আজ আবার রঞ্জনা চিঠিটা নিয়ে দৌড়ে এসে সুহৃদের হাতে দিয়ে বলে “পড়ে দেখ, নিশ্চয় কোন ভালো খবর আছে।” রঞ্জনা যতই আশাবাদী হোক, সুহৃদ কিন্তু আর কোন উৎসাহ পায় না ওর কথায়। সুহৃদের বিষণ্ণ মুখটার দিকে তাকিয়ে রঞ্জনা বলে “তুমি কিন্তু এবার থেকে আর কখনও অমন নেগেটিভ কথা বলবে না, বা ভাববেও না। একটা ভুলের জন্য সবকিছু শেষ হয়ে যেতে পারে না। গত একবছর ধরে আমাদের সংসারটা রক্ষার জন্য যেভাবে তুমি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছ, তা কি কখনও বিফলে যেতে পারে সুহৃদ? নিজের যোগ্যতায় একদিন তুমি অবশ্যই আবার মাথা তুলে দাঁড়াবে।এটা আমার বিশ্বাস, আর এটা আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল। তাড়াতাড়ি চিঠিটা পড়ে দেখ কি জানালো ওরা, আমি রান্নাটা বসিয়ে আসছি।”

কি হবে অযথা চিঠিটা পড়ে? সব চিঠির সারমর্মই তোসেই এক – বিনয়ের সাথে দুঃখপ্রকাশ করে জানানো যে তার চাকরীর আবেদন সফল হয় নি, তবে ওঁরা সকলেই সুহৃদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের সফলতা কামনা করেন। কিন্তু একবছরধরে বিভিন্ন কোম্পানি থেকে এইভাবে প্রত্যাখ্যাত হবার পর, কর্মজীবনে আবার ফিরে যাবার আশা কোথায়? তবু মনে হয়, আরেকটা সুযোগ কি সে পেতে পারে না জীবনে? ভুল হয়তো একটা হয়েছে কিন্তু অন্যায় তো সে কিছু করেনি, তবে কেন সেই নির্বুদ্ধিতার মাশুল তাকে দিয়ে চলতে হবে এইভাবে? এতো প্রিয় বন্ধু দেবাশিসের সাথে একটা সামান্য আলোচনার ফলে কেন ভেসে যাবে ওদের সংসারটা? ওরাতো শুধু ছোটবেলার বন্ধু নয়, চার বছর একই অফিসে চাকরি করেছে। একসাথে কাজ, একসাথে ওঠা-বসা, এমনকি সন্ধেবেলায় পার্ক স্ট্রীটে ঝাল মুড়ি খেতে খেতে একসাথে অফিস থেকে বাড়িফেরা। কত গল্পই তো হত ওদের মধ্যে, কিন্তু গল্পের মধ্যে বলে ফেলা সুহৃদের ওই কথাটা বসের কানে তুলে দেবার আগে একবারওকি মনে হল না যে সেটা কি বিপদ ডেকে আনতে পারে সুহৃদের জীবনে? সে তো কখনও দেবাশিসকে প্রতিদ্বন্দ্বী বলে ভাবে নি, বরং বন্ধু হিসেবে সবরকম সাহায্য করেছিল। ওর বিয়েতে যখন অফিসের লোণটা মঞ্জুর হল না, সুহৃদ নিজের সঞ্চয়ের সমস্ত টাকা তুলে দিয়ে বলেছিল “আমি থাকতে তোর টাকা নিয়ে কিসের চিন্তা?” শুধু টাকা কেন, দেবাশিসের বাবার অসুখের সময় দিনের পর দিনহাসপাতালে থাকা থেকে শুরু নিজের রক্ত দেওয়া পর্যন্ত কখনও এতটুকু দ্বিধা করেনি। অথচ সুহৃদকে বিপদে ফেলে নিজে প্রোমোশনটা বাগানোর জন্য সোজা গিয়ে বসকে জানিয়ে দেয় যে সুহৃদ নাকি রটিয়ে বেড়াচ্ছে যে তাদের কোম্পানি গত বছর বহু টাকা ইনকাম ট্যাক্স ফাঁকি দিয়েছে, যা কোম্পানির পক্ষে বিপদজনক হয়ে উঠতে পারে ভেবে ম্যানেজমেন্ট তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেয় সুহৃদকে চাকরী থেকে সরিয়ে দেওয়ার।

“ওমা! সেই থেকে চিঠিটা হাতে নিয়েই বসে আছো, এখনও পড়ে দেখো নি? কথায় আছে বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, অথচ সেই বিশ্বাসটাই কেন তুমি হারিয়ে ফেলেছ সুহৃদ?” বিমর্ষ সুহৃদের হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে খোলা মাত্রই লাফিয়ে ওঠে রঞ্জনা, দুহাতের মুঠি শক্ত করে আকাশের দিকে ছুঁড়ে বলে ওঠে “আমি জানতাম সুহৃদ, তুমি ঠিক পারবে। অথচ এই সামান্য কথাটা কেন যে তোমাকে বোঝাতে পারছিলাম না? পড়ে দেখো, এতো নামী কোম্পানির এসিস্ট্যান্ট সেলসম্যানেজারের পোস্ট, আর সাথে কত টাকা মাইনে।উফ, আমার যে কি আনন্দ হচ্ছে, আর ঠিক দশদিন পর তুমি আবার অফিস যাবে। তোমার জামা-প্যান্ট গুলো ইস্ত্রি করে গুছিয়ে রাখতে হবে। আর হ্যাঁ, ধুলো মেখে ব্রিফকেসটার যা অবস্থা, ওটা আমি পরিষ্কার করে দেবো।”

~~~~

প্রথম দিনেই সাজানো সুন্দর অফিসটা ভীষণ ভালো লেগে গেছে সুহৃদের। দুটো তলা মিলিয়ে প্রায় চল্লিশ জন মতো কাজ করে এই কলকাতা অফিসে। সুহৃদকে কাজ করতে হবে সেলস ম্যানেজার মানস গুপ্তর অধীনে, আর এই অফিসের সর্বোচ্চ কর্তৃত্বে আছেন জেনারেল ম্যানেজার মিঃ সম্রাট সরকার। ফর্সা এবং সুন্দর চেহারা সরকার সাহেবকে দেখে মনে হয় উনি বেশ রাশভারী মানুষ এবং অফিসের সকলেই ওনাকে বেশ সমীহ করে চলে। প্রথম সাক্ষাতে সুহৃদকে বলেছেন “কাজের ব্যাপারটা মানস তোমাকে সব বুঝিয়ে দেবে, তবে মনে রেখো চাকরীতে সফল হতে গেলে কঠিন পরিশ্রম ছাড়াও প্রয়োজন ম্যানেজমেন্টের নির্দেশ পালন।”

মিঃ গুপ্ত বেশ সাদাসিধে মানুষ, তবে ভীষণ স্পষ্টবক্তা। অফিসের কাজে উনি খুবই দক্ষ, প্রতিটা কাজ নিজে খুঁটিয়ে দেখেন। তাঁর মধ্যে লক্ষ্য করার মত গুন হচ্ছে প্রতিটা কাজকে প্রথমে সুন্দর ভাবে ছকে নেওয়া এবং তারপর সেগুলো সময়মত এক এক করে শেষ করা। কোনও কাজ উনি যেমন অসমাপ্ত রাখেন না, তেমনি কাজটা যথাযথ না হওয়া পর্যন্ত ছাড়েন না। সুহৃদ মাঝেমধ্যে কোন ভুল করলে শুধরে দিয়ে বলেন “তুমি যদি কাজ সঠিকভাবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করতে পার, তোমার চাকরী কেউ খেতে পারবে না। তবে হ্যাঁ, চোখটা কিন্তু খোলা রেখো।” দেখে অবাক লাগে যে যতই কাজের চাপ থাক, উনি কিন্তু ঘড়ির কাঁটা লম্বা হয়ে ছয়ের ঘরে ঢোকা মাত্রই অফিস থেকে সটান বেরিয়ে পড়েন। সুহৃদের দিকে চেয়ে হেসে বলেন “দেখো ভায়া, কোম্পানি মাইনে দেয় আট ঘণ্টা কাজ করার জন্য, তাহলে বাকি সময়টা আমার নিজের মতো করে কাটানো কি উচিত নয়। রাত পর্যন্ত অফিসে বসে থাকে যতসব অযোগ্য লোকের দল, আর কাজের ভণিতায় চেষ্টা করে সাহেবকে খুশী করতে। চাইলে তুমিও ওই দলে ঢুকতে পার, তবে আমার উপদেশ নিলে তৈলমর্দনের আগে সরকারকে একটু ভাল করে চিনে নেওয়া প্রয়োজন। যতক্ষণ তোমাকে দরকার, ততক্ষণ থাকবে সরকার। বিপাকে পড়লে কখন যে সটকে যাবে তা তুমি তুমি বুঝতেই পারবে না।”

গত একবছরের প্রতীক্ষার ফল এই চাকরীটা, এর মধ্যে সুহৃদের জীবনে বয়ে গেছে কত ঝড়ঝাপটা। কখনও মনে হয়েছে যে কি লাভ এভাবে বেঁচে থেকে? কিন্তু ছোট্ট সুরঞ্জনার কথা ভেবে বাধ্য হয়েছে মনকে আরও শক্ত করতে। সেই সময় রঞ্জনা যদি তার সেই দৃঢ় বিশ্বাসকে আঁকরে ধরে সুহৃদের পাশে না দাঁড়াত, এতদিনে হয়তো খড়কুটোর মতো ভেসে যেত ওদের সংসারটা। মানস গুপ্তর কথাগুলো যুক্তিসঙ্গত মনে হলেও জীবনে আর কোন ভুলের দরুন চাকরীতে ঝুঁকি নিতে চায়না সুহৃদ। আপাতত সরকার সাহেবকে তুষ্ট করে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।

অফিসে কাজের চাপ বেড়েই চলেছে। সমস্ত পূর্ব ভারতের মার্কেটিংটা হয় এই কলকাতা অফিস থেকে, অথচ তুলনায় লোকসংখ্যা কম থাকার দরুন কাজের চাপ বেশ ভালই। তাছাড়া ঠিকমত কাজ করার লোক তো মাত্র কয়েকজন। একদল লোক তো দিনের অর্ধেকটা সময় কাটায় ক্রিকেট, পলিটিক্স, সিনেমা ইত্যাদি নিয়ে, আর বাকি সময়টা কাটে সাহেবের মোসাহেবি করে– অফিসের কাজ করার সময় কোথায়? অন্যদিকে মহিলাদের গল্পের অফুরন্ত ভাণ্ডার, ফলে কোনও কাজই করানোই যায় না তাদের দিয়ে। কাজের কথা বললেই একরাশ বিরক্তি ভরে জবাব “অফিসের সমস্ত কাজ কি আমি একাই করবো নাকি? সাহেব বলে দিয়েছেন যে ওনার এই জরুরী কাজগুলো শেষ করার আগে অন্য কাজে হাত না দিতে।”কৌতূহল বসে ভদ্রমহিলার কম্প্যুটারে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সাহেবের ছেলের স্কুলের হোম ওয়ার্ক টাইপ হতে দেখামাত্র অবাক হয়ে যায় সুহৃদ। তার কাজটা আজকের মধ্যে শেষ করতে না পারলে যে এমাসের মাইনেটাই দেরী হয়ে যাবে তা বোঝানোর চেষ্টা করা মাত্র এমন মুখ ঝামটা এসে পড়ে যে গত্যন্তর না দেখে নিজেই বসে পরে চোদ্দ পাতার ওই রিপোর্টটা টাইপ করতে।

এইসব লোকগুলো অফিসের কাজ ঠিকমতো না করলে কি হবে, সরকার সাহেবের সাথে এদের বেশ ভালোই সম্পর্ক, কারণ সাহেবের নিজস্ব কাজগুলো এরা বেশ যত্নসহকারে করে। সকাল থেকেই ঘুরঘুর শুরু হয়ে যায় সাহেবের আশপাশে, অর্ডার পাওয়া মাত্রই ব্যাগ বগলে নিয়ে সেদিনের মতো অফিস থেকে বেরিয়ে পরে সাহেবের বাড়ির ট্যাক্সের বিল জমা থেকে শুরু করে ছেলের ক্রিকেটের ব্যাট কেনা ইত্যাদির জন্য। শুধু কাজে ফাঁকি নয়, সাথে ট্যাক্সি বিল, লাঞ্চ বিল বাবদ কামাই ভালোই হয়।

সরকার সাহেব বেশ মজাদার মানুষ। মাঝে মাঝেই ঘর থেকে বেরিয়ে মহিলাদের সাথে জুড়ে দেন খোস গল্প, হাসি-ঠাট্টা। মহিলারাও সাহেবের সাথে গল্প করতে পারলে এমন আহ্লাদিত হয় যে মনে হয় সাহেব তাদের ভীষণ প্রিয়। সামনে এসে দাঁড়ালেই চলতে থাকে মহিলাদের স্তাবকতা “আপনাকে কিন্তু স্যার ভীষণ স্মার্ট লাগছে আজ। স্যুটের সাথে টাইটা যা মানিয়েছে না?”,“গতকাল আপনার নতুন গাড়িটা দেখলাম–ওফ্‌, দারুণ কালারটা। কবে খাওয়াবেন বলুন তো?”,“এই সেন্টের গন্ধটা আমার ভীষণ প্রিয়, এটা কি ফ্রেঞ্চ না ইটালিয়ান?”। অনর্গল এইসব স্তোকবাক্য সাহেবও বেশ উপভোগ করেন, আর নানান মজার কথা বলে মহিলাদের পিঠ চাপড়ে দেওয়ার সাথে হাসির রোল ওঠে। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার যে সামনে এতো উল্লসিত দেখালেও আড়ালে কিন্তু মহিলাদের মধ্যে চলে নানান কটূক্তি। ওদের ইঙ্গিতে সুহৃদ বুঝতে পারে সাহেবের সাথে ওনার সেক্রেটারি স্নেহা ভাটিয়ার ঘনিষ্ঠতা একটু বেশী, তবে তা নিয়ে লোকজনের এতো যে কি চর্চা করার আছে তা বুঝতে পারে না সে।

স্নেহা ম্যাডাম বেশ স্মার্ট এবং সরকার সাহেব ছাড়া অন্য কাউকে তোয়াক্কা করেন না। বিশেষত অন্য মহিলারা তো ওনাকে বেশ সমঝে চলে, যদিও আড়ালে ওনাকে নিয়ে চলে বেশ রসালো গল্প। তবে ম্যাডাম সাহেবের ঘরে ঢুকলে যে অন্য কারও সেখানে যাওয়া উচিত নয়, এমন একটা অলিখিত নিয়ম মনে হয় অফিসের লোকেদেরই সৃষ্টি, তা না হলে সেদিন ওই জরুরী কাগজটা সই করানোর জন্য সাহেবের ঘরের দিকে যেতে সবাই এমন আঁতকে উঠলো কেন? ঘরে ঢোকামাত্র সাহেব তো বেশ হেসেই বললেন “এসো সুহৃদ। কি খাবে চা, না কফি?” স্নেহা ম্যাডাম মুচকি হেসে বলে “আমাদের দুজনেরই কিন্তু ব্ল্যাক কফি। আপনি কি নেবেন?” সুহৃদ সাহেবকে দিয়ে কাগজটা সই করিয়ে বেরোনো মাত্র সবাই কেমন যেন অদ্ভুত ভাবে তাকাচ্ছিল তার দিকে। একজন বলেই বসলো “নতুন এসেছেন, নিয়মকানুন গুলো আগে জেনে নেওয়া উচিত ছিল। যাই হোক, সব ঠিক আছে তো?” কিছুটা নির্বোধের মতো উত্তর দেয় সুহৃদ “ঠিক না থাকার কি আছে ? একটা তো মাত্র সই করাতে গিয়েছিলাম।”

হারানোর ভয়

অফিসের কাজে এখন অনেকটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে সুহৃদ, বুঝে গেছে কাজের ধরনধারণ। মনে হচ্ছে মানস গুপ্তর সাথে সাহেবের কোনও একটা ব্যাপারে বিরোধ চলছে। কেন যে উনি আজকাল সাহেবের কথা না মেনে তর্ক জুড়ে দেন, একটু মানিয়ে চললে তো আর এতো সমস্যা হয় না। তবে আজকাল মিঃ গুপ্তকে বেশ চিন্তিত মনে হয়, সেদিন তো সুহৃদকে কাছে পেয়ে বেশ উত্তেজিত হয়ে বলে ওঠেন “সাহেব যদি ভেবে থাকেন যে আমি ম্যাডামের অর্ডার মাফিক কাজ করবো, তাহলে উনি মানস গুপ্তকে এখনও চেনেন নি। আমার পেছনে লাগলে ফল পেতেই হবে ওনাকে।” মিঃ গুপ্তকে এতটা বিচলিত দেখে খারাপ লাগলেও কিছু তো করার নেই সুহৃদের। কদিন আগেও যার পরামর্শ ছাড়া কোনও কাজই করতো না সে, তাকে বাদ দিয়ে সরকার সাহেব এখন সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ সোজাসুজি সুহৃদকে দিয়ে বলছেন “তুমি আজকাল বেশ ভালই কাজ করছো। আমি চাই এই কাজগুলো মানসের বদলে তুমি কর।” সুহৃদের প্রতিক্রিয়া বুঝতে পেরে নিজেই বলে ওঠেন “জানো তো বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরী করার ঝক্কি কত। আমার কথামতো কাজ করে দেখো তোমাকে কোথায় পৌঁছে দিই। তবে ম্যানেজমেন্টের প্রত্যাশাপূরণ করতে না পারলে জানোই তো ………।” এর মধ্যে আবার একদিন সাহেব ডেকে বললেন “মানস সব কাজ ঠিক সামলে উঠতে পারছে না, তাছাড়া ওর নিজেরও অনেকরকম সমস্যা আছে। এবার থেকে তুমি পুরো আসামের মার্কেটটা দেখা শুরু কর।” সুহৃদকেএকটু ইতস্তত করতে দেখে বলেন “তোমার ভালোর জন্যই আমার ইচ্ছে এই কাজটা তুমি কর। আমি চাই তুমি এই কোম্পানিতে অনেক উন্নতি কর। ইতিমধ্যে তোমার জন্য আমি ঢালাও প্রশংসা করে হেড অফিসে পাঠিয়ে দিয়েছি। ভালোভাবে যদি কাজ চালিয়ে যাও, সামনে বছর তোমার সেলস ম্যানেজারের প্রোমোশনটা আটকাবে না।” সুহৃদ বলার চেষ্টা করে “কিন্তু ওই পজিশনে তো মিঃ গুপ্ত………।” কথা শেষ হওয়ার আগে সরকার সাহেব বলে ওঠেন “নিজের ভবিষ্যতের কথা ভাবো, মানসের ব্যাপারটা আমি দেখে নেব। ও! আর একটা দারুণখবর জানিয়ে রাখি। সামনের বছর থেকে বাড়ি এবং গাড়ির লোণ শুরু হচ্ছে আমাদের কোম্পানিতে। অনেক লড়াই করে টপ্‌ ম্যানেজমেন্টকে রাজি করিয়েছি -একদম সুদ বিহীন লোণ, তবে শুধু ম্যানেজারদের জন্য। প্রোমোশনটা হলেই আবেদনটা আমাকে পাঠিয়ে দিও।”

কাজ যেন ক্রমশ অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে ধরছে সুহৃদকে। আজকাল আর কাজের থেকে মাথা তোলার সময় পায় না সে, রাত দশটার পর যখন বাড়ি ফেরে,মেয়েটা ততক্ষণে রঞ্জনার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পরে। খেতে বসে চলতে থাকে রঞ্জনার নানা কথা, আর সুহৃদের মাথায় তখন ঘুরতে থাকে পরের দিন টেন্ডার জমা দেবার হাজারো ফিরিস্তি। একসময় বিরক্ত হয়ে রঞ্জনা বলে ওঠে “মেয়েটাকে তো সারাদিনে একটুও পাওনা, ওর গল্পও কি শুনতে ইচ্ছে করে না? সুরঞ্জনাতো তোমারও মেয়ে সুহৃদ, একবারও জানতে ইচ্ছে করে না যে সারাটাদিন ও কি করে, কি খায়? মেয়ে কিন্তু মাঝে মাঝেই তোমার কথা বলে, ‘বাবা কখন আসবে? কখন বাবার সাথে খেলবো?” সুহৃদকে চুপ করে থাকতে দেখে রঞ্জনা আবার বলে ওঠে “জানো তো মেয়েটা বইতে জন্তু-জানোয়ারের ছবি দেখে এমন করছিল যে আমি বলেছি ওকে চিড়িয়াখানা নিয়ে যাব। এই শোনো, কালকে একটা ছুটি নেবে? এই চাকরীতে তো এখনওএকদিনও ছুটি নাও নি। কাল একটা সিক্‌ লিভ নিয়ে নাও, মানুষ তো অসুস্থও হতে পারে নাকি? তাছাড়া, তুমি ছুটি নিলে নিশ্চয় অফিসটা বন্ধ হয়ে যাবে না?“ অসহায়ের মতো রঞ্জনার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দেয় যে ছুটি নেওয়া সম্ভব নয় সুহৃদের, আর রঞ্জনাও বুঝে যায় বৃথাই তার চেষ্টা।

দুদিন হল মানস গুপ্ত অফিসে আসছেন না। এসেই বা কি করবেন, ওনাকে তো আর কোনও কাজই দিচ্ছেন না সরকার সাহেব। গতকাল সুহৃদকে ডেকে সাহেব বলেছিলেন মানস গুপ্তর সব ফাইলগুলো ওনার ঘরে দিয়ে আসতে, কারণ মিঃ গুপ্তর ওই আলমারির ডুপ্লিকেট চাবি কেবল সুহৃদের কাছেই থাকে। তখনই সুহৃদের মনে হয়েছিল যে এর পেছনে সাহেবের কোনও অভিসন্ধি আছে। আজ মিঃ গুপ্ত অফিসে ঢোকামাত্রই তলব পরেছে সাহেবের ঘরে, তারপর থেকে শোনা যাচ্ছে দুজনের মধ্যে চিৎকার করে কথা বলার শব্দ। মাঝে মাঝে স্নেহা ম্যাডামের গলার আওয়াজও আসছে ঘর থেকে। বাইরে তখন সকলেই কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করে চলেছে। ঘন্টাখানেক পর মিঃ গুপ্ত আচমকা দরজা খুলে বেরিয়ে আসেন, তার দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে সুহৃদ। কি এমন ব্যাপার ঘটে গেল এর মধ্যে যে ওনার মুখটা টকটকে লাল, উত্তেজনায় সারা শরীর কাঁপছে থরথর করে? সুহৃদ বুঝতে পারে না এখন তার কি করা উচিত। মিঃ গুপ্ত নিজের জায়গায় এগিয়ে গিয়ে তাঁর সেই ছোট কালো ব্যাগটা গুছোতে থাকেন। সুহৃদকে ধীর পায়ে এগিয়ে আসতে দেখে বলেন “আমি জানি যে আমার ফাইল থেকে কাগজটা তুমি সরাওনি, কিন্তু মনে রেখো যে অন্যায় যে সহে সেও সমান অপরাধী।”

পরে জানা যায় যে অফিস ট্যুরের নামে স্নেহা ম্যাডামের সাথে সাহেবের কোম্পানির খরচে সিমলা যাবার খবরটা মানস গুপ্ত নাকি হেড অফিসে রটিয়ে দিয়েছিলেন, আর সেই থেকে সাহেব প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে ওঠেন, শুরু করে দেন মিঃ গুপ্তকে তাড়ানোর চক্রান্ত। সেদিন মিঃ গুপ্তর ফাইল থেকে ওই কাগজটা সরিয়ে দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন যে উনি একটা বড় টেন্ডারের অত্যন্ত গোপন তথ্য অন্য কোম্পানিকে ফাঁস করে দিয়েছেন। তাই কোম্পানির নিয়ম লঙ্ঘন করার জন্য মিঃ গুপ্তকে দুঘণ্টার মধ্যে ইস্তফা দিয়ে অফিস ছেড়ে যেতে বলা হয়। সেই থেকেই সুহৃদকে সামলাতে হচ্ছে সেলস ম্যানেজারের সমস্ত কাজ, ফলে তার অবস্থা আরও করুণ। সংসারটা যে কি ভাবে চলছে, কেমন ভাবে হচ্ছে বাজার, দোকানপাট, এমনকি বর্ধমানে অসুস্থ বাবা-মা কেমন আছেন সেসব খবর রাখার কোনও ফুরসত নেই সুহৃদের।

