এমনিতেই এই বান্ধববর্জিত শহরে এসে থেকে নিঃসঙ্গতায় ডুবে ছিল অভিনব। পরিচিত কেউই তার চেনাশোনার মধ্যে নেই। তার ওপর আবার এই মহামারী জনিত লকডাউন। মেজাজটা আরও খারাপ হয়ে যাচ্ছে। ফেসবুক আর মুঠোফোনের যোগাযোগ বজায় রাখতে রাখতে তার দিনগুলো চলে যাচ্ছিল। এই করে কেটেছে দুটো মাস। কিন্তু নাঃ, আর পারা যাচ্ছে না। এখন অফিসে যাতায়াত ও সপ্তাহে মাত্র দুদিন করে দিয়েছে গ্রাহক মক্কেল কোম্পানি। বেরোনোর ও কোনো জায়গা নেই।

অফিস থেকে ফিরে ফ্ল্যাটের বারান্দায় দূরের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিল অভিনব। একটু পরে খেয়ে নেবে। তারপরে কলকাতায় বাড়িতে ফোন করে মা বাবার সাথে কথা বলে নেবে যথারীতি। তারপর শুয়ে পড়া।
একভাবে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘাড়টা টনটন করে উঠল। ইদানীং কম্পিউটার গেমের নেশায় ধরেছে। খেলে খেলে ঘাড় ব্যথা হয়েছে। ঘাড় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একটু ব্যায়াম করে নিল অভিনব।
মাস চারেক আগে অক্টোবরে ঠিক হয়েছে ওর এই শহরে পোস্টিং। ওর অফিসে একমাত্র ও নিজেই জেনেভাতে বদলি হল এই প্রজেক্টে। ছোট পরিসরের প্রজেক্ট, কয়েকজন মাত্র কর্মচারী। আর একজন বাঙালি কর্মচারী আছে, সে আবার জুগে। তার সাথে অফিসে ফোনে কথা হয়, দেখা হয়েছে একবার। সীমন্তিনীদি। সুইজারল্যান্ডে তার এই নিয়ে তিন বছর হয়ে গেল। মাসে দু মাসে একবার জেনেভা অফিসে আসে, কাজের দরকারে। অভিনব ফোন নাম্বার নিয়ে রেখেছে। সীমন্তিনীদির কথাবার্তা আর আলাপচারিতা বেশ মিষ্টি। তবে ওদের অফিসের ইমিগ্রেশন অফিসার জুডিথ বলে দিয়েছে ওর সাথে বেশী না মিশতে। সীমন্তিনীদি নাকি কুসঙ্গে পড়েছে। নিজের ফ্ল্যাটে প্রায়ই কিছু অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে নিয়ে হুল্লোড় করে। আর নানা জায়গায় যায় টায়। জুডিথের সাথে খানিকটা আলাপ হয়েছে। এখানকার সাহেব, কিন্তু গায়ের রঙ যেন রোদে পুড়ে তামাটে। নীল চোখদুটো যেন অন্তর্ভেদী। বেশ হাসিখুশি।

-‘কি রে কেমন আছিস? বোর হচ্ছিস’?
অফিসে র চ্যাটে সীমন্তিনীদির মেসেজ। ফ্রুট জুস খেতে খেতে তাকাল, হাসি পেয়ে গেল। এই লকডাউন টাইমে অফিসে লোকজন কম। সবাই সাহেব। কয়েকজন ছাড়া তাকে কেউ বিশেষ পাত্তা দেয় না। উত্তর দিল-‘এখানে বোর হওয়া তোমার চেয়ে ভালো বুঝবে কে? তিন বছর হতে চলল ‘।
– ‘ কাজকর্ম চলছে’?
– ‘ধীরে ধীরে। জানোই ত- লকডাউনের বাজার’।
– ‘আমার এখানেও তাই। তাড়াতাড়ি ফিরে যা’।
তা মন্দ বলে নি। ফিরে গিয়েও ত সেই বাড়িতে একঘেয়ে সময় কাটানো। আজ তিনদিন পর অফিসে এসে তাও কয়েকটা মুখ দেখা পাওয়া গেল। একেবারে একা চুপচাপ থাকার চেয়ে ত ভাল।
-‘আর য়ু ওকে মিস্টার চ্যাটার্জি?’
ডাক শুনে পিছনে তাকাল অভিনব। একজন সাহেব সহকর্মী। হেসে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। ধন্যবাদ জানাল। সাহেব বলল ‘টেক কেয়ার’। অভিনব ও তাই বলল। সাহেবদের শিষ্টাচার দেখে অনেক শেখার আছে।

নাঃ আর ভাল লাগছে না। ফুড ডেলিভারি বয়ের এনে দেওয়া পিৎজা খেতে খেতে ভারি মুষড়ে পড়ল অভিনব। আজকে কুঁড়েমি করে আর খেতে বেরোয়নি বড়ি থেকে। একটু আগে বাড়িতে ফোন করে কথা হয়ে গেছে। রাখী পূর্ণিমা আসছে। বোন বলেছে ‘ এ বছরও আর রাখী পরানো হল না তোকে’। প্রতিবছরই পরায়। আগে যখন হায়দ্রাবাদে ছিল তখন কয়েক বছর পরায় নি। অ্যামেরিকায় যখন ছিল, ঠিক রাখী র আগের দিন ও ফিরে এসেছিল দেশে। সেবার বোনের হাতে রাখী পড়েছিল-মনে আছে। মনে করতে করতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল। এ বছর ইন্টারনেটে রাখী পড়ে ঘোলে স্বাদ মেটাতে হবে। নিজের ওয়ার্ক পারমিট কার্ডটা হাতে নিয়ে দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ল অভিনব।

আজকে অফিস নেই। সাড়ে নটা নাগাদ আস্তে আস্তে মুখ ঢাকা আবরণী পরে অভিনব বেরিয়ে পড়ল। ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে লিফ্টে নেমে একতলায়। তারপর সোজা রাস্তায়। রাস্তায় বেশি লোকজন নেই। হাঁটতে হাঁটতে চারটে বাড়ি পরে আরেকটা ফ্ল্যাট। হেঁটেই উঠে পড়ল তিনতলায়। টিপে দিল কলিং বেল।
দরজা খুলে দিল মাঝবয়সী এক মেমসাহেব। রোগা গড়ন, সরু চোখ। হেসে বলে উঠল ‘ হাউ গ্ল্যাড, কাম ইন’। একগাল হেসে ঢুকে পড়ল অভিনব। মেমসাহেব ‘অ্যাভিন্যাশ, অ্যাভিন্যাশ, কাম হিয়ার। লুক হু ইজ ইন’ বলে ডাক দিয়ে ভেতরে চলে গেল। বেরিয়ে এল এক মাঝবয়সী কেরালার খ্রিষ্টান। বলল ‘’আরে অভি, কেমন আছ?’ বলতে বলতেই পিছন পিছন একটা বছর আটেকের ছেলে ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে এল। অভিনব বলল ‘ হ্যালো ক্রিস্টো, কি করছ’?
-‘আর বোলো না, লকডাউনে অনলাইন ক্লাস হচ্ছে, আর ওদের ক্লাস টিচার কি বলেছে জানো? সারপ্রাইজ সামওয়ান এন্ড রাইট দ্য স্টোরি অব দ্য সেম। শিক্ষিকাগুলোর মাথায় আসে ও বটে।‘ বলে প্লেটে করে সসেজ এনে দিল। মজা পেয়ে অভিনব হেসে ফেলল। অবিনাশ ও যোগ দিল হাসিতে। বলল ‘ সত্যি বাবা এদের ইস্কুলগুলো কেমনধারা। শিক্ষিকাগুলোর মাথায় উদ্ভট বুদ্ধি। এর আগেকার ড্যানিশ ইস্কুলে এমন ছিল না। এই তল্লাটে এই একটাই ইংলিশ মিডিয়াম ইস্কুল। মহা মুশকিল। ক্রিস্টো ত প্রথমে এখানকার ইংলিশ কিছুই বুঝতে পারত না-এর আগে ড্যানিশ ইংলিশ ইস্কুলে পড়েছে। এনি ত অনেক কষ্টে ওকে তৈরি করল এই ইস্কুলটার জন্য।‘
এই কথাটা অভিনব আগেও শুনেছে। তাকিয়ে রইল শুধু ক্রিস্টোর দিকে। এদের বাসাটা অগোছালো। ক্রিস্টো লাফালাফি করতে করতে অভিনবর গায়ে এসে পড়ল। তারপর দৌড়ে গিয়ে একটা টুপি নিয়ে এসে পড়িয়ে দিল অভিনবর মাথায়। অভিনব সসেজ খেতে লাগল। এনি জিজ্ঞাসা করল ‘খাওয়া দাওয়া ঠিকঠাক করছ ত? মাঝেমাঝে চলে এস। আমি ত এখন আর বেশি কোর্টে বেরোই না।‘
-‘নিশ্চই চলে আসব’।
-‘ক্রিস্টোর অনলাইন ক্লাসের সময় হয়ে গেছে।‘ বলে এনি ক্রিস্টোকে নিয়ে ভেতরে চলে গেল। অবিনাশের সাথে অভিনব গল্প জুড়ে দিল।
