শীল vs. শীল (তৃতীয় পর্ব) – click here

তের।

 

মুম্বাইতে পার্কিং প্লেস পাওয়া একটা ঝামেলা, তার ওপর আজ শনিবার। জিতু গাড়ীটাকে ড্রাইভ করে মোড়ে নিয়ে এসে একটু ঝামেলায় পরে গেলো … চারিদিকে চলন্ত বা স্থির গাড়ীর মেলা। রাস্তার ধারে সাইড পার্কিং আজ পুরো ভর্তি। খুব বেশিক্ষণ থামার উপায় নেই কারণ পেছন থেকে অনবরত হর্ন বেজেই চলেছে, কানে আসে হিন্দিতে মানুষের নানা রকম মন্তব্য … আজকে রাতে সবাই খুব বিজি।

জিতুর অবশ্য মুম্বাইতে দশ বছরের ওপর হয়ে গেলো, সে খুব একটা ঘাবড়ায় না। মুম্বাই এমন একটা শহর যেখানে কেউ নিজের জায়গা ছাড়ে না … শক্ত হয়ে বসে থাকতে হয়। এখানে যে জায়গা একবার চলে যায় তা আর ফিরে আসে না। জিতু পেছনের হর্ন উপেক্ষা করে এদিক ওদিক দেখতে দেখতে হঠাৎ একটা গলির একটু পাশে অন্ধকার ঝুপসি মতো একটা জায়গায় একটা ফাঁকা পার্কিং স্পেস দেখতে পেল। জায়গাটা ছোট কিন্তু তার ফোর্ডের পক্ষে পার্ফেক্ট। ওই দিকেই গাড়ী ঘোরাল জিতু।

পার্কিং না হয় হোল কিন্তু এবার? এই কয়েক হাজার মানুষের মধ্যে কোথায় মাম্পি? জিতু তবুও হাঁটতে হাঁটতে যে জায়গায় সে মাম্পিকে ছেড়ে এসেছিল সেদিকেই এগিয়ে গেল। শনিবারে মুম্বাইয়ের রুল হোল যে এক ঝাঁক মানুষ একটা জায়গা ছেড়ে যাবে আর মুহুর্তে অন্য কিছু মানুষ এসে সেই জায়গাটা ভর্তি করে দেবে … মিনিট কুরি আগে যে জায়গাটা বেশ হেঁটে বেড়াবার মতো ছিল সেই জায়গাটায় এখন গিজগিজে ভিড় কিন্তু মাম্পির চিহ্ন নেই।

জিতু খানিক্ষণ ভ্যাবলার মতো সেখানে দাঁড়িয়ে রইল, কি করবে কিছু মাথায় আসছে না। আসলে জায়গাটা বড়ই জমজমাট … একদিকে মাল্টিপ্লেক্স, এক সঙ্গে নটা মুভি স্ক্রিনে দিলওয়ালে আর বাজীরাও মস্তানি চলছে … ভিড়ে একাকার, রীতিমতো ঠেলাঠেলি চলছে আগে যাবার জন্য। রাস্তার ওপারে বেশ কিছু নামকরা রেস্তোরাঁ … কেরালিয়ান ডিসেস, মনজিনিস, আর একটু এগিয়ে গেলে পাঞ্জাবী ধাবা। শুধু তাই নয়, রাস্তাটা পার হয়ে ওপারে গেলে বিশাল ম্যাজেস্টিক মল, সেখানে মলের ভেতরেই আছে একতলায় ম্যাকডোনাল্ডস আর দোতলায় বেশ বড় কে.এফ.সি. জয়েন্ট। এছাড়াও আছে খান্না মার্কেট আর তার একটু আগে একটা ফুড কোর্ট যেখানে ইতালিয়ান পাস্তা, আমেরিকান আইসক্রিম, নর্ড সি ফিস, তুর্কির ডোনার এই সবের বিরাট সমারোহ। জিতু কোথায় খুঁজবে মাম্পিকে? আজকে শনিবার, সমস্ত ফুড জয়েন্ট, রেস্তোরাঁ আর রোডসাইড ফুড কোর্ট লোকে ভর্তি, কোথাও ভালো করে দাঁড়াবার পর্যন্ত জায়গা নেই। জিতু এখন পর্যন্ত রাস্তার ধারেই দাঁড়িয়ে আছে আর মনে মনে ভাবছে … বোধহয় না ফিরে এলেই ভালো হোত, এই ভিড়ে জানা না থাকলে কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায় না। মাম্পির ফোন নাম্বারও জিতুর জানা নেই, অবশ্য জানা থাকলেও বা কি, ও তো নিজের কোন চেনা বন্ধুর সাথেই মিট করতে গেছে … এই মুহুর্তে জিতুর মতো সদ্য আলাপ হওয়া কাউকে আলাউ নাও করতে পারে। তাছাড়া জিতু মোটেই ওকে দেখা দিতে চায় না, ওর উদ্দেশ্য হোল মাম্পির এই গোপন বন্ধুটিকে একবার লুকিয়ে দেখা। যদি দেখা যায় যে ভদ্রলোকের স্ট্যান্ডার্ড বড় বেশি উঁচু ওর থেকে তাহলে জিতু নিজেই কেটে পরবে, আর ফোন টোন করে মাম্পিকে জ্বালাতন করবে না।

মিনিট দশেক এভাবেই দাঁড়িয়ে থেকে জিতু নিজের ওপরই বিরক্ত হয়ে উঠল, আচ্ছা ঝামেলা তো, কিছুই ডিসিশান নেওয়া যাচ্ছে না। কোথায় যাওয়া যায়, এতো অপশান চারিদিকে যে আজ এখানে দু ঘন্টা কাটালেও সব রেস্তোরাঁ বা ফুড জয়েন্ট ঘুরে দেখা সম্ভব নয়, আর তার বহু আগেই হয়তো মাম্পিরা উঠে বেরিয়ে যাবে। খানিকটা অসহায় বিরক্তিতে জিতু ডিসিশান নিল যে আজ রাতে আর কিচ্ছু দরকার নেই, মরুকগে মাম্পি তার বন্ধুকে নিয়ে। কালকে বিকেলের দিকে একবার ফোন করা যাবে, আজকে বরঞ্চ ম্যাক বা কে.এফ.সি. থেকে কিছু পেটে দিয়ে সোজা অরুনেশদের আড্ডায় চলে যাবে … ওখানে কিছুক্ষণ তাস পিটিয়ে তারপর বাড়ী। মনের মধ্যে একটু খুন্নতা রইল, তবু সে আর দেরি না করে সোজা ম্যাজেস্টিকের দিকে হাঁটতে শুরু করল। অবশ্য ওখানেও বেজায় ভিড় কিন্তু ম্যাক বা কে.এফ.সি. কোথাও একটা জায়গা হয়তো পাওয়া যাবে।

 

*******

 

লম্বা লম্বা পায়ে মিনিট সাতেকের মধ্যেই জিতু মলের এনট্র্যান্সে পৌঁছে গেল। বাপড়ে কি ভিড় আজকে … ম্যাকডোনাল্ডসে লোক থিক থিক করছে, একপাশে যেখানে সবজি মার্কেট সেখানেও লোকের ভিড়, আজকে সবাই উইক এন্ড শপিং করছে বোধহয়। অবশ্য এখানে অনেকে এমনিই আসে, কোনায় একটা কিডস কর্নার আছে, সেখানে ফ্যামিলি নিয়ে কিছু মজা করে। জিতু কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবল কি করা যায় … থাকবে না সোজা ঠেকে চলে যাবে। তারপর মনে হোল যে এই ভিড়ের মধ্যেও তো লোকে নিচ্ছে, হাতে প্যাকেট নিয়ে অনেকেই ম্যাকের বাইরে এসে কোথাও বসছে অথবা রাস্তায় চলে যাচ্ছে, কেউ আবার সোজা সমুদ্রের দিকেই যাচ্ছে। জিতু ভাবল যা থাকে কপালে এখানেই কিছু খেতে হবে তবে তার আগে ওপরে কে. এফ. সি. –র কেসটা একটু দেখে আসা যাক।

