Author : Subhojyoti Mukherjee

[Bio : গল্প লেখা আর পড়া শুভজ্যোতির একটা নিদারুণ হবি । শুভজ্যোতি সোশ্যাল ইসু নিয়ে লিখতে খুব ভালবাসে । এটা তারই একাটা উদাহরণ । ]

 

 

প্রশান্ত ঘরেই বসেছিল যখন দরজায় দু’বার টোকা পড়ল, “ প্রশান্ত জেগে আছিস?”

–কে দীপ? কি চাই?

–খুব দরকারি কথা আছে ভাই ,দরজা খোল শিগগিরি।

তাড়াতাড়ি উঠে প্রশান্ত দরজা খুলতেই হুর্‌মুর করে ঘরে ঢুকল দীপ।

“কিরে আবার নতুন কি ক্যাজ্‌রা করলি?”,চেয়ারে বসে জিজ্ঞেস করল প্রশান্ত।black-paint-bucket-with-paint-brush-md

–শুনিসনি !! ফারুখ স্যারকে ‘ওরা’ খুব মেরেছে । হসপিটালে ভর্তি করতে হয়েছে । অবস্থা ভালো নয় । এই দেখে এলাম।

“কেন?”, অস্ফূট স্বরে জিজ্ঞেস করল প্রশান্ত ।

–কালকে নিউজপেপারে একটা আর্টিকেল লিখেছিলেন । সেটা ওদের পছন্দ হয়নি ,তাই ।

এক মুহুর্তের মধ্যে প্রশান্ত উঠে দাঁড়ালো । চটিটা পায়ে গলিয়ে নিল, তারপর বলল,“চল ।”

–কোথায়?

–অন্যদের সাথে দেখা করা দরকার । কিছু কথা বলার আছে । চল ।

 

(২)

মেসের নিচে দাড়িয়ে প্রথমে প্রশান্তই কথা শুরু করল,“ফারুখ স্যারকে ওরা ধরে নিয়ে গেছে শুনেছিসতো নিশ্চয়ই?” অলকা বিরক্ত হয়ে বলল,“হোস্টেল থেকে এই কথা বলার জন্য ডাকলি !! এটা তো হতই । যা লিখেছিলেন ।”

পৌষালি অলকাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,“ একথা বলিস না অলকা । তুই লেখাটা পরিসনি । তাই বলছিস । যা লিখেছে ঠিক লিখেছে । এটা বলার প্রয়োজন ছিল । আমাদের এর প্রতিবাদ করা উচিত ।”

দীপ ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু পৌষালি আমরা কি করতে পারি? আমরা স্টুডেন্ট । ওদের সাথে মারামারিতো করতে পারব না। ”

আলতাফ গর্জে উঠল, “কেন পারবনা । এভাবে আমাদের উপর জুলুম করবে আর আমরা চুপচাপ মেনে নেব ।”

প্রশান্ত এতক্ষণে বলে উঠল, “মারামারিটা কোনও উপায় নয় আলতাফ । আর এটা আমরা –ওরার ব্যাপারও নয় । তবে এর উচিত জবাব দেব ।”

“কিভাবে?”, একসাথে বলে উঠল দীপ আর আলতাফ ।

–সেটা এখনো ভাবিনি । তাইতো তোদের ডেকেছি । তোরা কিছু বল ?

অলকা বলল,“চল গিয়ে স্যারকে বলি যা লিখেছেন সেটা ফিরিয়ে নিতে । সবঝামেলা তাতে মিটে যায়। ”

“স্যার সেটা লাইফে করবেন না । আমি জানি । আমাদেরই কিছু করতে হবে ।”, আলতাফএকটুভেবেবলল।

দীপ একটু মৃদুস্বরে বলল, “আমরা আবার ঝামেলা করলে স্যার আরও প্রবলেমে পরে যেতে পারে ।”

পৌষালি বলে উঠল,“আমার মাথায় একটা আইডিয়া আছে । আমরা প্রবলেমে পড়ব না আবার খুব ভালো ইমপ্যাক্ট হবে ।”

“কি আইডিয়া ?”,জিজ্ঞেস করল প্রশান্ত।

পৌষালি মৃদুস্বরে সবাইকে নিজের বক্তব্য পেশ করল ।

শেষে প্রশান্ত বলে উঠল, “অসাধারণ । তাহলে আজ রাতে সবাই এখানে জড়ো হব । এখনও চারঘণ্টা সময় আছে । সব বন্দোবস্ত করে ফেলা যাক ।”