প্রায় দেড় ঘণ্টা পরে ফেরার জন্য রওনা দিল অভিনব। এই এক দেশী প্রতিবেশীর সাথে ভাল ঘনিষ্ঠতা হয়ে গেছে ওর। এরা কেরালার। অদ্ভুত পরিবার। অবিনাশ হল ভারতীয় নাগরিক। তার স্ত্রী ডেনমার্কের। অবিনাশ আই আই টি-আই আই এম। ডেনমার্কে বহুজাতিক একটা কোম্পানিতে চাকরি করত এর আগে। সেই চাকরি ছেড়ে আরেকটা চাকরি ধরে এখানে এসেছে। এনি অত্যন্ত করিৎকর্মা। এখানে এসে ছোটখাট ওকালতি শুরু করে দিয়েছে। ডেনমার্কে আগে সে ওকালতি করত। এরা বেশ অমায়িক আর পরোপকারী। দেখা হয়েছিল শপিং মলে। ভারতীয় দেখে অবিনাশ নিজেই আলাপ করতে এসেছিল। অবিনাশ জুপুডি। বাড়িতে যাতায়াত করে এই কয়েক মাসেই এরা খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। আর ক্রিস্টোটা খুবই মজার। পুরো নাম ক্রিস্টোফার অবিনাশ জুপুডি। অনেক উপকার এরা অভিনবর জন্য করেছে। ক্যান্টন রেজিস্ট্রেশন, জিনিসপত্র কেনাকাটা করে দেওয়া, ব্যাঙ্ক একাউন্ট্ খোলার যোগাযোগ, ফ্ল্যাট সাজিয়ে গুছিয়ে দেয়া-সবকিছু। এনি ত অভিনবর বাড়ির লোকেদের অবধি চিনে গেছে। এমন প্রতিবেশী বিদেশ বিভুঁয়ে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।

দুদিন বাদে অফিস যেতেই কলকাতা থেকে ফোন। জুগে সীমন্তিনীদি অসুস্থ। অফিসে আসে নি। কি হয়েছে কে জানে। সীমন্তিনীদিকে ফোনে ধরার চেষ্টা করল অভিনব। ফোন বেজে গেল কেউ ধরল না। ঠিক আছে, পরে দেখা যাবে। অভিনব কাজে মন দিল। সারা পৃথিবীতে অর্থনীতির অবস্থা খারাপ। এখানে এখনো কোনমতে চলছে। এখনো তেমন মন্দার প্রকোপ পড়েনি। কিন্তু তাও চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। কলকাতা থেকে ফোনে জানাল সীমন্তিনীদি অসুস্থ বলে অভিনবকে একবার জুগ অফিসে যেতে হবে।
আবার দুটো দিন বাড়িতে একরকম কাটল। একদিন শুধু এনি ফোন করে খবর নিয়েছিল।
পরের দিন জুডিথের ফোন। সীমন্তিনীদিকে জুগ ক্যান্টনের মিউনিসিপ্যাল ওয়ার্ড হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। করোনা পজিটিভ কেস। শুনে রীতিমত ভয় পেয়ে গেল অভিনব। অফিস ছিল না সেদিন। নানারকম আশঙ্কায় কাটল। বাড়িতে এই খবরটা জানায়নি।

পরের দিন অফিসের গাড়ি করে জুগ যাওয়ার কথা। সকাল সকাল রওনা। ফেরার পথে রাত্রে একা একা গাড়িতে আধ শোয়া হয়ে চোখ বুজে ভাবছে অভিনব। সারাদিন অফিসে ব্যস্ততার পর জুগ মিউনিসিপ্যাল ওয়ার্ড হাসপাতালে একবার গাড়ি নিয়ে অভিনব গিয়েছিল। খোঁজ নিল সীমন্তিনীদির। হাসপাতালে নিরাপত্তাবেষ্টনী, তদুপরি স্বাস্থ্যবিধি আর স্বাস্থ্যসুরক্ষা যথাযথ পালন করতে খানিকক্ষণ সময় গেল। ড্রাইভারের সহায়তায় হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ হাসপাতালের নির্ধারিত পোশাকে অনেক অনুরোধের পর ঢুকতে দিল সীমন্তিনীদির কামরায়। সীমন্তিনীদি বসে ছিল খাটে। দেখেই খুব খুশী হল। অশেষ ধন্যবাদ দিয়েছিল। প্রবাসে হাসপাতালে কেউ দেখতে এলে খুবই খুশি হওয়ার কথা। বলল তেমন কোন অসুবিধা নেই, কোভিড পজিটিভ ধরা পড়েছে। পুলিশ অনুসন্ধান হবে। আরও টেস্ট হবে। মোবাইল ফোন আনার অনুমতি নেই এই হাসপাতালে। কড়া নিয়ম। বেশী কিছু কষ্ট নেই- হালকা জ্বর, গলায় ব্যথা আর রাতে মাথা ধরে থাকে-এর বেশী কিছু নয়। আশঙ্কাজনক কিছু বলে মনে হচ্ছে না। অভিনব জিজ্ঞেস করেছিল বাড়িতে খবর দিয়েছে কিনা। একটু বিষণ্ণ হয়ে সীমন্তিনীদি বলেছিল না, দেয়নি। তখন অভিনব একটু জোরজার করে বাড়ির ঠিকানা আর পরিবারের লোকেদের নম্বর চাইল। সীমন্তিনীদি সেটা বারবার এড়িয়ে গেল। শেষে বলল ‘আমার তেমন কেউ নেই রে।‘ কথার মধ্যে অনুযোগ আর নিরাশা মেশানো ছিল। চমকে উঠেছিল অভিনব। তারপরে সীমন্তিনীদি বলল তার কথা। কলেজে পড়ার সময়েই তার মা পরিবার ত্যাগ করে চলে যায়। মা আর বাবার মধ্যে বিবাদ লেগে থাকত। সীমন্তিনীদির বাবার আগে একজন স্ত্রী ছিলেন এবং একটি ছেলে ছিল। পূর্বতন স্ত্রী ক্যান্সার রোগাক্রান্ত হয়ে পড়লে ছেলেটি বারবার ওঁর কাছে সাহায্য চাইতে আসত আর কাউকে না পেয়ে। উনিও ছেলেকে ফেরাতে পারতেন না। এই নিয়ে পরিবারে মায়ের সাথে অশান্তি বাধে। তারই জেরে মা চলে যান আর আরেকবার বিয়ে করে নেন। তারপরে সেই ছেলের মা মারা গেলে বাবা তার সাথেই অ্যামেরিকা চলে যান। ছেলেটি লেখাপড়ায় খুবই ভাল, বিজ্ঞানী। সীমন্তিনীদি একজন মামার কাছে থাকত। সেই মামা আর নেই। বাবার সাথে ক্ষীণ যোগাযোগ আছে। বাড়িতে খবর দেওয়ার মত আর কেউই নেই। এখানে হুল্লোড়বাজি করে নেশা করে সীমন্তিনীদি দিন কাটায়। যুবক যুবতীদের সাথে ঘোরাফেরা করে, ক্লাবে যায়। সেজন্যই হয়েছে করোনা।
গাড়িতে এইসব ভাবতে ভাবতে অভিনব জেনেভা ফিরছিল। নানা কথা- সীমন্তিনীদির কুসঙ্গ, নেশা করা, জীবনের প্রতি হতাশা, পারিবারিক শূন্যতা, দেশ ছেড়ে এখানে এতগুলো বছর ধরে পড়ে থাকা- অনেক কিছু চোখ বুজে ভাবছিল। তন্দ্রা এসে গিয়েছিল। গাড়ির হর্নের আওয়াজে উঠে পড়ল।
জেনেভা এসে গেছে। ঘড়িতে রাত সাড়ে দশটা বাজে। সঙ্গী ড্রাইভার ডাকছে, অভিনবর ফ্ল্যাট এসে গেছে। ওকে নামিয়ে দিয়ে সে নিজে বাড়ি যাবে। ল্যাপটপটা তুলে নিয়ে নেমে পড়ল অভিনব। হাত নেড়ে দিল চালককে।
রাখী পূর্ণিমার দিনটা জেনেভায় টোটাল অফিসিয়াল লকডাউন। কোনো অফিস খোলা নেই। পূর্বঘোষিত। সকালে দেরি করে উঠে প্রাতঃরাশ বানিয়ে খাচ্ছিল অভিনব। খেতে খেতে মোবাইলটা নিয়ে খুটখুট করছিল। দেশ দুনিয়ার খবর নিচ্ছিল। এমন সময়ে বেজে উঠল মোবাইলটা। অবিনাশ ফোন করেছে।
-‘হ্যালো’
-‘হ্যালো, বাড়ি আছ ত আজ?’
-‘ হ্যাঁ ‘
-‘আমরা আসছি’
-‘বাঃ খুবই ভাল কথা। চলে এস।‘
আনন্দের ই কথা। খেয়ে নিয়ে থালা বাসন ধুতে গেল অভিনব। এরপর ঘরটা একটু গুছিয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে।
ঠিক পঁচিশ মিনিট বাদে কলিং বেল বাজল। অভিনব গিয়ে খুলে দিল দরজাটা। সামনে দাঁড়িয়ে সপরিবারে অবিনাশ। এনির হাতে ব্যাগ। সকলেরই মুখে হাসি। ‘এস এস সবাই । খুব ভাল লাগল’। বলার অপেক্ষা না রেখেই ক্রিস্টো হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল। পিছন পিছন ওরা দুজন।
-‘আমরা তোমাকে চমক দিতে এসেছি। আমরা এখানে রাখী উদযাপন করব আজ।‘
সত্যিই অভিনব চমকে গেল। ব্যাপার কী?
ততক্ষণে এনি ব্যাগ থেকে কেক আর পুডিং এর প্যাকেট বের করে ফেলেছে। আর তার সাথে একখানা দোকান থেকে কেনা ফ্লাওয়ার ব্যাণ্ড। দেখে অভিনব না হেসে পারল না। পারেও বটে এনি। ও গিয়ে রান্নাঘর থেকে ডিশ নিয়ে এল।
ডিশ আনতে এনি খাবার গোছাতে লেগে গেল। অবিনাশ বলতে লাগল ‘ সবই এনি র কাণ্ড! ফেসবুকে তোমার বোন মঞ্জুর সাথে গল্প করে সব জেনেছে-আর তারপর এই ফন্দি করেছে। পারেও বটে।‘ এক মুহূর্ত কি যেন ভাবল অভিনব। তারপর সম্বিৎ ফিরিয়ে এনে হর্ষধ্বনি করে উঠল। সবাই মিলে খেল। এনি ওর হাতে পরিয়ে দিল পুষ্পবন্ধনীখানা। মোবাইলে সবাই একসাথে ছবি আর ভিডিও তুলল। মঞ্জুকে ভিডিও কল করে নেওয়া হল। সবাইকে নিয়ে এভাবে দারুণ একটা মজা হল। ফেসবুকে দিয়ে দিল এনি ছবিগুলো । শেষে এনি বলল ‘ দিস ইজ ফর ক্রিস্টো। দিস ইজ ফর হোম এসাইনমেন্ট অফ হিজ স্কুল।‘ ক্রিস্টোর গালটা বেশ করে টিপে দিল অভিনব।
ওদের বেরোতে বেরোতে বেলা হয়ে গেল। খুশী খুশী মন নিয়ে অভিনব দুপুরের খাওয়া সেরে নিল। খেয়ে উঠে একটু বিছানায় গড়াগড়ি দিচ্ছে, এই সময়ে আবার ফোনটা বেজে উঠল। জুডিথ।
-‘হ্যালো অভিনব, তোমার দেশবাসী দিদির খবর শুনেছ’?
-‘না, কী হয়েছে?’
-‘তার ত পরীক্ষায় রক্তে ড্রাগ ধরা পড়েছে। পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করছে। পুলিশ এনকোয়ারি তে ধরা পড়েছে ও যাদের সঙ্গে মেলামেশা করত, তাদের মধ্যে ড্রাগ কারবারি আছে।‘
-‘তাই নাকি? কি হবে এখন তাহলে?’
-‘আমি জানি না। ধরা পড়লে ত কারাবাস।‘
অভিনবর ভিতরটা কেমন কেঁপে উঠল। ফোন রেখে দিল। কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। নানারকম চিন্তা করতে করতে জুগের ঐ হাসপাতালের ফোন নম্বর নেটে খুঁজতে লাগল। খুঁজে নিয়ে স্পিড ডায়াল করল। খানিকক্ষণ পর ওধার থেকে এক মহিলা ফোন ধরলেন। অভিনব সীমন্তিনীদির খবর জিজ্ঞাসা করল। ভদ্রমহিলা জানালেন পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করবে কাল। মাদক চক্রের যোগ সন্দেহ আছে। আর এমনি শরীর মোটামুটি ভালই আছে। একটু শ্বাসকষ্ট হয়েছিল রাতে। এর বেশী কিছু জানা গেল না।
দুদিন পর অফিস। সকালে তৈরি হয়ে অফিসের পথে হাঁটা দিয়েছে, এই সময়ে পকেটে বেজে উঠল ফোনটা। অচেনা নম্বর।
-‘হ্যালো’
ওপাশ থেকে সীমন্তিনীদির গলা।
‘কি রে অভি, অফিসে পৌঁছলি?’
-‘না রাস্তায় আছি। তুমি কোত্থেকে ফোন করছ’?
-‘আমাকে হাসপাতালের একটা ফোন একবার ব্যবহার করতে দিয়েছে। তোকে একটু আমার সাহায্য করতে হবে’।
-‘বলো’।
-‘শোন আমি ফেঁসে গেছি। আমি অল্প অল্প নেশা করতাম। পরীক্ষায় ধরা পড়েছে। যাদের সাথে মেলামেশা করতাম তারা কেউ কেউ ড্রাগ এডিক্ট’।
-‘ওদের সাথে মিশতে কেন’?
-‘ এড়িয়ে যেতে পারিনি। ওদের মধ্যে একজন আমাকে…’
-‘ফোনে এত কিছু বোলো না। যেতে হবে তোমার কাছে’।
-‘তুই আসবি?’
-‘উপায় কি? আজ রাতেই যাব।‘
-‘রাতে দেখা করবি কি করে’?
-‘রাতে থাকব হাসপাতালে, সকালে দেখা করব কাল’।
ফোন কেটে দিয়ে অভিনব পা বাড়াল। কাউকে কিছু জানানো এখনই ঠিক হবে না। অফিস থেকেই একটা গাড়ি ভাড়া করে নিল। রাত নটায় গাড়ি করে রওনা দিল জুগে র দিকে অফিস থেকেই। খাওয়া দাওয়া সেরে নিয়েছিল আগেই।
হাসপাতালে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত একটা বাজল। ওয়েটিং লবিতে বসে বসে ঝিমিয়ে আর মেগাজিন পড়ে রাতটা কাটাতে হল। সকাল হলে প্রাতঃরাশ করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে আগের মতোই সব বিধি মেনে, নির্দিষ্ট পোশাক পরে গিয়ে দেখা করল সীমন্তিনীদির ঘরে।
সীমন্তিনীদি জানালা দিয়ে চেয়ে ছিল। সাড়া পেয়ে ঘুরে তাকাল। ‘এসেছিস, তোর কথাই ভাবছিলাম রে ভাই’।
-‘বলো, কি ব্যাপার’। উদ্বিগ্ন স্বরে বলল অভিনব।
-‘বোস বলছি। খেয়েছিস ত’?
-‘হ্যাঁ হ্যাঁ । আগে বলো।‘
-‘হুঁ। আমি জড়িয়ে পড়েছি। আমাকে পুলিশ জেরা করেছে। আমার রক্তে অল্প অল্প মাদক পেয়েছে টেস্ট করে’।
-‘তুমি কি বেশি ড্রাগ নিতে’?
-‘না মাঝে মধ্যে ওরা ওয়াইন বা খাবারে মিশিয়ে দিত। বুঝতাম না। ওরা নিজেরাও ঐভাবে ড্রাগ মেশানো মদ আর খাবার দাবার খেত’।
-‘ওরা নিজেরা নেশা করত?’
-‘হ্যাঁ ওরা সরাসরি ড্রাগও নিত। ওরা অনেকটাই নেশা করত।‘
-‘ উঃ। কেন যে সরে আসো নি ওদের কাছ থেকে! কেউ মেশে ওরকম। ওদের মধ্যে নাকি ড্রাগ কারবারি ও আছে?’
-‘হ্যাঁ, জানতাম না। আমি কয়েকবার না জেনে একটা দুটো ব্যাগ আর সুটকেস পৌঁছেও দিয়েছি।‘
-‘ আঁ, কিভাবে?’
-‘যখন জেনেভা অফিসে আসতাম, রাস্তায় ওদের লোক আমার কাছ থেকে নিয়ে নিত ব্যাগ। ‘
-‘সে কি! অফিসের গাড়ি করে তুমি এই কাণ্ড করতে’?
-‘কি করব বল। জানতাম না। আমাকে বলেছিল পরিবারের মোকদ্দমার কাগজপত্র পৌঁছে দিতে সাহায্য করতে। আমি ত বুঝিনি তখন। পরে বুঝেছি।‘
-‘সেরেছে। তুমি চিনতে যে তোমার কাছ থেকে নিত ব্যাগটা?’
-‘না রে। এক এক বারে এক এক জন নিত।‘
-‘সর্বনাশ, এ ত বড় চক্র। যখন জানতে পারলে তখন কী করলে’?
-‘তখন আর রাজি হইনি।‘
-‘ওরা জোর করেনি? কোন ছেলেটা? চেনো? নাম জানো?’
-‘হ্যাঁ হ্যাঁ, চিনি। পুলিশ আবার জিজ্ঞাসা করবে। কি করি বল ত?’
-‘তোমার কারো সাথে পরামর্শ করা দরকার।‘
-‘এখন এখানে তুই ছাড়া ত কাউকে দেখছি না।‘
খানিকক্ষণ পরামর্শ করার পর ঘর থেকে বেরিয়ে এল অভিনব। সত্যিই চিন্তার কথা। অফিসে কাউকে জানালে মুস্কিল। সীমন্তিনীদির চাকরি বাকরি থাকে কি না সন্দেহ-সুইজারল্যান্ড থেকে বহিষ্কার হয়ে যেতে পারে। শিরে সংক্রান্তির মত ফেঁসেছে, কোভিড রোগেও ধরেছে। চোখ মুখ শুকিয়ে গেছে, রোগা দেখাচ্ছে। আজকে জুগে লকডাউন। পুরো দিনটা হাসপাতালে কাটাতে হবে।
সারাদিন জুগের রাস্তায় ঘুরে আর হাসপাতালের বিশ্রামকক্ষে কাটিয়ে দিল অভিনব। সন্ধ্যায় আরেকবার সীমন্তিনীদির ঘরে যেতে পারল। সীমন্তিনীদি মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। মাথা ধরেছে। সংক্ষেপে কিছু কথা সেরে নিয়ে বসেই রইল ওরা। রাতে অভিনব বেরিয়ে এল ঘরটা থেকে।
বাইরে এসে পায়চারি করতে লাগল। ওষুধের গন্ধে যেন ভিতরে দম আটকে আসছিল এতক্ষণ। বাইরে হাসপাতালের ছোট বাগানটা থেকে একটা কোনো অচেনা ফুলের গন্ধ আসছে। অভিনব অন্যমনস্ক হয়ে ভাবতে লাগল। এই ব্যাপারে আর কী জড়ানো উচিত? কার সাথে আলোচনা করা দরকার? অফিসের কারো সাথে করলে আরও মুস্কিল। এদিকে অন্য কাউকে ত চেনেও না এদেশে। অথচ এর থেকে রেহাই পেতে গেলে সাহায্য চাই। কিছুই মাথায় আসছে না।
পরদিন অফিস ছিল না। গাড়ি ভাড়া করে ফিরে এল অভিনব জেনেভাতে। ঘরে ঢুকে ভীষণ ক্লান্ত বোধ হচ্ছে। স্নান সেরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল একদম। কম ধকল যায় নি গতকাল পুরো দিনটা।

তার পরের দিনটাও অফিস নেই। দুপুরে একবার হাসপাতালে ফোন করল অভিনব। কেউ ধরল না সেই ফোন। সীমন্তিনীদির খবর না পেয়ে মনটা খচখচ করতে লাগল। তারপরে বিকেলে একটা ফোন করল অবিনাশকে। অবিনাশ ত আর ওদের আপিসে কাজ করে না, ওকে জানানো যায়। ফোন করে সবিস্তারে বলল ও অবিনাশকে সীমন্তিনীদির সংকটের ব্যাপারে। অভিনব ধরে নিয়েছিল অবিনাশ ব্যাপারটা এড়িয়ে যাবে; কিন্তু না, সে সহানুভূতিশীল হয়ে পড়ল।
পরদিন ছিল অফিসের দিন। অফিসে অবিনাশের বার্তা পেল অভিনব তার মুঠোফোনে। অবিনাশ তাকে রাতে যেতে বলেছে নিজের বাড়িতে।
অফিস থেকে যথাসময়েই বেরিয়ে অবিনাশের বাড়ি পৌঁছে গেল অভিনব। অবিনাশ তখনও নিজের অফিস থেকে ফেরেনি। এনি র সাথে দেখা হল। কথায় কথায় সীমন্তিনীদির কথা জিজ্ঞাসা করল এনি।
-‘ সে কি, তুমিও জানো দেখছি’।
-‘হ্যাঁ, আমাকে অবিনাশ বলেছে সব। শুনে আমারও মন খারাপ হয়ে গেছে।‘
-‘ঠিকই, স্বজনহারা তো , তাই খারাপ লাগছে।‘
-‘আমরা কোন সাহায্য করতে পারি?’