মানস গুপ্ত চলে যাবার পর থেকে সাহেবের ভাবগতিক বদলাতে শুরু করেছে। সারাদিন এইভাবে মুখ বুজে কাজ করা সত্ত্বেও সামান্য এদিক থেকে ওদিক হলেই এমন খারাপ ব্যাবহার করেন যে মেনে নেওয়া যায় না। অথচ প্রয়োজন পড়লে পিঠে হাত রেখে কত ভালো ভালো কথা “কেমন চলছে অফিসের কাজকর্ম? কোনও অসুবিধে হলে আমাকে বলবে কিন্তু। বাড়ির সকলের খবর ভালো তো? তোমার কথা আমার মাথায় রয়েছে, যে ভাবে হোক সামনে বছর তোমার প্রোমোশনটা করাবোই।”

আজ সকালে অফিসে ঢোকামাত্রই সাহেবের ঘরে জরুরী তলব। সুহৃদকে ঘরে বসিয়ে সাহেব বলেন “ব্রহ্মদেশ, অর্থাৎ মায়ানমারের একটি কোম্পানি পাঁচহাজার ওয়াটার পিউরিফায়ার কিনবে, অর্থাৎ বিশাল অর্ডার। ওদের কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার মিঃ আউং লিন বিভিন্ন কোম্পানি ভিজিট করে কেবল দুই থেকে তিনটে কোম্পানিকে বাছাই করবেন।আমাদের হেড অফিস তাকিয়ে আছে কলকাতা অফিসের দিকে এই অর্ডারটা ধরার জন্য। এই অর্ডারটা পেলে আমাদের ভাগ্যই বদলে যাবে, তবে অর্ডারটা ধরতে না পারলে কিন্তু আমাদের চাকরী নিয়ে টানাটানি পড়তে পারে। তাই তোমাকে কোমর বেঁধে মাঠে নামতে হবে, যে ভাবে হোক এই অর্ডারটা তোমাকে আনতেই হবে। সামনের সোমবার মিঃ লিন কলকাতায় আসছেন দুদিনের জন্য, কিন্তু দুঃখের বিষয় ওই সময় আমি একটা জরুরী মিটিঙে কলকাতার বাইরে থাকবো। উনি আমাদের অফিসটা ঘুরে দেখে, স্টাফদের সাথে কথা বলে যদি সন্তুষ্ট হন, তবেই আমাদের নামটা সুপারিশ করবেন। সুতরাং তোমাকে সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে মিঃ লিনকে ওই দুদিন ভালো করে খাতির যত্ন করতে হবে। প্রথমে আমাদের কোম্পানি এবং প্রোডাক্ট নিয়ে কয়েকটা ভালো স্লাইড দেখিয়ে তারপর ওনার পছন্দমত খাওয়া-পিনা, নাচ-গান, ফুর্তি – যেমনটি চাইবেন ঠিক তেমন ব্যবস্থা করে দিও। খরচের জন্য কোনও চিন্তা করো না, তোমার যত টাকা দরকার তুমি অফিস থেকে তুলে নিও, কিন্তু অর্ডারটা আমার চাইইই। ও হ্যাঁ, অফিসটা কিন্তু বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করিয়ে রেখো, আর সবাইকে বলে দাও যে ওই দুদিন যেন ভালো ড্রেস করে অফিসে আসে, আর মেয়েরা একটু ইয়ে, মানে চটকদার ড্রেস করে এলে ভালো হয়। আমাদের ওই নতুন মেয়েটার নাম তো বোধহয়য় ঊর্মি,ওকে সঙ্গে নিতে পারো কারন মেয়েটাকে বেশস্মার্ট বলেই মনে হয়।”

সকালে এয়ারপোর্ট থেকে মিঃ লিনকে সঙ্গে নিয়ে অফিসে এসেছে সুহৃদ। সাহেব অফিসে নেই, এমনকি স্নেহা ম্যাডামও নাকি সাহেবের সাথে দিল্লী গেছে, তাই একা সবকিছু সামলাতে হবে ভেবে বেশ নার্ভাস লাগছে সুহৃদের। শনি-রবিবার প্রায় সারারাত জেগে পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশনটা বেশ ভেবেচিন্তে বানিয়েছে সুহৃদ, যাতে ওটা দেখে মিঃ লিনের বেশ উচ্চ ধারণা হয় ওদের কোম্পানি সম্মন্ধে। যদিও সব তথ্য এবং পরিসংখ্যান সঠিকভাবে দেখানো হয়নি, তবে সেলস প্রেজেন্টেশনে তো এইটুকু কারচুপি তো করতেই হয়। এমন গুরুত্বপূর্ণ একটা অর্ডারের ক্ষেত্রে তো আর মানস গুপ্তর মতো সত্যবাদের ঝুঁকি নিতে পারে না সুহৃদ, বিশেষত সরকার সাহেব যখন ভরসা করে সম্পূর্ণ দায়িত্ব সুহৃদকে দিয়েছেন।

সারাদিন ধরে মিটিং, মিঃ লিনের নানান কঠিন প্রশ্নের জবাব দেওয়া, তাঁকে অফিসের সমস্তকিছু ঘুরিয়ে দেখানো সেরে ক্লান্তিতে শরীর যেন আর দিচ্ছে না সুহৃদের। ঊর্মি অবশ্য আজ সারাদিনই সুহৃদকে নানাভাবে সাহায্য করেছে। গত দুদিন ঠিকমতো ঘুম নেই, সাথে নানানচিন্তায় শরীর এতটাই কাহিল যে আজ আর মিঃ লিনকে ডিনারে নিয়ে যাবার মতো অবস্থা নেই তার, তাছাড়া ঊর্মিও রাজি হল না অফিসের পরে থাকতে। ঠিক করেছে আগামীকালমিঃ লিনকে শহর কলকাতার দ্রষ্টব্য স্থানগুলো ঘুরিয়ে দেখাবে, এছাড়া খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে শপিং সবকিছু কাল হবে, কারন ওই ব্যাপারটা ঊর্মি ভালোই সামলে দেবে।

মিঃ লিনকে হোটেলে নামিয়ে গাড়িতে শরীরটা এলিয়ে দেয় সুহৃদ। দুশ্চিন্তা যেন ছাড়ছে না,যদি সে না পারে সাহেবের প্রত্যাশা পূরণ করতে? শুধু প্রোমোশনের জন্য তো নয়, এই মুহূর্তে চাকরীটা বাঁচানোই তো সবথেকে বড় চিন্তা। এদিকে হোটেলে ফেরার সময় মিঃ লিন বললেন কাল একটা ভালো স্যাম্পল যেন ওনার হোটেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এই মুহূর্তে কলকাতা অফিসে মাত্র দুটো স্যাম্পল আছে,সুহৃদ ভাবতে থাকে কোনটা ওনাকে দেওয়া ঠিক হবে।

