“জানো মা , আজ না স্যার আমাদের বলেছেন আকাশে কোনটা তারা আর কোনটা গ্রহ সেটা দেখে চিনতে । “ , স্কুল থেকে ফিরেই এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো শেষ করে, পিঠ থেকে বইয়ের ব্যাগটা নামিয়ে রেখেই মাকে জাপটে ধরে নীলু । মা তো শুনে তাজ্জব । ছেলে বলে কি ! হাত থেকে চাল ভরতি কুলোটা নামিয়ে রেখে ছেলেকে বুকে টেনে নেয় কমলা ।

আদর করে বলে, “বাব্বাহ, কত্ত বড় হয়ে গেছে আমার নীলু ! রোজ ইশকুলে যায়, পড়া করে, আর যতো দুষ্টুমি মার কাছে? ওরে পাগল ছেলে, আকাশের তারা, তার আবার চেনা-চেনির কি আছে ! ”

মায়ের কথায় নীলু রেগে গিয়ে মার হাত ছাড়িয়ে বেশ কিছুটা দূরে গিয়ে বলে, ” ধুর । তুমি কিচ্ছু জানো না মা । সব চেনা যায় । তুমি রোজ আমাকে বল বাবা নাকি ওই তারাটায় চলে গেছে । মিথ্যে কথা ! স্যার বলেছেন, সন্ধ্যার প্রথম ওই উজ্জ্বল তারাটার নাম সন্ধ্যাতারা । ওখানে মানুষ থাকতে পারে না !”

মায়ের চোখদুটো ছলছল করে ওঠে। না । এ জল কোন পুরানো স্মৃতির না । এ এক পরম সুখের ঢেউ । তার ছেলে আর তার মত মূর্খ নেই । কমলার চোখে ধরা দিতে থাকে এক ঝাঁক স্বপ্ন- এক নতুন ভোরের স্বপ্ন । মায়ের চোখে জল দেখে নীলুও কাঁদো কাঁদো হয়ে মাকে আবার জড়িয়ে ধরে ।

 

কে যেন তার গলাটা জড়িয়ে ধরে বলে ওঠে , “মা , তুমি আসবে আমাদের কাছে——————?”

 

আবার তার অকপট প্রশ্ন, “বলনা মা । বাবা তাহলে কোথায় থাকে ?” এবার কমলার স্বপ্নজাল ছিঁড়ে যায় । ছেলের এ প্রশ্ন তাকে আবার নির্মম বাস্তবে এনে দাঁড় করায় । সেই যে যেদিন নীলু সাতে পা দিল । সেদিনই তো ওর বাবার বুকের যন্ত্রণাটা  শেষবারের মতো বেড়েছিল । যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে কমলার হাতদুটো ধরে বলে গিয়েছিল- “পারলে ছেলেটাকে মানুষ কোরো ।“ তারপর আজ পাঁচ বছর হল কমলা একাই তো বুক দিয়ে আগলেছে তাদের আদরের নীলুকে ।

সম্বিৎ ফিরল ছেলের ডাকে- “বলনা মা । তুমি কেন লুকোও ?”

“ওরে সে তো এখন দেবতা । তারা’য় তো দেবতারাই থাকে ।“ অজান্তেই কথাগুলো বেরিয়ে আসে কমলার মুখ থেকে । কথাটা নীলুর মনেও যেন দাগ কাটে । সরল মন আজও একটা উত্তর পেয়ে যায় “ সত্যিই তো ! স্যার এটা তো বলেননি । সবার বাবা তো মানুষ নাও হতে পারে । আমার বাবা কি তাহলে দেবতা ! “

সেদিন সন্ধ্যাবেলা, তুলসীতলায় প্রদীপ দিতে এসে আকাশের দিকে তাকাতেই কমলার মনে পরে যায় নীলুর স্কুল থেকে এসে বলা কথাগুলো । হঠাৎ পিছন থেকে নীলু এসে তাকে জড়িয়ে ধরে-“ দেখবে মা, আমি বলব কোন তারাটার কি নাম ?”

কমলা তাকে কোলে তুলে নেয়- “হ্যাঁ । কই দেখা তো দেখি ।“

“ ওই যে ওইটা, যেটাকে তুমি সন্ধ্যাতারা বল । ওটা আসলে একটা গ্রহ । স্যার বলেছেন ওটা শুক্রগ্রহ । ওটাই  নাকি আবার ভোরবেলা পূর্বদিকে দেখা যায় । তখন সবাই তাকে বলে শুকতারা ।“

কথাগুলো বলতে বলতে নীলু হঠাৎ লক্ষ্য করে মা প্রদীপটার দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছে । সে কমলার থুতনি ধরে নাড়া দিয়ে আবার বলতে থাকে, “ আমি বড় হয়ে ওটায় যাব । গিয়ে বাবাকে খুজে আমাদের কাছে নিয়ে আসব । আচ্ছা মা, বাবা আমাকে চিনতে পারবে ?”

কমলা ম্রিদুহেসে শুধু বলে, “হ্যাঁ হ্যাঁ । বাবা তোকে ঠিকই চিনতে পারবে । আর দুষ্টুমি করলেই বকে দেবে ।”

রাতে নীলু কে ঘুম পারিয়ে রোজকার মতো  সেদিনও নীলুর বাবার ছবিটার কাছে এসে দাঁড়ায় কমলা । আঁচল দিয়ে ছবিটা মুছে মনে মনে শুধু বলে, “আমি পারব তো নীলু কে বড় করতে ?”

এভাবেই শুরু হয় নীলু কে নিয়ে তার এক নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখা ।

কিন্তু ভগবান বোধহয় কিছু মানুষকে পৃথিবীতে পাঠানই তাঁর নাটকের দুয়োরানী সাজিয়ে ।

ঘটনাটার শুরু সেদিন । যেদিন স্কুল থেকে নীলু একদিন বাড়ি ফিরল স্যারের হাত ধরে । তখনও জ্বরে তার গা পুড়ে যাচ্ছে ।

তার পর থেকেই দিন দিন কেমন যেন হয়ে পড়ল ছেলেটা । আগে যাকে ঘরে আটকে রাখা দায় হত , তাকে এখন ঘর থেকে বেরই করা যায় না । সবতেই তার এক উত্তর , “ মা , আমার কিছু ভাল লাগছে না কেন ? “

দিনে লোকের বাড়ি কাজ করে আর রাতে সেলাই করে কতটুকুই বা জোটে ? চিরকাল অভাবের সংসারে থেকে আর বাবুর বাড়ি কাজ করে কমলা শিখেছিল , “ ছেলেকে মানুষ করতে গেলে আনেক টাকা লাগে ! “ ঘরে যা দু পয়সা ছিল তাই নিয়েই নীলু কে সঙ্গে করে ছুটল গ্রামের হাতুড়ে এক ডাক্তারের কাছে ।

তার কয়েকদিন পর নীলু যেন একটু ভাল হল । তারপর আবার আগের মতই । মাঝে মাঝে জ্বর, অসহ্য যন্ত্রণা । ছেলেটা যেন একদম শুকিয়ে গেছে ।

একদিন সন্ধাবেলা উঠানে মায়ের কোলে শুয়ে নীলু বলল ,” জানো মা , কাল রাতে আমি বাবাকে দেখেছি । আমাকে ডাকছিল । বলছিল নীলু আমার কাছে আসবি ? তুই থাকবি ভোরের শুকতারায় , আর আমি সন্ধ্যাতারায় । আসবি তো ? “

কমলার বুক যেন ছ্যাঁত করে ওঠে , “ বালাই ষাট । ও কথা বলতে নেই । তোকে কেউ নিয়ে যেতে পারবেনা আমার থেকে । তুই চলে গেলে আমি থাকব কার কাছে ! “

নীলুর সরল উত্তর , “ ধুত ! বাবা তো জানেই না । সন্ধ্যাতারা আর শুকতারা তো একই । বাবা যখন ঘুমোয় , ভোররাতে ওটাই তো শুকতারা হয়ে যায় । মা তুমিও যাবে । থাকবে আমাদের সাথে । বুতান দের মতো আমরাও তিনজন একসাথে থাকব। ওদের থেকেও আমাদের বাড়ি টা অনেক অনেক বড় হবে ।“

জ্বর যেন আর কমছেই না । জীর্ণ ছেলেটার পেটটা যেন ফুলে জয়ঢাক । গ্রামের ডাক্তার জবাব দিল চিকিৎসার জন্য শহরে নিয়ে যেতে হবে । রক্তে যেন কি একটা দোষ হয়েছে । কমলার সারা শরীর হিম হয়ে এল ।

শহরে নিয়ে যেতে হবে ! এত টাকা কোথায় পাবে সে ? সে তো কোনদিন শহরে যায়ও নি ।

তবু তাকে যেতেই হবে । তার নীলুকে সে কিছুতেই হারাবে না ।

সেবার মহালয়ার দিন বিকালে নীলু হঠাৎ পরে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে যায় । তার পর থেকেই জ্বরে বেহুশ । পেটটা যেন আরও ফুলে উঠেছে ।

কদিন পর কমলা চেয়ে চিন্তে কিছু টাকা জোগাড় করে ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল কলকাতার উদ্দেশ্যে । চারিদিকে তখন উৎসবের ছোঁয়া । আর তার মাঝেই সকলের অগোচরে জীবন নাটকের শেষ দৃশ্যে চলছে এক অভাগী মায়ের জীবনের শেষ সম্বলটুকু বাঁচানোর এক করুণ লড়াই ।

আনেক কষ্টে কলকাতার এক হাসপাতালে সে ভরতি করল নীলু কে ।

কিন্তু ওই ! সে যে এ নাটকের দুয়োরানী ।

যা হবার ছিল তাই ই হল । লক্ষ্মীপূজার রাত্রে, চারিদিক যখন ধুমধাম করে দেবী কমলার আরাধনারত, মানবী কমলা হারাল তার নীলুকে । পরে থাকল শুধু একা কমলা, আর তার স্মৃতিরা ।

শ্যামাপূজার পরের ভোররাতে —

অনেক শাঁখের শব্দে তন্দ্রাছন্ন ভাবটা কেটে যায় কমলার । মনে পরে যায় আজ তো আকাশে শুকপ্রদীপ দেখানর দিন । ঘর থেকে বেরিয়ে এসে শুকতারাটার দিকে তাকায় সে । মনে হয় নীলু কে পেয়ে সেটা আজ আরও জ্বলজ্বল করছে । কে যেন তার গলাটা জড়িয়ে ধরে বলে ওঠে , “মা , তুমি আসবে আমাদের কাছে——————?”

 

(সমাপ্ত)

~ সন্ধ্যাতারা ~
গল্পটির প্রকাশ : ২৪-ঘণ্টা শারদীয়া ই-ম্যাগাজিন

 

LEAVE A REPLY

*