-‘সেটাই ত ভাবছি।‘
কিছুক্ষণ নীরবতার পর কলিং বেলের আওয়াজ হল। এনি গিয়ে দরজাটা খুলে দিল। অবিনাশ। অভিনবকে দেখে হাত নাড়িয়ে ভেতরে চলে গেল। এনি আবার অভিনবর সামনে এসে বসল। কিছুক্ষণ বাদে অবিনাশ বেরিয়ে এল জামাকাপড় ছেড়ে।

দুদিন পর। জেনেভা থেকে জুগ রওনা হল গাড়িতে অভিনব। সঙ্গে সপরিবারে এনি। ওদের গন্তব্য মিউনিসিপ্যাল হসপিটাল। উদ্দেশ্য সীমন্তিনীদির সাথে সাক্ষাৎ করা। গাড়িতে শুধু ক্রিস্টো নানারকম কথা বলে যাচ্ছে। বাকিরা গম্ভীর। যথারীতি সব বিধি মেনে সীমন্তিনীদির সাথে দেখা করল ওরা। এনি সীমন্তিনীদির এটর্নি হিসাবে নিজের পরিচয় দিল। এনিকে নিয়ে অভিনব রইল সীমন্তিনীদির ঘরে। অবিনাশ আর ক্রিস্টো নীচে নেমে এল। এনি সমস্ত শুনল সীমন্তিনীদির কাছে। শুনে বলল ‘আমাদের একটা পরিকল্পনা করতে হবে। তুমি পুলিশের জেরায় নিজে থেকে কখনোই বলবে না যে ওদের ব্যাগ তুমি পৌঁছে দিয়েছে কয়েকবার। যদি ওরা ধরে ফেলে , তখনই বলবে যে তোমার অজান্তে তুমি তা করে ফেলেছিলে-কিছু মনে নেই। আর তুমি স্বেচ্ছায় মাদক কখনো নাও নি, কোনভাবে খাবারে মিশে গিয়েছিল।‘
-‘ঠিক আছে। আর তোমার ফি?’
-‘তোমার কাছে আমি ফি নেব না।‘
-‘সে কী?’
-‘ ফি এর কথা বললে আর আমি আসব না। আর কাউকে ডেকো।‘
বিষম শর্ত। রাজি না হয়ে উপায় নেই।
অভিনব অবিনাশের পরিবারের সাথে জুগ ঘুরে দেখল সেদিনটা। রাতে ওরা সীমন্তিনীদিকে বলে ফিরে এল।
তিনদিন পর সীমন্তিনীদির ফোন। উদ্বিগ্ন কন্ঠস্বর। বলল এনি র এটর্নি ফার্ম থেকে এখানকার পুলিশে যোগাযোগ করেছে। দরকার হলে জামিনের ব্যবস্থা হবে। আর সীমন্তিনীদির জন্য মার্সি প্লিডিং করা হবে। সেসব এনি করে দেবে। মনে মনে এনিকে ধন্যবাদ না জানিয়ে পারল না অভিনব। ‘এখন তোমার শরীর কেমন?’ জিজ্ঞাসা করল অভিনব। কিন্তু ওধার থেকে কোনো জবাব এল না। ফোনটা কেটে গেল।
অফিসে জুডিথের সাথে দেখা হল। সুইস সরকার এই করোনা পরিস্থিতিতে তিন মাসের বেশী এক্সটেনশন মঞ্জুর করছে না। চিন্তার বিষয়। বারবার আবেদন করতে হবে মঞ্জুরির। কাজ বাড়ল সব পরবাসী কর্মচারীর। কিন্তু মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। অভিনবর অবশ্য এখনো অনেক দেরি পারমিট কার্ডের মেয়াদ শেষ হতে। এখন চিন্তা না করলেও চলবে। এরপর উঠল সীমন্তিনীদির কথা। ওর ভিসা হয়ত খারিজ করে দেবে এ দেশের বিদেশ মন্ত্রক। এখন এই মন্ত্রক খুব কড়া পদক্ষেপ নিচ্ছে। জুডিথের কাছে খবর আছে সীমন্তিনীদির শরীর ও ভাল নেই। অভিনব জুডিথকে কিছু বলল না আর খুলে।
এরপর কদিন অভিনব খেয়ে ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিল। মাঝে একবার ক্যান্টন অফিস থেকে ফোন করেছিল। পরের মাসে একদিন মেডিকেল সার্টিফিকেট নিয়ে ক্যান্টন অফিসে হাজিরা দিতে হবে। সেখানে ডাক্তারি পরীক্ষা করা হবে। পাসপোর্ট, পারমিট কার্ড, আপিসের কাগজপত্র, বাড়ি ভাড়ার কাগজ সব গুছিয়ে নিয়ে গিয়ে দেখাতে হবে।
সেদিন টা ছিল রবিবার। ভোর ছটায় বেজে উঠল ফোনটা। অবিনাশ। ফোন ধরতে ওপার থেকে এনি র গলা পাওয়া গেল। উত্তেজিত কন্ঠে বলল ‘হ্যালো, ব্যস্ত আছ?’
