“রুনি, এই রুনি, চেকবই টা কোথায় দেখো তো| এল আই সি র চেক টা কাটবো, কোথায় রাখলাম পাচ্ছি না..” সুগত র ডাকে কল্পনার জগৎ থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল রঙ্গন| পাশে ঘুমন্ত বাবানের গায়ে চাদর টা একটু টেনে দিয়ে কাগজ কলম সরিয়ে উঠে দাঁড়াল| চেকবই খুঁজতে খুঁজতে নিজের অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস পড়ল একটা-আজ ও বোধহয় হল না| কালকে নিশ্চয়ই সাজিয়ে ফেলতে পারবে গল্প টা, পরশু প্রতিযোগিতা র ডেডলাইন এর আগেই|

সংসার এর ব্যস্ততা র মধ্যে থেকে দু’ ঘন্টা সময় কি বেরোবে না? আচ্ছা যদি কাল রান্নাটা একটু অল্পের ওপর দিয়ে সারা যায়? ডাল, শ্বাশুড়িমা র জন্য একটা নিরামিষ কিছু, বাবানের জ্বর গেছে দু’ দিন, সবে আজ থেকে আর আসেনি,ওর জন্য চিকেন স্যুপ হালকা করে…আসলে বহুদিন তো লেখে না, বাবান হওয়ার আগে একটা ছোট স্কুলে চাকরি করত, তখন থেকেই সময় হয়ে ওঠে না আর – একটু ভাবনা চিন্তা গুছিয়ে না নিয়ে কাগজে নামানো যায় নাকি| আর কোনোদিন লিখতে পারবে ভাবেনি, কিন্তু ফেসবুকের এই নতুন পেজ টা যেন রক্তে আবার পুরোনো নেশা ধরিয়ে দিচ্ছে|

এতদিন পছন্দের লেখক দের লেখা পড়ে মন্তব্য করেছে খালি, প্রতিযোগিতার কথাটা পড়ে থেকে লোভ হচ্ছে খুব| পরমাণু গল্প, পঞ্চাশ শব্দের, এইটুকু লেখা লিখতে পারবে না? কিন্তু লিখতে গিয়ে বুঝতে পারছে, অত সহজ নয়, অল্প কথায় কাহিনী তুলে ধরা বরং আরো কঠিন কাজ, আরো সময়সাপেক্ষ| আর সময়ের যে বড় অভাব দস্তুরমতো গৃহবধূ রঙ্গনের| সাতপাঁচ ভাবতে থাকা মগজের গাড়ি হঠাৎ ব্রেক কষল, আরে, এই তো চেকবই, বাবানের বইয়ের তাকে গুঁজে রাখা| যেখানকার জিনিস সেখানে রাখা সুগত কিছুতেই রপ্ত করতে পারল না| রঙ্গন চেকবই টা হাতে নিয়ে মিহি গলায় ডাক দিল একটা, “এই যে আনছি দাঁড়াও”

সুগত কে বইটা ধরিয়ে বেডরুমে ফিরছিল রঙ্গন, পেছন থেকে আবার ডাক, “আরে আরে এই রুনি, শোনো শোনো, বলছি কাল ঝিমলি-অর্ণব খাবে তো, কি বাজার করতে হবে বললে না তো? কাল একটু তাড়াতাড়ি যেতে হবে, একটা মিটিং আছে, সাড়ে আটটায় বেরোব| বাজারটা সেরে দিয়ে যাবো তো! নাকি তুমি পরে বেরিয়ে আনবে?”

রঙ্গনের যাবতীয় ভাবনা গুলিয়ে ঘেঁটে গেল নিমেষে| তাই তো, কাল তো ঝিমলি আসবে! ননদ ঝিমলি র বিয়ে হয়েছে বারাসাতের দিকে, আদরের ভাইপোর জ্বর শুনে ও সময় করে উঠতে পারেনি আসার| অবশেষে সুযোগ হয়েছে, ওর বর দিল্লি যাবে কাল রাতে, পাঁচ দিনের জন্য অফিশিয়াল কাজে, ঝিমলি কে দিয়ে যাবে এখানে| এখানে ডিনার সেরে ডাইরেক্ট এয়ারপোর্ট, তাই ধীরেসুস্থে গল্পগুজব করে ডিনার সারার উপায় নেই, অর্থাৎ রঙ্গন কে একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সারতে হবে সব| অর্থাৎ গল্প লেখার গল্প শেষ|

রাগ হয় রঙ্গনের, বড় রাগ| নিজের কিছুই কি করার সময় কোনো দিন পাওয়া যাবে না? কিন্তু কি করবে, ঝিমলি যে ওর ছোট বোনের মত| ও আসছে বলে রাগ করবে? বিকেলে এসেই হয়তো বায়না ধরবে, রুনিদি ফুচকা খেতে চলো| বা বলবে বিদিশাদির বুটিকে ঘুরে আসি| না:, ঝিমলি আসার পরে আর কিচ্ছু হবে না| কাল বরং ভোর ভোর উঠবে রঙ্গন, রাত টা ভেবে নিলে সকালে লিখে নিতে পারবে না? তারপর তো আইপ্যাডে টাইপ করা খালি| শ্বাশুড়িমা ছ’টায় উঠে পড়েন, ওনার আগে উঠতে হবে, নাহলে গল্প লেখার ব্যাপার ওনাকে বোঝাতে হবে আবার| কেমন লজ্জা লজ্জাও লাগে, কেন কে জানে, খারাপ কাজ তো কিছু নয়, শ্বাশুড়ি ও কিছু খারাপ মানুষ নন|

কিন্তু ঘরের বউ ভোর বেলা উঠে গল্প লিখছে…
বেডরুমে এসে আবার কাগজ কলম টেনে নেয় রঙ্গন | একটা নতুন পাতায় লেখে, বড় গলদা চিংড়ি, ঝিমলি ভালবাসে খুব, কিন্তু অর্ণবের আবার এলার্জি, বড় পাবদা ওর জন্য, ইলিশ কি ভালো পাবে, পেলে কচুর শাক….

 

~ একটি মেটাফিকশন ~

Print Friendly, PDF & Email
0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments