।৮।

টিয়ার সাথে সমরের আলাপ হয় ফিলাডেলফিয়ার এক আর্ট মিউজিয়ামে। বিগ্যানে যেমন অরুচি, তেমন ছোটবেলা থেকে সমরের উৎসাহ ছিলো শিল্পে। অনেক অল্প বয়েস থেকে খুব ভালো আঁকতে পারতো। ফুটবল খেলার থেকেও ভালো। পশ্চিমে জন্ম হলে হয়ত শিল্পীই হোতো। কিন্তু দেশে তো শিল্প করে পেটে ভাত জুটবে না, তাই ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। তবে কৌতুহলটাকে তো আর ইচ্ছা করলেই ধামা চাপা দেওয়া যায় না! তাই সুযোগ পেলেই ঢুঁ মারতো মিউসিয়াম, আর্ট গ্যালারী ইত্যাদিতে। আলাপ হবার মুহূর্তে টিয়া মিশরের শিল্পী হাজেম তাহা হুসেইন এর একটা বিশ্ববিখ্যাত পেইন্টিং এর সামনে দাঁড়িয়ে ঘাড় কাত করে মনোযোগ দিয়ে পরখ করছিল। সেই দৃশ্য সমরকে মাঝপথে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলো। মিনিট দশেক অপেক্ষা করেছিল সমর মেয়েটার সাথে কথা বলবে বলে। কিন্তু সে মেয়ে আর ঘাড়ই ফেরায় না। শেষে মড়িয়া হয়ে এগিয়ে গিয়ে বলেছিল “আর ইউ ইজিপশিয়ান?” “নো। হোয়াই ডু ইউ থিঙ্ক সো?” প্রশ্ন করেছিল টিয়া। সমর একটু লজ্জা পেয়ে বলেছিল “নো। আই মিন…আই মিন ইয়র আই ল্যাশেস আর সো ডার্ক অ্যান্ড লং” টিয়া দুষ্টু হাসির সাথে জিগ্যেশ করেছিল “সো, হাউ লং হ্যাভ ইউ বিন স্টেয়ারিং অ্যাট মাই আই ল্যাশেস?” সেই তাদের প্রথম দেখা। তারপর প্রেম। ঘটনাচক্রে দেখা গেল যে তারা দুজনেই তখন ইউনিভার্সিটি অফ পেন্‌সিলভেনিয়ার ছাত্র। সমর ম্যানেজমেন্টএর আর টিয়া সোশাল সাইন্সএর। প্রেম করতে তাতে বেশ সুবিধা হয়েছিল। এর দুবছর পর তাদের বিয়ে হয়। সেই বিয়েতেই গগাবাবুর সাথে ওদের শেষ দেখা। ভাগ্যবশত পাশ করে বেরোবার পরই দুজনে নিউ ইয়র্কে চাকরীও পেয়ে যায় প্রায় একই সময়।

সেই যে মিশরের শিল্প দেখতে গিয়ে দুজনের প্রথম আলাপ হয়েছিল, তারপর থেকেই একসাথে মিশরে বেরাবার তীব্র বাসনা দুজনেরই। কিন্ত নিউ ইয়র্কে আসার পর দুজনেই কেরিয়ার নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে পরলো। দুজনেই তখন সদ্য নতুন চাকরীতে ঢুকেছে। প্রচন্ড কাজের চাপ। বিশেষ করে সমরের। তার পক্ষে তখন এক সপ্তাহ ছুটি পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তাও তক্কে তক্কে ছিলো দুজনে। শেষে যখন সমর ছুটি পেল প্রায় বছর দুয়েক পর, ততদিনে টিয়া অন্তঃসত্ত্বা। পাঁচ মাস হয়ে গেছে। বন্ধুবান্ধব, টিয়ার মা বাবা, সকলে ওই অবস্থায় মিশরে যেতে ওদের বারন করেছিল। এমনিতেও ওই সময় মিশরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুব একটা ভালো ছিলো না। রোজই ছাত্রগোষ্ঠির সাথে সরকারের লাঠালাঠি চলছিল। প্রথমে টিয়া আর সমরও মেনে নিয়েছিল যে টিয়ার এই অবস্থায় যাওয়া সম্ভব নয়। পরে মত পাল্টালো। রোজরোজ তো আর সমর এক সপ্তাহের ছুটি পায় না। দু বছর পর অনেক কাকুতিমিনতি করে এই ছুটি জুটেছে। আর তাছাড়া সন্তান সন্তাদি হয়ে গেলে তখন যাওয়া আরো কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। স্বপ্ন সারাজীবন স্বপ্নই থেকে যাবে। টিয়ার ডাক্তারও আশ্বাস জোগালো। বলল যে টিয়াকে নিয়ে ভাবনার কোনো বিশেষ কারন নেই। পাচঁ মাসের মাথায় চলাফেরা করাতে কোনো রিস্ক নেই। শুধু একটু সাবধানে চলাফেরা করতে হবে এই যা। অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম যেন না হয়। সব বিবেচনা করে ওরা শেষ অবধি যাওয়ার সিদ্ধান্ত পাকা করলো।