(৩)

রাতে চারিদিক শুনশান, নিস্তব্ধ । ল্যাম্প-পোস্ট-এর নীচে এমন সময় তিনটি ছেলে আর দুটি মেয়ের আভির্ভাব ঘটল ।

প্রশান্ত জিজ্ঞেস করল,“সবাই তৈরিতো ? আর কিন্তু পিছোনো যাবে না ।”

সবাই ঘাড় নাড়ল । অলকা জিজ্ঞেস করল,“আলতাফ তোর হাতে আবার এটা কি ?”

“ও কিছুনা । এক বালতি আলকাতরা । আজ ওদের দেওয়ালে একদম লিখে দেব ।”, দাতে দাঁত কষে উত্তর দিল আলতাফ।

দীপ এবার ভয়ে ভয়ে বলে উঠল,“তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি ? আর কত বাড়াবাড়ি করবি ? পোস্টারতো লাগাচ্ছি আমরা। আর কি চাস ?”

“পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা যায় দীপ । কিন্তু  এটা অত সহজে উঠবে না ”, বালতিটা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল আলতাফ।

প্রশান্ত কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল,“তোর যা ইচ্ছে কর । কিন্তু ঝামেলা হলে কিন্তু ।”

“ও যা হবে দেখা যাবে । আগে এখন কাজটা সেরেনি ”, পৌষালি বলে উঠল ।

“ঠিক আছে । দীপ,আলতাফ তোরা অফিসের সামনে চলে যা । পৌষালি, অলকা তোরা গলির মুখে সব জায়গায় লাগা । আর আমি এখানে লাগাচ্ছি ”, হাতের পোস্টার গুলো নাচাতে নাচাতে বলল প্রশান্ত ।

কিছুক্ষণ বাদে হঠাৎ একটা আওয়াজ শুনে ঘুরে দাঁড়ালো প্রশান্ত । তাকিয়ে দেখল দীপ আর আলতাফ প্রায় ছুটতে ছুটতে আসছে । আলতাফের জামা,হাতে আর মুখে কালো কালো কিসব লেগে আছে ।

“এটা আবার কি করে হল?”, অস্ফুটস্বরে জিজ্ঞেস করল প্রশান্ত ।

এমন সময় অন্যদিক থেকে পৌষালি আর অলকা হাঁপাতে হাঁপাতে এলো “ এদিকে আওয়াজ শুনলাম ? কি হয়েছে ?”
black-paint-bucket-with-paint-brush-md
“আর বলিস না । আলতাফটা এত পাকামি মারতে যায় । বললাম করিসনা,তাও লিখতে গেল । অফিসে লোক ছিল । ব্যাস! দেখে নিল । তারপরই চিৎকার-চ্যাঁচামেচি শুরু হল । আমরা পালাতে গেলাম । এর মধ্যে একজন ওই আলকাতরার বালতিটা ছুঁড়ে মারল আমাদের দিকে । আর এই হাঁদাটার গায়ে দেখ সব লেগে গেছে ”, এক নিঃশ্বাসে কথাটা বলে শেষ করল দীপ ।

“এবার কি হবে?ওরা তো দেখে নিয়েছে । আর এই রঙও উঠবেনা সহজে”,ভয়ার্ত গলায় বলল পৌষালি ।

“কে তোকে পাকামোটা মারতে বলেছিল ? কালকে ওরা যখন খুঁজতে বেরোবে তখন কি হবে? তোকেতো একনজরে দেখেই চিনে ফেলবে ।”, বলে প্রশান্ত প্রায় মারতে উঠল আলতাফকে ।

“তোরা চাপ নিস না । যদি ধরা পড়ি, তো বলব আমি একা করেছি । তোদের বিপদে ফেলব না ।”, কাঁদো কাঁদো গলায় বলল আলতাফ ।

অলকা প্রশান্ত আর আলতাফের মাঝে দাড়িয়ে ওদের থামিয়ে দিল । বলল,“এখন আর ঝামেলা করিস না । আমাদের মধ্যে ঝামেলা করলে প্রবলেম সল্ভ হবে না । আমার মাথায় একটা প্ল্যান এসেছে । আগে এখান থেকে চল । ওদিকে আওয়াজ হচেছ  , ওরা খুঁজতে বেড়িয়েছে মনে হচেছ ।”