হঠাৎ মোবাইলে বেজে ওঠে সাহেবের ফোন “মিঃ লিনের সাথে মিটিং কেমন হল সুহৃদ? ওনার ঠিকমতো দেখভাল করছো তো, মানে উনি যা চান তার সব ব্যবস্থা হয়েছে? কালকের জন্য কি ব্যবস্থা………..।” সাহেবকে থামিয়ে সুহৃদ তড়িঘড়ি উত্তর দেয় “হ্যাঁ স্যার, সব ঠিক আছে। আজ সারাদিন ওনাকে আমাদের অফিস দেখিয়েছি, আমাদের কোম্পানি এবং প্রোডাক্ট নিয়ে সমস্ত বুঝিয়ে বলেছি। দেখে মনে হয় উনি বেশ সন্তুষ্ট। কাল ঠিক করেছি ওনাকে কলকাতাটা ঘুরিয়ে দেখাব, তারপর সোনার বাংলায় খেয়ে বাকি সময়টা শপিং……।” এবার সরকার সাহেব রেগে বলে ওঠেন “তুমি যে কি বলছ আমি তার কিছুই বুঝতে পারছি না সুহৃদ। একটু আগে ফোনে ওনার কাছ থেকে জানলাম যে মিঃ লিন তোমাকে হোটেলে একটা ভালো স্যাম্পল পাঠানোর কথা বলেছেন, আর তুমি কিনা ঘুরে বেড়ানোর কথা ভাবছো?” সুহৃদ এবার বলে ওঠে “কোনও চিন্তা করবেন না স্যার। আমাদের অফিসের সবথেকে ভালো স্যাম্পলটা পাঠিয়ে দেব ওনার কাছে।” সরকার সাহেব এবার অবাক হয়ে বলেন “আমাদের অফিসে ভালো স্যাম্পল কোথায় দেখলে ভাই? আগে যে দু’একজন ছিল, এখন কি আর তাদের সেই বয়স আছে? তবে ওই ঊর্মির ব্যাপারে অবশ্য আমার কিছু জানা নেই।” এবার সুহৃদ ঘাবড়ে যায় “নামানে…… আমি স্যার অফিসে রাখা ওই স্যাম্পল ওয়াটার পিউরিফায়ারটার কথা বলছিলাম, ওটা তো ক্লায়েন্টদের দেখানোর জন্যই আনা হয়েছিল।” সুহৃদের কথা শুনে সরকার সাহেব এবার রাগে ফেটে পড়েন “মাই ফুট! এই বুদ্ধি নিয়ে পিউরিফায়ার তো দুরের কথা, তুমিপান-বিড়িও বেচতে পারবে না। এতো করে তোমাকে বুঝিয়ে বললাম যেভাবে হোক মিঃ লিনকে খুশী করতেই হবে, আর তুমি কিনা ভাবলে যে উনি তোমাকে হোটেলে ওয়াটার পিউরিফায়ার পাঠানোর কথা বলেছেন? একজন ক্লায়েন্ট যখন প্রকাশ্যে একটা ‘ভালো স্যাম্পল’ চাইছেন, ইজ ইট নট এনাফ ইন্ডিকেশন সুহৃদ, না মাথায় এতটাই গোবর ঠাসা যে এই সাধারণ কথাটা বোঝার মতো ক্ষমতাও নেই তোমার? ক্লায়েন্টের চাহিদা পূরণ করা কি তোমার ডিউটির মধ্যে পরে না? এখনও পর্যন্ত কি সার্ভিস দিয়েছ ওনাকে যে উনি আমাদের এতবড় অর্ডার দেবেন?”

মনে হচ্ছে বাকশক্তি লোপ পেয়েছে সুহৃদের। শীতের রাতে বাইপাস দিয়ে ছুটন্ত গাড়িতে বসেও ঘামতে শুরু করেছে সে, নাক-মুখ দিয়ে যেন গরম হাওয়া বেরোচ্ছে। একটু থেমে থেকে সাহেব আবার বলে ওঠেন “অর্ডারটা যদি হাত ছাড়া হয়, আই উইল থ্রো ইউ আউট অফ আওয়ার কোম্পানি। এখনও সময় আছে, যদি ভালো চাও তো আমি যা বলছি এখুনি তার ব্যবস্থা কর। একটা ফোন নাম্বার বলছি, আগে লিখে নাও। এই নাম্বারে ফোন করে আমার কথা বললে সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে।তবে হোটেলের নাম আর সময়টা ঠিক মতো বলে দিও, তোমার তো আবার মাথায়……?”

বিস্ময় যেন এখনও কাটছে না, কিছুতেই সুহৃদ ভাবতে পারে না যে মিঃ লিনের মতো অমন একজন বয়স্ক রাশভারী মানুষ এমন কোনও ইঙ্গিত করতে পারেন। সত্যি তো, সরকার সাহেবের কত অভিজ্ঞতা, আর তাই একটামাত্র কথায় উনি সব বুঝে গেছেন। তাই আর কিছু না ভেবে নাম্বারটা ডায়ালকরে সুহৃদ, কিন্তু একি! এতো বলছে ‘নাম্বার ইজ নট রিচেবল।’ বারবার চেষ্টা করতে থাকে সুহৃদ, কিন্তু সেই একই উত্তর। এবার বেশ ভয় করছে তার। এমন অবস্থার সম্মুখীন তো সে কখনও হয় নি, তাছাড়া এব্যাপারে কোনও অভিজ্ঞতাও নেই তার। কোনও উপায় না দেখে সাহেবের নাম্বারটা ডায়াল করতেই ওপাশ থেকে সেই চিৎকার “কি হচ্ছেটা কি সুহৃদ? অসময় এভাবে ফোন করার সাহসটা হয় কি করে তোমার? তাড়াতাড়ি বল সব ব্যবস্থা ঠিকমতো হয়েছে কি না, নয়তো কাল থেকে আর তোমার অফিস যাওয়ার প্রয়োজন নেই।” সুহৃদ কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে চেনা মহিলা কণ্ঠ ভেসে আসে “ডিসগাস্টিং, হোয়াই ডোন্ট ইউ সুইচ্‌ অফ ইওর ফোন?” সুহৃদ কিছু বলার আগেই কেটে যায় ফোনের লাইন। আবার ডায়াল করে বুঝতে পারে যে ফোনটা ইতিমধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

রঞ্জনা তখনও মেয়েকে ঘুম পাড়াতে ব্যস্ত। মনে পড়ে সকালে রঞ্জনা বলেছিল যে মেয়েটার বেশ জ্বর, স্কুলে যেতে পারেনি। ঘরে ঢুকে সুহৃদকে ব্যাগটা খাটে ছুঁড়ে দিতে দেখেই রঞ্জনা বুঝতে পারে যে সমস্যা নিশ্চয় গুরুতর। জলের গ্লাসটা হাতে দিয়ে বলে “তুমি বড় সহজে ভেঙ্গে পর। সমস্যা আমাদের জীবনে তো কম আসেনি সুহৃদ, সমাধানও তো হয়েছে সেইসব সমস্যার। দেখো সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি আগে জামাকাপড় বদলে নাও, আমি ততক্ষন টেবিলে খাবারটা লাগাই।” ক্ষিদে নেই জানিয়ে সুহৃদ সোজা গিয়ে শুয়ে পরে।

এক অদ্ভুত অস্থিরতা যেন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মনের মধ্যে। বিছানায় কিছুক্ষন ছটফট করার পর একটা সিগারেট ধরিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসে সুহৃদ। রাত অনেক হয়েছে, চারপাশের সমস্ত বাড়ির আলো নিভে গেছে, হয়তো শীতের রাতে সবাই নিশ্চিন্ত ঘুমে আচ্ছন্ন। কুণ্ডলীকৃত সিগারেটের ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে অজস্র চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে মাথায়। তবে কি সুহৃদের সব চেষ্টাই বিফলে যাবে? গত তিনবছর এই কোম্পানির চাকরীতে সে তো সাহেবের প্রতিটা আদেশ পালন করে এসেছে, সহ্য করেছে নানান অপমান, তাচ্ছিল্য -তবে কেন এমন একটা জঘন্য কাজের দায় বর্তাবে তার ওপর? আর চাকরীটা? ওটা চলে গেলে যে সবই শেষ ওদের জীবনে। এই চাকরীটার জন্যই তো সম্ভব হয়েছে মেয়ে সুরঞ্জনাকে নামী স্কুলে পড়ানোর, অন্যদের মতো সুহৃদরাও এখন স্বপ্ন দেখে লেখাপড়া শিখিয়ে মেয়েকে মস্ত মাপের এক মানুষ করার। টানা এক বছরের বেকারত্বের জ্বালায় কখন যে ওদের বিবাহিত জীবনের সমস্ত স্বপ্ন ঢেকে গিয়েছে তা আজ আর মনে পড়ে না, এখন শুধু মেয়েকে কে ঘিরেই ওদের স্বপ্নের পাহাড়। দুদিন পর সুরঞ্জনা পাঁচ বছরে পা দেবে, রঞ্জনার আবদার অনুযায়ী এবারের জন্মদিনের অনুষ্ঠানটা বেশ ঘটা করে ব্যবস্থা করা হয়েছে। অথচ কাল যদি………?

