।এক।

 

সৌগত হাতে চিঠিটা পেয়ে একটু ঘাবড়েই গিয়েছিলো। ও হঠাৎ যে একটা চিঠি পাঠাবে তা আর কে ভেবেছিল। কয়েকদিন অবশ্য ওদের বাড়ীর দিকে যাওয়া হয়নি। সেটাও তো হতেই পারে … আলাপটাই বা আর কতদিনের। এখনও ভালো করে মাস দুয়েকও হয়নি।

ব্যাপারটা খুব জটিল কিছু নয়, তবু খোলাখুলিই বলা যাক। সৌগত পি.এইচ.ডি. শেষ করে কি করবে ভাবছিল। হাতে অবশ্য চাকরী কিছুই ছিল না, নানা জায়গায় অ্যাপ্লাই করা ছিল কিন্তু কিছুই উত্তর আসছিল না। যাও বা আসছিল তাও সবই ইনিয়ে বিনিয়ে না বলা। এই সব ইমেল রিপ্লাই গুলো পরলে বোঝা যায় যে দুনিয়ায় মানুষকে কত রকম ভাবে, কত সুন্দর ভাবে পোলাইটলি না বলা যায়। সৌগতর অবশ্য হায়ার স্টাডির দিকে বেশ একটু ঝোঁক আছে, কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং-য়ে পোস্ট-ডকটরাল ফেলোশিপ পাওয়া বেশ হিম্মতের ব্যাপার। খড়গপুর আই.আই.টি.-তে পি.এইচ.ডি. করতে করতেই এই ব্যাপারগুলো মাথায় ঢুকে গিয়েছিল। তার পি.এইচ.ডি. গাইড প্রোফেসর প্রশান্ত পাত্র এই ব্যাপারে তাকে বেশ ভালো মতো সতর্ক করেছিলেন। তার ওপর আবার কমপিউটেশানাল মেকানিক্সের ওপর কাজ, পুরোপুরি থিওরেটিকাল। কাজেই ভালো পাবলিকেশান না থাকলে ফারদার কোথাও চান্স পাওয়া মুশকিল। প্রোফেসর পাত্রও অবশ্য নিজের কিছু চেনা জানা কলীগের কাছে লিখেছিলেন, অন্যান্য আই.আই.টি. বা আই.আই.এস.সি. বাঙ্গালোর-এ। কিন্তু কোথাও-ই সেরকম কিছু হচ্ছিল না। সৌগতর মেন ব্রাঞ্চ ছিল অ্যারোস্পেস, কিন্তু মেকানিক্যাল বা সিভিলের অনেক ফ্যাকাল্টি-কেও সে চিনতো। তাই নানা যায়গায় জিজ্ঞাসা করে ভারতের বাইরেও বেশ কিছু ভালো ইউনিভার্সিটিতে অ্যাপ্লাই করে রেখেছিল। মনে আশা যদি কিছু হয় …। আর আশাতেই তো মানুষ বাঁচে …।

 

এ সব অবশ্য তা প্রায় মাস সাত আট আগের কথা, মানে গত বছর জুনের ঘটনা। তখন সৌগতর অবশ্য খুব কিছু জরুরী কাজ ল্যাবে থাকতো না, সকালে সাড়ে নটা থেকে দশটার মধ্যে সাইকেলে করে একবার ল্যাবে আসা, দু একজন এম.টেক. যারা ল্যাবে থাকতো তাদের সাথে একটু কথা বার্তা বা কাজে কিছু সাহায্য করা … এই সব সেরে এগারটার একটু আগে অন্যান্যদের সাথে দল বেঁধে চা খেতে চলে যাওয়া। সকালের এই চা খেতে যাওয়াটা একদম মাস্ট। কখনও হিজলী জেলের লাল বাড়ীর দোতলায়, কখন বা নিজেদের অ্যারোস্পেস বিল্ডিঙেরই ভেতরে। আসলে চা খাবার নাম করে খানিক্ষন আড্ডা দেওয়াই মূল ঊদ্দেশ্য। সৌগতকে অবশ্য প্রোফেসর প্রশান্ত পাত্রই স্পনসর করে দিচ্ছিলেন একটা ন্যাশানাল এরোস্পেস ল্যাবরেটরীর প্রোজেক্ট থেকে, কাজেই তার সেরকম কাজের চাপ ছিল না।

এরকম যেতে যেতে হঠাৎ উদ্ভট একটা ব্যাপার ঘটলো। সেদিনটা বোধহয় একটা শুক্রবার, বিকালের দিকে চা-টা খাওয়া হয়ে গেলে সে একবার রিসার্চ স্কলার রুমের দিকে যাচ্ছিল নিজের টেবিলের দিকে। ওখানে কিছু দরকারি টেকনিক্যাল পেপার জেরক্স করা আছে ওগুলো নিয়ে নিতে হবে, কাল মানে শনিবার আর রবিবার এদিকে আসার ইচ্ছা নেই, বি.সি.রায়. হস্টেলের ঘরে বসেই ওগুলো পড়ে ফেলার ইচ্ছে আছে। প্রোফেসর পাত্র বলছিলেন যে এই পেপার গুলো থেকে যদি কিছুটা থিওরি ওর পি.এইচ.ডি.-তে লেখা সফটওয়্যারে ইমপ্লিমেন্ট করে দেওয়া যায় তাহলে একটা পেপার হয়ে যেতে পারে। তা নিজের ঘরে যাওয়ার পথেই পায়রার খোপের মতো মেল বক্স-গুলো পরে। সাধারণত সৌগতর মেল বক্সে হাবি জাবি কাগজ ছাড়া আর কিছুই থাকে না। আজকেও সেরকম কিছু একটা থাকবে ধরে নিয়ে একবার আর চোখে চেয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল … কিন্তু কিছু অ-দরকারি কাগজের তলায় কিছু একটা যেন চোখে পড়ল। একটা নিলচে বর্ডার দেওয়া খাম, তার সামান্যই দেখা যাচ্ছে।

সৌগত দাঁড়িয়ে গেলো … ওটা আবার কি? আজ সকালেও তো একবার উঁকি দিয়েছিল কিন্তু তখন কিছু তো ছিল না …। ডান দিকে দু এক পা এগিয়ে খামটাকে বার করে আনল। পার-আ-ভিওন … তার মানে ইন্টারন্যাশানাল মেল। উল্টো দিকে ঘোরাল … বেশ বড় বড় করে তার নাম আর ঠিকানা লেখা, ওপরে ফ্রম এর জায়গায় লেখা … ইম্পিরিয়াল কলেজ লন্ডন, সাউথ কেন্সিংটন, ইউ.কে.।

হরি হরি … এটা আবার কখন এলো। হাতে নিয়ে হাতটা একটু বোধহয় কেঁপেই গেলো সৌগতর। মাই গড, ইম্পিরিয়াল কলেজ লন্ডন … কবে যে অ্যাপ্লাই করেছে তাই তো ভুলে মেরে দিয়েছে। নিশ্চয়ই গত দু মাসের মধ্যে নয়। মার্চের শেষের দিকে পরপর কয়েকটা ব্লাইন্ড অ্যাপ্লাই করেছিল, মানে ইমেলে বায়োডাটা নানা ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্টাল হেডদের কাছে পাঠিয়েছিল। তার মধ্যে মনে হচ্ছে ইম্পিরিয়াল কলেজও ছিল … মানে নিশ্চয়ই ছিল না হলে এই চিঠিটা এলো কি করে। যাই হোক এখন তো দুরু দুরু বুক, কি লিখেছে চিঠিতে। যেটা মজার সেটা হোল যারা নেগেটিভ আনসার দেয় তারা তো একটা ছোট্ট ইমেলেই সেরে দেয়, চিঠি তো দেয় না। তাহলে এটা আবার কি? হাতে চিঠিটা নিয়ে এই বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকার কোন মানে হয় না, হঠাৎ কেউ এসে গেলেই সারা ডিপার্টমেন্ট জেনে যাবে এবং হাজারটা লোকে আলোচনা করবে। সৌগত ঝট করে চিঠিটা বুকের কাছ দিয়ে সার্ট আর গেঞ্জির মধ্যে চালান করে দিল, তারপর নিজের টেবিলে গিয়ে গোটা চারেক পেপার হাতে নিয়ে বেরিয়ে এলো। গোটা দুয়েক এম.টেক. ঘরে বসেছিল, তাদের একটু হাই-হ্যালো বলে উৎসাহ টুৎসাহ দিয়ে পরে দেখা হবে বলে বেরিয়ে এলো। এখন বেজায় কম্পিটিশানের বাজার, ফ্লুইড মেকানিক্স গ্রুপের স্বাতীলেখা দুমদাম আমেরিকায় অ্যাপ্লাই করে যাচ্ছে। ওর গাইড গোপাল ভার্মা আবার আমেরিকার ভার্জিনিয়া টেকের পি.এইচ.ডি., কাজেই ওখানে ওর বেশ ভালোই নেটোয়ার্কিং আছে … সৌগত জানে স্বাতীলেখার কিছু একটা হয়ে যাবে। আর মেয়েটাও বেশ, মানে যাকে বলে গর্বে মটমট করছে। রীতিমত পয়সাওলা ঘরের মেয়ে, কলকাতায় গুরুসদয় দত্ত রোডের কোথাও ওদের বাড়ী। সৌগতদের মতো মিডিল ক্লাসদের পাত্তাই দেয় না, নেহাত একই ডিপার্টমেন্টের বলে “কি রে কেমন আছিস” গোছের মামুলি কিছু কথা বার্তা হয়, তার বেশী কিছু নয়। তবে মেয়েটা বেশ ভালো কাজও করেছে এই চার বছরে। তিনটে পেপার অলরেডি বেশ ভালো জার্নালে পাবলিশড, আরো দুটো শোনা যায় কমিউনিকেটেড। তার মধ্যে আবার একটা নাকি মাইনর অল্টারেশানের পর অ্যাকসেপ্টেড।

এসব অবশ্য ওর অন্যান্য কলীগদের থেকেই শোনা, স্বাতীলেখা এসব নিয়ে নিজের গাইড ছাড়া কারোর সাথে ডিসকাস করে না। এই মাস ছয়েক আগেও কম্পিউটার সায়েন্সের একটা ছেলের সাথে বেশ চুটিয়ে প্রেম করতো, কিন্তু থিসিস সাবমিট করার মাস দুয়েক আগে পট করে হঠাৎ সব কেটে গেলো। রাস্তায় দেখা হলে আর কেউ কাউকে চেনে না। তবে ইন্দিরা গান্ধী লেডিজ হোস্টেল থেকে কানা ঘুষোয় যা শোনা যায়, স্বাতীলেখাই নাকি ব্যাপারটা কাটিয়ে দিয়েছে … এখন নাকি বিয়ে করার ইচ্ছে নেই, আগে বাইরে থেকে পোস্টডক করে এসে তারপর ঠিক করবে, হয়তো বাইরেও সেটেল করতে পারে … ওদের ফ্যামিলীর অনেকেই আবার আমেরিকা, কানাডায় সেটেল্ড। সৌগত অবশ্য এসব নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামায় না, স্বাতীলেখার বাজার মারাত্মক গরম … বহু ছেলেই ওর সাথে প্রেম করতে মরীয়া। স্বাতীলেখাই তথাগতকে বেছেছিল, ছেলেটা পড়াশোনায় ভালো আবার একটু শান্ত গোবেচারা গোছের … মানে স্বাতীলেখার মতো অ্যাগ্রেসিভ মেয়ের পক্ষে আদর্শ … যারা হাসব্যান্ডকে পুরো কব্জা করে রাখতে চায়। যাই হোক, ওদের সম্পর্ক কেটে গেলে গেলো, সৌগত এখন এই মুহুর্তে সাইকেল শেড থেকে তার নীল রঙের সাইকেলটা বার করে নিয়ে সোজা বি.সি.রায় হোস্টেলের দিকে ধাবিত। চিঠিটা নিজের ঘরে গিয়ে খুলে দেখতে হবে ভেতরে কি আছে … হ্যাঁ বা না যাই হোক, সৌগত এসব অনেক পেয়েছে কাজেই তার বিরাট কিছু হেরফের হবে না কিন্তু ডিপার্টমেন্টের মেলা লোকের কাছে খবরটা যেন না যায়। রিসার্চ স্কলার আর এম.টেক.-রা হাজারটা প্রশ্ন করে বড়ই নাকাল করে। আর তাছাড়া পোস্টডক রীতিমত কম্পিটিভ ব্যাপার … একই প্রোফেসরের কাছে একই ডিপার্টমেন্টের দুই কলীগের সি.ভি. চলে গেলেই কেলো … তখন যার সি.ভি. ভালো তাকেই নিয়ে নেবে। কাজেই এইসব ক্যারিয়ারের ব্যাপারে সবাই খুব সেয়ানা, কেউ কারুর কাছে পুরোপুরি সত্যি কথাটা বলে না, একটু ওপর ওপর বলে এরিয়ে যায়। তাই এইসব লুকোচুরির ব্যাপারে শুধু সৌগতকে দোষ দিয়ে লাভ নেই।