এক সন্ধ্যাতে কাইরো বিমানবন্দরে ইজিপ্ট এয়ারের ফ্লাইট নামলো। সোজা নিউ ইয়র্ক থেকে কাইরো। সমর ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট কেটেছিল যাতে টিয়ার কোনো কষ্ট না হয়। কষ্ট কিছু হয়ও নি। টিয়া পুরো ফ্লাইট ঘুমিয়ে কাটিয়েছিল। এয়ারপোর্ট থেকে সোজা মেরিয়ট হোটেল। ওদেরই শাটেল বাসে। কোনো অসুবিধাই হয়নি। এর পর পাঁচ দিন হইহই করে কেটে গেল। সমর আগে থেকে খুব ভালো এক নামকরা টুরিং কম্পানির সাথে গাইডেড টুরের ব্যাবস্থা করে রেখেছিলো। ওরা খুব যত্ন সহকারে কাইরো শহর, গীজার পিড়ামিড, স্পিংস, ও অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থানগুলো ঘুড়িয়ে দেখিয়েছিল। টিয়া দিব্বি ছিল। কেবল একদিন গরমে অতিরিক্ত হাঁটার ফলে একটু কাবু হয়ে পরেছিল, তবে তা পরদিনই ঠিক হয়ে গেছিলো। শেষ সন্ধ্যায় চাঁদের আলোয় নীল নদের ওপরে বজ্রা করে পরিভ্রমন পর্জন্ত্য করেছিলো ওরা। ভালো লাগার আবেশে টিয়া সেই রাতে বজ্রার রেলিংএর ধারে সমরকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন দিয়ে বলেছিলো “থ্যাঙ্ক ইউ সমর। আই উইল নেভার ফরগেট দিস ইভিনিং!”

বজ্রা ভ্রমন থেকে ফিরে এসে রাতের খাওয়াদাওয়া সেড়ে ওরা যখন ঘরে ফিরলো তখন রাত প্রায় এগারোটা। পরদিন দুপুর একটায় ওদের ফ্লাইট। সমর সুটকেস গোছাতে শুরু করলো। টিয়া তখন বাথরুমে ঢুকেছে। টিয়ার অভ্যাস রাত্তিরে শোবার আগে স্নান করা। সুটকেস গোছাতে গোছাতে অভ্যাসবশত সমর টিভিটা চালিয়ে দিলো। কয়েক মিনিটের মধ্যে টিভি স্ক্রীনের সব চিত্র দেখে তার রক্ত হীম হয়ে গেলো। গোছানো থামিয়ে সে নিস্পলক ভাবে টিভির দিকে চেয়ে রইলো। ঘন্টা খানেক আগে সমস্ত শহরে দাঙ্গা লেগেছে। কিছু কিছু এলাকায় আগুন ছড়িয়ে পরছে। সর্বত্র ভাংচুর। পুলিশ আর ছাত্রদের লড়াই। যেখানে সেখানে বোম ফাটছে, টিয়ার গ্যাস আর গুলিগালা চলছে। যাচ্ছাতাই অবস্থা। যদিও খবরে বলছে যে এয়ারপোর্ট এখনো খোলা, তা বন্ধ হতেই বা কতক্ষন? আর তাছাড়া এ অবস্থায় কিছুতেই এয়ারপোর্টএ যাওয়া যাবে না। টিয়া বাথরুম থেকে বেরোলো। টিভিতে সব দেখে তার মুখ একেবারে ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। ধপ করে বিছানায় বসে পরলো। সমর উঠে গিয়ে বউএর গলা জড়িয়ে তাকে আশ্বাস জুগিয়ে বলল “বি কাম টি। সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি একটু রেস্ট নাও, আমি নিচে একবার ম্যানেজার এর সাথে কথা বলে আসি”। বলে টিভিটা বন্ধ করে দরজা টেনে বেরিয়ে গেল।

