এক।

মহাদেব নিজের ঘরের জানলার ধারে বসেছিল। বাইরে একটু ছিপছিপে বৃষ্টি পরছে … অনেকটা সেই ছোট বেলার মতো, একটা মোটা কাপড়ের জামা প্যান্ট পরে এই বৃষ্টিতে বাইরে বেরুলে গা মোটেই ভিজবে না, মাথার চুলটা একটু হাত দিয়ে ঝেড়ে নিলেই হোল। ছোটবেলায় মহাদেব এই সব কান্ড অনেক করেছে …। গ্রামের বাড়ীতে যে ঘরে ও থাকতো তার বাইরেই একটা কুল গাছ ছিল, সামান্য বৃষ্টিতে মহাদেব ওর বন্ধুদের সাথে ঝট করে বেরিয়ে কয়েকটা কুল পেরেই আবার ছুটে ঘরে চলে আসতো। তখন মাথায় কম্বলের মতো এক ঢাল চুল ছিল, একটু ঝেড়ে নিলেই ব্যাস, আর বোঝে কার সাধ্য। মা বোধহয় বুঝতো, ঘরে এসে প্রথমেই মাথায় হাত,

— হ্যাঁরে বিলু, বাইরে গিয়েছিলি?

— না মা, তুমি বলার পর সেই থেকে তো বই নিয়েই বসে আছি।

— মাথাটা যেন একটু ভিজে ভিজে লাগছে …।

ঘাবড়ে গিয়ে মহাদেব নিজেই মাথায় একটু হাত দিয়ে ফেলে – কোথায় মা, তোমার নিশ্চয়ই ভিজে হাত।

এই সময় মা সুলোচনার নজর পরলো টেবিলের দিকে …

— বিলু, এই কুলগুলো কে দিল, অ্যাঁ? এখনও বৃষ্টির জল লেগে আছে? নিশ্চয়ই বাইরে গিয়েছিলি?

— আরে না না … ওই… বিপিন আর ভোলা জানলা দিয়ে দিয়ে গেলো …।

সুলোচনা কিছুক্ষণ মহাদেবের দিকে তাকিয়ে রইলেন, ছেলেটা একটু ডানপিটে আছে, আর কুলতো ওর ভীষণ প্রিয়, শুধু কুলই নয় … কুলের টক, কুলের আচার, শুকনো কুল … সবই গবগবিয়ে খায় আর মাঝে মাঝেই গলায় ব্যাথা নিয়ে বসে থাকে। কাজেই বাইরে গিয়েছিল কিনা কে জানে … সন্দেহ তো থাকছেই। কিন্তু প্রমান করা আরো মুশকিল, মাথা সেরকম ভিজে নয়, জামা ভিজে নয় তাছাড়া বাইরে বৃষ্টিও খুবই সামন্যই পড়ছে। সুলোচনার মনটা একটু খচ খচ করছিল, কিন্তু হাতে অনেক কাজ তাই আর কথা বারালেন না …

— বিলু, সামনেই পরীক্ষা, পড়াশুনোটা কিন্তু মন দিয়ে কর। আমি রান্না ঘরে যাচ্ছি, একটু পরেই খেতে ডাকবো।

সুলোচনা চলে গেলেন, মহাদেব এবারকার মতো হাঁফ ছেড়ে বাঁচল, মার যা চোখের দৃষ্টি, আর একটু হলেই ঠিক ধরে ফেলতো।

মহাদেব আনমনা হয়ে এই সব কথা ভাবছিল। সেইসব মানুষরা আর নেই, বিলু বলে ডাকার মতো লোক আজ কোথায়। এ তো বহু বছর আগের কথা, তখন তারা সেই কৃষ্ণনগরের গণ্ডগ্রাম বীরপুরে থাকতো। সে, মানে ছোট্ট মহাদেব আর তার মা, সুলোচনা। তার বাবা গৌর শীল মহাদেবের যখন পাঁচ বছর বয়স তখনই মারা যান। গৌরের কোন কালেই পড়াশুনোয় মন ছিল না … কিন্তু বেশ ডানপিটে ছিলেন। মাত্র কুরি বছর বয়সে বাড়ী থেকে সোজা মিলিটারীতে জয়েন করেন। যথেষ্ট সাহসী হিসাবে নাম ছিল, সুবেদার অবধি উঠেছিলেন। একাত্তরের বাংলাদেশ যুদ্ধে গিয়ে মারা যান। সাহস করে বন্দুক নিয়ে ছোট্ট একটা গ্রুপকে লিড করতে করতে একটু ভিতরে চলে এসেছিলেন, ব্যাস … অন্ধকার থেকে খান সেনারা অ্যামবুস করে দিল। ওর কলীগরা অবশ্য যথেষ্ট সম্মান করেই ডেডবডি কৃষ্ণনগরে নিয়ে আসেন … জলঙ্গীর তীরেই দাহ কার্য হয়। মা অনেক কষ্ট করে তাকে মানুষ করেছেন, ছোট্ট একটা স্কুলে অল্প মাইনের চাকরী করে। আর কোন ভাই বোন না থাকায় মার সমস্ত দৃষ্টি ছিল মহাদেবের প্রতি। স্কুলের পর বাড়ীতে ফিরলেই ব্যাস, মা এসে দরজায় দাঁড়ালেন …

— অ্যাই বিলু, হাত পা ধুয়ে বিশ্রাম নে, তারপর পড়তে বসবি।

— মা, বিপিন, তোতা, কুমার … ওরা সবাই মাঠে ফুটবল খেলছে, আমিও একটু যাই না।

— না বাবা … ওই সব মারাত্মক খেলা তুমি খেলবে না। কখন কোথায় লেগে যায় কে যানে, তারপর আমি কি করবো? যদি খুব মন খারাপ হয়, তাহলে যাও পাশের বাড়ীর সোনার সাথে দাবা খেলো বা বাড়ীর উঠোনে ব্যাডমিন্টন খেলো … কিন্তু মাঠে বল খেলতে যেতে পারবে না।

 

ব্যাস হয়ে গেলো। মার কথা মানে সুপ্রিম কোর্টের জাজের অর্ডার … এর ওপর আর কোন আপীল চলে না। আসলে বাড়ীতে মা ছাড়া আর কেউ না থাকায় মহাদেব আর কার কাছেই বা যাবে। তার মামার বাড়ীর মামা বা মামীরাও তো বছরে একবার খবর ন্যায় কিনা সন্দেহ। তাদের অবস্থা একটু ভালো, কাজেই গরীব বোনের দিকে আর কারই বা নজর থাকে। কাজেই সুলোচনাই মহাদেবের একাধারে মা এবং বাবা। তবে লুকিয়ে চুরিয়ে কি আর বন্ধুদের সাথে খেলা কি সাঁতার হোত না … নিশ্চই হোত। শনি বা রবিবার সকালের দিকে হঠাৎ ভোলা বা সিরাজ চলে এলে মাও তাকে রুখতে পারতো না। হাতে একটা ছোট ঝোলা নিয়ে তারা বেরিয়ে যেত … কখন কোন জঙ্গলের মধ্যে কাঁচা আম পাড়া, কখন বা কারোর বাড়ীতে পেয়ারা গাছে উঠে কাঁচা পেয়ারা পাড়া … এসব তো ছিলই। তাছাড়া গরমের দিনে জলঙ্গী নদীতে ঝাঁপিয়ে পরে সাঁতার কাটা … হাফ প্যান্টের ওপরে জড়ান কোমরের গামছা খুলে দু তিন জনে মিলে নদীতে ছোট চুনো মাছ ধরা … এসব মহাদেব অনেকই করেছে, সুলোচনার হাজার বারন সত্ত্বেও। এই ভাবেই মানুষ হয়েছে মহাদেব … গ্রামের কাদা প্যাচপেচে বর্ষার রাস্তায় হেঁটে স্কুলে গেছে … সন্ধ্যায় লন্ঠনের আলোয় ফিজিক্স কেমিস্ট্রি পড়েছে, মাধ্যমিক বা হায়ার সেকেন্ডারিতে যথেষ্ট ভালো রেসাল্ট করেছে আবার খালি পায়ে আম বা পেয়ারা গাছে উঠে ফল পেরেছে … বর্ষায় দুকুল ছাপানো জলঙ্গীর জলে পার থেকে লাফ মেরেছে। ছোটবেলাটা বড়ই ভালো কেটেছে তার। যখন সুলোচনা চোখ বুজলেন … তিনি খুশী মনেই যেতে পেরেছিলেন, ছেলে তাঁর ভালোই মানুষ হয়েছে, মার গর্ব তো বটেই।

 

দুই।

 

মহাদেব এই সব পূরনো ব্যাপার ভাবতে ভাবতে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পরেছিল। ঘরটা কেমন যেন একটু গুমোট আর স্টাফি লাগছে। এই মেরিন ড্রাইভের অপোসিটে চার তলার ফ্ল্যাটটা সে বছর সাতেক হলো কিনেছে। অবশ্য কৃষ্ণনগর থেকে মেরিন ড্রাইভ আসার পথটা বেশ দীর্ঘ আর নানা বাধা বিঘ্নে ভরা। কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুল থেকে ভালোভাবে হায়ার সেকেন্ডারী পাস করে মহাদেব কলকাতায় পড়তে এলো … যাদবপুরে ফিজিক্স পড়তে। বাড়ী থেকে দূরে এলেও সুলোচনার কড়া নজর ছিল, মাসের মধ্যে অন্তত একবার বাড়ীতে যেতেই হতো। কলকাতায় এসে অবশ্য মহাদেব যাদবপুর থানার কাছে হোস্টেলে যায়গা পেয়ে গেলো। কিন্তু খরচও কম নয়, কাজেই টিউশানি শুরু করলো … সপ্তাহে দুটো, তাতেই তার খরচ চলে যেতো। অবশ্য মাসের খরচ একটু সাবধানে করতে হোত, বন্ধুরা ওকে কিপটে মহাদেব বলে একটু খেপাতো … এটাও ঠিক, কিন্তু তা যাক, ওসব গায়ে মাখে না মহাদেব। আগে তো নিজে খেয়ে পড়ে বাঁচো তারপর লোকে কি বললো দেখা যাবে। খুব অল্প বয়স থেকেই সে ব্যায় সঙ্কোচ ব্যাপারটা বুঝে গিয়েছিল … সেই সব রাত্রে কৃষ্ণনগরে যখন সে স্কুলের হোম টাস্ক করতে ব্যাস্ত, মা তারা লাগাতো – ওরে বিলে, তাড়াতাড়ি পড়া শেষ কর বাবা, কেরোসিন ফুরিয়ে যাবে … কালকে আমার একদম সময় নেই আনতে যাবার। রাত্রে অন্ধকারে রাঁধতে না পারলে খাবি কি? যা শুয়ে পর, কালকে আবার পড়িস। মহাদেব মার কথা শুনে বাধ্য ছেলের মতো শুয়ে পরতো, কিন্তু ঘুমতো না … খোলা জানলা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতো। আর ঘরের আলো নিভে গেলেই যত আপদ … কোথা থেকে এক গাদা জোনাকি উড়তে উড়তে ঘরে ঢুকে আসতো, জানলার ঠিক পাশ থেকে একটা ব্যাং কুরুক কুরুক করে ডেকে উঠতো … পাশের ঘোষ বাড়ীর ভাঙ্গা দেওয়ালের কোটর থেকে একটা প্যাঁচা ওড়া উড়ি শুরু করতো, কখন জানলার পাল্লায় কখন ঠিক জানলার পাশের শিউলি গাছে বসে ডানা ঝাপটাতো। মহাদেব পাশ ফিরে জানলার দিকে মুখ করে শুয়ে থাকতো আর গাল বা নাকের কাছে মশাগুলো পিন পিন করতে করতে চলে এলে চটাশ চটাশ করে নিজের গায়ে মুখেই হাত চালাতো। এই রকম ভাবে খানিক্ষণ শুয়ে থাকলে তার চোখে হয়তো একটু ঘুম ঘুম ভাব … আর ঠিক তখনই দূরে সেই জলঙ্গীর তীরে কোন ঝোপের মাঝে একটা শেয়াল ডেকে উঠতো … তার ঠিক কয়েক মিনিট পরেই এদিক ওদিক থেকে আরো পাঁচটা শেয়ালের রিপ্লাই। এতো ঝামেলায় কেউ ঘুমতে পারে? মহাদেবের চোখ আবার খোলা … আর মনটা খোলা জানলা দিয়ে বাড়ীর বাইরে। এতক্ষণে বিপিন, হামিদ, সিরাজ, জটাই, আশুরা নিশ্চই বাড়ী থেকে বেরিয়ে নদীর ধারে জড় হয়েছে। এরকম ব্যাপার তো গরমকালের প্রায় প্রতি শুক্রবারই হোত … । গ্রাম গঞ্জের লোকেরা একটু তাড়াতাড়িই ঘুমোয়, তার ওপর কেরোসিনের দাম আকাশ ছোঁয়া … কাজেই রাত দশটা বাজার আগেই গ্রাম অন্ধকার … রাস্তা ঘাট সুনসান … শুধু মার্কা মারা কিছু দোকানে লন্ঠন বা হ্যাজাকের আলো জ্বলতে দেখা যেতো। অবশ্য ওই সব দোকানে বেশী রাত্রে খদ্দের আর কোথায় … শুধু বাজী রেখে তাস খেলা চলতো আর লুকিয়ে মদ খাওয়া। তা সিরাজ, ভোলা বিপিনের তো সেদিকটাও দেখা আছে। তখন ওরা হায়ার সেকেন্ডারীর সিনিয়র স্টুডেন্ট … এক সোমবার ওরা ক্লাসের লাস্ট বেঞ্চে বসে সারাক্ষণ শুধু নিজেদের মধ্যে কথা বলে যাচ্ছে … ক্লাস শেষ হলে মহাদেব এগিয়ে গেলো …, ওরা তখন সবাই স্কুল বাড়ী থেকে বেরিয়ে পিছন দিকে আম বাগানের মধ্যে গিয়ে বসেছে।

— কি ব্যাপার রে সিরাজ, কিছুই শুনছিস না যে ক্লাসে, সামনেই টেস্ট না …।

— আরে শালা… রাখ তোর টেস্ট। দুনিয়ায় কত কিছুই ঘটে যাচ্ছে …খবর তো কিছুই রাখিস না।

— কেন আবার নতুন কি হোল …

— আর কি। ওই বিপনেটাকে জিজ্ঞাসা কর … এক্কেবারে বিচ্ছু, রাম বদমায়েশ। দ্যাখ কি রকম মিস্টি মুখে বসে আছে … মুখে এখনো ভালো করে গোঁফ দাড়ি বার হয়নি কিন্তু পেটে পেটে শয়তানি।

বলেই আবার খ্যাক খ্যাক করে হাসতে লাগলো, ওর সাথে ভোলা, বিপিন সবাই। মহাদেব একটু উষ্ণ হয়ে বললো – কিন্তু কি ব্যাপার … কাল বা পরশু রাত্রে নিশ্চই আবার কিছু শয়তানি কান্ড ঘটিয়েছিস। আবার কার ঘার ভাঙলি বলতো খোলসা করে।

— আরে … কারো সাথে শয়তানি করিনি। শুধু রাত্রে ঘুর্ণির ওদিকে ঘুরতে ঘুরতে পটাদার ভাঁটিখানাটা চোখে পরে গেলো … ব্যাস আমরাও ঢুকে গেলাম … ওটা কিন্তু ওই বিপিনের প্ল্যান ছিল।

— ও তো সবাই জানে … ওখানে ওই গোবিন্দদার গ্যাংটা বসে তাস ফাস খেলে, ভাং চুল্লু খায় … এই তো ব্যাপার। ওখানে তো আমিও বার কয়েক গিয়েছিলাম গতবারের পূজায় … কি যাই নি? তোরাও তো ছিলি , ছিলি না?

— তুই তো আবার মদ টদ খাস না, খাস কি?

— আরে সে তো মার জন্য। মার যা নাক না, ঠিক ধরে ফেলবে, তাছাড়া এক ঘরে শুই না! ওখানে একদম ধরা পরে যাব।

— মহাদেব, তুই বড় ভিতু। আমাদের দ্যাখ … কি না করে বেড়াচ্ছি … এটাই জীবন বুঝলি। তোর মতো ভালো সেজে থেকে মটকা মেরে জীবন কাটাই না। তাছাড়া ওই বিপিন, ভোলা ওদের দ্যাখ, ওরাও তো ক্লাসে খুব খারাপ রেজাল্ট করে না, তোর মতোই ওরাও ভালো কলেজে চান্স পাবে।

— আরে রাখ তোর জ্ঞান। আমার প্রবলেমটা আলাদা … কিছুই তো বুঝিস না। তোরা যদি কোনদিন রাত্রে মাল টাল টানিস, একরাত কোথাও গাছের তলায় বা কারো বাড়ীর বারান্দায় ঘুমিয়ে সকাল বেলায় ফিরে আসিস, তোদের মা কিছুই বুঝতে পারে না, বলে দিস যে রাত্রে কোথাও পড়ছিলি … তাই তো? আর আমার মা শুধু আমার পড়ার জন্য সকালে স্কুলে চাকরী করে, রাত্রে আবার সেলাই। একটা কৃতজ্ঞতা তো আছে, না কি? আমি একদিন রাত্রে না ফিরলে মা নির্ঘাত পুলিশে চলে যাবে…।

ভোলা এগিয়ে আসে – কুল কুল মহাদেব, সিরাজের কথায় এতো রাগিস না। ও তোকে রাগাচ্ছে …।

— গতবার পূজোয় মনে নেই … অষ্টমীর দিন … মাকে রাত জাগবো বলে বেরিয়ে আমি মাল টানিনি? কিরে … ভুলে গেলি… অ্যাঁ?

সিরাজ এবার উঠে মহাদেবকে জড়িয়ে ধরে – আরে বাবা, আমি তো শুধু বলেছি যে একটু আনন্দ করে বাঁচ … ব্যাস। এতেই এতো রাগ কেনো … ? মাকে তো একটু গুলটুল-ও মারা যায় … নাকি? আমরা মারি না? আচ্ছা সে যাকগে, কালকের গল্প কিন্তু এখনো শেষ হয়নি, বাকিটা শুনবি তো … নাকি?

মহাদেব পকেট থেকে একটা চুইং গাম মুখে ফেলে দিয়ে বলে – ও বোঝা গেছে … পটার দোকানে এই শনিবার বেশ নরক গুলজার হয়েছে। বেশ কয়েক বোতল চোলাই টেনেছিস, তাই তো?

হামিদ মুখটা একটু ভ্যাটকানি করে বললো – আরে ও তো আছেই … শনিবারের রাত এগারটা … তাতে আবার গরমকাল … আমরা ছ সাত জন সাইকেলে সারা গ্রাম টহল মারছি আর একটু মাল টানবো না। ওটা আবার বলার কি আছে…!

— তাহলে আবার নতুনটা কি … অ্যাঁ? রাত বিরেতে ভুত টুত দেখলি নাকি?

স্বপন, বিভাস, সিরাজ ওরা সবাই আবার হ্যা হ্যা করে হাসতে শুরু করলো …। তারপর ভোলা পকেট থেকে একটা বিড়ি বার করে ধরাল, বেশ জুত করে একটা সুখটান মেরে মুখটাকে একটু ছুঁচোর মতো করে কয়েকটা ধোঁয়ার রিং বার করলো। তারপর বিড়িটা পাশে সিরাজের দিকে চালান করে মহাদেবের দিকে ফিরলো – তা বলতে পারিস, ভূত হয়তো নয় কিন্তু পেতনি …।

ওরা সবাই আবার খিক খিক করে একটু হেসে নিল। মহাদেব একটু তেতে উঠে বললো – আর নাটক করিস না … বলতে চাইলে বল … না হলে ছাড়।

সিরাজ ঘাড়টা ঘুরিয়ে একটু এদিক ওদিক দেখে নিয়ে বললো – ওখানে বাড়ীর ভিতর দিকে একটা বড় সাজান ঘড় আছে জানিস তো?

— সবাই জানে, শহর থেকে পয়সা ওয়ালা খদ্দের এলে ওখানে বসায়, তাই তো?

— এই বিপনেটা পেচ্ছাপ করার নাম করে ওই ঘরের সামনে দিয়ে ভিতরে গিয়েছিল। ওই ঘরের মধ্যে বসেছিল আমাদের গ্রামের ঝুমুর।

 

— ঝুমুর … মানে আমাদের ঝুমুরদি? অত রাতে ওখানে কি করছিল?

 

বিপিন মুখটা একটু বিকৃত করলো – আহা … ঝুমুরদি …। মেলা ক্যালাস না মহাদেব। অত রাতে একটা ডবকা মেয়ে একটা ঘরে শুধু সায়া পরে বীরপুরের প্রদীপের সাথে কি করে?

 

— বাজে কথা …। মহাদেব তাও দুর্বল ভাবে তর্ক করার চেস্টা করে – তোরাও যেমন … ঝুমুরদিকে আমরা কতদিন ধরে চিনি … এই এদিকেরই মেয়ে তো, বড় বাজারের ওদিকে বাড়ী। ওদের ফ্যামিলীতে পয়সার একটু কমতি আছে ঠিকই, তবে … ।

 

মহাদেব থেমে যায়, স্বপন আর ভোলা হাতের তেলোয় খৈনী পাকাচ্ছিল, সেটা কয়েকটা ভাগ করে সিরাজ, হামিদ আর বিপিনের হাতে দিল। মহাদেব তার অভ্যাস মতো পকেট থেকে খানিকটা গুঁড়ো খৈনী বার করে মুখে ফেলে দিল। এবার সিরাজ দাঁত আর ঠোটের ফাকে খৈনীটা জিভ দিয়ে প্লেস করতে করতে একটু জরান গলায় বললো – তোর কি মনে হয়, আমরা সবাই মিথ্যে কথা বলছি?

 

মহাদেব খৈনীটা একটু চিবিয়ে প্যাচ করে খানিকটা থুতু পাশের ঝোপে ফেলে বললো – না না শোন, আমি শুধু বলছি যে তোরা তো মাল টাল খাচ্ছিলি, নেশার ঝোঁকে কি দেখতে কি দেখেছিস …।

 

সিরাজ ঝাজিয়ে ওঠে – মহাদেব, যা জানিস না তা নিয়ে বকিস না। আর মাল আমরা আজ নতুন খাচ্ছি না … আর শনিবার আমাদের হাতে এমন কিছু পয়সা ছিল না যে বেশী মাল খাব। শুধু বিপিন নয়, আমি, স্বপন, ভোলা, হামিদ … আমরা সবাই একবার ছুতো করে ঘরের দরজার সামনে দিয়ে ঘুরে এসেছি … পর্দা ফেলা ছিল কিন্তু ভেতরে ফ্যান ঘুরছিল তাই একটু পাশে সরে গিয়েছিল। ঝুমুর সায়া পরে বিছানায় বসা আর প্রদীপ মালের বোতল হাতে ওর কোলে মাথা রেখে শুয়েছিল। এটাকে কি বলবি?

 

— ওর সাথে প্রদীপের কেমন প্রেম প্রেম ব্যাপার ছিল না?

 

— হুমমম…। তা হবে হয়তো … শালা প্রদীপ মাঝ রাতে শুঁড়িখানায় প্রেম করছে … । আচ্ছা মহাদেব, প্রেম তো ওই সাহাদের মেয়ে স্বাতীও করে … সবাই জানে … ঘোষদের মোটকা পোলা শুভজিতের সাথে। ওরা তো বুক চিতিয়ে দিনের বেলায় নদীর ধারে … রেল স্টেশানে, বাজারে … সব জায়গায় ঘুরে বেড়ায় … কই রাত্রে ভাটিখানার ভিতরের ঘরে তো ঢুকতে হয়না… হয় কি?

 

মহাদেব বেশ থিতিয়ে গেল, কথাটা ঠিকই। শুড়িখানায় মেয়েছেলে … তাও আবার শনিবারের মাঝ রাত্রে … কেন? মহাদেব হাত বাড়িয়ে সিরাজের মুখের আধ খাওয়া বিড়িটা নিয়ে একটা ছোট্ট টান দিল। কিন্তু কোন উত্তর দিল না। হামিদ হাতের ঘড়িটা দেখে উঠে দাঁড়াল … বিড়িটায় একটা বড় টান দিয়ে পাশে ফেলে দিল, তারপর – সবই ঈশ্বরের লিলা … এই বলে কোমরের একটা ভঙ্গি করলো … সবাই হা হা করে হেসে উঠল।

 

স্বপন উঠে দাঁড়িয়ে প্যান্টটা ঝাড়তে ঝাড়তে বললো – তুই বড্ড ন্যাকা মহাদেব, আর নাহলে নাটক করছিস। তুই ওদিকে চাষাপাড়ার যূথিকার নাম শুনিস নি? সে তো নাম করা মেয়েছেলে, চৌধুরীদের বাড়ীতে বাঁধা ব্যাবস্থা ছিল … কি শুনিস নি?

 

কথা বার্তা আর বেশীদূর এগোয় নি … স্কুল বিল্ডিং এর বারান্দায় মুদসুদ্দি ঠ্যাং ঠ্যাং করে ঘণ্টা বাজিয়ে দিল … টিফিন শেষ। আবার ক্লাস শুরু হবে … টিফিনের পরেই আবার অঙ্কের ক্লাস … প্রবোধবাবু ক্লাসে এসেই ব্ল্যাক বোর্ডে ক্যালকুলাস শুরু করবেন। ওনার কাছে কোন মজা নেই, সবাই বাঘের মতো ভয় পায় … মহাদেবরা আবার ক্লাসের দিকে রওনা দিল।

 

তিন।

 

পাশেই কোন বাড়ীতে দুম করে বেশ সজোরে কে টেলিভিশান চালিয়ে দিল … হুম হাম করে কোন সিরিয়ালের রি-টেলিকাস্ট শুরু হয়ে গেল … কে যেন বেশ মিস্টি গলায় গান গাইছে … বড়ে আচ্ছে লাগতে হ্যাঁয় … ইয়ে ধরতি, ইয়ে দুনিয়া …। ব্যাস, মহাদেব সেই পূরণ স্কুল জীবনের স্মৃতি ছেড়ে বাস্তবে নেমে এলো, অথবা বলা যায় দড়াম করে বাস্তবে আছড়ে পড়লো।

 

সেই সব অন্ধকার রাত্রি … কৃষ্ণনগরের স্মৃতি … জলঙ্গী নদী … ছোটবেলার সেই সব বন্ধুর দল স্বপন, সিরাজ, বিপিন, ভোলা, হামিদ … এরা কে কোথায় জীবনের বাঁকে হারিয়ে গেছে। প্রথম প্রথম কোলকাতায় এসেও কিছু যোগাযোগ তো ছিলই … মাসে অন্তত একবার বাড়ীতে যেতেই হোত মার জন্য। কাজেই তখন কৃষ্ণনগরে যারা ছিল তাদের সাথে দেখা হোত, আড্ডা হোত। কিন্তু সবাই ছিল না, হায়ার সেকেন্ডারীর পর অনেকেই বাড়ী ছেড়ে এদিক ওদিক চলে গিয়েছিল। মহাদেব শুনেছিল যে সিরাজ আর হামিদ মুর্শিদাবাদের কোন কলেজে চলে গেছে, স্বপন কলকাতার এদিকেই পড়তে এসেছিল কিন্তু মহাদেবের সাথে কোন যোগাযোগ রাখে নি। বিপিন তখনও কৃষ্ণনগরেই ছিল, তার সাথেই যা একটু কথা বার্তা হোত। মহাদেব যখন এম.এস.সি – তে অ্যাডমিশান নিল, তখন বিপিনও কেমিস্ট্রিতে বি.এস.সি কমপ্লিট করে মেডিক্যাল রিপ্রেসেন্টেটিভ হয়ে কলকাতায় এসেছিল কিন্তু প্রথম কয়েক মাস ট্রেনিঙের পরে তার পোস্টিং হোল ভুবনেশ্বর … ব্যাস ওই সময়েই মহাদেবের সাথে তার শেষ দেখা।

 

সে সবও অবশ্য বেশ কয়েক বছর আগের কথা। কালে কালে মহাদেবেরও বেশ বেলা হয়েছে … একমাথা কালো কোঁকড়ান চুল এখন স্মৃতি, মাথার মাঝখানটা অনেকটাই সাফ, কানের দুই পাশে আর মাথার পিছনে কিছু কাঁচা পাকা চুল এখনও উঁকি মারছে। তবে মহাদেব চিরকালই একটু রোমশ, মানে সেই কিশোর বয়সের প্রথম গায়ে লোম ওঠার পর থেকেই। আজও তার কাঁধে বা বুকে বেশ ঘন লোম বিদ্যমান, অনেকটা ঘন কার্পেটের মতো। স্বাস্থ্য এখন অবশ্য ভালোই আছে … এই মুহুর্তে সে একটা স্যান্ডো গেঞ্জী আর পায়জামা পরে নিজের ঘরের একটা দামি সোফায় সে বসে আছে … বেশ পুরুষ্ঠু ডান হাতে আজকের কাগজটা, বাঁ হাতটা সোফার ওপর আলতো করে রাখা। কাগজটা ধরে আছে বটে কিন্তু পড়ছে না, জানলার বাইরে খানিকটা দূরে মেরিন লাইনস ফ্লাইওভারের দিকে তাকিয়ে আছে … বাঁ দিকে আলো ঝলমলে কুইন্স নেকলেস আর ডান দিকে শ্যামলদাস গান্ধী মার্গ।

 

সেই কৃষ্ণনগরের উঞ্ছ বৃত্তির দিন ছাড়িয়ে মহাদেব এখন অন্য জায়গায় পৌঁছে গেছে … আজকাল মাঝে মাঝে বাড়ীতে ছোটখাট পার্টিতেই কয়েক হাজার টাকা বেরিয়ে যায়, তাতে মহাদেবের বিরাট কিছু যায় আসে না। তবে এসব কিন্তু রাতারাতি হয়নি, বেশ কয়েক বছর সময় লেগেছিল। যাদবপুরে এম.এস.সি. শেষ করে যখন মহাদেব কি করবে ভাবছে তখন হঠাৎ টি.সি.এস. এর ক্যাম্পাস ইনটারভিউইয়ের লিস্টে নামটা এসে গেল। তাও আসতো না, কিন্তু এম.এস.সি.-তে ফার্স্ট হওয়া দেবজিত পি.এইচ.ডি. করার সিদ্ধান্ত নিল আর সেকেন্ড লাভলী মিত্র বিয়ে করে আমেরিকায় চলে যাওয়ায় মহাদেবের নামটা দশজনের লিস্টে শেষের দিকে ঢুকে গেল। আর মহাদেবের লাকটাও বোধহয় ভালোই খেলে গেল এই সময়। ইন্টারভিউতে তিনজন ছিল, তাদের মধ্যে একজনের বাবা ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্সের ক্যাপটেন। মহাদেবের বাবার কথা শুনে বোধহয় কিছুটা সহানুভূতিশীল হয়েছিলেন … কিম্বা মি. বাগচী হয়তো … পরে মহাদেব শুনেছিল যে ওনার মা কৃষ্ণনগরেরই মেয়ে। কাজেই যে কারণেই হোক, মহাদেবের চাকরীটা হয়ে গেল। ক্লাসে তার র‍্যাঙ্ক প্রথম দশজনের মধ্যেই ছিল, কিন্তু তার আগেও দারুণ ভালো সব ছেলে ছিল, কিন্তু চাকরীটা তারই হোল, আর অরুনের, অবশ্য সেও বেশ ভালো ছেলে। অবশ্য মহাদেব এটাও শুনেছে যে কোম্পানীরা এমন ছেলেই প্রেফার করে যারা ঝট করে চাকরী ছেড়ে পালাবে না, কাজেই ক্লাসের টপারদের অনেক সময় মিডিল লেভেলের কোম্পানীগুলো নিতে চায় না।

 

মহাদেবের প্রথম ট্রেনিং-টা হোল কলকাতায়, তারপর পোস্টিং হোল বাঙ্গালুরুতে, ওদের টেকনোলজি সেন্টারে। মহাদেব এই চাকরীটা পেয়ে একটা জিনিস করেছিল, সে তার জান কবুল করেছিল … যেটুকু খামতি ছিল তা খেটে পুষিয়ে দেবে। কৃষ্ণনগরের দিন গুলোর কথা তার মাথায় টগবগ করতো। ছ মাসের হ্যান্ডস অন ট্রেনিং সে ভালো ভাবেই পাশ করলো। তারপর তার আসল চাকরী জীবন শুরু হোল, বাঙ্গালুরুতে।

 

মহাদেবের কাজটা ছিল মেন্টেন্যান্স, ইকুইপমেন্ট আর সফটওয়ার ইন্সটলেশান ডিপার্টমেন্টে। প্রথম প্রথম সে বাঙ্গালুরুর মধ্যেই ঘুরতো, কিন্তু প্রথম বছর পার হোলে মহাদেব একটু সিনিয়রিটি পেলো কাজেই তারপর থেকে তাকে সারা ভারতেই চক্কর মারতে হোত। বাঙ্গালুরুতে প্রথম ছ মাস একটা মেসে থাকলেও তারপরে মহাদেব একটা দুঘরের ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিল আর মাকে কৃষ্ণনগর থেকে নিজের কাছে এনে রেখেছিল। চাকরীর বছর দুয়েক কমপ্লীট হোলে মার জোর আদেশ, এবার বিয়ে করতে হবে … তা সেটাও হোল। কলকাতার মেয়ে অনন্যা … তাকে নিজে পছন্দ করে সুলোচনা ঘরে আনলেন। ভাগ্যবতী সুলোচনা যাবার আগে নাতির মুখও দেখে যেতে পেরেছিলেন … প্রসেনজিত, মহাদেব আর অনন্যার একমাত্র সন্তান।

 

একটু অন্যমনস্ক হয়ে মহাদেব জানলার দিকে তাকিয়ে বসেছিল। টি.সি.এসের বাঙ্গালুরুতে চাকরী করেই মহাদেব শেষ হয়ে যায়নি, ওটা ছিল তার একটু বড় ট্রেনিং। তাও নয় নয় করে বছর সতেরো সে ওখানেই ছিল … বেশ মন দিয়েই কাজটা শিখাছিল। কাজের প্রয়োজনে তাকে সারা ভারত ঘুরতে হোত আর এই ভাবেই নানা লোকের সাথে আলাপ হয়েছিল। টি.সি.এসের বড় ক্লায়েন্টদের মধ্যে ছিলেন মি. সিঙ্ঘানিয়া, তাঁর মিডিল সাইজের কম্পানীর শাখা ছিল বাঙ্গালুরু আর মুম্বাইতে। একচুয়ালী সিঙ্ঘানিয়ার কোম্পানীতে আই.টি. সলিউশান দিতে গিয়েই ওনার সাথে আলাপ হয়েছিল, ভারি হাসি খুশী মানুষ। মহাদেব নানা সময়ে বেশ কয়েকবার ওনাদের অফিসে গিয়েছিল, কয়েকবার মুম্বাইতেও। ব্যাবসাটা আর কিছুই নয়, মোবাইল টেকনোলজি। মি. সিঙ্ঘানিয়া বা তাঁর ছেলে মাঝে মাঝেই বাইরে যায়, নানা ফরেন কোম্পানী যেমন নোকিয়া, মাইক্রোসফট বা এই রকম কোন কোম্পানী থেকে নতুন টেকনোলজি কিছু পেলেই কোলাবরেশান করে সেটা ভারতে নিয়ে আসেন, সিঙ্ঘানিয়া মোবাইল সলিউশান এর কাজই এটা। এছাড়া এদের সাথে ভারতে এয়ারটেল, রিলায়েন্স বা টাটাদের কমিউনিকেশান … সবারই টেকনোলজি সেক্টরে ঘনিষ্ঠ কোয়াপরেশান আছে, আছে মার্কেটিং অ্যালায়েন্স। এখনকার থ্রি জি আর ফোর জির বাজারে সিঙ্ঘানিয়া মোবাইল সলিউশান রমরম করে এগিয়ে চলছে। মহাদেবের সাথে কয়েকবার মিট করেই সিঙ্ঘানিয়ার ওকে ভালো লেগে গিয়েছিল, কাজেই জব অফারটা একচুয়ালি বেশ পুরনো, মানে বছর চারেকের তামাদি অফার। মহাদেব যখন একলা বাড়ীতে বসে থাকতো, এই নিয়ে অনেক ভাবতো। ঝরাকসে তের চোদ্দ বছরের পুরনো চাকরী কেউ ছেড়ে দিতে পারে না, তাছাড়া মহাদেবের কাছে সাফ কথা … কোনটা বেটার? টি.সি.এস. একটা গ্লোবাল ফার্ম, একটু খাটনি বেশী হয় ঠিকই, কিন্তু স্যালারী, পেনশান, গ্র্যাচুইটি ইত্যাদিতে ভালোই পুষিয়ে দেয়, তাছাড়া জব সিকিয়রিটি বলে একটা ব্যাপার তো আছেই … টি.সি.এসে মহাদেবের এখন বেশ সিনিয়র পোজিশান। আর সিঙ্ঘানিয়া … লোকটা ভালো, কিন্তু টি.সি.এসের তুলনায় তার ফার্ম আর কতটুকু? সারা পৃথিবীতে সিঙ্ঘানিয়া মোবাইল সলিউশান-কে চেনেই বা কে? কিন্তু তাও মনটা একটু খুঁত খুঁত করতো, পনের বছর পরে টি.সি.এসের চাকরীটা যেন কেমন ম্যাদা মেরে গেছে, আর আগের মতো সেরকম চার্ম নেই … অবশ্য সিঙ্ঘানিয়া ছাড়াও আরো বেশ কয়েকটা অন্য অফারও তার ছিল, কিন্তু কোনটাকেই সে টি.সি.এসের রিপ্লেসমেন্ট হিসাবে ভাবতে পারছিল না।

 

এ সব ব্যাপারও অবশ্য প্রায় বছর সাত আট আগের, তখনও অনন্যা বেঁচে … মাঝে মাঝেই সন্ধ্যা বেলায় তাদের বাঙ্গালুরুর ফ্ল্যাটে বসে দুজনায় এই সব আলোচনা চলতো, মাঝে মাঝে আলতো তর্কও হোত। মহাদেব মনে মনে তৈরী হচ্ছিল, অনন্যাও অবশ্য কোনদিন তাকে কোন কিছুতেই বাধা দেয়নি শুধু একটু সাবধান করতো … এই যা।

 

ঠিক এই রকম দোদুল্যমান অবস্থাতে একটা বড় সুযোগ এসে গেল। সিঙ্ঘানিয়ারা একটা নতুন ভেঞ্চারে যাচ্ছিল এয়ারটেলের সাথে … ইন্ডিয়ার মোবাইল টেকনোলজি আফ্রিকায় এক্সপোর্ট করা। নাইজেরিয়ার জিডিপি এখন প্রতিবছর প্রায় সিক্স পারসেন্ট করে বারছে, কাজেই আফ্রিকার দিকে টেক কোম্পানীগুলোর বিজনেস প্রসপেক্ট এখন দারুণ ব্রাইট। সিঙ্ঘানিয়া আর এয়ারটেলের বস সুব্রামানিয়ম সেদিকেই ছিপ ফেলেছেন, কোম্পানীর নাম সফটকম। ওনারা এই বিজনেসে একজন সিনিয়র লোক খুঁজছিলেন যে সফটওয়ার বিজনেসটা ভালো বোঝে। আর লোক তো বহুদিন থেকেই রেডি … মহাদেব এই রকম একটা দাঁও মারার ধান্দাতেই ছিল … বাঙ্গালুরু থেকে সফটকমের টপ সি.ই.ও.-র পোজিশান নিয়ে মুম্বাই-এ শিফট করে এলো ফ্যামিলী নিয়ে। রীতিমত বড় পোজিশান, সফটকমের সমস্ত বিজনেস ডিল মহাদেবের ডিসিশান অনুযায়িই চলবে, শুধু মাঝে মাঝে সিঙ্ঘানিয়া আর সুব্রামনিয়ামের সাথে ফাইনান্স নিয়ে কথা বলতে হবে। অর্থাৎ যাকে বলে খোলা আকাশ, যা পারো নিজে কর … আর নিজের কাজের দায় নিজে সামলাও। বাঙ্গালুরু থেকে আনন্দে লাফাতে লাফাতে মহাদেব মুম্বাইতে হাজির … সঙ্গে বছর পনের ষোলর ছেলে প্রসেনজিত আর স্ত্রী অনন্যা।

 

… to be continued

~ শীল vs. শীল -(প্রথম পর্ব) ~

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

*