 

।দুই।

 

সৌগত সাঁই সাঁই করে সাইকেল চালিয়ে এসে বি.সি.রায়. হোস্টেলের মধ্যে ঢুকে পরলো। স্বদেশের চায়ের দোকানটা তখনও খোলা, তার সামনে যথারীতি বেশ কিছু ছেলের ভিড়। অনেকেই চায়ের গেলাস হাতে দাঁড়িয়ে গল্প করছে, কেউ কেউ বিস্কুট বা ডিমের ওমলেট খাচ্ছে। রাত্রে খাবার মেনু বাজে থাকলে স্বদেশ মাংস টাংস কিছু একটা করে … আজও বোধহয় কিছু একটা হবে। সাইকেলটা লক করতে করতে সৌগত এই ধরনের কিছু কথা বার্তা শুনতে পেল। একটু পরেই বোধহয় সামনের মাঠে ফুটবল শুরু হবে, দুতিন জন অলরেডি মাঠে নেমে ফুটবলে কিক মারতে শুরু করেছে। সৌগত জেনারেলি ফুটবল আর ক্রিকেটের পোকা, দুটোই খেলে থাকে এবং খেলার খবরও ভালোই রাখে … কিন্তু আজ একটু আলাদা। ওই নীল আর লালে দাগ দেওয়া খামটা তার মনকে টানছে। ওকে দেখেই দু একজন এগিয়ে এলো …

মনজয়। সৌগত, হাফ প্যান্টটা পরে নেমে আয়, আমরা কিন্তু এখনই শুরু করছি।

সৌগত। এই একটু পরেই আসছি।

দেবাশীষ। মেলা বাওয়াল করিস না সৌগত … এখন হাতে পেপার নিয়ে কি হচ্ছে? জলদি নেমে আয়। এখন কিন্তু সাধাসাধি আর ভালো লাগছে না।

সৌগত ঠিক কি বলবে ভেবে পেল না, তারপর খুব তাড়াতাড়ি দোতলায় যাবার ভান করে একটু দূর থেকে বললো – ঠিক আছে, তোমরা শুরু করে দাও না … আমি খানিক পরে এসে কোন একটা টিমে ঢুকে যাব। ঠিক আছে?

ওরা দুজনেই মাথা নারলো … এখনই অবশ্য অনেক ছেলে মাঠে ঢুকে গেছে কাজেই ছেলে কম পরার সেরকম কোন চান্স নেই।

সৌগত দুড়দাড় করে সিঁড়ি দিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে এলো। হাতের পেপার গুলো টেবিলে ছুড়ে দিয়ে পিছনে দরজাটা বন্ধ করে দিল। এইবার সেই খামটা …। ঘরের আলোটা জ্বালিয়ে সার্টের ভিতর থেকে খামটা বার করে আলোর সামনে ধরল … এক পাতার একটা ছোট্ট চিঠি আছে বলে মনে হচ্ছে। আর বেশী দেরি না করে একটা ব্লেড দিয়ে খামের একটা ধার কেটে ভিতরের চিঠিটা বার করে আনলো।

বেশী নয়, মাত্র তিন চার লাইনের একটা অফিশিয়াল লেটার …। মদ্দা কথা সৌগতর অ্যাপ্লিকেশানের জন্য তাকে ওরা ধন্যবাদ জানিয়েছে। তার সি.ভি. এরোস্পেস ডিপার্টমেন্টের একটা রানিং প্রোজেক্টের জন্য খুব ক্রিটিক্যালি ইভ্যালুয়েট করা হয়েছে এবং সেই কম্পোসিট স্ট্রাকচারের প্রোজেক্টের জন্য তার নাম ইন্টারভিউয়ের ফাইনাল লিস্টে রয়েছে। আগামি দু সপ্তাহ পরে তার টেলিফোন ইন্টারভিউ হবে এবং তার জন্য ওরা একটা কনভেনিয়েন্ট টেলিফোন নাম্বার ইমেল মারফত জানাতে বলেছে। ফাইনাল ডেট আর টাইম ওরা ইমেলে জানিয়ে দেবে। সৌগতর মাথাটা যেন একটু হাল্কা হয়ে এলো … একটু যেন ঘুরেও গেল। সে কোন রকমে বিছানায় বসে পরলো। ও বাবা, তাহলে ব্যাপারটা সত্যি সত্যিই ঘটতে চলেছে। এতদিন শুধু অ্যাপ্লাই করেই গেছে, কিছুই খবর আসেনি কাজেই বিশেষ কিছু করার ছিল না। আর যা এসেছে সবই নেগেটিভ …! প্রথমে বুকের ভিতরটা কেমন যেন ধক ধক করছিল … একটু বসার পর যেন কমলো।