 

রেলিঙে দাঁড়িয়ে রিয়া ওই এলোমেলো চুল আর ফেডেড ব্ল্যাক জিনস দেখেই ঘাবড়ে গেলো … মরেচে, এ আবার এখন কি করছে ! জিতু যে তাকে নামিয়ে দিয়ে বড় রাস্তা দিয়ে চলে গেলো সেটা তো সে স্পষ্টই দেখেছে, তাহলে আবার ফিরে এলো কেন? কাউকে খুঁজছে নাকি? না শুধু মলে মার্কেটিং করবে বলেই ফিরে এলো? বেশ ধুকপুকুনি লাগছে তার, এটা আবার উটকো ঝামেলা, রিয়া ওকে বলেছিল যে সে একজনের সাথে মিট করছে কিন্তু সেটা সে প্রাইভেটই রাখতে চায়। রিয়া জিতুকে তেমন ভালোভাবে চেনে না, আসলে শালিনিকে বাদ দিলে ওদের পুরো গ্যাংটাকেই রিয়া হয়তো মাস খানেক চেনে … সেরকম কারোর সাথেই কোন পার্সোনাল ফ্রেন্ডশিপ নেই, মাঝে মাঝে বসে আড্ডা দেয় … এই পর্যন্ত। অবশ্য বড় শহরে এই রকম কোন গ্রুপের সাথে আড্ডা মারতে মারতেই গাঢ় বন্ধুত্ব তৈরী হয়, সেটা রিয়া ভালোই জানে। সে যাই হোক, রিয়া ঠিক করলো যে জিতুকে আজকে কাটাতে হবে, ওর সাথে দেখা হওয়া মানেই আবার একগুচ্ছ এক্সকিউজ, ওসব এখন ভালো লাগছে না। তাছাড়া মহাদেবের সাথেও তো আজকেই প্রথম মুলাকাত। রিয়া জিতুর দিকে একটু লক্ষ্য রাখছিল … হঠাৎ দেখলো যে জিতু এস্কালেটরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সর্বনাশ, তাহলে নিশ্চয়ই ওপরে আসছে, কোন ফ্লোরে কে জানে। শপিং করতে হলে অবশ্য যে কোন ফ্লোরেই যেতে পারে কিন্তু রিস্ক নেওয়া যায় না … এই মুহুর্তে মহাদেবকে বলার মতো সময়ও নেই কারণ জিতু দোতলায় আস্‌লে রিয়া মহাদেবের টেবিলে পৌঁছতে পৌঁছতেই ও এখানে উঠে আসবে। রিয়া একবার মহাদেবের দিকে তাকাল, চোখাচোখি হতেই একবার হাত নেড়ে ও সোজা লেডিজ টয়লেটের দিকে দৌড়ল।

মহাদেব নিজের টেবিলে বসে অল্প অল্প করে খাচ্ছিল … রিয়া একটু উঠে গেছে। হয়তো টয়লেটে যাবে, তার আগে রেলিঙে দাঁড়িয়ে নিচের ভিড় একটু দেখছে … সে তো দেখবেই, একদম বাচ্চা মেয়ে, কতই বা বয়স, এই বয়সে মহাদেব নিজেও এক জায়গায় বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারতো না। এই ছটফটানির জন্য প্রথম প্রথম বাঙ্গালুরুতে টি.সি.এসের বসের কাছে সে বেশ কয়েকবার বকা খেয়েছে। যাই হোক, আজকে রিয়ার সাথে মুখোমুখি আলাপটা ভালোই এগোচ্ছে … মেয়েটা বেশ কালচার্ড আছে মনে হয়। ডান দিকে কালো সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ছিল মহাদেব, অনেক দূরে আকাশের তারা আর শহরের আলো কোথায় যেন মিশে গেছে, আলাদা করে বোঝা যায় না। কখন কখন মহাদেব নিজের মধ্যেই কোথাও হারিয়ে যায়, সেই সময় সে বড় একলা, সেই সময় সে দুনিয়াকেও কেয়ার করে না … হয়তো আজকের সন্ধ্যাকেও নয়। আনমনে ঘাড় ঘুরিয়ে মহাদেব রেলিঙের দিকে তাকাতেই রিয়ার দিকে চোখ পরলো, রিয়া হাত নেড়ে অল্প একটু হেঁসে রেস্টরুমের দিকে চলে গেল। মহাদেব আনমনে একটা ফ্রাই নিয়ে মেয়োনেজ সসে ডুবতে গিয়ে দেখে সে অলরেডি সেটা শেষ করে ফেলেছে। মেয়োনেজ ছাড়া কি ফ্রাই খাওয়া যায়, সে উঠে দ্রুত কাউন্টারের দিকে হাঁটা লাগাল … এক পাউচ এক্সট্রা সস তার দরকার।

 

চোদ্দ।

 

জিতু এস্কালেটর চড়ে দোতলায় উঠে এলো … মাই গড, এখানেও বসার কোন জায়গা নেই। সামনে কাউন্টারের সামনে অসংখ্য মানুষের মাথা … এই সবে প্রায় সাড়ে নটা বাজে, এখন সবাই তাড়াতাড়ি পেটে কিছু দিয়ে আবার রাস্তায় নামতে চায়। আজ শনিবার, মুম্বাইয়ে আজ সন্ধ্যা খুব লম্বা … অন্তত রাত বারোটা সারে বারোটা অবধি রাস্তায় মানুষের মিছিল থাকবেই।

জিতু দোতলায় দাঁড়িয়ে কেমন একটু দোনামোনা করতে লাগলো … ম্যাকে যাবে না এখানে কে.এফ.সি.-র কাউন্টারেই দাঁড়াবে … তার কাছে অবশ্য দুটোই এক। একটু আনমনা ভাবে দাঁড়িয়ে থেকে জিতু চারিদিকে তাকাল, সব সিটই ভর্তি … শুধু জানলার ধারে একটা টেবিল ফাঁকা, যদিও তার ওপর দুটো খাবার ভর্তি ডিস রয়েছে … আধ খাওয়া বার্গার, পোটেটো ফ্রাই ইত্যাদি। সে কিছুক্ষণ ভাবলো, তারপর দুত্তেরিকা বলে আবার এস্কালেটরের দিকে এগিয়ে গেল … একতলার ম্যাকই ভালো, ওখানে কত লোক, খেতে খেতে তাও কিছু মানুষের মুখ দেখা যাবে। দোতলায় এই কে.এফ.সি.-র বড় কাঁচের জানলা দিয়ে দূরের সমুদ্র দেখা যায়, এই ভিউয়ের জন্যই অনেকে এখানে ভিড় করে। জিতু অত সমুদ্র টমুদ্রের ধার ধারে না, এই পঁচিশ ছাব্বিশ বছর বয়সে অতটা বিবাগী হয় নি এখনও।

 

*******

 

রিয়া ওয়াসরুমের দরজার গোল করা কাঁচের ভিউ ফাইন্ডার দিয়ে বাইরেটা দেখার চেস্টা করছিল। এখান থেকে ফ্লোরের সামান্যই দেখা যায়, কিন্তু এস্কালেটরের থেকে ওঠা নামার মুখটা পরিস্কার দেখা যায়। জিতু এস্কালেটর থেকে ফ্লোরে এসে কেমন অবাক চোখে চারিদিকে তাকাচ্ছিল, তারপর কি ভেবে ভেতর দিকে হেঁটে গেল। ব্যাস, তারপর থেকে রিয়া নাকটা কাঁচে ঠেকিয়ে দুচোখ বড় বড় করে ওই দিকেই তাকিয়ে আছে, … ছেলেটা এখানেই বসে গেল নাকি। সেরেছে, তাহলে তো আজ সে ধরা পরে যাবে যেটা সে মোটেই চাইছে না। একচুয়ালি, ধরা পরার চিন্তাটা হয়তো একটু বাড়াবাড়ি, তার অন্য কোন ফ্রেন্ড থাকতেই পারে তবে তার প্রাইভেট লাইফের সমস্ত কিছু জিতুর কাছে মেলে ধরার মতো ক্লোজ তারা নয়। এবং সেটাই এই মুহুর্তে রিয়ার সমস্যা …।

কিন্তু আজকে বোধহয় রিয়ার লাকটা ভালো। রিয়া মনে মনে ভাবছিল হঠাৎ যদি কোন মহিলা ঢুকে আসেন তাহলে ব্যাপারটা বেশ এমব্যারাসিং হবে। ঠিক এই সময় জিতু লম্বা লম্বা পা ফেলে ঝড়ের বেগে এস্কালেটর দিয়ে নেমে চলে গেল। বাপ … কি টেনশান, রিয়া মুখে ঘারে একটু জলের ছিটে দিয়ে বেরিয়ে এলো … ঠিক সেই মুহুর্তেই মহাদেব হাতে গোটা দুয়েক সসের পাউচ নিয়ে নিজের সিটের দিকে আসছিল। দূর থেকে ওরা দুজনে দুজনকে দেখে একটু হাসলো তারপর এক সঙ্গে নিজেদের জানলার ধারে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। রিয়া এখন আবার অনেক স্বাভাবিক … গালে টোল ফেলে একটু হেঁসে সে তার বার্গারে একটা ছোট্ট কামড় বসাল, মহাদেব ওর দিকে তাকিয়ে একটু মাথা নেড়ে সসটা ডিসে ঢাললো … এবার পটেটো ফ্রাইটা জমবে ভালো।

 

********

 

জিতু ম্যাকে বেশীক্ষণ বসে নি … খাবারটা তাড়াতাড়ি পেটের মধ্যে চালান করে সে নিজের গাড়ীতে গিয়ে বসে। তারপর ড্রাইভ করে সোজা অরুনেশদের ঠেকে, সেখান থেকে ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় বারোটা। রোজকার মতো যেমন হয় … সারা বাড়ী অন্ধকার, বাবা নিশ্চয়ই অনেক আগেই ঘুমিয়ে পরেছে। সে চাবি দিয়ে দরজা খুলে সোজা নিজের ঘরে চলে গেল … সন্ধ্যে বেলায় সে যথেষ্ঠ খেয়েছে কাজেই আর রান্না ঘরের দিকে যাওয়ার দরকার হলো না।

পরের দিন বিকাল পাঁচটার দিকে জিতু মাম্পিকে ফোন করলো, ওদিক থেকে মাম্পির গলা ভেসে এলো …

মাম্পি। Hi Jitu, how are you?

জিতু। সব ঠিকঠাক … এখন কি করছো? যদি ফ্রি থাকো তাহলে চল কোথাও মিট করি, কফি খেয়ে তারপর ওখান থেকে ঠেকে চলে যাব।

মাম্পি। Actually আমি একটু বিজি আছি জিতু। তবে তুমি যদি একটু পরে, say … সাড়ে ছটা নাগাদ কোথাও মিট কর তাহলে আপত্তি নেই।

জিতু। ফাইন, নো প্রবলেম। কোথায় মিট করলে তোমার সুবিধা হয়?

মাম্পি। এক কাজ কর, কালকের ওই জয়েন্টেই এসো না … ম্যাজেস্টিকের সামনে? কি … অসুবিধা নেই তো? আমি অটো ধরে ওখানে চলে যাব।

জিতু। ঠিক আছে, তাহলে sharp at half past six … ম্যাজেস্টিকের সামনে, ওকে?

মাম্পি। ওকে … বাই।

জিতু ফোনটা বিছানায় ছুড়ে দিয়ে হাল্কা পায়ে রান্না ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো … এখন তো প্রায় ঘন্টা খানেক টাইম আছে, এর মধ্যে এক কাপ চা তো চলতেই পারে। গাড়ী করে এখান থেকে ওই জয়েন্টে যেতে খুব জোর মিনিট কুরি লাগবে।

ঠিক সেই মুহুর্তে মহাদেব তার মোবাইলে কাউকে টেক্সট মেসেজ লিখতে বড়ই ব্যাস্ত।

 

পোনের।

 

এর পরের মাস পাঁচেক মহাদেব আর জিতুর ভালোই কাটলো। দুজনার জীবনেই সামান্য চেঞ্জ হয়েছে। মহাদেব এখন প্রত্যেক দিন দাড়ি কামায় আগে যেটা খুব বেশী হলে সপ্তাহে তিন বার হতো … দাড়ি কেটে গালে প্রত্যেকবার ওল্ড স্পাইস ঘষতে হয়, চান করে গায় দামি ডিওডোর‍্যান্টও দেওয়া চলছে। আর অফিসে লাঞ্চ টাইমে একটু গোপনে মোবাইলে রেগুলার ফেসবুক আপডেট চলে সেই সঙ্গে রিয়ার সঙ্গে টেক্সট মেসেজ। মহাদেব প্রথম প্রথম রিয়ার সাথে মিশত একটু লাজুক লাজুক ভাবে, কে কাকে কোথায় দেখে ফেলে কে জানে … অফিসে তো এখনও কেউ জানে না। কিন্তু কয়েকবার দেখা হওয়ার পর আর সেরকম লজ্জার ব্যাপার নেই … মুম্বাই বেশ বড় শহর, এখানে সবাই সন্ধ্যের পর বা উইকএন্ডে কিছু না কিছু কাজে ব্যাস্ত থাকে কাজেই নেহাত লাক খারাপ না হলে এতো বড় শহরে চেনা কারুর সাথে বাই চান্স রাস্তায় দেখা হয়ে যাওয়া একটু শক্ত। আর মহাদেব জেনারেলি শহরের খুব পপুলার জায়গাগুলো অ্যাভয়েড করে, নিজেই রিয়ার বাড়ীর কাছাকাছি কোন জায়গা থেকে ওকে তুলে নেয় আবার একসঙ্গে কোথাও বসে কথাবার্তা, খাওয়া এসব হয়ে গেলে ওর বাড়ীর খুব কাছে কোথাও নামিয়ে দিয়ে বাড়ী চলে আসে। উপহার দেওয়ার ব্যাপারে মহাদেব দারুণ নভিস, কিছুই মাথায় আসে না। বিয়ের পর বউকে শাড়ি দিত, গয়না দিত … সেগুলো সবই অনন্যার নিজের হাতে পছন্দ করা। কোথাও কোন নিমন্ত্রণ এলে সেটাও অনন্যা সামলাতো। প্রথম যেদিন সে রিয়াকে উপহার দেওয়া মনস্থ করলো, পুরোটাই নিজেকে চিন্তা করতে হোল … ব্যাপারটা তো আর কাউকে তো জিঞ্জাসা করাই যায় না। খুব একটা কিছু মাথায় না আসায় সে একটা দামি রুমালই দিয়ে বসলো … ভেবেছিল রিয়া হয়তো হেঁসে ফেলবে কিন্তু রিয়া বেশ পছন্দ করেছিল … পরের দিন মেসেজে ওর সিনসিয়ার থ্যাঙ্ক ইউ-টাই সেকথা প্রমান করে। তারপর থেকে মহাদেব প্রায় রোজই কিছু না কিছু সারপ্রাইজ উপহার দেয়। ওকে নিয়ে বড় একটা শপিঙয়ের ইচ্ছা আছে কিন্তু সেটা এখনই হচ্ছে না কারণ ওর বাবা মাও তো কিছুই জানে না … মেয়ে হঠাৎ একগাদা জামা কাপড় নিয়ে বাড়ী ঢুকলে টাকার ব্যাপারে একটা কোশ্চেন তো উঠবেই। উপহার দেওয়ার ব্যাপারে মহাদেবের কোন কার্পণ্য নেই, কারণ তার টাকার কোন অভাব নেই। সে আজ একটা ছোট হ্যান্ড ব্যাগ, কাল একটা দামি ফ্রেঞ্চ সেন্ট এসব তো রিয়াকে দিয়েই থাকে … কিন্তু তার অভাব সময়ের। অফিসের কাজে সে ভয়ঙ্কর ব্যাস্ত, মাঝে মাঝে তার ট্যুর পরে মুম্বাইয়ের বাইরে। বছরে দুবার তাকে ট্যুরে আফ্রিকায় যেতে হয় … সিঙ্ঘানিয়ার বিসনেস-তো ওই দিকেই বারছে, আর মহাদেব তো সিঙ্ঘানিয়ার জাহাজের ক্যাপ্টেন। তাই সপ্তাহের উইকএন্ড ছাড়া রিয়ার সাথে দেখা হয় না, তাও আবার রিয়ার নানা রকম বায়না, এমনও হয়েছে যে সে আর রিয়া সকালে জুহুতে মিট করেছে, উইকএন্ডের সন্ধ্যেগুলো রিয়া আবার তার বন্ধুদের সাথে ব্যাপক বিজি। মহাদেব অল্প বয়সীদের সাইকোলজি অনেকটাই বোঝে, রিয়া যখন তার সাথে থাকে তখন এক ধরনের ফিলিংস আবার সে যখন তার ক্লাস মেট বা ইকুয়াল এজ গ্রুপের বন্ধুদের সাথে থাকে তখন অন্য রকমের একটা হ্যাপীনেস বা এক্সাইটমেন্ট কাজ করে। মহাদেব এগুলো একসেপ্ট করে নিয়েছে, রিয়া এখন তার খুব ভালো বন্ধু। তার জীবনের একাকীত্ব কাটাতে রিয়া এক অব্যর্থ ঔষধ।

জিতুরও কিছু চেঞ্জ হয়েছে … মাথার এলোমেলো চুল একটু পরিপাটি হয়েছে … আগে জামা প্যান্ট পনেরো দিনে একবার ওয়াসিং মেশিনে যেত, এখন সপ্তাহে মিনিমাম একবার কখন কখন দুবার ধোয়া হয়। কোথাও বেরোবার আগে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ফ্যাঁস ফ্যাঁস করে সেন্ট দেওয়া চলছে, হ্যাঁ … তা বেশ কয়েক সপ্তাহ হয়ে গেল। যদিও গালের দাড়িটা রেগুলার কাটা হয় না, জিতু মাম্পিকে বুঝিয়েছে যে ওটাই নাকি স্টাইল, যাকে বলে কেয়ারফ্রি। মাম্পি অবশ্য কি বুঝেছে বোঝা যায় না, সে শুধু মুচকি হেঁসে বলেছে – গুড। জিতু অবশ্য মডার্ন জমানার ছেলে … কাজেই মাম্পির সাথে বন্ধুত্ব গাঢ় করতে কয়েকবারের বেশী মিট করতে হয়নি। প্রথম প্রথম কোথাও খেতে গিয়ে মাম্পির বিলটা মেটাতে একটু লজ্জা করতো কারণ বন্ধু বান্ধবদের মধ্যে রুল হলো খাওয়ার পর যে যার নিজের বিল মেটাবে। প্রথম কয়েকদিনের পর সে একদিন দুম করে বলেই দিয়েছিল – মাম্পি, তোমার বিলটা আজ আমিই দিচ্ছি। মাম্পি আপত্তি করেনি … সেই থেকেই চলছে। মাম্পির অবশ্য আত্মসম্মান বোধ ভালোই আছে, তাই মাঝে মাঝেই সে জিতুকে টুকটাক কিছু খাওয়ায় যেমন আইসক্রিম … দহি বঢ়া … এই সব। মুম্বাই শহরে অবশ্য এসব জিনিস চলতা হ্যায়। এত বড় শহরে কে কাকে বেড়াতে নিয়ে গিয়ে খাওয়চ্ছে বা কে কার সাথে প্রেম করছে … কে তার খবর রাখে। তবে জিতু আর মাম্পি দুজনেই ব্যাপারটাকে শুধু নিজেদের মধ্যেই রেখেছে, অন্যান্য বন্ধুদের মধ্যে ছড়াতে দেয়নি। তবে সময় কাটছে ভালোই … সপ্তাহে দিন দুয়েক তো নিজেদের মিটিং আর ইটিং হচ্ছেই, তাছাড়া অন্যান্য বন্ধুদের সাথে উইকএন্ড গুলো সমান জমজমাট। মাম্পির অবশ্য কি সব হসপিটালিটি কোর্স ফোর্স আছে, কাজেই সবদিন ওকে পাওয়া যায় না, এটাই যা একটু সমস্যা।

 

ষোল।

 

জিতু আর মহাদেব … ছেলে আর বাবা। ওরা থাকে একই বাড়ীতে, জিতুর শরীরে মহাদেবের জিন কিলবিল করছে, কিন্তু তবুও তারা দুটি আলাদা মানুষ। তারা থাকে একই ছাদের তলায় আলাদা দুটি ঘরে, কিন্তু তাদের চিন্তা ভাবনা আলাদা, খাওয়া দাওয়া আলাদা, তাদের পোশাক, বন্ধু বান্ধব, পছন্দের গান, পছন্দের সিনেমা, পছন্দের বই … কোন এক অদ্ভুত কারণে সমস্তই আলাদা। তাদের খাওয়া দাওয়ার সময় আলাদা, ঘুমের সময় আলাদা, চান করার সময় আলাদা, সকালে টিফিন করার সময় আলাদা, সত্যি কথা বলতে গেলে তাদের চেহারাও আলাদা … তবুও এক বাড়ীতে তারা ভালোই ছিল। ক্বচিৎ কদাচিৎ মহাদেব আর প্রসেনজিত মুখোমুখি হোত … বাড়ীর সিঁড়িতে বা ছুটির দিনে লাঞ্চ টাইমে, তখন ওই সামান্যই কথা বার্তা হোত … যেমন – হাই ড্যাড বা কিরে জিতু, কেমন আছিস? কোন ইন্টারভিউ পেলি নাকি? ইত্যাদি । অনন্যা যতদিন ছিল ততদিন সেই বাপ আর ছেলের মাঝখানে সেতুর কাজ করতো। ছেলে আর বাপের স্বভাব আলাদা, কাজেই তারা তো দুদিকে যেতে চাইবেই কিন্তু অনন্যা তার অসামান্য কর্ত্রিত্বশক্তি দিয়ে ওদের দুজনকে একদিকে নিয়ে আসতো। একদিন সেই সেতুটা ভাঙল আর সঙ্গে সঙ্গে দুটো গ্রহ যেন তাদের অভিকর্ষটান ছাড়িয়ে দুদিকে দৌড়ে পালাল। তবুও তারা যে যার নিজের মতো থেকে ভালোই ছিল … ছিল ঠিকই কিন্তু থাকলো না, কোথাও একটা গন্ডগোল হোল।

 

***

 

রিয়া খুব একটা খুশি নেই। ছিল, সে তা প্রায় মাস চার পাঁচ আগে। কিন্তু হঠাৎ একটু গন্ডগোলে পরে গেল। সে আজকালকার মেয়ে, বন্ধু বান্ধব নিয়ে থাকতে ভালোবাসে, সেই ভাবেই মানুষ হয়েছে। আর মুম্বাইতে কলেজে গ্র্যাজুয়েট শেষ করার দৌলতে এই শহরে তার অনেক বন্ধু। কাজেই কোন কোনদিন সন্ধ্যায় বা উইকএন্ডে বন্ধুদের সাথে আড্ডা মেরে আর সারা সপ্তাহ হসপিটালিটি কোর্স করে বেড়ে মজায় দিন কাটছিল। কিন্তু এই বন্ধুত্বের বন্ধনেই কোথাও একটা গাড্ডা ছিল … কিছু বোঝার আগেই রিয়া অন্ধকারে ধপাৎ করে সেই গাড্ডায় পরে গেল।

একজন বন্ধু একটু বেশী প্রিয়, একজন একটু কম প্রিয়, এরকম তো সবারই হয়। রিয়ারও ছিল, কাউকে একটু বেশী ভালো লাগতো কাউকে একটু কম। কখন কখন কারুর সাথে একটা সিনেমা দেখতে যাওয়া, আবার অন্য কারুর সাথে সাউথ ইন্ডিয়ান ডিস খাওয়া এরকম তো কলেজ লাইফে সবাই করে। কিন্তু কোন কোন বন্ধু কখনও একটু বেশী কাছে চলে আসে কিছু বোঝার আগেই এবং তাতে কিছু প্রবলেমও আসে। আর যদি একই সাথে দুজন কাছে আসতে চায়? ডাবল বিপদ।

রিয়া যখন একলা থাকে তখন সে দেবু আর জিতু … দুজনের কথাই ভাবে। তার কাছে দুজনাই ভালো, কারণ দুজনে একদম আলাদা।

জিতু হচ্ছে মডার্ন ছেলে, যখন তখন ফোন করে, কখন কখন রাত বারোটার সময়ও। তাকে দেখা করার জন্য ডাকলে রাত দুটোর সময়ও জুহুতে চলে আসবে, একদমই হিসেবি নয়। প্রায় প্রতিদিনই দেখা করতে চায়, অবশ্য রিয়ার পক্ষে সেটা সম্ভব হয় না কিন্তু ওর এই দামাল ব্যাপারটা আর অন্তরের টানটা বেশ উপভোগ করার মতো। জিতুর খাওয়ানোর হাতটাও ভালো, এয়ারপোর্টের আসে পাশে নানা হোটেল রেস্তোরাঁতে ওরা একসাথে নানান ইন্টারন্যাসানাল ডিস চেখে দেখেছে … রিয়ার তো মজাহি মজা, তার রসনার সাথে সাথে বাবার দেওয়া হাত খরচাটাও বেঁচে যাচ্ছে। জিতু এযুগের ছেলে, তার জড়তা কম, সে এসেই রিয়ার হাত ধরে … মাঝে মাঝেই গাড়ীর মধ্যে এসে সিগারেট ধরিয়ে বাঁ হাত দিয়ে রিয়ার গলা জড়িয়ে বসে থাকে। নতুন পুরুষ স্পর্শ রিয়ার শরীরে একটা নতুন অনুভূতি সৃষ্টি করে কিন্তু তার পরেই হয়তো আনমনে জিতু গাড়ীর ইঞ্জিন চালু করে। জিতু একটা দামাল পুরুষের মতো তার জীবনে এসেছে … রিয়া ওর বাবা মার খবর রাখে না কিন্তু ছেলেটা ভদ্রতার সীমারেখা কোনদিন লঙ্ঘন করেনি। ওর আপ ব্রিঙ্গিং বেশ ভালো কিন্তু সেই সঙ্গে ওর সাতাশ আটাশ বছরের মন হয়তো জীবনে নতুন কিছুর স্বপ্ন দেখছে। সে তার পঁচিশ বছরের জীবনে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে তার মনে নতুন চিন্তা, শরীরে নতুন কোন অনুভূতির আহ্বান … হয়তো যে কোন দিন নতুন কিছু ঘটতে পারে ওদের জীবনে কিন্তু কোথাও একটা সরু সুতো ওদের ব্যালেন্সে রেখেছে।

দেবু একটু এজেড ক্যাটিগরি, কিন্তু যথেষ্ঠ ফান টাইপের লোক। দেবুর রেগুলার দেখা করার সময় হয় না কারণ সে অফিসের বড় বস কাজেই নানা কাজে ব্যাস্ত, তাছাড়া ভদ্রলোক আবার একটু ডিসিপ্লিন্ড লাইফ লিড করেন। কিন্তু যখন সময় হয় তখন দেবু রিয়েলি একটা এঞ্জয়েবল টাইপ। তাছাড়া ওর সাথে রিয়ার গান, মুভি, লিটারেচার ইত্যাদি নানা ব্যাপারে দারুণ মিল। তাছাড়া কারেন্ট এফেয়ার্সের নানা ব্যাপারে রিয়া ওর কাছে অনেক কিছু জানতে পারে, ওর সাথে যেদিন ও বসে, সময়টা দারুণ কেটে যায়, আর তারপর বন্ধুদের ঠেকে গিয়ে রিয়া তার নিউলি একোয়ার্ড নলেজগুলো গল গল করে উগলে দেয়। দেবু লোকটা একটু অদ্ভুত, সে যেমন অমিশুক এবং একলা, তেমনি ও নানা ব্যাপারে পড়াশুনো করে। প্রথম প্রথম দেবু ওদের ফেসবুকের কমন এরিয়াগুলোর মধ্যেই আলোচনাগুলোকে রাখতো, কিন্তু একটু আলাপ ঘনিষ্ঠ হবার পরেই ও আরো নানা বিষয়ে কথা বলেছে যা রিয়া কিচ্ছু জানতো না। দেবু বহুবার বাইরে গিয়েছে, সেই সব অভিঞ্জতা সে উজার করে দিয়েছে রিয়ার কাছে, সেটাও তার কাছে একটা নতুন দিগন্ত। সব মিলিয়ে দেবু বেশ লোক, আর তাছাড়া ওর লেক্সাস ক্যাব্রিওটা তো রিয়ার দারুণ পছন্দ। সে দু একদিন সমুদ্রের ধারে চালিয়েছেও। দেবু প্রথম যেদিন ওর হাত ধরে সমুদ্রের ধারে হেঁটেছিল সেদিন রিয়ার একটা আশ্চর্য অনুভূতি … দেবুর বলিষ্ঠ হাতের মধ্যে অনেক নির্ভরতা লুকিয়ে আছে।

রিয়া এই সব কথা আনমনে বসে ভাবে … যখনই একা তখনই ভাবে। কখনও কলেজের লাইব্রেরীতে বসে সামনে একটা বই খুলে রেখে, কখন বা নিজের বেডরুমে রাত্রে অন্ধকারে একা শুয়ে শুয়ে। এটা একটা বড় সমস্যা তার কাছে … সে ছিল একা, ছিল এক গাদা বন্ধুর সাথে … তখন বেশ ভালোই ছিল। যখন তখন এর ওর এস.এম.এস., কোন কোন দিন সন্ধ্যেবেলায় বা উইকএন্ডে এখানে ওখানে বসে চুটিয়ে আড্ডা … বেশ নির্ঝঞ্ঝাট জীবন। কিন্তু কোথায় একটা তাল কেটে গেছে … একাকী মনের বাসর ঘরে ছোট্ট একটা ফুটো দিয়ে অশান্তি ঢুকে পরেছে। অথচ দুজনেই ভালো বন্ধু এবং দুজনেই ভালো মানুষ। জিতু অল্প বয়সী, ছটফটে … সারাক্ষণ কোথাও না কোথাও ঘুরতে যেতে চায়। সে সাহসী, কাজেই রিয়াকে নানা ভাবে জীবনের হাটে আহ্বান জানায় এবং হয়তো বয়সের তাড়নাতেই তার ভালোবাসা বেশ শরীরী। নিজের এই বয়সে জীবনের খেলায় নামতে রিয়ারও কোন আপত্তি নেই … সে আরো জানে যে জিতু হচ্ছে সেই ধরনের ক্যারেক্টার যাকে খুব সহজেই পোষ মানানো যায়।

আর দেবু? সে কিছুটা অন্য রকম। সে জীবনে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে, অনেক কিছু জেনেছে। সে রিয়ার কাছে অনেকটা গাইডের মতো, রিয়া অসংকোচে তার কাছে অনেক কিছু জিঞ্জাসা করে। দেবুর মধ্যে ভণ্ডামি বেশ কম, সে কোন হেসিটেশান ছাড়াই শারীরিক ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে পারে। সে রিয়াকে অনেকবারই বলেছে যে কোন গভীর রিলেশানসিপে শরীর আসে কিন্তু যখন আসে সেটা অটোম্যাটিক্যালি আসে। দেবু মোটেই দুর্বল নয়, তার সাথে স্বচ্ছন্দে রাত্রে সমুদ্রের ধারে বেড়ান যায়, তার মনটা যেন কোথাও প্রোগ্র্যাম করা আছে। সে তার প্রথম স্ত্রীর কথা অনেকবার বলেছে, তার জীবনে নারী শরীরের অভিঞ্জতা যথেষ্ঠ, কাজেই সেই দিক থেকে রিয়া তার সাথে ডেটিঙে বেরিয়ে নিশ্চিন্ত। দেবুর নিজের ওপর কনট্রোল অনেক বেশী কাজেই তার অনিচ্ছায় কিছু করান খুব সহজ নয়।

দুটো মানুষ আর একজন নারী। রিয়া ওদের কথা ভাবতে ভাবতে কেমন একটা ক্লান্ত ফিল করছিল। কিন্তু ঝামেলাটা হঠাৎ-ই মিটে গেল।

 

সাতের।

 

জিতুর সব প্ল্যানই শেষ পর্যন্ত কেমন যেন ভেস্তে যায়। কি যে হয়, তার তো চেষ্টার ত্রুটি নেই কিন্তু তাও কোথাও একটা কিছু আটকে গেলেই মনের ভেতর গুর গুর করে। এই যেমন আজ, শনিবার … বেশ জব্বর একটা প্ল্যান করে মাম্পিকে একটা এস.এম.এস. করলো বেলা বারোটার দিকে, অথচ দুপুর আড়াইটে অবধি কোন উত্তর নেই। অধৈর্য্য হয়ে সাড়ে তিনটে নাগাদ সে সরাসরি ফোন করলো … পুঁ পুঁ করে মিনিট দশেক ধরে বেজে গেল, কেউ ধরলো না। মিনিট দশেক পরে আবার ফোন, এবার ফোন বন্ধ। যাচ্চলে, মাম্পি তো এমন করে না। আর আজ শনিবার, সব বন্ধুরা ঠেকে আসার জন্য তৈরী … সবার সাথে মিটিং প্লেস আর টাইমের কথা হয়ে গেছে। জিতু শুধু ভেবেছিল যে মাম্পিকে নিয়ে একটা গ্রীক রেস্তোরাঁয় একটু সি-ফুড খাইয়ে তারপর ঠেকে চলে যাবে। মেয়েটা আজ ফেল মারাবে দেখছি। ওর বাড়ীটাও ঠিক জানা নেই কারণ মাম্পি বাড়ীতে তাকে এখন ইনট্রোডিউস করেনি কাজেই সেখানে যাওয়া যায় না, সে চেয়েছিল মাম্পির সাথে কথা বলে একটা পিক-আপ স্পট ফিক্স করতে …।

প্রায় বিকেল ছটা। এর মধ্যে জিতু বার তিনেক ফোন করে ফেলেছে আর গোটা দুয়েক এস.এম.এস. কিন্তু কোন উত্তর নেই। দুত্তোর বলে জিতু উঠে পরলো … সাদার ওপর নীল চেক কাটা একটা জামা আর কালো রঙের একটা জিনস পরে সে রান্না ঘরের দিকে গেল, যাওয়ার আগে একটা লাস্ট কফি মেরে দিয়ে সে বেরিয়ে পরবে … আজকের ঠেকটা বসবে পাঞ্জাবী ধাবায়, সেটা আবার বেশ কিছুটা দূরে। কফি করতে করতে সে বাবার ঘরের ওদিক থেকে বেশ কিছু লোকের কথা বার্তার আওয়াজ শুনলো। বাবার ঘরের পাশের লাউঞ্জে মাঝে মাঝে পার্টি হয়, মহাদেব তার বন্ধুদের ডেকে এনে খাওয়ায়। জিতু ওদিকে সেরকম মন দিল না কারণ এরকম সে অনেক দেখেছে ছোটবেলা থেকে, একটু স্বচ্ছল সোসাইটিতে এরকম গেট টুগেদার খুব কমন। জিতু একটা ছোট্ট এক্সপ্রেসো কয়েক চুমুকে শেষ করে নিজের ঘরে গেলো তারপর পায়ে তার উডল্যান্ডসের জুতোটা পায়ে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।

জিতুর ঘরটা এই অ্যাপার্টমেন্টের কোনার দিকে, অন্য ঘরগুলো থেকে একটু আলাদা। এই ঘর থেকে রান্না ঘর, সিঁড়ি বা বসার ঘরে সোজা চলে যাওয়া যায়, অন্য কোন ঘরের মধ্যে দিয়ে যেতে হয় না। একে মাম্পির কাছ থেকে কোন সারা নেই, তার ওপর সারা দুপুর থেকে দশবার ওকে ফোন করে জিতুর মেজাজটা একটু খাপ্পা। সে নিজের ঘরটা ল্যাচ করে ঝাঁ করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে যেতে গিয়েও থেমে গেল। বসার ঘর থেকে নানা রকম গলায় হাঁসি আর কথার আওয়াজ আসছে। কয়েকটা গলার আওয়াজ অবশ্য সে চেনে, তবুও কয়েকটা নতুন গলাও রয়েছে। জিতুর মনে কোথায় একটা কৌতুহল জেগে উঠলো … কতক্ষণ আর লাগবে, একবার তো জানলায় উঁকি মারা, কারা এসেছে তা দেখে নিয়েই সে বেরিয়ে যাবে। সবাই বলে মানুষের মনে কৌতুহল থাকা ভালো, এতে নাকি জীবনের আনন্দ বেড়ে যায় … হয়তো ঠিকই তবে কৌতুহল মাঝে মাঝে হতাশাও ডেকে আনে। কিছু কিছু জিনিস জীবনে না জানাই বোধহয় ভালো।

জিতুর দামি উডল্যান্ডসের জুতোয় আবার খুব একটা আওয়াজ হয় না। সে সিঁড়ির প্রথম ধাপ থেকে আবার ল্যান্ডিঙে উঠে এসে পেছনের বারান্দা দিয়ে বসার ঘরের জানলায় এসে দাঁড়াল। জানলাটায় কাঁচের পাল্লাটা আধ খোলা আর পর্দা ফেলা, বোধহয় বেশী হাওয়া যাতে না সে তার জন্য। তবে জিতুর মাথাটা স্বচ্ছন্দে পর্দার ওপরে যাচ্ছে। প্রথমেই যেটা পাওয়া যাচ্ছে সেটা হোল নানা সুখাদ্যের গন্ধ। সে জানে বাবা কোন পার্টি অরগানাইজ করলে সব ডিসই বাইরে থেকে আনানো হয়। জিতু ব্যাপারটা ইগনোর করে মাথাটা সামান্য উঁচু করে ঘরের ভেতরে তাকাল। পুরো ঘরটা অবশ্য দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু মি. সিঙ্ঘানিয়াকে দেখা যাচ্ছে আর তার পাশে তাঁর অফিসের নতুন সেক্রেটারি মিস. নূতনকে দেখা যাচ্ছে। ভদ্রলোকের স্ত্রী বিয়োগ হবার পরে এই যুবতী মহিলার সাথে বেশ গভীর আলাপ হয়েছে। হয়তো প্রেম ট্রেমও আছে … মানে উচ্চবিত্ত হাই সোসাইটিতে তো এরকম হয়ই, সিঙ্ঘানিয়ার অঢেল পয়সা, কাজেই নূতন ম্যাডাম স্বচ্ছন্দে ওনার সাথে জুটে গিয়েছেন। জিতুর লম্বা ফ্রেন্ড সার্কেলেও ব্যাপারটা এসেছে … নূতন ঘেরজী এন্ড এসোসিয়েটে চাকরী করতেন, সেখানে ওনার প্রেম ট্রেম নিয়ে কোন কলীগের সাথে কিছু ঝামেলা হওয়ায় চাকরী ছেড়ে সে সিঙ্ঘানিয়ার সফটকমে জয়েন করেছে। ভদ্রমহিলাকে দেখলে অনেক মানুষেরই আকর্ষনীয় মনে হতে পারে, সিঙ্ঘানিয়ার নিশ্চয়ই ভালো লেগেছিল কাজেই উনি স্বচ্ছন্দে জয় করে নিলেন। জিতু একটু ঘার ঘোরাতেই সিঙ্ঘানিয়ার ছেলে সিডকে দেখতে পেল আর তার পাশে ওর গার্ল ফ্রেন্ড মাধুরী। এদের দুজনকেই জিতু ভালো করে চেনে। এছাড়া আরো দুজন ওদিকের বড় টানা সোফায় বসে আছে যাদের ও চেনে না, হয়তো বাবার নতুন কোন ক্লায়েন্ট। ভেতরের দিকে কোথাও মহাদেব বসে আছে, তার গলা পাওয়া যাচ্ছে আর সবাই তার দিকেই তাকিয়ে কিছু শুনছে। জিতু এসব দেখে এবার যাবার কথা ভাবছিল কারণ এখানে দেখার মতো নতুন কিছু নেই। এমন সময় মহাদেব একটু গলা তুলে কাকে বললো – এই রিয়া, কোথায় তুমি … ঘরে কি করছো, আইসক্রীমের ট্রেটা নিয়ে চলে এসো। ভেতর থেকে কোন অল্প বয়সী মহিলার গলার আওয়াজ পাওয়া গেলো – আসছি আসছি, এতো তাড়া দিও না। জিতু যেতে গিয়েও আবার দাঁড়িয়ে পরলো, রিয়া আবার কে … নতুন কোন মহিলা হয়তো, বাবার নতুন বান্ধবী নাকি? … দেখেই যাওয়া যাক। অপেক্ষা করার খুব একটা দরকার হলো না, ভেতর থেকে কেউ একজন বেরিয়ে এলো যদিও জানলা থেকে তাকে দেখা গেলো না। টেবিলে ট্রে রাখার একটা শব্দ হলো … তারপর একটা গলা শোনা গেলো – মি. গিলানি, আপনার তো মনে হয় একটু চাটনী লাগবে। সোফায় বসে থাকা অচেনা দুজনের একজন মাথা নেরে বললেন – হ্যাঁ … একটু নিলে হয়, বেশ ভালো তৈরী করেছে।

নীল জিন্স আর হাল্কা সবুজ টি সার্ট পরা একজন অল্প বয়সী মহিলা বড় একটা চামচীতে খানিকটা চাটনী নিয়ে ভদ্রলোকের দিকে এগিয়ে এলো, সাইড থেকে চেহারাটা একটু চেনা চেনা। জিতু ভালো করে দেখার জন্য মাথাটা আরো একটু সরালো, … । রিয়া চামচী হাতে সাবধানে সোফার দিকে এগোচ্ছিল, হঠাৎ তার মনে হোল যে জানলার পর্দার ওপর দিয়ে কালো মতো কি যেন একটা সরে গেলো … ভালো করে দেখার জন্য সে মাথাটা ঘুরিয়ে জানলার দিকে তাকালো। জানলার ওপারে দাঁড়ান লোকটার চুল, চোখ, কান আর কপালের অনেকটা দেখা যাচ্ছে পর্দার ওপর দিয়ে … লোকটাকে দেখে রিয়া ভুত দেখার মতো চমকে উঠলো, সেখানে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সত্যিই যেন একটা ভূত দাঁড়িয়ে। রিয়া কেমন বোকার মতো জানলার দিকে তাকিয়ে ছিল, আর হাতের চাটনী কয়েক ফোটা মাটিতে পরে গেল।

মেয়েটা মাথা ঘোরাতেই জিতু মুখটা দেখলো … সেই মুহুর্তে পায়ের তলার মাটি যেন একটু সরে গেলো। মাথার মধ্যে কোথাও কিছু একটা যেন মুহুর্তের জন্য থেমে আবার চালু হয়ে গেল। সে কোনোক্রমে পড়া থেকে নিজেকে সামলে নিল … তারপর আর কে জানলায় দাঁড়ায় … সোজা সিঁড়ি দিয়ে নেমে পার্কিং লটে নিজের গাড়ীতে উঠে বসলো। কয়েক মুহুর্তের মধ্যে তার ফোর্ডটা ঝড়ের মতো রাস্তা দিয়ে দৌড়তে শুরু করলো।

 

আঠের।

 

গাড়ী চালাতে চালাতে জিতু কেমন ঘোরের মতো বসে রইল … খুব মন দিয়ে গাড়ী চালাতেও আর ইচ্ছে করছে না। কিন্তু কোথায় যেন একটা খটকা … বাবা তো মেয়েটাকে রিয়া বলে ডাকলো, অথচ সে বরাবরই ওকে মাম্পি বলে জানে। কিন্তু একটাই তো মেয়ে, জমজ তো আর নয় … তাহলে? আচ্ছা, সত্যিই যদি জমজ হয়? জগতে একই রকম দেখতে মেয়ে তো দুটো হতেও পারে, তাই না? দোৎ, বাদ দাও ওসব বাজে চিন্তা। আচ্ছা, ও যেই হোক, রিয়া বা মাম্পি, ও বাবার সাথে ভিড়লো কি করে? জিতু তো বেশ কয়েক মাস ধরে ওই মেয়েটার সাথে লাইন মারার চেষ্টা করছে … ওর সাথে বাবার আলাপটাই বা হোল কি করে? মাই গড, দুনিয়ায় ক্রস কানেকশান হয়, কিন্তু তাই বলে এই রকম? মহাদেবের মতো সাকসেসেফুল লোকের সাথে কেউ জুটে গেলে জিতুর মতো বেকারকে কয়ে পাত্তা দেয়? এই নিয়ে জিতুর দ্বিতীয়বার প্রেম কাটাই হোল … ওফ কতো আর সহ্য হয়। মেয়েদের নিয়ে এই এক প্রবলেম, কখন যে কার দিকে ঝোঁকে বোঝা বড় মুস্কিল। জিতু কিছুতেই বুঝে উঠতে পারলো না … সে তো তেল কম দেয় না। খাওয়ানো যদি বল তাহলে এই মাম্পি না রিয়ার পেছনে এই কয়েকমাস প্রায় কয়েক হাজার টাকার খেসারত দিয়েছে, তার ওপর আছে ছোটখাট উপহার … তাও কিছু না হোক হাজার দুয়েক ক্রস করেছে। তার ওপর আছে তার বন্ধুরা, জিতুর প্রেম নিয়ে ওরা তো অলরেডি বেটিং শুরু করেছে … এগুলো অবশ্য ছেলে ছোকরাদের মজা কিন্তু আজকের ব্যাপারটা নিয়ে ওরা একটু হাসাহাসি তো করবেই। ধুস, মানুষের জীবনটাই এইরকম, জিতু আর কিছু ভাববে না। কিন্তু মাম্পি বা রিয়া যেই হোক, যখন একবার চলে গেছে তখন সে আর ডাকবে না … মরুক গে, ও ওর পছন্দ করেছে, জিতু তার পছন্দ করবে, কিন্তু কিছু একটা করতে হবে এবং খুব তাড়াতাড়ি … গড প্রমিস।

 

*****

 

রিয়া কেমন বোকা বোকা ভাবে মহাদেবের পাশে সোফায় বসে পরলো … আচ্ছা জ্বালা, এর মধ্যে আবার এখানে জিতু এলো কি করে। রিয়ার অনেক বন্ধু, তার মধ্যে দেবু আর জিতু একটু বেশি কাছে এসে পড়েছিল … একটু প্রেম ট্রেম ব্যাপার তৈরী হয়েছিল। জিতু কম বয়সী, সে ছোটাছুটি করতে ভালোবাসে, সে কাছে আসতে ভালোবাসে … তার ভালোবাসার মধ্যে বয়সের জ্বালার একটা ব্যাপার আছে। সে যখন সিগারেট হাতে ধপ করে পাশে এসে বসে তখন বেশ ঘাম ঘাম পুরুষালী একটা গন্ধ নাকে আসে … বেশ গায়ের লোমগুলো খাড়া হয়ে যায়, ঐ রকম ভাবে খানিকটা বসে থাকতে বেশ লাগে। কিন্তু মহাদেব খানিকটা অন্যরকম … তার মন অনেক বেশী মজবুত। সে রীতিমতো বড় পোস্টে চাকরী করে, দেদার পয়সা। সে সোজাসুজি কথা বলতে ভালোবাসে … সে রিয়াকে অ্যাডাল্ট হিসাবে ট্রিট করতে ভালোবাসে। সে রিয়ার মতামতকে মূল্য দেয় একজন পার্টনার হিসাবে। মহাদেব সোজা কথার মানুষ, সে তার সোশ্যাল পোজিশান রিয়াকে বুঝিয়ে ছিল … সে একজন অফিসের বস, সে অনেক কিছু সোজাসুজি করতে পারে না। সে রিয়াকে অফিস পার্টিতে নিয়ে গিয়েছে, সে রিয়াকে অফার দিয়েছিল উইকএন্ডে কোথাও ছুটি কাটাতে, হয়তো মুম্বাই থেকে একটু দূরে কোথাও কিন্তু সব কিছুই রিয়ার ওপিনিয়ানের ওপর নির্ভর। জিতুর আছে আবদার, সেও রিয়াকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যেতে চায় কিন্তু তার চাওয়া অনেকটা বাচ্চা ছেলের বায়নার মতো। আর দেবুর কথা অনেকটা সাজেশানের মতো … দুজন অ্যাডাল্ট যে ভাবে ডিসকাস করে সেরকম। রিয়া কোন কথায় “না” বললে জিতুর আছে অভিমান, গম্ভীর মুখ … আর সেই একই সিচুয়েশানে দেবুর মুচকি হেসে বলা – Never mind, we shall do some other time … লেটস্ গো ফর সাম আইসক্রিম। জিতুর নৌকো একটু পলকা, নিজের মনের ঝড়ে দুলে যায় আর তাছাড়া তার তো এখন চাকরীই নেই। আর দেবু লাইফে ওয়েল সেটেল্ড, প্রোফেশানালি হাইলী সাকসেসেফুল আর বিগ ব্যাঙ্ক ব্যালান্স। রিয়া খুব লজিক্যালি দেবুর দিকে একটু ঝুঁকে পড়েছে সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই … যদিও এরকম পার্টিতে তো সে দেবুর সাথে কয়েকবারই গিয়েছে, আজকে জিতুর সাথে এই বাড়ীতেই দেখা হয়ে গিয়ে কেমন যেন সব গোলমাল হয়ে গেল। রিয়া মনে মনে ছক কষছিল কি ভাবে জিতুকে সান্তনা দিয়ে আস্তে আস্তে প্রেমের আশাকে আবার বন্ধুত্বের বাস্তবে ফিরিয়ে আনা যায় … কিন্তু আজ জানলার ফাঁক দিয়ে এই শুভদৃষ্টি তার কাজকে বোধহয় একটু সহজ করে দিল।

 

*****

 

এই রকম ভাবে আরো সপ্তাহ দুয়েক কাটলো। মহাদেব এখন বেশ মস্তিতে আছে … রিয়ার সঙ্গে ওর রিলেশানটা অনেকটা ফরমালাইজ হয়ে গেছে। ঠিক কি হয়েছে বলা খুব মুস্কিল কিন্তু রিয়াও এখন দারুণ সহজ আর ফ্রিলি ওর সাথে মিশছে। সেদিনকার পার্টিটা বোধহয় ওর পক্ষে বেশ ভালো হয়েছে, সমস্ত জড়তা কেটে গেছে। তবে মহাদেবের লাইফ খুব স্ট্রিক্ট … ওয়ার্কিং ডে-তে তার সময় খুব কম তাই সে রিয়াকে বলেই রেখেছে যে যদি কোনদিন দেখা করার ইচ্ছে থাকে তাহলে জাস্ট একটা এস.এম.এস. করে দিতে … অফিস থেকে ফেরার পথে মহাদেব ওকে পিক আপ করে নেবে। উইকএন্ডে অবশ্য রিয়া প্রায় প্রতি শনিবারই মহাদেবের বাড়ী চলে আসে, এখানেই থাকে যদি না কলেজে কোন এক্সাম থাকে। হয়তো রিয়ার বাড়ীতেও কোন ইঙ্গিত চলে গেছে … অন্তত মহাদেবের সেই রকমই মনে হয়।

সেদিন রবিবারের সকাল … সকাল প্রায় সাড়ে দশটা। মহাদেব আর রিয়া দুজনে রান্না ঘরের টেবিলে বসে টোস্টে মাখন মাখাচ্ছিল, পাশের স্টোভে দুটো ডিম জলে সেদ্ধ হচ্ছে … ঠিক সেই মুহুর্তে দরজার সামনে একটা ছায়া এসে পড়লো। মহাদেব অতটা বুঝতে না পারলেও রিয়া ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল … দরজায় জিতু দাঁড়িয়ে। এতদিনে অবশ্য নানা ক্রস কানেকশান থেকে রিয়া খবরটা বার করে নিয়েছে … মহাদেব আর জিতুর সম্পর্ক …। ব্যাপারটা বেশ মজার যদিও … সে একসাথে বাবা আর ছেলের সাথে কোর্টশিপ চালাচ্ছিল … তারপর ছেলেকে ডাম্প করে বাবাকে বেছে নিয়েছে, at least for the time being। এই সব কথা ভাবতে রিয়ার কয়েক মুহুর্ত লেগেছে, জিতু কয়েক পা ভেতরে ঢুকে এলো।

জিতু। হাই রিয়া … হাই ড্যাড …।

রিয়া। হাই জিতু … গুড মর্নিং …।

মহাদেব স্বভাবতই একটু লাজুক, একটু থতমত খেয়ে ঠিক কি বলবে ভাবছিল, অন্তত একটা গুড মর্নিং বলা উচিৎ … ঠিক এই সময় আবার দরজার সামনে একটা ছায়া। খুব ধির পদক্ষেপে একজন টান টান লম্বা সুন্দর ফিগারের মেয়ে ঘরে এসে ঢুকলো, রিয়া যাকে শালিনী বলে চেনে।

শালিনী। গুড মর্নিং রিয়া … মর্নিং ড্যাড।

মহাদেব অবাক চোখে তাকাল … সকাল বেলায় এ আবার কে। সে অবশ্য শালিনীকে চেনে না। সারপ্রাইজ, জিতু কি কালকে তার ফেন্ডকে নিয়ে বাড়ীতে ছিল নাকি…। মহাদেব ঠিক কিছু বলতে না পেরে দুজনের দিকে অবাক ভাবে তাকিয়ে রইল।

জিতু নিজের মনে নিজের পিঠ চাপড়ে দিল … মার দিয়া কেল্লা … কয়েকদিন আগে বাবা তাকে ট্রাম্প করেছিল, আজ সে বাবাকে ওভার ট্রাম্প করেছে। যাক, অন্তত মনের জ্বালা একটু তো কমলো …। তাছাড়া প্রেমের খেলা কে বলিতে পারে …?

 

সমাপ্ত

~ শীল vs. শীল -(অন্তিম পর্ব) ~

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

*