(৪)

“আপনার মেসেরই কোনও ছেলে,এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই ।”,গর্জে উঠলেন সুধাংশু মিত্র ।

“নানা । আপনার বোধহয় কিছু ভুল হচেছ । আমার মেসে এরা তো স্টুডেন্ট । এটা নিশ্চয়ই ‘অন্যদের’কাজ ।”, মিহি গলায় সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করলেন মিস্টার সান্যাল ।

“আমার কোনও ভুল হচেছনা । কাল রাত থেকেই আমরা খোঁজা শুরু করেছি । আপনার এই মেসটাই বাকি ।”,গরমস্বরে বললেন সুধাংশুবাবু ।

“যে করেছে তার মুখ দেখেছেন কি?” ,জিজ্ঞেস করলেন মিস্টার সান্যাল ।

“নারে মশাই । দেখে নিলে তো অসুবিধাই থাকত না কিছু । কিন্তু বুদ্ধিমানের মতো আলকাতরার বালতিটা ছুঁড়ে মেরেছিলাম । গায়ে রঙ লেগে গেছে শালাটার । পালাবে কোথায় এখন ।”, চিৎকার করে বললেন মিস্টার মিত্র ।

“ ও ও  . . .।”, মুখটা ছোট হয়ে এলো সান্যাল বাবুর ।

সুধাংশু বাবু বলে চললেন,“ আপনার ওই মুসলিম ছেলেটাকে আমার খুব সন্দেহ । মালটাই করেছে মনে হয় । একবার হাতে পাই । মার কাকে বলে বুঝিয়ে দেব ।”,দাঁতে দাঁত কষে বললেন সুধাংশুবাবু ।

“এরা ছেলে মানুষ । করে থাকলে হয়ত ভুল করেছে । ওদের মাফ করে দিন ।”, হাতজোর করে বললেন মিস্টার সান্যাল ।

–মাফ ??? এতবড় সাহস, সারা গলিতে পোস্টার মেরেছে তারপর আবার আলকাতরাদিয়ে লিখতে যায় আমাদের দেয়ালে । বলে বাক্‌-স্বাধীনতা চাই । এরা ছেলেমানুষ নয় জঙ্গিসব । আপনি খালি ওদের কাছে নিয়ে চলুন তো একবার । তারপর বুঝিয়ে দেব ।

“পোস্টারগুলো তো ছিঁড়ে ফেললেই ল্যাটা চুকে গেল ।”,বিজ্ঞের মতো বললেন মিস্টার সান্যাল ।

“আরে না মশাই অত সহজ নয় । লোকে খবর পেয়ে গেছে । এখন বাঁচতে হলে শাস্তি দিতে হবে ।”, গম্ভীর স্বরে বললেন সুধাংশুবাবু ।

“কি করবেন ধরতে পারলে ?”, ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলেন মিস্টার সান্যাল ।

“দেখুন মশাই আমাকেও উপর লেভেলে জবাবদিহি করতে হয় । বেশি নয় একজন কালপ্রিট চাই । আপনিকাদের সাথে থাকবেন ভেবে নিন । আপনাকে কিন্তু এখানেই থাকতে হবে । এরা তো কয়েকদিনের মেহমান ।”,হুমকির সুরে বললেন সুধাংশুবাবু ।

কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে ভেবে নিলেন মিস্টারমিত্র ।

“আসুন । ওরা বোধহয় সব হলঘরে আছে ।”,অসহায়ভাবে পথ দেখিয়ে নিয়ে চললেন মিস্টার মিত্র ।

হলঘরের দরজা ঠেলে ঢুকতেই থমকে দাঁড়ালেন দুজনে । সুধাংশুবাবুর মুখটা লাল থেকে পাংশু হয়ে গেল । ঘর আলোয়-আলোময় । একদঙ্গল ছেলে-মেয়ে ঘরে বসে আছে । সবার মুখে দৃপ্তহাসি । সবার মুখে-গায়ে-জামায় কালোরঙ ।

“গুড মর্নিংস্যার । ভালো আছেন ?”, সবাই একসাথে হাসতে হাসতে বলে উঠল ।

বাইরে জনতার কোলাহলে সুধাংশুবাবুর জবাব আর শোনা গেল না।

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

*