 

নিচে বি.সি.রায়ের মাঠে তখন ফুটবল বেশ জমে উঠেছে … মাঠের সাইডে গোল পোস্টের পিছনে দাঁড়ান জনতা তাদের নানান অভিব্যাক্তি ব্যাক্ত করছে। সৌগত চিঠিটা হাতে খামচে ধরে বসে রয়েছে। সে বোধহয় উত্তেজনায় একটু নেতিয়ে পরেছিল, হঠাৎ তার মনে হোল ইমিডিয়েটলি প্রোফেসর পাত্রকে খবরটা জানান দরকার, ওনার মতামতের একটা মূল্য আছে। তাছাড়া কালকে আবার শনিবার, যদি কলকাতা চলে যান তাহলে কবে ফিরবেন তার ঠিক নেই। সে চিঠিটাকে পকেটে গুঁজে দরজা বন্ধ করে আবার নিচে চলে এলো … কমনরুমের ঠিক পাশেই টেলিফোনটা থাকে, ওখান থেকে ওনার বাড়ীতে একটা কল করতে হবে।

 

।তিন।

পরের দিন টিক্কায় কফি খেতে খেতে সৌগত আর প্রোফেসর পাত্র বসে বসে কথা বলছিলেন। মোটামুটি ঠিক হোল যে সোমবারই সৌগত ইমেল করে একটা নম্বর লন্ডনে জানিয়ে দেবে। ওর নিজের মোবাইল নম্বরটাই এই ব্যাপারে সব চেয়ে ভাল। আরো ঠিক হোল যে ইন্টারভিউটা খড়গপুর থেকে দেওয়াই সব থেকে ভালো কারণ ওর সব টেকনিক্যাল পেপারস, থিসিসের কপি সবই এখানে। ইন্টারভিউ ডেট আর টাইমটা জানলে একটা ফাঁকা ঘরের ব্যাবস্থা করা যাবে … আর ইন্টারভিউ এবং ওদের ডিসিশান ফাইনাল না হলে এখনই কাউকে লাফালাফি করে বলার কিছু নেই। সৌগত অবশ্য এমনিতেই এই মুহূর্তে কাউকে বলার পক্ষপাতি নয়।

ব্যাপারটা যেমন হঠাৎ ঝড়ের মতো এসেছিল, সেরকম তীব্র গতিতে চলেও গেলো। যে শুক্রবার চিঠিটা পেল তারপর একটা শুক্রবার বাদ দিয়ে তার পরের শুক্রবার ইন্টারভিউটা হোল। ইংল্যন্ডের থেকে ভারতের টাইম প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার ঘন্টা এগিয়ে, কাজেই শুক্রবার বিকাল সাড়ে পাঁচটার পরে ইন্টারভিউ টাইম ছিল। শুক্রবার বিকাল পাচটার পর এমনিতেই ডিপার্টমেন্ট ফাঁকা, তা হলেও প্রোফেসর পাত্র তাঁর ঘরের চাবিটা সৌগতকে দিয়ে নিজে বাড়ী চলে গেলেন আর সৌগত ভেতর থেকে দরজা দিয়ে সামনে মোবাইল, কিছু পেপার আর নিজের বাঁধান থিসিসটা নিয়ে দুরুদুরু বুকে বসে রইল।