মেরিয়ট আমেরিকান হোটেল। তার ম্যানেজারও আমেরিকান। সমর আমেরিকান নাগরিক বলে তার কথা মন দিয়ে শুনলেন। শুনে বললেন যে হোটেলের শাটেল বাস এই অবস্থায় এয়ারপোর্টে তিনি পাঠাবেন না। তাতে ড্রাইভারেরও প্রানের রিস্ক। উনি বললেন যে খুব সম্ভবত ভোর রাত্তিরের দিকে দাঙ্গার প্রকোপ অনেকটা কমে যাবে। অতএব সমরের উচিত খুব ভোর বেলা ট্যাক্সি নিয়ে এয়ারপোর্ট চলে যাওয়া। বন্ধুত্বের খাতিরে উনি ওনার জানাশোনা একজন ট্যাক্সি ড্রাইভারকে ফোন করে এক্ষুনি ব্যাবস্থা করে দিতে পারেন, এই কথা জানালেন। এই ভোরের যাত্রায় খানিকটা রিস্ক থাকবেই। তবে এও জানালেন যে সমর যদি না যেতে চায়, তবে হোটেলে আরো কিছুদিন থাকতে দিতে তাঁর কোনো আপত্তি নেই। সমর একবার ভাবলো যে থেকে যাবে। পরক্ষনেই ভাবলো যে যদি দাঙ্গা বেড়ে যায়? যদি এয়ারপোর্ট পরে বন্ধ হয়ে যায়? এখন তাও খোলা আছে। যতই এরা এখন আমেরিকান বলে খাতির করুক, দাঙ্গা এ হোটেলে এসে পৌঁছালে এরা সকলেই পাততারি গুটিয়ে পালাবে। তখন সে কি করবে? নানান দিক বিবেচনা করে সমর সিদ্ধান্ত নিল যে ভোর পাঁচটায় সে ট্যাক্সি নিয়ে এয়ারপোর্টে রওনা দেবে। ম্যানেজারকে সেই মত ব্যাবস্থা করার ইঙ্গিত দিল সে। ঘরে ফিরে টিয়াকে সব কিছু বুঝিয়ে বলল। টিয়া সমরকে আঁকরে ধরে বলল “আমার ভীষন ভয় করছে সমর”। সমর টিয়ার দুগাল নিজের হাতে ধরে চোখে চোখ রেখে বলল “আই লাভড ইউ বিকজ ইউ আর ব্রেভ। দিস ইস দ্যা টাইম টু বি ব্রেভ টি”। টিয়া মাথা নেড়ে জানালো যে সে বুঝেছে।

সে রাত্রে আর তাদের ঘুম হয়নি। ভোরের দিকে হয়ত সমরের একটু চোখ লেগে এসেছিল। ফোনের কর্কশ শব্দে ঘুম ভাঙল। ট্যাক্সি ড্রাইভার কথা রেখেছে। ঠিক পাঁচটায় হাজির। গোছগাছ সব করাই ছিল। কোনোমতে জামাকাপড় চড়িয়ে, দাঁত মেজে তারা নিচে এসে ট্যাক্সিতে চড়লো। হোটেল বিল আগের রাত্রেই মিটিয়ে দিয়েছিল সমর। মেরিয়ট হোটেলটা কাইরো শহরের ঠিক মাঝখানেই বলা চলে। সেখান থেকে ২৫ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে গেলে পরবে তাদের গন্তব্য কাইরো বিমানবন্দর। আকাশে সদ্য ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ট্যাক্সি যখন হোটেল থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নামলো, রাস্তা তখন একেবারে জনমানবশুন্য। গত রাতের দাঙ্গার কোনো চিহ্নই নেই। অবশ্য দাঙ্গা হয়েছে এই এলাকা থেকে খানিকটা দূরে, কাইরো ইউনিভার্সিটির কাছাকাছি। সকালের ফাঁকা রাস্তায় ট্যাক্সি দ্রুতগতিতে ছুটে চলেছে এয়ারপোর্টের দিকে। হাওয়ায় কিরকম একটা পোড়া পোড়া গন্ধ। সেই গন্ধে টিয়ার মাঝেমাঝে গা গুলিয়ে উঠছে। সে সমরের কাঁধে মাথা রেখে শক্ত করে তার হাত ধরে আছে।

এদিক ওদিক একটু ধোঁয়া আর ওই পোড়া গন্ধ ছাড়া বোঝার উপায় নেই যে এই শহর এমন বিভৎস রূপ নিয়েছিল গতকাল রাতে। মিনিট পনেরো যাবার পর ট্যাক্সি এল-গালা ব্রিজ পার হয়ে একটা ট্রাফিক লাইটে দাঁড়ালো। সমর জানলা দিয়ে দেখলো যে ডানপাশে কয়েকটা ভাঙ্গাচোরা বাড়ি আর বাঁদিকে কাইরো মিলিটারি অ্যাকাডেমী। তাহলে প্রায় এসে গেছি, ভাবলো সে। যদিও রাত ছিল, সমরের স্পষ্ট মনে আছে যে আসার সময় এয়ারপোর্ট চত্তর ছাড়ানোর কিছুক্ষনের মধ্যেই এই মিলিটারি অ্যাকাডেমী তাদের ডানদিকে পড়েছিল। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে যাবে সে, হঠাৎ একটা জ্বলন্ত বোতোল তাদের গাড়ির বনেটএর ওপর পড়লো। পরমুহূর্তে বিকট শব্দে বিস্ফোরন। সমর আর টিয়া সঙ্গেসঙ্গে মাথা নিচু করে পেছোনের সিটের ওপর শুয়ে পরলো।

যখন মাথা তুললো, তখন দেখলো যে বিস্ফোরণে গাড়ির উইন্ডশিল্ড টুকরো টুকরো হয়ে গেছে, আর ড্রাইভাররের মুখটার অর্ধেক আর নেই। তা দেখে টিয়া চিৎকার করে হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করলো। সমর টিয়ার কাঁধ ধরে একটা ঝাঁকুনি দিল। তারপর বলল “টি, টি, লিসেন টু মি, উই নিড টু গেট আউট অফ হিয়ার। রাইট নাউ। আর ইউ লিসেনিং?” বলে গাড়ির দরজা খুলে ঘষটাতে ঘষটাতে টিয়াকে কোনোমতে বাইরে বার করলো। চারিপাশে একবার চোখ বোলালো। এখনো কোনো জনমানবের চিহ্ন নেই কোথাও। এখন যদি আর একটা বোমা ছোঁড়ে কেউ, তাহলে আর কিছু করার থাকবে না। টিয়াকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে জিগ্যেশ করলো “ক্যান ইউ ওয়াক?” টিয়া কোনো উত্তর দেয় নি। শুধু সমরের কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটতে শুরু করেছিল। সমরের অন্য কাঁধে একটা ব্যাগ। দুহাতে দুটো সুটকেস। ঈশ্বরের কৃপায় হোক বা যে কারনেই হোক সেদিন তাদের দিকে আর কোনো বোমা নিক্ষেপিত হয়নি।

এইভাবে কতক্ষন হেঁটেছিল ওরা জানেনা। সেই কাছের এয়ারপোর্ট চলে গেছে যেন বহু দূরে। যেই সাহারার বুকে তারা দিন পাঁচেক কাটিয়ে এলো, সেই সাহারার মরিচীকার মতই। বেলা বাড়ার সাথে সাথে রোদ বাড়লো। শেষ অবধি টিয়া আর পারলো না। তার চোখ ঘোলাটে লাগতে লাগলো। মাথা ঘুড়তে লাগলো। এক সময় সে সমরের কাঁধ থেকে খসে পড়ে গেল। তার দেহে প্রানটাই শুধুমাত্র রইল। শক্তি রইল না। বাকি ঘটনা টিয়া আর বিস্তারিত বলতে পারেনি সেদিন গগাবাবুকে। কারন তার আর গ্যান ছিলো না। শুধু এইটুকুই জানে সে যে সমর সেদিন তাকে পাঁজাকোলে করে প্রায় দু কিলোমিটার হেঁটেছিল ওই প্রখর রোদে। যখন টিয়ার গ্যান ফিরলো তখন দেখলো যে সে মধ্যআকাশে প্লেনে। একটা স্ট্রেচারে শুয়ে। পাশে সমর বসে। তার হাতটা সমরের হাতের মধ্যে। সমরের সমস্ত মুখটা রোদে ঝলসে লালচে হয়ে গেছে। তাকে চোখ খুলতে দেখে সমর মৃদু হেসে বলেছিল “উই মেড ইট টি”। তখনো সে জানতো না…

To be continued…

~ ফিট্‌বিট্‌ (অষ্টম পর্ব) ~

LEAVE A REPLY

*