ভোরের দিকে হয়তো একটু তন্দ্রা এসে গিয়েছিল। মোবাইলটা আওয়াজ শুনে ঘুম চোখে ধরতে গিয়ে লাইনটাই যায় কেটে। পর মুহূর্তে আবার ফোন, তাকিয়ে দেখে এতো সরকার সাহেবের নাম্বার। কয়েক মুহূর্ত ভাবার চেষ্টা করে যে কি করবে সে, কি জবাব দেবে সাহেবকে, কিন্তু আর কোনও উপায় তো জানা নেই সুহৃদের। সাহসে বুক বেঁধে কোনোমতে ফোনটা ধরা মাত্রই হুঙ্কার ভেসে আসে “তোমার সাহস তো কম নয় সুহৃদ। প্রথমে লাইন কেটে দিলে আর এখন ঘুমের ঘোড়ে এমন ভাবে হ্যালো বলছ, যে কে কার বস্‌ বোঝাই মুশকিল। সারাটা রাত আমাকে ঘুমোতে না দিয়ে নিজে এমন টেনে ঘুম দিচ্ছ, যেন অর্ডার তোমার হাতের মুঠোয়। স্যাম্পলের ব্যবস্থাটা করেছো কিনা আগে বলো? আমি কিন্তু তোমার মুখ থেকে ‘না’ শুনতে চাই না।“ সুহৃদের জবাব শোনামাত্র আবার রাগে ফেটে পড়েন সরকার সাহেব “ইউ স্টুপিড ……। সেলস্‌ লাইনের বেসিক কাজটাই করতে পারো না, আর তুমি কিনা হবে আমাদের কোম্পানির সেলস্‌ ম্যানেজার? আজকাল কলকাতা শহরে কি এজেন্টের অভাব আছে? ওই ফোননম্বরে যখন পেলে না, অন্য এজেন্টদের কি চেষ্টা করা যেত না? সব কাজ আমি করে দেব, আর তুমি মাস গেলে মোটা টাকা মাইনে নেবে? এতবড় একটা অর্ডার হাতছাড়া হতে বসেছে, আর তুমি কিনা নিশ্চিন্তে বাড়ি বসে ঘুমোচ্ছ? হবে না সুহৃদ, তোমার দ্বারা এসব কাজ হবে না। আজ থেকে অফিস না গিয়ে মনের সুখে বাড়িতে ঘুমোও, কারন তোমার মতো অপদার্থকে আমাদের কোম্পানিতে কোনও প্রয়োজন নেই।

“প্লিজস্যার, আমাকে আর একটা সুযোগ দিন, ছোট ভাইয়ের মত বুঝিয়ে দিন এখন আমি কি করতে পারি। আপনি যেমন বলবেন আমি ঠিক তেমনই করবো। একটু থেমে সাহেব বলেন “ফালতু কথা বলে আমার সময় নষ্ট করো না। বোঝার মত বুদ্ধি থাকলে তো বোঝাব?এতদিন সেলস্‌ লাইনে কাজ করার পর যদি প্রতি মুহূর্তে আমাকে পরামর্শ দিতে হয়, তাহলে তোমার মতো স্টাফকে দুধ কলা খাইয়ে পোষার কোনও প্রয়োজন নেই আমার। আমি বুঝে গেছি যে তোমার দ্বারা সেলসের কাজ হবে না। সুতরাং দুঘণ্টার মধ্যে তোমার রেজিগনেশনটা আমাকে ইমেল করে দাও, নয়তো তোমার অবস্থা মানস গুপ্তর চেয়েও করুণ করে দেবো, এমন কেসে ফাঁসিয়ে দেবো যে আগামী দশবছর কোর্ট-ঘর করে নিঃস্ব হয়ে যাবে।”

চাকরীটা বাঁচানোর আর কোন আশা নেই দেখে শেষবারের মত আপ্রাণ চেষ্টা করে সুহৃদ “স্যার, এবারের মতো আমাকে রক্ষা করুণ, নয়তো বউ-বাচ্চা নিয়ে বিপদে পরে যাব। শুধু একটা উপায় বলে দিন, আমি যেভাবে হোক ব্যবস্থা করবো। প্লিজ স্যার…………………..“

সরকার সাহেব এবার উত্তেজিত হয়ে বলেন “চাকরী যদি বাঁচাতে চাও, যেভাবেই হোক তোমাকে আজ স্যাম্পলের ব্যবস্থা করতেই হবে। এজেন্টের মারফৎ যদি না পারো, অন্য উপায় দেখো। তোমার সাথে তো ঊর্মির বেশ ভালোই সম্পর্ক, তাছাড়া মিঃ লিনও ঊর্মিকে দেখেছেন। আর তাও যদি তোমার দ্বারা না হয়, তোমার মিসেসের সাহায্য নিচ্ছ না কেন, এমন বিপদের সময় নিজের স্ত্রী সাহায্য করবে না তো কে করবে? তবে হ্যাঁ, আমাকে যেন এসব ফালতু ব্যাপারে জড়াতে না হয়।” সুহৃদ নিচু গলায় একটু বলার চেষ্টা করে “স্যার, এটা কি করে সম্ভব, আমি………।“ সুহৃদকে কোন কথাই বলতে দেয় না সাহেব,“কিছুই যদি না পারো, দেন গো টু হেল। আর শোনো, আমি আজ সারাদিন মিটিঙে থাকবো, ফোনে যেন কোনোরকম বিরক্ত করা না হয় আমাকে।”

এবার যেন সম্পূর্ণ দিশেহারা লাগছে সুহৃদের। সাহেবের কথাগুলো মাথার মধ্যে ক্রমাগত ড্রাম পিটিয়ে চলেছে। নিজে অমন দুশ্চরিত্র বলেই কি লোকটা এমন একটা কু-প্রস্তাব দেওয়ার সাহস পায়, নাকি তার এই বেহায়াপনার জন্য সুহৃদের প্রশ্রয়ই দায়ী? অফিসের মেয়েটা, এমনকি নিজের স্ত্রীয়ের সম্মন্ধে এমন কথা শোনার পর থেকে নিজেকে যেন ক্ষমাই করতে পারছে না সুহৃদ, নপুংসকের মতো কথাগুলো সে শুনলো কি করে, কেনই বা পাল্টা প্রতিবাদ করলো না? এই ভাবেই কি তাকে সাহেবের অন্যায় চাহিদা মিটিয়ে চলতে হবে? বিভ্রান্ত হয়ে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষন, চোখে পরে যায় অফিসের ব্যাগ হাতে পাশের বাড়ির অনিমেষ তার মিসেসকে টা-টা করে গাড়িতে উঠছে। কোনোমতে বি এ পাশ করা অনিমেষটা যে কি করে চাকরীতে এতো উন্নতি করলো? সুহৃদের কিন্তু উন্নতি নিয়ে অতশত মাথাব্যাথা নেই, কেবল চাকরী বাঁচানোটাই এখন তার চিন্তা। কেন যে হঠাত রঞ্জনার মায়ের কথা পরছে, বিয়ের দিন উনি বলেছিলেন “আমার মেয়ে কিন্তু ভীষণ আবেগপ্রবণ। প্রয়োজনে ও তোমার জন্য সবকিছু করবে, কিন্তু কখনও যেন ওকে অন্যায় কাজ করতে বোলো না।” না, কখনই না, সুহৃদ কোনোমতেই এই পাপের আঁচড় ছুঁতে দেবে না রঞ্জনাকে। যদিও ঊর্মি ওর ছোট বোনের মতো, তবে অফিসে ওই তো একমাত্র সুহৃদের কথা শোনে। ফোনটা নিয়ে চুপিসারে ছাদে চলে যায় সুহৃদ, আর কিছু ভাবার চেষ্টা না করে ফোনটা করেই বসে ঊর্মিকে। কথাটা শুনে প্রথমে হতবাক হয়ে যায় ঊর্মি “সুহৃদদা, আপনি আমাকে এমন কথা বলতে পারলেন? ছোট বোনের মতো আপনার সব কথা শোনার অর্থ এই নয় যে এমন প্রস্তাব দেওয়ার অধিকার আপনার আছে। সামান্য একটা অর্ডারের লোভে নিজেকে এতটা নীচে নামিয়ে ফেললে জীবনে উন্নতি করবেন কি করে? আপনি হয়তো জানেন না যে আমার সামান্য একটা অভিযোগ আপনাকে শ্রীঘরে পাঠানোর পক্ষে যথেষ্ট।” এক লজ্জা মিশ্রিত ভয়ে সুহৃদের মুখ থেকে কোন কথা বেরোয় না। ঊর্মিকে ক্রমশ উত্তেজিত হতে দেখে কোনোমতে বোঝানোর চেষ্টা করে যে সাহেবের নির্দেশ মতোই সে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মিঃ লিনকে খুশি করানোর। কথাটা শোনামাত্র রাগে ফেটে পরে ঊর্মি, গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বলে “তার মানে এই মতলবটা সরকারের? এবার কিন্তু আর আমি ওই লোকটাকে ছাড়বো না। সেবার অফিস ছুটির পর ঘরের মধ্যে অমন অশ্লীল ইঙ্গিত করাতে এমন টাইট দিয়েছিলাম যে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়েছিল। এবার আমি শেষ দেখেই ছাড়বো।”

হঠাত পাশে রঞ্জনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চমকে ওঠে সুহৃদ, বুঝতে পারে সব কথাই হয়তো গেছে তার কানে। অসহায়ের মতো তাকিয়ে বলে “চাকরীটা আর রাখতে পারলাম না রঞ্জনা। আমার সব চেষ্টাই বৃথা গেল।” কিছুক্ষন চুপ করে থাকে রঞ্জনা, তাকে এতটা হতাশ হতে কখনও দেখেনি সুহৃদ। ক্ষুব্ধ রঞ্জনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে ওঠে “বৃথা কেন যাবে সুহৃদ, এখনও তো আমি বাকি আছি। একটা অর্ডারের লোভে তুমি যদি অনায়াসে কোন মহিলাকে এমন প্রস্তাব দিতে পারো, তবে তোমার স্ত্রী বাদ যায় কেন?” রঞ্জনার চোখের দিকে তাকাতে পারে না সুহৃদ, উত্তরের ভাষা খুঁজে না পেয়ে মাথা নিচু করে মৃদু স্বরে বলার চেষ্টা করে “কি বলছো তুমি, নিজের স্ত্রীকে দিয়ে…………।” কথাটা শেষ করার আগেই রঞ্জনা আবার বলে ওঠে “কেন নয় সুহৃদ? অন্যের স্ত্রী যদি পারে, তবে নিজের স্ত্রী কেন পারবে না?”

এক প্রবল আত্মগ্লানিতে এবার সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পরে সুহৃদ”প্লিজ রঞ্জনা, তুমি এভাবে বোলো না। আমার অবস্থাটা একটু বোঝার চেষ্টা করো। তুমি জানো না এই সবকিছুর জন্য দায়ী শুধুমাত্র ওই লোকটা। নিজের লোভ চরিতার্থ করার জন্য লোকটা প্রথম থেকেই আমার ওপর মানসিক অত্যাচার চালিয়ে এসেছে, আর দিনের পর দিন আমিও সব সহ্য করেছি, পরোক্ষে হয়তো কিছুটা প্রশ্রয়ও দিয়েছি, কিন্তু সেতো শুধুমাত্র চাকরীটা বাঁচানোর জন্য। সাপ্লায়ারদের কাছ থেকে টাকা তোলা থেকে শুরু করে, ওর অফিস ট্যুরের জালি বিল বানানো, অফিসের টাকায় ছেলের কম্প্যুটার কেনা, এমন কি স্নেহা ম্যাডামের সেক্রেটারিয়াল কাজের বিস্তর প্রশংসা করে রিপোর্ট বানানো –সমস্ত বেআইনি কাজ লোকটা আমাকে দিয়ে করিয়েছে শুধুমাত্র আমার চাকরীটাকে সামনে রেখে। সবথেকে দুঃখের ব্যাপার, ওর পথের কাঁটা মানস গুপ্তুর মতো অমন ভালো মানুষকে তাড়ানোর জন্যও ব্যবহার করেছে আমাকে। শুধু কি তাই, দিনের পর দিন অফিস ট্যুরের নামে ওই মহিলাকে নিয়ে ফুর্তি করার জন্য হোটেল বুকিং, ফ্লাইট বুকিং এমনকি ওর মিসেসের প্রশ্নের জবাবদিহি পর্যন্ত করতে হয়েছে আমাকে, একটা মিথ্যে ঢাকতে বলতে হয়েছে আরও দশটা মিথ্যে। নিজের অজস্র কুকীর্তি সত্ত্বেও লোকটার মধ্যে কোনও লজ্জা তো নেই, উপরন্তু মাথায় কেবল মানুষকে হয়রান করার ফন্দিফিকির। লোকটার জন্য এতকিছু করার পর তবু আমার ওপর কেন এতো অত্যাচার করে বলতে পারো? তোমার মনে পরে, গতবছর আমাদের বিবাহ বার্ষিকীর দিন কিভাবে একটা কাজ ধরিয়ে দিয়ে রাত পর্যন্ত আমাকে অফিসে আটকে রেখেছিল, অথচ কাজটা শেষ করার পর শুনলাম তার অনেক আগেই নাকি ম্যাডামকে নিয়ে অফিস ছেড়ে বেড়িয়ে গেছে সাহেব। এখনও আমি ভুলতে পারি না তোমার এপেন্ডিসাইটিস অপারেশনের দিনের কথা, সামান্য আধবেলার ছুটি চেয়েছিলাম বলে কি অপমানটাই না করে ছুটিটা নাকচ করে দিয়েছিল, যদিও তেমন কোন জরুরি কাজই সেদিন ছিল না। লোকটা এতদিন আমাকে লোভ দেখিয়েছে প্রোমোশনের, আর আজ এইসব জঘন্য কাজ করানোর জন্য দেখাচ্ছে চাকরীর ভয়। লোকটা একটা অসভ্য ইতর, নিজের স্বার্থ ছাড়া কিছুই বোঝে না, লোভের বশে এমন কোন কাজ নেই যে করতে পারে না। শুনেছি অফিস বেয়ারাদের ওভারটাইম পাওয়ানোর পেছনেও নাকি ওর কমিশন আছে। একবার নাকি অফিসের পিকনিকে মদ্যপ অবস্থায় এক পিওনের বউকে হাত ধরে টেনেছিল, আর সেই কথা রটে যেতে বেচারা পিওনের চাকরীটাই যায়।” একটু চুপ করে থেকে আবার বলে “আমি আর পারছি না রঞ্জনা। গতবার ভুলের খেসারত দিয়েছিলাম চাকরীটা খুইয়ে, আর এবার তো ভুলের পর ভুল করে গেছি চাকরীটা রক্ষার জন্য। আমি জানিনা এ অবস্থায় আমার কি করা উচিত, আর আমি পারছি না রঞ্জনা,আমাকে বাঁচাও।”

রঞ্জনা এবার বলে “ভুল মানুষ করে ভুলবশত, যা হয়তো তোমার ক্ষেত্রে ঘটেছিল গতবার। কিন্তু ভুলের জন্য করা ভুল তো অন্যায়, আর তা যদি অন্য কারও অনিষ্ট করে তবে সেটা অপরাধ। মাসের শেষে অফিস তোমায় যে টাকাটা দেয় সেটা তো কাজ করার জন্য, মিঃ সরকারের মোসাহেবি করার জন্য নিশ্চয় নয়। তবে কেন সাহেবের প্ররোচনায় এতো অন্যায় করতে হবে তোমাকে, কেনই বা তোমাকে সহ্য করতে হবে এতো অপমান?”

রঞ্জনার প্রশ্নের কোন উত্তর নেই সুহৃদের কাছে, শুধু বলে “সবই তো চাকরীটা হারানোর ভয়ে।” নিরাশ রঞ্জনা অভিযোগের স্বরে বলে ওঠে “শুধুমাত্র হারানোর ভয়ে তোমার জীবন থেকে যে হারিয়ে গেছে বহুমূল্যবান অনেককিছু, চলে গেছে সুরঞ্জনার শৈশবের সেই দিনগুলো, হারিয়ে গেছে তোমার সততা, চেতনা, বিবেক – সবকিছু। আর আমি কি হারিয়েছি জানো? আমি হারিয়েছি আমার গর্ব, যা ছিল শুধু তোমাকে নিয়ে।”

সুহৃদের অসহায় দৃষ্টিতে তখন শুন্যতা, এক তীব্র যন্ত্রণার ছাপ। তার ওই আকুল চাহনি বুঝিয়ে দেয় পথভ্রষ্ট সুহৃদ এই মুহূর্তেসঠিক পথের দিশা প্রার্থী। নিজেকে প্রশ্ন করে রঞ্জনা যে সুহৃদকে দোষী সাব্যস্ত করা কি পরোক্ষে নিজের আদর্শের বড়াই, তা না হলে যে মানুষটা সংসার রক্ষার জন্য সাহেবের এতো অন্যায়, অপমান সহ্য করে এসেছে তার এই সংকটের মুহূর্তে রঞ্জনার কি উচিত নয় তার পাশে দাঁড়ানোর, তাকে সৎ পরামর্শ দেওয়া?

হারানোর ভয়

 

রঞ্জনার নির্দেশ সুহৃদের প্রথমটা অবাক লাগলেও রঞ্জনাই তাকে বুঝিয়ে বলে যে মিঃ লিনের প্রয়োজন অনুযায়ী সুহৃদের দায়িত্ব হচ্ছে ওয়াটার পিউরিফায়ারের স্যাম্পলটা ওনার কাছে পৌঁছে দেওয়া, সরকার সাহেবের অভিধান মাফিকস্যাম্পলের অর্থ মেনে চলার কোন নিয়ম নিশ্চয় সুহৃদের নিয়োগ পত্রে লেখা নেই। তবে রঞ্জনার পরামর্শ মতো সুহৃদ প্রথমেই ইমেল পাঠিয়ে মিঃ লিনকে জানিয়ে দেয় যে স্যাম্পল নিয়ে সে হোটেলে পৌঁছে যাবে দুঘণ্টার মধ্যে, আর তার কপি পাঠিয়ে দেয় সরকার সাহেব এবং হেড অফিসে সাহেবের বসকে।

স্যাম্পলটা নিয়ে হোটেলে ঢুকতে বেশ ভয় করছিল সুহৃদের, পিউরিফায়ারের স্যাম্পলটা দেখে যদি ভীষণ রেগে যান মিঃ লিন? কিন্তু কই, উনি তো বললেন স্যাম্পলটা রেখে দিতে, এমনকি ঘরে বসে কফি খেতে খেতে কত গল্পই না করলেন। ফিরে আসার সময় মিঃ লিন সুহৃদের সাথে করমর্দন করে বলেন যে উনি সুহৃদের কাজে অত্যন্ত প্রসন্ন এবং আশা করেন ভবিষ্যতে তাদের মধ্যে কোম্পানির মধ্যে অনেক ব্যবসার আদানপ্রদান হবে।

সকালে উঠেই চোখে পরে সাহেবের এস এম এস, যার অর্থ “আমার আদেশ অমান্য করার জন্য, আজকের মধ্যে তোমাকে পদত্যাগপত্র অফিসে জমা দিতে জানানো হচ্ছে, নয়তো কোম্পানি তোমার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।” সুহৃদ বুঝে যায় আজই তার এই চাকরীর শেষ দিন, কিন্তু রঞ্জনা কিছুতেই মানতে পারে না “তুমি তো কোন অন্যায় করনি সুহৃদ, তবে কেন পদত্যাগ করবে, কেন মেনে নেবে সাহেবের এই অন্যায় দাবি? অন্যদিনের মতো আজও তুমি অফিসে যাবে কাজ করার জন্য, কারও দালালি করার জন্য নয়।”

একরাশ চিন্তা নিয়ে একটু দেরীতে অফিসে পৌঁছে সোজা চলে যায় নিজের জায়গায়। ইচ্ছে না করলেও কম্প্যুটারটা চালায় সুহৃদ আর প্রথমেই মিঃ লিনের ইমেলটা দেখে অবাক হয়ে যায় – একি! মিঃ লিন আমাদের কোম্পানিকে শুধু যে বাছাই করেছেন তাই নয়, ওনার পছন্দের তালিকায় তাদেরকে প্রথম স্থানে রেখেছেন। সুহৃদের কাছে তার চেয়েও বড় আনন্দের খবর হচ্ছে যে ওদের ম্যানেজিং ডিরেক্টরকে লেখা ইমেলে মিঃ লিন সুহৃদের নামে বিস্তর প্রশংসা করেছেন। প্রথমটা যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না তার, আসলে সাহেবের অত্যাচারে নিজের প্রতি সব আস্থাই যেন হারিয়েছিল সে। অন্যকে নিজের স্বার্থে ব্যবহারের জন্য তাদের মনোবল এইভাবে ভেঙ্গে দেওয়াটাই হয়তো সাহেবের কৌশল। হঠাত ঊর্মির ডাকে ফিরে তাকায় সুহৃদ “এই যে সুহৃদদা আপনাকেই খুঁজছিলাম, খবরটা শুনেছেন? বহুত বেড়েছিল লোকটা, একবার ক্ষমা করে দিয়েছিলাম বলে কি এবারও ছেড়ে দেব নাকি? এমন জবরদস্ত নালিশ ঠুকে দিয়েছি, যে কোম্পানির কোড অফ কন্ডাক্ট অনুযায়ী সাহেবকে প্রথম ছমাসের জন্য সাসপেন্ড এবং দোষ প্রমাণিত হলে পুরোপুরি বরখাস্ত করা হবে। ওনার কুকীর্তির ভুরিভুরি প্রমাণ তো আপনার কাছেও আছে, সেগুলো ম্যানেজমেন্টের কাছে পাঠালে কারও সাধ্য নেই ওর চাকরী বাঁচায়। ও হ্যাঁ, আপনার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি সেদিন খারাপ ব্যবহার করার জন্য, তবে রঞ্জনা বউদি সাহসটা যোগালেন বলেই হয়তো পারলাম এমন এক জাঁদরেল লোককে শায়েস্তা করতে।“

সুহৃদ চুপ করে শুনতে থাকে ঊর্মির কথা, এ যেন এক অন্ধকার যুগের অবসান। রঞ্জনা তবে শুধু সুহৃদকেই নয়, ঊর্মিকেও সাহস জুগিয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে। ঊর্মি এবার উচ্ছ্বাসের বসে চেঁচিয়ে ওঠে “সেলস্‌ ম্যানেজারের চিঠিটা হাতে পেলেই কিন্তু একটা গ্র্যান্ড পার্টি চাই।”

 

 

~ হারানোর ভয় ~
Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

*