শীল vs. শীল -(প্রথম পর্ব- Click here

চার।

 

তা মুম্বাইতে প্রথম এসে দিনগুলো বড়ই আনন্দে কাটছিল … থ্রি বেড রুম ফ্ল্যাট বেশ জমজমাট লোকেশানে … তাও ফুললি পেড বাই সফটকম। যাতায়াতের জন্য চব্বিশ ঘন্টার গাড়ী, সঙ্গে ড্রাইভার … সমস্ত পেট্রলের খরচ কোম্পানীর। ব্যাস, আর কি চাই … এর থেকে বেশী মহাদেব স্বপ্নেও ভাবেনি, অনন্যাও নয়। এর সাথে অবশ্য আরো একটা ব্যাপার ছিল … বছরে বার দুয়েক আফ্রিকায় বিজনেস ট্রিপে যাওয়া। তা সেটা অবশ্য অনন্যা খুব একটা পছন্দ করেনি … ওর ভাষায় … ওরে বাবা, ওই সব ডেঙ্গী, ইবোলা … ব্ল্যাক মাম্বা … সিংহের দেশে কে যায়। প্রথম প্রথম মহাদেব যখন যেত তখন অনেকবার বউকে রিকোয়েস্ট করেছে, অফিসের কত কলীগই তো বউকে সঙ্গে নিয়ে ট্যুরে যায় … কিন্তু না, অনন্যা নিজে যায় নি, ছেলেকেও যেতে দেয় নি। শুধু যাবার আগে অনন্যা মহাদেবকে ব্যাগ গুছিয়ে দিত, হাজারটা প্যারাসিটামল আর ডায়ারিয়ার অষুধ ব্যাগে ভরে দিত আর ঠিক বাড়ী থেকে বের হবার আগে টাইটা ঠিক করে দিতে দিতে বলতো

– শোন, প্রত্যেক দিন একবার করে ফোন কিন্তু অবশ্যই করবে। আর সন্ধ্যের ঠিক আগেই ঘরে ঢুকে পড়বে … ওই সব জায়গায় যা মশার উপদ্রব।

শেষের কথাটা অবশ্য ঠিক নয়, নাইজেরিয়ায় বিজনেস ট্রাভেলার্সদের জন্য অনেক ফাইভ স্টার হোটেল আছে যা ইন্টারন্যাশানাল স্ট্যান্ডার্ড। যাই হোক, প্রথম কথাটা মহাদেব অবশ্যই রাখতো, ট্যুরে থাকা কালিন টাইম জোন ক্যালকুলেট করে রেগুলার ফোন করতো। অনন্যা মাম্বা, সিংহকে বড় ভয় করতো, কিন্তু ডেঙ্গী ভারতেও হয়। এই রকম একটা ট্যুরের সময়ই অনন্যা জ্বরে পড়ল, দিন সাতেক পরে মহাদেব বাড়ী ফিরে বউকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল কিন্তু তখন বেশ দেরী হয়ে গেছে … অনন্যা সেই ডেঙ্গীতেই চলে গেল।

 

******

 

মহাদেব আজকে এই সব এলোমেলো কথাই ভাবছিল। অনন্যা চলে যাবার পর তার আরো উন্নতি হয়েছে, তার এই নতুন বাড়ীটা হয়েছে … অনন্যা অবশ্য এই ফ্ল্যাটে কয়েকবার এসেছিল, তখনও কনস্ট্রাকশান চলছে, সেই হিসাবে এখানেও তার ছোঁয়া আছে। তারপর থেকে মহাদেব একাই থাকে, শুধু নতুন কিছুর মধ্যে তার ড্রিঙ্কিং হ্যাবিটটা আর একটু বেড়ে গেছে। ছেলে প্রসেনজিত এখন বড় হয়েছে। সে এখন বছর পঁচিশের যুবক … গ্র্যাজুয়েশানের পর আর পড়াশুনো করেনি … এই মুম্বাই শহরে তার প্রায় কয়েক শো বন্ধু বা বান্ধবী। এই মুহুর্তেও সে তার সেকেন্ড হ্যান্ড ফোর্ড মনডেওটা নিয়ে কোথাও গেছে। মহাদেব মোর অর লেস সিওর যে জিতু, মানে তার ছেলে প্রসেনজিত এখন একদল বন্ধু বান্ধবী নিয়ে দামি কোন রেস্তোরাঁতে আড্ডাতে ব্যাস্ত, এবং এই রকম জমজমাট মুম্বাইয়ের সন্ধ্যেতে ওরা সবাই জলপথেই থাকে। ড্রিঙ্কিং এর ব্যাপারে ছেলে বাবার থেকে কম কিছু যায় না। মহাদেবের অ্যাকাউন্ট থেকে জিতুর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে যা পকেটমানি যায় তা আজকালকার দিনেও অনেকের স্যালারির সমান। তা সত্তেও ছেলে বাপে টাকা নিয়ে মাঝে মাঝেই তুমুল ঝগড়া হয়। ব্যাপারটা জিতুর দোষ নয় আবার মহাদেবের দোষও নয়। যদি কিছু দোষ থাকে তা জিতুর মা অনন্যার। ছেলে আবদার করে কিছু চাইলে মা না করতে পারতো না আর মহাদেবের অত খোঁজ খবর করার সময় কোথায় …! সে তখন তার কোম্পানী আর ক্যারিয়ার নিয়ে বড়ই ব্যাস্ত … নিজেকে সিঙ্ঘানিয়ার কাছে প্রমান করতে হবে তো …! কাজেই জিতুর খরচের হাত খুব খোলা আর তাছাড়া বন্ধুদের কাছে নিজের দাম বাড়ানোর একটা নেশা তো এই বয়সের সবার মধ্যেই থাকে। মহাদেব এই সব নিয়ে বিরাট কিছু ভাবে না কারণ জিতু বাবার থেকে একটু দূরে দূরেই মানুষ হয়েছে, ওর ফেভারিট ছিল মা … তা মা তো কবেই আউট হয়ে প্যাভিলিয়ানে, এখন বাবা আর ছেলের পার্টনারশিপ চলছে। জিতু কখন বাড়ীতে আসে, কখন বাইরে যায় মহাদেব তা খবর রাখে না … বাড়ীতে একজন কুক রাখা আছে, তার কাছ থেকেই যা মাঝে মাঝে খবর পেয়ে থাকে। তাছাড়া সে বড়ই বিজি লোক, অফিসের আরো দায়িত্ব বেড়েছে আর বেড়েছে পার্কস।

কিন্তু মহাদেবের প্রবলেমটা অন্য জায়গায়। অনন্যা চলে যাবার পর তো কয়েক বছর চলে গেছে, মহাদেব একাই কাটাচ্ছিল … কিন্তু গত কয়েক বছর কেমন যেন একটা অন্য রকম ভাব তার মনের গভীরে বাসা বেঁধেছে। তার জীবনের এতো সাকসেস সেটা কিসের জন্য? কার জন্য? সন্ধ্যে বেলায় বাড়ীতে একা বসে সে মাঝে মাঝেই এই সব কথা ভাবতো। তাকে মাঝে মাঝেই অফিস পার্টিতে মুম্বাইয়ের নানা হোটেলে যেতে হয়। বড় অফিসের বড় পার্টি … কাজেই ঢালাও আয়োজন এবং অনেক ক্ষেত্রে গেস্ট আলাওড। কাজেই অফিসের অনেকেই তাদের পার্টনারকে নিয়ে আসতো … কেউ বউ কেউ বা গার্ল ফ্রেন্ডকে। আর গত কয়েক বছর ধরে মহাদেব এই সব পার্টিতে একাই। এই সব হাই এন্ড পার্টিতে কোন কিছুই আউট অফ বাউন্ড নয়। গভীর রাত্রে পার্টির পর অনেকেই তার পার্টনারকে নিয়ে কোথায় হাওয়া হয়ে যায়, অফিস তার খবর নিতে যায় না। এই সব পার্টি শুধু সিঙ্ঘানিয়ার কোম্পানিকে নিয়েই হয় না, অসংখ্য সিস্টার কনসার্নের এমপ্লয়িরাও জয়েন করে। আর আছে ন্যাশানাল বা ইন্টারন্যাশানাল বহু ক্লায়েন্ট। বড় বড় ফাইভ স্টার হোটেলের পার্টি হল গুলো অসংখ্য সুন্দরী রিসেপশনিস্ট, সেক্রেটারি, টাইপিস্ট আর ম্যারেড আনম্যারেড এমপ্লয়ি আর সুন্দরী মহিলায় গিজ গিজ করে। এই সব পার্টি থেকে অসংখ্য রিলেশানসিপ শুরু বা শেষ হয়। যারা একটু বোল্ড টাইপ তাদের পক্ষে আন-ম্যারেড মেয়েদের সাথে ফ্লার্টের স্বর্গ হচ্ছে এই সব পার্টি … কেউ কেউ তো এই সব মান্থলি গ্যাদারিং-য়ের জন্য মুখিয়ে থাকে। স্মার্টনেস আর দামি ঝলমলে পোশাক … কোন ভাবে কাউকে পটাতে পারলেই হোল। মুম্বাই ইনটারন্যাশানাল সিটি … এখানে সব কিছুই অ্যালাওড … পার্টির শেষে একটা ট্যাক্সি ডেকে দুজনে উঠে পরলেই হোল … কে কোথায় যাচ্ছে তা দেখার দায়িত্ব কারুরু নেই। মহাদেবেরও অনেক সুযোগ ছিল … ছিল সিংঘানিয়ার ইঙ্গিত … কিন্তু খানিকটা ব্যাকডেটেড, খানিকটা লাজুক বলে খুব একটা কিছু করে উঠতে পারেনি। কিন্তু মনের মধ্যে কোথায় একটা একাকিত্ব যেন বেড়েই যাচ্ছে। অফিসের পেড হলিডে গুলোও তো মার খাচ্ছে … কাঁহাতক আর একা একা গোয়া, সিমলা, দার্জিলিং করা যায়।

এর মধ্যে অফিসে একটা হিড়িক এলো … ফেসবুক। অফিসের সব বড় বড় সিনিয়র টেকনিক্যাল স্টাফরা লাঞ্চ টাইমে মাথা গুঁজে ফেসবুক আপডেট করে যাচ্ছে বা ফেসবুকের মাধ্যমে পাওয়া নতুন বন্ধুকে ইমেল করে যাচ্ছে। নিজের ঘরে বসে চিকেন বিরিয়ানি বা চানা বাটোরা চিবোতে চিবোতে মহাদেব কাঁচের দেওয়ালের মধ্যে দিয়ে সবই লক্ষ্য করতো … কিছু একটা মজা নিশ্চয় আছে এর মধ্যে না হলে … ধরা যাক মি. ভার্গবের কথা, অফিসের অ্যাকাইন্ট্যান্ট … বয়স প্রায় পঞ্চান্ন … কিন্তু হাতে সেরকম কাজ না থাকলে কি মনযোগের সাথেই না ফেসবুক খুলে বসে … অনেক সময় পাশে টেবিলে রাখা চা ঠান্ডা হয়ে যায়, খেয়াল থাকে না। মহাদেব ভাবে, নাঃ, কিছু একটা ব্যাপার আছেই ভাই, যাই বলো, না হোলে বুড়ো বুড়ো লোক, বাড়ীতে বউ, দু তিনটে ধারি ছেলে মেয়ে, কিন্তু অফিসে বসে ফেসবুক মেরে যাচ্ছে … অনেকে তো আবার মোবাইলে চ্যাট করে বা ফেসবুক বন্ধুর সাথে কথা বলে পুরো লাঞ্চ টাইম পার করে দেয়, কলীগদের সাথে আড্ডা মারার টাইমই নেই।

নাঃ, ব্যাপারটা একটু দেখতে হয়। চার পাঁচ বছর আগের মতো এখন আর মহাদেবকে অফিসের অত চাপ আর নিতে হয় না কারণ এখন দুজন সি.ই.ও. আছে যারা মহাদেবের আন্ডারে কাজ করে। কাজেই উইক এন্ড গুলো এখন তার ফাঁকা … তাই বেশীর ভাগ সময় বাড়ীতেই থাকে, মাঝে মাঝে অবশ্য অখিলেশ বর্মা বা দিভেচা ফোন করে ডাকলে একটু আধটু গলফ খেলতে যায়। এদিকে জিতু বাড়ীতে অবশ্য বাপের তোয়াক্কা খুব একটা রাখে না। মহাদেব ওকে বাড়ীতে কোনার দিকে একটা বড় ঘর ছেড়ে দিয়েছে, ঘরটা অন্য দুটো ঘরের থেকে কিছুটা সেপারেট। কাজেই সেখানে বন্ধু বান্ধবীদের নিয়ে জিতু প্রায়ই পার্টি বসায়। মহাদেব নিজের ঘর থেকে লাউড মিউসিক আর উঁচু হাসির শব্দ পরিস্কার শুনতে পায়। সত্যি কথা বলতে … ওদের লাইফের আনন্দ, খুশী এই সব দেখে মহাদেবের মনটা কেমন হু হু করে, কারণ জিতুর যা বয়স ঠিক এই বয়সে মহাদেব কলকাতায় দাঁতে দাঁত চিপে পকেটে একটা পঞ্চাশ বা একশ টাকার নোট নিয়ে জীবনের সাথে লড়ে যাচ্ছে। জিতু মহাদেবের যুদ্ধের কথা খুব একটা জানে না, খুব একটা পরোয়াও করে না। আজকালকার ইয়ং জেনারেশানের ফিলজফি খুব সিমপল – বাবা হিসাবে জন্ম যখন দিয়েছ, দেদার পয়সা হাত খরচা দিয়ে আনন্দের রাস্তাটাও খুলে দাও … ব্যাস ঝামেলা খতম। জিতুর সাথে তার বাবার সম্পর্কটাও এই টুকুই … প্রতি মাসে তার পকেট মানি ব্যাঙ্কে চলে গেলে সে তার বাবাকে খুব একটা বিরক্ত করে না।

 

পাঁচ।

 

জিতুর একজন স্পেশাল বান্ধবীও আছে, তাকে ও মাঝে মাঝে বাড়ীতে নিয়ে আসে। মহাদেব অবশ্য সেটাও খুব ভালোমতো জানে। এখন অবশ্য কোনদিন রাত্রে থাকে নি কিন্তু মুম্বাইয়ের মডার্ন সোসাইটিতে ওরা ঘোরা ফেরা করে কাজেই তাও একদিন ঘটবে, মহাদেব সেটাও ভালোমতোই বোঝে। এই সব ঘটনা গুলো মহাদেবের একাকীত্ব আরো বাড়িয়ে দেয় … অনন্যা যখন ছিল তখন বাড়ীতে তার একজন দোস্ত ছিল, ওরা প্রায় বন্ধুর মতোই ছিল … কখন কখন সমুদ্রের ধারে বেড়াতে যেত, কখন বা সুপার মার্কেটে সপিং … সময় ঠিক কেটে যেত। এখন ঠিক ওই জায়গাতেই প্রবলেম … ছেলে তার বন্ধু বান্ধবীদের নিয়ে ব্যাস্ত … জিতুর ঠিক একটাই গার্ল ফ্রেন্ড না তার বেশী তা মহাদেব জানে না … আর জানার দরকারই বা কি? ওরা আছে ওদের মতো, শুধু কোন স্ক্যান্ডাল না হোলেই হোল। আর মহাদেব সিওর, আজকালকার কলেজে পড়া মেয়েরা যা সেয়ানা, ওরা আর যাই করুক, বিপদের রিস্ক নিয়ে কিছু করবে না, আর তাছাড়া এরা প্রায় সবাই উচ্চাকাঙ্ক্ষী কাজেই দুম করে কেউ কাউকে বিয়েও করবে না। মহাদেবের এখন নিজের লাইফে কিছু করা দরকার।

তা সে করলো … একদিন ঝাটাকসে ফেসবুকে একটা একাউন্ট খুলে বসলো। মাঝে মাঝে সন্ধ্যের দিকে বা উইক এন্ডে সে তার ট্যাবলেটে নানা চ্যাট সাইটে ঘুরে বেড়াত। কিন্তু ওতে মন ভরে না, সারাক্ষণ অ্যানোনিমাস হয়ে থাকার ভ্যান্তারা। আর কি সব নাম … স্পেশ জাঙ্কি, ওয়ার হর্স, সুসু মাস্টার, পিওর জয় … ব্লা ব্লা। মহাদেবও অ্যানোনিমাসই ছিল, নাম নিয়েছিল গ্লোবাল কাইট। কিন্তু তার ওসব চলে না, মানে পাতি কথা ভালো লাগলো না, অতএব নিজের নামে ফেসবুকে একটা একাউন্ট খুলে তার শান্তি। তাছাড়া আরো লাফরা আছে চ্যাট সাইটে … কখন কোন টপিক নিয়ে কথা হয় তা আগে থেকে জানা যায় না, সব কিছু আবার মহাদেবের ভালোও লাগে না, আর তাছাড়া এ তো সবাই জানে যে কোন কোন চ্যাট সাইটে পুলিশ নাক গলিয়ে ঘাপটি মেরে বসে থাকে … কখন আই.পি. অ্যাড্রেস খুঁজে বাড়ীতে হানা দিলেই হোল।

নাঃ ওসব ঝামেলায় না গিয়ে সোজা সাপটা একটা অ্যাকাউন্ট ফেসবুকেই খুলে ফেললো … তাও তো আজ প্রায় মাস ছয়েক হয়ে গেলো। ফেসবুক ব্যাপারটা কিন্তু বেশ ম্যাজিকাল। মহাদেব বেশ যত্ন করে প্রোফাইলটা তৈরী করেছিল … মানে এই যেমন hobbies … গান … সেমি ক্লাসিক্যাল … গায়ক … মান্না, রফি, কিশোর, হেমন্ত, কে. এল. সাইগল, সচিন দেব বর্মন … সিনেমা … ওল্ড ক্ল্যাসিকস … যেমন হোয়েন হ্যারি মেট স্যালি, সদমা, অভিমান, বা এই রকম … সাহিত্য … ক্ল্যাসিক নভেলস এন্ড সর্ট স্টোরিস। আরো কিছু কিছু পছন্দ অপছন্দের ব্যাপার অ্যাড করা ছিল। প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কয়েকটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এলো। তাদের মধ্যে অবশ্য কয়েক জন বেশ ক্যাসুয়াল মানে মাঝে মাঝে দু একটা ইমেল করে ব্যাস সব বন্ধ। কিন্তু একটা মেয়ে … রিয়া … বোধহয় বেশ মড টাইপের, তার সাথে মহাদেবের যোগাযোগ বেশ জমে উঠলো। প্রথমে ছিল ফেসবুক আপডেট আর মেসেজ তারপর এলো ইমেল এক্সচেঞ্জ। ইমেলে নানা রকম গল্প, জোকস সবই চলছিল কিন্তু তার বেশি কিছু নয়। ঐ যে বলেছি, মহাদেব একটু লাজুক আর ব্যাকডেটেড, তাই দুম করে দেখা করার কথাটা আর বলে উঠতে পারেনি … কিন্তু মোটের ওপর ভালোই কাটছিল এই নতুন বন্ধুত্ব। কিন্তু মেয়েটা একটু ফাজিল আর একটু বোল্ড টাইপ … ও একদিন ইমেলে সোজা নিজের মোবাইল নাম্বারটা পাঠিয়ে ওরটা চেয়ে পাঠাল। মহাদেব আর কি করে, তাছাড়া পেটে পেটে ইচ্ছে তো আছেই … কাজেই নিজের নাম্বারটা পরের ইমেলে পাঠিয়ে দিল। সেই দিন থেকেই ওদের কথা বার্তা শুরু হোল।

সেই থেকেই চলছে, মানে রিয়া মনমরা মহাদেবকে একটু চাঙ্গা করে তুলেছে। মাঝখানে রিয়া ওকে ইমেলে কয়েকটা ফটো পাঠিয়ে দিয়েছে … কোন একটা ছোটখাট পার্টির ছবি … বেশ কয়েকজনের মধ্যে রিয়া বসে আছে। তা মন্দ নয় … এই বয়সে এই রকম বন্ধু পাওয়া বেশ ভাগ্যের ব্যাপার। রিয়া একটা মিলিটারী লতা পাতা আঁকা সবুজ জিনস টাইপের প্যান্ট আর একটা ডিপ গ্রে রঙের লঙ হ্যান্ড টি শার্ট পরে তিন চার জনের মাঝখানে বসে আছে। দেখলেই বোঝা যায় বেশ উচ্চবিত্ত ভদ্র ঘরের মেয়ে … মাথার চুলগুলো পিছনে টান করে বাঁধা … বেশ শার্প নাক মুখ চোখ … অবশ্য যতটুকু ফটোতে বোঝা যাচ্ছে। মহাদেব মাঝে মাঝেই ট্যাবলেটে এই ফটোটা দেখে, বুকের মধ্যে কেমন যেমন গুর গুর করে।

আজকেও সেইরকম। সকালে একবার ইমেল চেক করেছিল, রিয়ার একটা মেল এসেছে, সাবজেক্ট শুধু –Hi। বিশেষ কিছু খবর নেই, তবে বলেছে যে আজ সন্ধ্যে আটটার পর হয়তো ফোন করবে। সে মন্দ নয়, মহাদেব তো এই রকমই চায়, কেউ তাকে ফোন করুক, একটু খবর নিক, একটু হাঁসাক … মোদ্দা কথা তাকে একটু মানসিক আনন্দ দিক। ছোটবেলায় সে তার মায়ের সাথে বছরের পর বছর দারিদ্রের সাথে লড়ে গেছে … লড়ে সে জয়ী হয়েছে, টাকার কোন প্রবলেম তার আর নেই, হয়তো তার জীবনে আর কোনদিন দারিদ্র আসবে না। কিন্তু অনন্যা চলে যাবার পর সে একা, ছেলে জিতু বাবার সাথে তেমন সময় কাটায় না, তার অনেক বন্ধু বান্ধব, তাছাড়া হয়ত তার কাছে মহাদেব একটু পুরনো জমানার কাজেই সেরকম মানসিক কানেকশান নেই। মহাদেব অফিসে পুরো সেট, অনেক কাজ তার … সে একটা কোম্পানীর টপ পজিশানে, অতগুলো লোকের স্যালারীর দায়িত্ব তার হাথে, কাজেই বাজে কথার সময় তার নেই, কিন্তু বাড়ীতে ফিরে আসলেই প্রবলেম … এখানে সে একা, এই রকম একাকীত্ব ভরা সন্ধ্যাগুলোয় বা উইক এন্ডে তার মনের সঙ্গী দরকার … আর অবসরের সেই সঙ্গী অবশ্যই অফিসের কোন গোমরা মুখো অফিসার বা গলফ খেলার সঙ্গী ভার্মা নয়, অন্য কেউ। রিয়া কি সত্যিই তার বন্ধুত্ব যায় নাকি এটাও কোন মজা?

 

ছয়।

 

জিতু তার পুরনো ফোর্ড গাড়ীটাকে পার্ক করে রেস্তোরাঁয় ঢুকলো … জায়গাটা সান্টাক্রুজ আর জুহুর খুব কাছাকাছি। বেশ নামকরা রেস্তোরাঁ … পার্কিং প্লটটা গাড়ীতে থিক থিক করছে। ওর বন্ধুরা বোধহয় এর মধ্যেই এসে গেছে … রেমোর নতুন হণ্ডাই গাড়ীটা তো দেখাই যাচ্ছে। জিতু গাড়ীটা পার্ক করে চাবিটা পকেটে রাখতে রাখতে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো … ভেতরে যথারীতি বেশ ভিড়। জিতু অন্যান্য বারের মতো প্রথমেই বাঁ দিকে একটা ছোট করিডোরের মধ্যে জেণ্টস রেস্ট রুমে ঢুকে গেল। এটা তার বরাবরের অভ্যেস, প্রথমে চোখেমুখে একটু জল দিয়ে ফ্রেস হয়ে সে ঠেকে গিয়ে বসে।

জিতু তার ডেইলি রিচুয়াল সেরে বেরিয়ে এলো … হাতে একটা রুমাল, মুখে চোখে তখন জল লেগে আছে। সে বেরিয়ে এদিক ওদিক তাকাল, কোথায় কোন টেবিলে যে তার buddy-রা বসে আছে কে জানে। আর এই এক হয়েছে, যত দামি হোটেল রেস্তোরাঁতেই যাও, সন্ধ্যেবেলায় ফাঁকা কোথাও নেই … থিক থিক করছে ফ্লোরটা, লোকের এতো পয়সা যে কোত্থেকে আসে কে যানে। জিতুর তো ওই পয়সা নিয়েই যত ঝামেলা, বাবার সাথে এই সেদিনই ঝগড়া হয়ে গেলো … । আর এই সব বন্ধু, … মাই গড। ওদের পকেটে হাজার বা পাঁচশ টাকার নোটের তারা দেখে চোখ টেরিয়ে যায়। ওদের বাবারাও অবশ্য বেশ হোমরা চোমরা লোক … কেউ কেউ বড় ব্যবসায়ী। কিন্তু জিতুর বাবাই বা কম কি, ওর পকেটে অত টাকা কোনদিনই থাকে না। জিতু সাবধানে কয়েকটা টেবিল আর তুমুল স্পীডে খাবার হাতে যাতায়াত করা butler-দের কাটিয়ে নিজের গ্রুপের দিকে এগিয়ে গেলো।

ওরা আগেই এসে গেছে, … মানে ববিতা, রেমো, দলজিত, সোনাম, বালু, অর্ক, অভি, শালিনী আর সেই নতুন মেয়েটা, কি যেন নামটা, মাম্পি না পিউ কি একটা। মেয়েটা বোধহয় অর্ক না অভির চেনা, মানে কোন চ্যাট রুমে আলাপ হয়েছে। ওদের যেরকম, একটু আলাপ হতেই গ্রুপে মিট করতে বলেছে, … মেয়েটাও এসে হাজির। অবশ্য মেয়েটা খারাপ নয়, বেশ ফ্রেন্ডলি, আপ ব্রিঙ্গিং বেশ ভালো বলেই মনে হয় মানে ভালো ফ্যামিলির মেয়ে। জিতুর সাথেও মোটামুটি আলাপ হয়ে গেছে। জিতু কে দেখে ওরা ডাকলো …

অর্ক। হাই জিতু, এদিকে …।

জিতু একটা হাত তুলে এদিক ওদিক তাকাল, হাতে খাবার নিয়ে তুমুল স্পীডে আসা কারোর সাথে হঠাৎ দুম করে ধাক্কা লেগে গেলেই আর কি, জামা কাপড় একদম ধোসার চাটনি বা কোন ভেজি তরকারির রসে একেবারে মাখামাখি হয়ে যাবে। ভিড় কাটিয়ে জিতু দলের মধ্যে এসে একটা চেয়ার টেনে নিল …।

জিতু। তোরা সব এসে গেছিস দেখছি, … মাই গড, আজকে এতো ভিড় কেন…?

অর্ক। জানি না ভাই, তবে মনে হয় লোকের পকেট আজকাল বেশ গরম।

দলজিত বোধহয় কিছু অর্ডার দিয়েছে … ওর সামনে একটা ছোট্ট বাটিতে কি একটা স্যুপের মতো ঝোল ঝোল তরল রয়েছে আর একটা ডিশে কিছু কটকটে করে স্যাঁকা পাউরুটি। ও একটা ব্রেড নিয়ে বাটির স্যুপে ডুবিয়ে কুটুস করে কামড় দিল, … তারপর একটুক্ষণ বেশ তারিয়ে তারিয়ে চিবিয়ে বললো …

দলজিত। টাকার ব্যাপারে চিন্তা নেই, মুম্বাইতে লোকে টাকা ধার করেও হোটেলে খায়। এটা একটা কালচারের ব্যাপার।

ববিতা ডান হাত দিয়ে দলজিতের একটা পাউরুটি একটু ভেঙে মুখে ফেলে দিল, তারপর জিতুর দিকে তাকিয়ে বললো – হ্যারে জিতু, তোর সেই অ্যাপ্লিকেশানের কি হোল? কিছু রিপ্লাই পেলি?

জিতু। অল ক্র্যাপ …। আমায় ডেকেছিল, তারপর ওদের জেনারেল ম্যানেজার আমায় হাজার কোয়েশ্চেন করলো, … আমি কি এই জানি … ওই জানি, হাজার একটা ডিম্যান্ড । আরে আমি কি জানি না জানি তা তো আমার সি.ভি.-তেই লেখা। ঠিক কিনা? তারপর আবার অতো বাহানা কেন? পছন্দ না হোলে না ডাকলেই হয় …।

ববিতা। আচ্ছা, তোর বাবাও তো ইন্ডাস্ট্রির একজন বিগ শট, তো বাবাকে বলিস না কেনো?

জিতু। বাবাকে বলেছিলাম …। বাবার তো টেকিনিকাল সাইড আর আমার কমার্স … খুব একটা মিলছে না। বাবা একটা ছোটখাট চাকরী এখনি করে দিতে পারে … মানে এই অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা ওই জাতীয় কিন্তু ও সব পোস্ট আমার ভালো লাগে না। আমি একটু হাই পোস্ট খুঁজছিলাম কিন্তু experience-এ আটকে যাচ্ছি।

দলজিত তার দ্বিতীয় পাউরুটিটা মুখের মধ্যে চালান করে আবার বেশ চেরিস করে চিবলো, তারপর মুখটা একটু খালি হোলে বললো – এই দিক থেকে ভাই আমি লাকি। কলেজ ছেড়েই বাবার বিজনেসে ঢুকে পরেছি … বেকার থাকার কোন ব্যাপার নেই। এখন নতুন বলে একটু কাজ শেখার ব্যাপার আছে কিন্তু বছর খানেক পরেই তো কোন সেকশানের ম্যানেজার হয়ে যাব, তখন পকেটে যা মাল আসবে না … ব্যাপক!

এই বলে দলজিত দুই হাত দিয়ে একটা ভঙ্গি করলো যার অর্থ বেশ বড় একটা অ্যামাউন্ট। মাম্পি বলে মেয়েটা একটা সফট ড্রিঙ্কসের বোতল নিয়ে বসে ছিল, সে জিতুর সাপোর্টে এগিয়ে এলো …

মাম্পি। না না জিতু … তুমি ভেবো না, … কিছুদিন দেখো, নিশ্চয়ই তোমার কিছু একটা হয়ে যাবে। হয়তো বড় বড় বিসনেস হাউস গুলোয় একটু নজর রাখতে হবে, ওদের তো প্রচুর লোক দরকার হয়।

জিতু মনে মনে হাসলো, মাম্পি এই গ্রুপে এখন নতুন, হয়তো সবাইকে ভালো করে চেনেই না কারণ আজকেও তো সবাই ঠেকে আসেনি … তাই এখনও তুমি চালাচ্ছে, তুই-তে আসেনি। তাছাড়া জিতু বহু বছর মুম্বাইতে আছে, শহরটাকে ভালোই চেনে। এই শহরে রেফারেন্স নিয়ে গেলে আধ ঘণ্টায় লোকের চাকরি হয়ে যায়, … কত লোকে টেলিফোনে চাকরি পায় তার ঠিক নেই। আবার যোগাযোগ না থাকলে কত ছেলে বছরের পর বছর বেকার থাকে, অনেকটা তার নিজের মতো … তারও তো কলেজ ছাড়ার পর বছর ঘুরে গেলো, কই কিছুই তো সুরাহা হোল না। জিতু একটু হাঁফ ছেড়ে চারিদিকে তাকিয়ে দেখলো, রেস্তোরাঁ ভর্তি … চারিদিকে শুধু চামচি আর প্লেটের টুং টাং শব্দ, নানা ধরনের টুকরো কথা বার্তা আর হাঁসির শব্দ। খুব জোরে চেচিয়ে না বললে শোনা একটু মুশকিল। কথা ঘোরানোর জন্য সে জনতার দিকে একটা নতুন টপিক ছুঁড়ে দিল …

জিতু। আচ্ছা, সুনীলের কি হোল, ও তো বেশ কয়েকদিন আসছে না … বিয়েটা কি হচ্ছে …?

অভি অনেকক্ষণ ধরে একজন হোটেল বয়কে এদিকে ডাকার চেস্টা করছিল, এখন রেস্তোরাঁর পিক টাইম, ঘরে বেজায় ভিড়, এই সময় সবাই এতো ব্যাস্ত যে কেউ ঠিক মনোযোগ দিচ্ছে না … সবাই কোন না কোন কাস্টমারকে অ্যাটেন্ড করছে। অভি খুব একটা সুবিধে করতে পারছিল না। সুনীলের কথায় সে ঘাড় ফিরিয়ে বললো …

অভি। আমি শুনেছিলাম দুই ফ্যামিলীর মধ্যে এখনও নাকি কোন কোন ব্যাপার নিয়ে কিছু গন্ডগোল চলছে। আগামি মাসে সার্টেনিলি বিয়ে হচ্ছে না, তবে হয়তো পরে হবে …।

সোনাম কথা বার্তায় অংশগ্রহন না করে অনেকক্ষণ ধরে মোবাইলে কি সব চেক করছিল, হয়তো কোন টেক্সট বা কিছু, সে মুখ ঘুরিয়ে একটু আনমনা ভাবে বললো …

সোনাম। আমি তো শুনেছি প্রিয়াঙ্কা নাকি আরো পড়তে চায় … আর সুনীলের বাড়ীতে এই নিয়ে নাকি আপত্তি …।

বালু পট করে একটা মন্তব্য করলো – সুনীলেরও মাথা খারাপ হঠাৎ ওই রকম একটা মেয়ের প্রেমে হাবুডুবু … ।

শালিনী বোধহয় ঝাঁঝিয়ে কিছু একটা উত্তর দিতে যাচ্ছিল ঠিক এমন সময় টেবিল বয় ওদের টেবিলে এসে দাঁড়াল – বোলিয়ে সাব …।

ছেলেটা খাকি পোশাক পড়ে আছে, পোশাকের নানা জায়গায় খাবারের ঝোল বা রস লেগে আছে, হাতে একটা ছোট্ট খাতা আর পেন্সিল। ওদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পরে গেলো, বেশ কিছুক্ষণ ধরে বসে আছে … খিদে তো পাবেই। একসঙ্গে পাঁচ ছ-জনের অর্ডার নিয়ে ছেলেটা চলে গেলো … এবার শালিনী ঝাঁপিয়ে এলো …

শালিনী। আচ্ছা বালু, তুই মেয়েটা সম্পর্কে কতটুকু জানিস?

বালু একটু সামলে নিয়ে উত্তর দিল – দ্যাখ, আমি সুনীলকে খুব ভালো করে চিনি, প্রিয়াঙ্কাকে অতটা চিনি না কিন্তু আমি বুঝি যে ওরা টোটাল মিসম্যাচ …।

শালিনী। আমি প্রিয়াঙ্কার সাথে বহুদিন আড্ডা মেরেছি, আমি জানি মেয়েটা ভালো … খুব সার্প কিন্তু বোধহয় একটু প্যাম্পার্ড চাইল্ড।

অভি এবার ফোরন কাটলো – তবে সুনীলের বাবা যা একটা পিস … বাপরে।

এই কথায় সবাই হেসে উঠল …। অর্ক আবার দলজিতের একটা পাউরুটি মুখে তুলে বললো …

অর্ক। ওদের ফ্যামিলির সবাই বোধহয় এই রকম। ওর মাই বা কি … সেবার গণেশ পূজার পর পার্টিতে কি করেছিল মনে আছে … গড। সামান্য একটা ব্যাপার নিয়ে কি কেলো …।

জিতু। ওটা ছাড়াও আমি আরো শুনেছি। সুনীলের বাবার বোধহয় কোন দুসরা কারবার আছে বুঝলি … কোন কালা ধান্দা।

অর্ক সতর্ক করলো – মাইন্ড ইওর ল্যাঙ্গুয়েজ buddy … সুনীল তোর বন্ধু, ওর বাবাকে নিয়ে ওরকম বলিস না … ।

জিতু একটু সামলাল – সরি … সরি। কিন্তু ওদের বাড়ীতে আমি ডনকে দেখেছি। আচ্ছা তোরাও তো অনেকে ছিলি, সেই যে মনে আছে, গত বছরে ওর বোনের জন্মদিনের পার্টিতে … যেই ডন ঢুকলো আর ওর বাবা ডনকে নিয়ে ছাদের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। তারপর ওখানেই তো ঘন্টা খানেক কিসব গুজগুজ ফুসফুস হোল … । কি মনে পরছে …?

অভি। হ্যাঁ হ্যাঁ, পরিস্কার মনে আছে। আর ডন মানেই তো সেই বোম্বাইয়ের রোম হর্ষক লোক যার নাম নিতে নেই … যাকে নাকি নানা কেসে পুলিশ খুঁজে বেড়াচ্ছে কিন্তু রাত্রে সেই লোক নানা সোস্যাল ইভেন্টে পুলিশের কর্তাদের সাথেই বসে মাল টানছে। ডনের বিসনেস মানেই তো দুবাই আর এমিরেটস, ঠিক তো …।

অর্ক। ওই পার্টিতেও তো একটা পুলিশ অফিসার ছিল, সেই যে কেমন যেন কালো হোঁৎকা মতো … তোরা দেখেছিলি?

শালিনি। ওকে আমি চিনি, আমার বাবার সাথেও মাঝে মাঝে দেখা করতে আসে। অফিসার খারে …।

অভি এবার একটু ফিক করে হেঁসে ফেলে – যাঃ তারা … তোর বাবার সাথেও …! মরেচে … তাহলে তোর বাবারও কি ডাল মে কুছ কালা নাকি?

শালিনি। সাট আপ অভি। আমার বাবা নেহাতই ভালো মানুষ … খারে আসে কি সব সিকিউরিটির ব্যাপারে।

অভি। খেপিস না, খেপিস না। জাস্ট জোকিং। কিন্তু তোর বাবার সাথে সিকিউরিটির কি কথা? উনি তো শুনেছি কোন কোম্পানীতে চাকরী করেন … নাকি?

শালিনি একটু গম্ভীর ভাবে বললো – তুই বড় আধা খাপচা খবর রাখিস। আমার বাবা এল. এন্ড. টির চিফ সিকিউরিটি অফিসার। তাছাড়া প্রাইভেট সিকিউরিটিও সাপ্লাই করে নানা কোম্পানীতে।

অভি চোখে মুখে একটা ছদ্ম প্রশংসার ভাব করে বললো – উঊঊ … গ্রেট।

শালিনি ইয়ার্কিটা বুঝতে পারলো, ফিক করে একটু হেসে বললো – যতই এখন ঊঊ কর, পোজিশানটা বেশ বড়। তোদের ওই পোজিশানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে চোখে ছানি পরে যাবে … গ্যারান্টিড।

জিতু পিস মেকার হিসাবে এগিয়ে এলো – না না অভি, ইয়ার্কি নয়, আমি শালিনিদের বাড়ীতে বহুবার গিয়েছি … রিয়েলি নাইস ডেকরেটেড হাউস … আঙ্কেল নিশ্চয়ই ভালো স্যালারী ড্র করে।

শালিনি। করেই তো।

বলেই সে হাতটা এগিয়ে দিল, হাতের কবজিতে একটা নাইস স্যুইস ওয়াচ, বেশ দামি।

জিতু। না কিন্তু যা বলছিলাম, আচ্ছা সুনীলের বাবা আবার টাকা ফাকা দাবি করে বসলো না তো?

সোনাম টুক টুক করে ওর মোবাইলে বোধহয় কাউকে একটা টেক্সট লিখছিল, শেষ করেই লাফিয়ে আড্ডায় ঢুকে এলো – কিসের টাকা …! আমায় কিছু দিবি?

জিতু। ধ্যত তেরিকা, তুই কিছুই শুনিস নি তাহলে …।

বালু। তুই বলছিস … ডাউরি …?

জিতু। হ্যাঁ, বলছি … কেন নয়? ওর বাবাকে আমার কেমন যেন একটু ধান্দাবাজ বলে মনে হয়।

ববিতা। না ওই সব ধান্দা টান্দা জানি না, কিন্তু ডাউরি উনি চাইতে পারেন। সুনীলরা তো অরিজিনালি ফ্রম রাজস্থান। ওদের ওদিকে তো ডাউরি চলে শুনেছি।

দলজিত। গড, তোরা বলছিস যে ডাউরির জন্য বিয়ে আটকে যাচ্ছে?

ববিতা। না না, আমি কিছুই বলছি না। জাস্ট আন্দাজ। জিতু বলছিল ওরা ডাউরি ডিম্যান্ড করতে পারে … তাই আমি বলছিলাম যে রাজস্থানে ডাউরি চলে, মানে বেশ ভালোই চলে … এইই।

এই সময় দুজন টেবিল বয় কয়েকটা ট্রে করে ওদের খাবার গুলো নিয়ে বেশ সাবধানে ওদের টেবিলে এসে দাঁড়াল।

 

সাত।

 

জিতু আজ শুধু দহি বড়া নিয়েছে, অবশ্য তাও মন্দ নয় স্ন্যাকস্‌ হিসাবে। কি সুন্দর একটা সাদা নোনতা দইয়ের মধ্যে তিনটে বড়া সাঁতার কাটছে, ওপরে একটু গুঁড়ো গুঁড়ো মশলা ছেটান। চামচি দিয়ে একটু ছোট টুকরো মুখে দিয়ে নিজেই একটু প্রশংসা করলো, ব্যাটারা খাবারটা ভালোই বানায় … যদিও এই দই বড়া আর চা বা কফি বাবদ নগদ দুশো টাকা আজ পকেট থেকে খসবে … মুম্বাই কা বোম্বাই খরচা। সে একটু মাথা উঁচু করে অন্য সবার দিকে তাকাল। এই রেস্তোরাঁটা ভেজিটেরিয়ান, কাজেই সবার প্লেটেই আজ ভেজি খাবার। আর চোখে দেখলো যে মাম্পি একটা ভেজ প্যাটিস নিয়েছে এবং অলরেডি চামচি দিয়ে এক টুকরো মুখে ফেলে চিবুচ্ছে … দলজিত একটা ধোসা নিয়েছে … শালিনি আর সোনাম কি সব ডাল বড়া আর চাটনি টাইপের জিনিস নিয়েছে কিন্তু এক সঙ্গে, কাজেই একটু বড় একটা প্লেটে দুজনে খাচ্ছে। জিতু আবার লুকিয়ে মাম্পির দিকেই তাকাল, মেয়েটাকে এই কয়েক মাস চেনে, কিন্তু কেমন যেন বেশ ভালো লাগে। আলাপ খুব গভীর নয় কিন্তু কথা বললে বেশ ভদ্র বলে মনে হয়। জামা কাপড়ের মধ্যে মেলা আহামরি ফ্যাশান কিছু নেই যেমন আজকে একটা ব্লু জিনস আর একটা কালো ফুল সার্ট পরেছে, হাতাটা গোটান হাতের কনুই অবধি, মাথার চুলটা দুই বিনুনি করে পিঠের অপর ফেলা, হাতে একটা মোটামুটি দামের টাইটান ঘড়ি। মানে সোজা কথায় জিতুর বেশ ভালো লাগে।

জিতুর মনে প্রেমের লিপ্সা আজকে নতুন নয়, সে আগেও প্রেমে পড়ার চেস্টা করেছে, কিন্তু আজকালকার মেয়েদের ব্যাপারটাই আলাদা। সে কলেজে টিনা বলে একটা হট পাঞ্জাবী মেয়েকে প্রপোজ করেছিল, মানে ওই আর কি, একদিন একটা রেস্তোরাঁতে খাওয়াতে নিয়ে গিয়ে একটু আড়ালে বলেছিল যে

জিতু। তোকে খুব ভালো লাগে রে … চল না একদিন লঙ ড্রাইভে যাই …।

মানে এই সব আর কি, ছেলেদের টিপিক্যাল হিন্টস্‌। শুনে টিনার কি হাসি, কিছুক্ষণ বেশ মনোযোগ দিয়ে চিকেন বিড়িয়ানি তাড়িয়ে তাড়িয়ে খেয়ে ওর দিকে তাকিয়ে হিন্দিতে বলেছিল –

টিনা। আরে জিতু, ক্যায়া হুয়া তুমহারা … আভি কি শাদি করনে কা টাইম হ্যায়? লাইফ তো আভি শুরু হুয়া ভাই। তুমহারা কেয়া ইরাদা হ্যায় … হোটেল বাজি? তো সাফ সাফ বাতাও না ইয়ার। ম্যায় তো দো তিন বরস বাদ মেহি শাদি করুঙ্গি … অঔর জ্যাদা হি রিচ কোই লড়কা কো … উমর মে থোরা সা বড়া। তুম মেরা গুড ফ্রেন্ড হো … তুমহারে সাথ খানা পিনা অঔর ঘুমনা আচ্ছা লাগতা হ্যায় লেকিন শাদি নেহি। সরি জিতু …।

খাওয়ার শেষ হোলে জিতুই বিল পে করলো, তারপর জিতুর পুরনো গাড়ীতে যেতে যেতে টিনা বললো …

টিনা। জানো জিতু, মেরা এক ফ্রেন্ড হ্যায় … হরিয়ানা মে, বিজনেস লড়কা। উসকা লন্ডনমে তো বড়া কারবার হ্যায়। হর মাহিনা মে এক ইয়া দোবার লন্ডন ট্রাভেল করতা হ্যায়। উসকা পিতাজিকে সাথ মেরে পিতাজিকা কুছ রিস্তা হ্যায়। ম্যায় তো উসকো থোরা লাভ করতা হুঁ … আই মিন থোরা সা সফট করনার। লেকিন বাদ মে কেয়া হোগা পাতা নেহি …।

জিতু কিছুই বলে নি। ওঃ এই সব স্মার্ট মডার্ন মেয়েরা … কার কোথায় কি লুকনো তা বোঝার উপায় নেই। জিতুর মাঝে মাঝে কেমন মনে হয় যে মেয়েদের মন যেন একটা বিশাল ক্যাকটাস ঝোপ … হাত দিয়ে নাড়লে হাত ছোরবে আবার ঝোপের তলা থেকে সাপ ব্যাং কিছু একটা বেরিয়ে আসতে পারে। এই কালই অশোকের সাথে তার বেট হচ্ছিল যে টিনাকে দলজিত না প্রপোজ করে বসে, ওদের যা ক্লোস ফ্রেন্ডসিপ। তা দলজিতকে ট্রাম্প করতে গিয়ে এবার নিজেই খেলা থেকে আউট। ব্যাস, সেই ধাক্কা সামলাতে তার পাক্কা দু মাস লেগেছিল, অবশ্য টিনা ব্যাপারটা কলেজে মোটেই ছড়াতে দেয় নি, সেই বিশ্বাসঘাতকতাটা করে নি। তারপর সে গ্র্যাজুয়েট করে বেড়িয়ে এসেছে তাও এক বছরের অনেকটাই বেশী হয়ে গেল … আজ কোথায় টিনা কে জানে।

এদিক সেদিক ভাবতে ভাবতে জিতু আবার বাস্তবে ফিরে এলো। ওদের খাওয়া দাওয়া প্রায় শেষের দিকে, জিতু আবার মাম্পির দিকে তাকাল … মাম্পি তার প্যাটিসটা শেষ করে লস্যির গেলাসে চুমুক মারছে। জিতু এই মুহুর্তে ঠিক করে ফেললো যে সে আজ মাম্পিকে গাড়ীতে লিফটের অফার দেবে … দেখা যাক না কি হয়।

 

******

 

মহাদেব একটু উসখুস করছে … একটু যেন অধৈর্য লাগছে। কোথায়, ফোনটা তো আসছে না … রিয়া একটা ছোট্ট টেক্সট পাঠিয়েছে যে আটটার পর ফোন করবে। কোথায় সে ফোন, এখন তো আটটা কুড়ি প্রায় বাজলো।

ঠিক এই সময় টেবিলের ওপর রাখা মোবাইলের খুব সুক্ষ্ম রিংটোন শোনা গেলো। মহাদেব হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিয়ে ভরাট গলায় বললো …

মহাদেব। হাই … মহাদেব হিয়ার।

রিয়া। হাই দেবু … ইটস রিয়া … হাউ থিংস আর গোয়িং ?

দেবু। ও হাই রিয়া … আই অ্যাম ফাইন … হাউ এবাউট ইউ?

রিয়া। গুড … সো ফার। এখন কি করছো?

দেবু। আর কি, একটা বই পড়ছিলাম। তুমি কোথায় এখন?

রিয়া। আমি এখন এই সান্টাক্রুজ আর এয়ারপোর্টের মাঝামাঝি একটা রেস্তোরাঁতে, একটু বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছি। অবশ্য এখন আড্ডা আর খাওয়া দাওয়া প্রায় শেষ … by the way … তুমি কি ফ্রি আছো?

দেবু। মোর অর লেস …। হাতে সেরকম কোন আরজেন্ট কাজ নেই।

রিয়া। হুম্‌ম্‌ … তাহলে কি কোথাও মিট করা যায়? আজকে তো শনিবার, তাই না? একটু রাত হলেও ক্ষতি নেই …।

দেবু। নো প্রবলেম। কোথায় মিট করতে চাও?

রিয়া। আমি তো এয়ারপোর্টের কাছাকাছি আছি …। এদিকেই কোথাও মিট করা যায় … এই ধর স্যান্টা ক্রুজের কোথাও …।

দেবু। ফাইন … ওখানে একটা মল আছে জানো তো … ভিলে পার্লে আর ইন্দিরা নগরের মাঝামাঝি … কি যেন নাম … ম্যাজেস্টিক মল ঐ রকম কিছু … স্যান্টা ক্রুজের থেকে বেশ কাছেই …। অটো করে আসতে পারবে?

রিয়া। হ্যাঁ, বুঝেছি … ওখানেই তো একটা মাল্টিস্ক্রিন মুভি থিয়েটার আছে … কখন আসছো বলত?

দেবু। তুমি হঠাৎ আসতে বলছো … একটু তো সময় লাগবেই। say half an hour max, বুঝতেই তো পারছো এখন আমাকে ড্রাইভ করে যেতে হবে এই বিজি রাস্তায়, তার ওপর শনিবার … একটু সময় তো লাগবেই।

রিয়া। নো প্রবলেম। আমি আরো মিনিট পনের ওদের সাথে কাটিয়ে এখান থেকে বেরুচ্ছি।

দেবু। ওকে … ওকে। সি ইউ দেয়ার।

ফোনটা কেটে দিয়ে মহাদেব সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। নাঃ, ব্যাপারটা তো মন্দ দিকে যাচ্ছে না। এতদিন শুধু লোকের দিকে তাকিয়েই থাকতো … অফিসের কলীগদের তো এই ফেসবুক আর ট্যুইটার একেবারে ফ্যাশান হয়ে গেছে। এই বয়সে তার যদি একজন বন্ধু জুটে যায় … সে আর খারাপ কি। এই সব ছুটির দিনে বাড়ীতে সারাদিন হাঁ করে বসে থাকা আর হয় এটা সেটা পড়া … না হয় ইন্টারনেট সার্ফিং … এ কি আর ভালো লাগে। তার থেকে গাড়ী ড্রাইভ করে গিয়ে কারুর সাথে মিট করা, কিছু কথা বলার মধ্যে অনেক তৃপ্তি। দাড়ি তো রোজ সকালে নিয়ম করে কাটা, কাজেই মহাদেব বাথরুমে গিয়ে লিস্টারিন দিয়ে কয়েকবার মুখটা ধুয়ে নিল, মুখটা একটু ফেস ওয়াস দিয়ে ক্লিন করে নিল। ব্যাস, এবার একটা ক্যাজুয়াল হাল্কা ব্রাউন রঙের লি-ভাইস জিনস আর দামি ছাই ছাই রঙের ভন হাউসেন সার্ট গুঁজে পরে নিল … তারপর সারা গায়ে হাল্কা করে ফ্রেঞ্চ পারফিউম ছড়িয়ে দিল … ব্যাস তার গেট আপ রেডি। মোবাইলটা পকেটে পুরে আর কারের চাবিটা নিয়ে মহাদেব একবার ঘরের দিকে তাকাল। নাঃ … একটা জিনিস এখন বাকি … মাথার টুপি, তা সেটাও র‍্যাকে রয়েছে, হাতের কাছেই। টুপিটা একটু কায়দা করে বেঁকিয়ে মাথায় পরে মহাদেব আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল … এই বয়সেও মন্দ নয়। মহাদেবের বাড়ীতে পুরোটাই সেন্ট্র্যাল সিকিউরিটি, কাজেই দরজা বন্ধ করে সে একটা ছোট্ট নামবার প্যাডে একটা পাসওয়ার্ড টাইপ করে দিল। ব্যাস শান্তি। আজকে লিফট দিয়ে না নেমে গুনগুন করে একটা হিন্দি গান গাইতে গাইতে মহাদেব গ্রাউন্ড ফ্লোরে পার্কিং লটে নেমে এলো … তার নতুন কালো লেক্সাস ক্যাব্রিওটা এখানেই পার্ক করা। রিমোটটা পকেট থেকে বার করে একটা নব টিপতেই গাড়ীর ফ্রন্ট আর রিয়ার লাইটগুলো কয়েকবার ফ্ল্যাশ করে উঠলো। মহাদেব মনে মনে – ইয়ে দিল না হোতা বেচারা … গানটা গাইতে গাইতে গাড়ীর দরজা খুলে ভেতরের সিটে উঠে বসলো … সামান্য একটা নব স্পর্শ করতেই ওপরের ছাদটা প্রায় নিঃশব্দে ফোল্ড হয়ে পিছনে সরে গেলো। মহাদেব গাড়ীটা স্টার্ট করলো …।

 

 

দ্বিতীয় পর্ব সমাপ্ত

~ শীল vs. শীল -(দ্বিতীয় পর্ব) ~

 

LEAVE A REPLY

*