-‘না কি হয়েছে? এত সকালে?’
-‘তুমি শিগগির চলে এস আমাদের ফ্ল্যাটের গেটের সামনে, জুগ যেতে হবে।‘
-‘কেন কী হল?’
-‘চলে এস। আমাদের গাড়িতেই যাব।‘
আর বাক্যব্যয় না করে বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে স্নান সেরে তড়িঘড়ি তৈরি হয়ে নিল অভিনব। না খেয়েই দরজা বন্ধ করে রওনা দিল।
ফ্ল্যাটের তোরণের সামনেই এনি দাঁড়িয়ে ছিল। দূর থেকে হাত নাড়ল। হাত নেড়ে দেখাল গাড়ি বের করে নিয়ে আসছে। অভিনব হেঁটে পৌঁছে মিনিট চারেক দাঁড়াতেই এনি নিজে গাড়ি চালিয়ে এনে হাজির। ‘উঠে পড়ো, বলছি সব।‘
সকালের রাস্তা দিয়ে এনি গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পাশে অভিনব। পিছনের সিটে একটা সুটকেস, ভেতরে দরকারি সব কাগজ। অভিনব তাকিয়ে আছে দূরের পাহাড়ের দিকে। একটু একটু কুয়াশা। পাহাড়ের মাথাটা পুরো দেখা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে পাহাড়টা মেঘের মধ্যে দিয়ে যেন আকাশের সাথে মিশে এক হয়ে গেছে।
-‘বুঝলে, খবর ভাল নয়।‘
-‘কি হয়েছে?’
-‘সীমন্তিনী আর নেই। হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে।‘
-‘সে কি? কি করে? কখন?’
-‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে আকস্মিক হৃদযন্রের বৈকল্য। তার সাথে ত করোনা আর শ্বাসকষ্ট ছিলই। দুর্বল শরীরে ধকল নিতে পারে নি, ডাক্তার বলেছে…’
আর কিছু তেমন শোনার আগ্রহ ছিল না। পুলিশ সীমন্তিনীদিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চেয়েছিল। এনি ও অনেক চেষ্টা করে মামলাটা অনেকটা মিটিয়ে এনে সীমন্তিনীদিকে উদ্ধার করে ফেলেছিল প্রায়। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। পুলিশ সীমন্তিনীদির বাড়ির আর পরিবারের খোঁজখবর চেয়েছিল। এনি সীমন্তিনীদির কাছ থেকে তার বাবার আমেরিকার ঠিকানা আর নম্বর যোগাড় করে দাখিল করেছিল। সীমন্তিনীদির বাবা কে সব জানিয়ে এনি ফোন করেছিল। কিন্তু তিনি সোজা জানিয়ে দিয়েছিলেন তিনি কোনো দায়িত্ব এই ব্যাপারে নিতে চান না। এখানকার পুলিশ ওঁর সাথে যোগাযোগ করাতে উনি সোজা সীমন্তিনীদিকে অস্বীকার করে দেন। সেই খবর সীমন্তিনীদি পাওয়ার পরে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই এই পরিণতি।

জুগে র হাসপাতালে পৌঁছে নির্দিষ্ট ঘরটা তে ঢুকল ওরা। তখন ডাক্তার আর দুজন কর্মচারী সীমন্তিনীদির খাটের পাশে দাঁড়িয়ে। পুরো ব্যোমযাত্রীর পোশাকের মত পোশাকে সীমন্তিনীদি মোড়া এখন-শোয়ানো। একটু বাদে পুলিশের লোক আসার কথা। এনি র সুটকেসে কাগজপত্র আছে সব। ও এরই মধ্যে ফোনে নিজের অফিসে একবার কথাও বলে নিয়েছে। মৃত্যুর কারণ কোভিড সহ আকস্মিক হৃৎ বৈকল্য।

পুরো মোড়া অবস্থায় আর তাকে চেনার উপায় নেই। পরিষ্কার বোঝাও যাচ্ছে না অন্তিম লগ্নের চেহারার অভিব্যক্তি। স্বেচ্ছামৃত্যু, না আত্মহনন নাকি ব্যাধির শিকার তাও এখন আর দেখে বোঝার উপায় নেই। কাছে যাবার অনুমতি নেই সংক্রমণের সাবধানতা অবলম্বন করে। দূর থেকেই অভিনব চেয়ে রইল হতবাক হয়ে সীমন্তিনীদির আগাগোড়া মুড়ে দেওয়া সংক্রামক ব্যাধিগ্রস্ত নিথর দেহটার দিকে।

Print Friendly, PDF & Email
0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments