Home Literature Poetry মহারাণী ভবশঙ্করী।

মহারাণী ভবশঙ্করী।

0

মধ্যগগনে সূর্য–একাকী নৃপতি রুদ্র রায়,

গহীন অরণ্য–তাঁহার অশ্ব মৃগ পশ্চাতে ধায়।

সহসা শ্রবণি’পশু গর্জন–থমকিয়া যায় অশ্ব,

সম্মুখ পানে হেরিলেন নৃপ ভয়ানক এক দৃশ্য।

বন্য বরাহ সংখ্যায় ছয়–হিংস্র মুখব্যাদান,

তাহাদের মাঝে কে ঐ বীরা হস্তে তীক্ষ্ণ কৃপাণ !

একক হস্তে করিলেন যিনি বিনাশ সকল অরি,

তিনি ত’ কভুই হইতে নারেন সামান্যা কোনো নারী।

ছয় বরাহের বিনাশ অন্তে তুরগ পৃষ্ঠে চড়ি,

উদ্যত অসি রণহুঙ্কারে ত্বরায় চলেন নারী।

সুন্দরী ঐ বীরাঙ্গনা ত’ নৃপের হিয়াকে জিনি’

রাজঅন্তরে পাতিলেন বুঝি প্রেমের আসন খানি।

এমত কন্যা তাঁহার রাজ্যে–কে বা হইতে পারে !

পিছেই চলেন রুদ্রপ্রতাপ–আড়ালে কিয়ৎ দূরে।

বালা চৌধুরী ভবশঙ্করী সত্যই রায়বাঘিনী,

পিতা দীননাথ রাজার দুর্গে পাচক ছিলেন তিনি।

তীরন্দাজী ও অসিচালনায় পিতার করেই দীক্ষা,

রণনীতি তথা পুঁথি কি শাস্ত্রে ছিলই বিশেষ শিক্ষা।

এমনই ছিলেন ভবশঙ্করী–যোদ্ধাও তিনি বটে,

আসিলেন রাজা তাঁহার কুটীরে সূর্য তখন পাটে।

রাজারে হেরিয়া ত্র্যস্তব্যস্ত দীননাথ সেনাপতি,

কি হেতু তাঁহার আগমন সেথা ব্যাখ্যা করেন নৃপতি।

“আসিয়াছি আমি বিশেষ কারণে হয়ত ক্ষুদ্রস্বার্থী,

ভূরিশ্রেষ্ঠ নরেশ তব কন্যার পাণিপ্রার্থী।”

আজ বাংলায় হাওড়া,হগলী–সেদিনের ভূরিশ্রেষ্ঠ,

রুদ্রপ্রতাপ নরপতি সেথা শৌর্যে একনিষ্ঠ।

তাইতো সেদিন বঙ্গবালার এহেন বীরতা হেরি,

মুগ্ধ নয়নে ভাবেন নরেশ–ইনিই যোগ্যা নারী,

করিবো যাঁহারে সহধর্মিনী–ভূরসুট প্রজায়িনী,

দেবীচণ্ডিকা সনে মহারাজ রহিলেন চিরঋণী।

কিন্তু ললনা ভবশঙ্করী–তিনি যে অসম্মত !

অসিযুদ্ধে নৃপতি তাঁহারে করিলেই পরাভূত,

তবেই রুদ্রে দিবেন মাল্য–বীরাঙ্গনার পণ,

নচেৎ বিবাহ অসম্ভবই–বিষ্মিত বুঝি রাজন।

ভীত দীননাথ ভাবিলেন এবে শিয়রে সর্বনাশ,

রাজরোষানল দুহিতারে বুঝি করিবেই এবে গ্রাস।

হাসিলেন নৃপ–কন্যাটি তব সত্যই সাহসিনী,

পুরিব তাঁহার মনস্কাম অসিযুদ্ধেই জিনি।

পরপ্রত্যুষে রাজঅঙ্গনে তীক্ষ্ণ অসির যুদ্ধ,

বীরাঙ্গনার রণকৌশলে নরপতি বাকরুদ্ধ।

তথাপি নৃপের শক্তি অসীম–বীরনারী অসিচ্যুত,

স্বয়ং রুদ্র প্রাসাদে তাঁহারে করিলেন সমাদৃত।

অবশেষে দোঁহে শুভ পরিণয়–অত্যদ্ভুত কাহিনী,

ভবশঙ্করী ভুরিশ্রেষ্ঠের হইলেন মহারাণী।

রাণীর বুদ্ধ তথা শৌর্য রুদ্রের মহাশক্তি,

সবার উপরে চণ্ডিকা মাতে দোঁহার অসীম ভক্তি,

ভূরিশ্রেষ্ঠেরে করিল অচিরে সর্বঅর্থে শ্রেষ্ঠ,

কিন্তু তাহার উত্থানে হায় গৌড় হইল রুষ্ট।

পাঠান শাসক মহাবলশালী সুলেমান কারনানী,

সাবধান করে রুদ্রপ্রতাপে–অস্ত্রের রনরনি।

বিহার ওড়িশা মিত্র শকতি রুদ্রপ্রতাপ সনে,

পরাজিত করে পাঠান নবাবে ত্রিবেণী রণাঙ্গনে।

ওড়িশা সেনানী বীর ও সাহসী রাজীব লোচন রায়,

তাঁহার হস্তে সুলেমান মানে শোচনীয় পরাজয়।

অন্যদিকে দেবী বরদানে পবিত্র তরবারি

লভিলেন রাণী যাহাতে ধ্বংস হইবে সকল অরি।

দেবী চণ্ডীর অশেষ আশীষে ভবশঙ্করী ধন্য,

গড়িলেন এক মহিলা বাহিনী ভূরিশ্রেষ্ঠের জন্য।

সৈন্যদল ও রাজদুর্গের আমূল সংস্কারে,

দিলেন বারতা–হুঁশিয়ার রহ–শত্রু দাঁড়ায়ে শিয়রে।

বাংলার বুকে অঙ্কিত আজো বীরাঙ্গনার ছবি,

বেতাই চণ্ডী নামেই এখনো আরাধিতা মহাদেবী।

রুদ্রপ্রতাপ ভবশঙ্করী দোঁহার সম্মিলনে,

বিরাজ করিত সততই সুখ ভুরসুট অঙ্গনে।

কিন্তু সহসা মেঘ ঘনঘটা–গৌড়াধিপতি নবাব

প্রতিহিংসায় মত্ত পাঠান–উন্মদ অতি স্বভাব।

ভূরিশ্রেষ্ঠকে ধ্বংস করিতে পাঠাইল সেনাপতি,

কালাপাহাড়–নাম শ্রবণেই সকলের মনে ভীতি।

পরাস্ত হায় বিহার রাজ্য–পরাভূত ওড়িশা,

তাহার সমুখে বলশালী কত নৃপতি হারান দিশা।

কালাপাহাড় ত’ নয় আর কেহ–রাজীবলোচন রায়,

সেই কিনা শেষে হায় বিধর্মী–ঐ পাঠানের সহায় !

রোষায়িতা রাণী ভবশঙ্করী–হস্তে অজেয় কৃপাণ,

কালা পাহাড়ের পরাভব আর পিছু হটে যত পাঠান।

ভবশঙ্করী তখন জননী–পুত্রটি পাঁচে সদ্য,

এহেন ক্ষণেই তাঁহার ললাটে লিখিত নিঠুর গদ্য।

শত্রুহস্তে নিহত রুদ্র–শোকার্ত মহারাণী,

সংযত হন হেরিয়া আপন শিশুর আননখানি।

তিনমাস ব্যাপী করিবেন পূজা দানধ্যান মন্দিরে,

তদপরে রাজউষ্ণীষখানি তুলিবেন নিজ শিরে।

দুর্লভ তথা চতুর্ভুজ–মন্ত্রী ও সেনাপতি,

রাজকার্যের জন্য দুজনা লভিলেন অনুমতি।

ওসমান খান তখন নবাব ছিলেন গৌড়বঙ্গে

সুবর্ণ এই সুযোগ সমীপে–হর্ষ তাঁহার তুঙ্গে।

চতুর্ভুজের বিশ্বাসঘাতে সন্দেশ লভে খান,

প্রতি সন্ধ্যায় ভবশঙ্করী দেবীর দেউলে যান।

অতএব করো আক্রমণ ঐ দেউলের চত্বর,

রাণীনিধনেই ভূরিশ্রেষ্ঠের পতন হেরিনু সত্বর।

কিন্তু গুপ্তচরের সন্দেশ লভি’সতর্ক মহারাণী,

ছদ্মবেশেই তাঁহার পার্শ্বে দুর্দম সেনাবাহিনী।

প্রমীলা এবং যুবক সৈন্য ভবশঙ্করী সনে,

কোতল করিল সহস্রাধিক পাঠানে সমুখ রণে।

দিনের আলোর মতই সত্য কে বিশ্বাসঘাতী,

কিন্তু হায়রে প্রমাণ অভাবে মুক্ত দুষ্টমতি।

দেবী মন্দিরে রাণী অভিষেক সজ্জিত রাজধানী,

চতুর্ভুজের দুষ্টবুদ্ধি–ঝলসায় শয়তানী।

একবার যে বিশ্বাসঘাতী–বারে বারে সেই বটে,

ওসমান খানে সমাচার ধায়–সুযোগ সন্নিকটে।

ভবশঙ্করী অপ্রস্তুত–করুন তাঁহারে বন্দী,

রাজসৈনিক ভিনপথে ছোটে–দুর্বৃত্তের ফন্দী।

সমরাঙ্গনে গৌড় নবাব–সঙ্গে পাঠান বাহিনী,

রচিত হইল বাংলার বুকে বীরাঙ্গনার কাহিনী।

সন্দেশ আসে অগ্রেই তাই সজ্জিত মহারাণী,

সাথে সাহসিনী প্রমীলার দল যেন অক্ষৌহিণী।

আর ছিল শত তীরন্দাজী বাগরী ও চণ্ডাল,

সবার দাপটে শত্রুসৈন্য–বুঝি অন্তিম কাল।

হস্তে কামান রুদ্র অগ্নি–সঙ্গে অজেয় কৃপাণ,

ভবশঙ্করী যেন মা দুর্গা–ছত্রভঙ্গ পাঠান।

বিশ্বাসঘাতী চতুর্ভুজের শিয়রে অমোঘ শমন,

ফকিরের বেশে ওসমান খান করে একা পলায়ন।

দিল্লী তখন মুঘল অধীনে–আকবর মহামতি,

নজর তাঁহারো ছিল অবশ্য ভূরিশ্রেষ্ঠের প্রতি।

কিন্তু বীর ললনার কাহিনী শ্রবণে আকবর বাকরুদ্ধ,

ভূরিশ্রেষ্ঠের সঙ্গে মুঘল কখনো করেনি যুদ্ধ।

পুত্রটি যবে হয় সাবালক তাঁহারে সঁপিয়া রাজ্য,

ভবশঙ্করী কহেন সবারে-“সমাপ্ত মোর কার্য।

চলিলাম এবে বাণপ্রস্থে–জীবনের শেষ অংক

রচিব এখনে কাশীধামে আমি বাজায়ে অমল শঙ্খ।

আজো বুঝি ভাসে আকাশেবাতাসে বীরাঙ্গনার গাথা,

ইতিহাস দেয় যাহার সাক্ষ্য–কর সন্ধান সেথা।

ষোড়শ শতকে বাংলারই বুকে এহেন ঘটনা দৃষ্ট,

গঙ্গার তীরে ত্রিবেণী অধুনা অতীতের ভূরিশ্রেষ্ঠ।

 

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
wpDiscuz
0
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x
Exit mobile version