের মামলা, ছেলেটার হাত থেকে প্যাকেটটা ফেরত নিয়ে টাকাটা বাড়িয়ে ধরে গম্ভীর গলায় চিন্তাহরিবাবু বললেন –“…..সাহেব পাঠিয়েছেন? এ মাল বিক্কিরি নেই|”

ছেলেটার অনেক অনুরোধেও ‘ক’বাবুর বরফ গললনা; বললেন – “সাহেবকে আসতে বলবেন| বন্দুক নিকালকে আনতে বলবেন| পুরানো মালটা বাক্সে রাখা আছে, তালাটায় জং ধরে গেছে, গোলি মেরে ভাঙতে হবে|”

ছেলেটি অফিসে ফিরে সাহেবের কাছে সবকিছু বর্ণনা করার পরে সাহেবের অবধারিত উত্তর ছিল – “বন্দুক নিকালকে গোলি মার দো”|

একবার চক্রধরপুর যাওয়ার ট্রেনের টিকিটের জন্য সাহেব বারবার ফোন করে এজেন্টকে খুব জ্বালালেন; হাওড়া থেকে সমস্ত ট্রেনের সময়, সমস্ত ক্লাসের ভাড়া আর প্রতি মুহুর্তে বদলাতে থাকা খালি আসনের তথ্য জানতে চেয়ে| শেষে নিয়মিত যাত্রীদের মত কায়দা করে বললেন ‘ফাইভ আপ’-এ টিকিট কাটতে| বোঝাতে চাইলেন ৮০০৫ সম্বলপুর এক্সপ্রেস; ঘন্টা পাঁচেক দৌঁড়ে শেষ রাতে চক্রধরপুর পৌঁছায় – আমাদের কাজের জন্য সব দিক থেকে সুবিধাজনক ট্রেন| বিকেল নাগাদ হাতে পেলেন ৩১৫ আপ চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জারের টিকিট; টাইম টেবিলের হিসেবে দশ ঘন্টায় আদ্রা-পুরুলিয়া ঘুরে দুনিয়ার সব স্টেশনে জিরিয়ে বাস্তবে কখন পৌঁছয় ঠিক নেই, অন্ততঃ বেলা দশটার আগে নয়| প্রশ্ন করায় এজেন্ট ছেলেটার বিরক্তি ভরা উত্তর ছিল – এটাও তো ফাইভ আপ, শুধু ‘গোলি’ লেগে’ ‘রুট’টা বেঁকে চুরে গেছে|

সাহেব একবারই কিছু টাকা খরচ করার কথা তুলেছিলেন, নিজের থেকে| এক্সাইজ থেকে বেশ কয়েক লক্ষ টাকার ‘ডিমান্ড’ নোটিস এল| সাহেব চোখ বন্ধ করে পুরোটা ব্যাপারটা শুনলেন, তারপর সরু চোখে তাকিয়ে বললেন – “কত টাকার ডিমান্ড?”

“স্যার, প্রায় চল্লিশ লাখ|”

“একটা বন্দুকের দাম কত?”

আঁতকে ওঠা ছাড়া গতি ছিলনা| সাহেব বিড়বিড় করে বললেন – “লাখ দুয়েক খরচ করলেই পাওয়া যাবে| …..লোগকো গোলি মার দো|”

বললেন বটে, তবে ‘কেউ কথা রাখেনি’; বন্দুক যোগাড়ের সাহসটাই কেউ করে উঠতে পারলনা| কিছুদিন পরে সাহেব অবশ্য আমাদের কোম্পানির চাকরিকে “গোলি মেরে” দিল্লির দিকে কোন একটা কাজে যোগ দিয়েছিলেন; মালিকদের তরফেও গুলি চলেছিল কিনা জানা নেই| তবে “গোলি মার দো” কথাটায় অফিসের প্রায় সবাই অভ্যস্ত হয়ে ওঠায় এখনও চালু আছে, যখন তখন শোনা যায়; বাস্তবে গুলি চলুক আর না চলুক|

 

~ গোলি মার দো ~

SHARE
Previous articleজিজ্ঞাসা
Next articleগুজি
SUBHAMOY MISRA
জন্ম আর বড় হওয়া অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলায় হলেও কলকাতায় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া আর চাকরির সুবাদে এখন হাওড়ার বাসিন্দা। দেওয়াল পত্রিকায় লেখা শুরুর পরে স্কুল কলেজের পত্রিকা ছাড়াও অন্যান্য বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হয়েছে। বই পড়া, নাটক দেখা, গান শোনারও নেশা আছে। পেশাসূত্রে লব্ধ অভিজ্ঞতা লেখার মধ্যে দিয়ে একটু একটু করে সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার ইচ্ছে আছে মনের মধ্যে।

LEAVE A REPLY

*