ইন্টারভিউটা কিন্তু বেশ টেকনিক্যাল হয়েছিল, তিনজন প্রোফেসার ইন্টারভিউ নিলেন। ওর থিসিস, পাবলিকেশান আর কম্পোসিটের ওপর বেশ কিছুক্ষণ প্রশ্ন চললো … প্রায় চল্লিশ মিনিট ধরে নানা ব্যাপারে কথা হোল, শুধু টেকনিকাল ব্যাপার নয়, তার হবি কি, ফ্রি টাইমে সে কি করতে ভালোবাসে, লন্ডন সম্পর্কে সে কতটা জানে, ইংলন্ডে তার কোন আত্মীয় বাস করে কিনা, নতুন কোন জায়গায় গিয়ে থাকার ব্যাপারে তার অভিঞ্জতা কতটুকু এবং নতুন জায়গার অ্যাডাপটেশানের ব্যাপারে তার অ্যাটিচিউড কি এই সব ব্যাপার নিয়েও কথা হোল। ইন্টারভিউ শেষ হবার আগে একজন তাকে ছোট্ট করে প্রশ্ন করলো – অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেলে কত তাড়াতাড়ি সে জয়েন করতে পারে? হরবর করে সৌগত বলেই দিল যে সে ফ্রি এবং ইমিডিয়েটলি জয়েন করতে পারে। তখন একজন প্রফেসর তাকে মোলায়েম করে জানালেন যে ইংল্যন্ডে এই মুহূর্তে ওয়ার্ক পারমিট বার করতে মিনিমাম ছয় থেকে আট উইক লাগবে, তাছাড়া সৌগত সেই ওয়ার্ক পারমিট হাতে পেলে তাকে ব্রিটিশ কনস্যুলেট থেকে ভিসা পেতে হবে। অতয়েব যদি এই মুহূর্তেও সে জয়েনিং লেটার পায় তাহলেও মাস তিনেকের আগে সে প্লেনের টিকিট কাটতে পারছে না। যাই হোক, ব্রিটিশ কার্টসি বলে কথা, চাকরি দিক না দিক দুদিক থেকেই প্রবল থ্যাঙ্ক ইউ দিয়ে ইন্টারভিউ শেষ হোল।

ব্যাস … ইন্টারভিউ শেষ হতেই সৌগত লাফিয়ে উঠল। আঃ … অনেক দিন পর আজ কেমন যেন একটা স্যাটিসফাইয়েড ভাব … কেমন যেন একটা খুশী খুশী দিলখোসা ব্যাপার। সে স্যারের ঘরের দরজা বন্ধ করে সাইকেল নিয়ে সোজা ছুটল স্যারের বাড়ীতে। সেখানে স্যার বাইরের ঘরেই বসেছিলেন একটা শরদিন্দু রচনাবলীর খন্ড নিয়ে। বোধহয় ব্যোমকেশ সমগ্র, … অবশ্য সৌগত গল্পের বই পড়তে খুবই ভালোবাসে কিন্তু আজ খুব একটা গ্রহ্য করল না। ঝড়ের মতো ঘরে ঢুকেই সোফায় বসে পরলো।

  • হ্যাঁ, তারপর কি কি প্রশ্ন করলো বল সৌগত। প্রোফেসর পাত্র প্রশ্ন করলেন।

সৌগত। মোটামুটি উত্তর দিয়েছি স্যার। প্রশ্ন বেশ ভালোই করেছে টেকনিক্যাল দিক থেকে। প্রথমে কম্পোসিট স্ট্রাকচারে কি ভাবে স্টিফনেস ম্যাট্রিক্স তৈরী করে, মানে এ., বি., ডি. ম্যাট্রিক্স তৈরী করে থেকে থার্মাল লোডিং স্ট্রাকচারে কিভাবে ইমপ্লিমেন্ট করা যায় … মানে থার্মাল স্ট্রেনের ব্যাপার, … তারপর হায়ার অর্ডার প্লেট থিওরী প্লেটে কেন করা হয়, মিন্ডলিন থিওরী থেকে কোথায় হায়ার অর্ডার থিওরী বেটার রেসাল্ট দেয় এবং কেন ইত্যাদি। তারপর, আজকাল আরো থিওরেটিক্যালি ইনভল্ভড লেয়ার ওয়াইজ প্লেট বেন্ডিং থিওরি লোকে করছে … তার অ্যাডভান্টেজটা কি, তার কিছু ডিস-অ্যাডভান্টেজ আছে কিনা, ইন্টারফেস মডেলিং-টা ঠিক কি, কোহেসিভ এলিমেন্ট কাকে বলে, ডিল্যামিনেশানটা ঠিক কি ফেনমেনা, এটা ঠিক কি ধরনের স্ট্রাকচার বা লোডিঙে প্রমিনেন্ট হয় … এই রকম আরো বহু ফান্ডামেন্টাল কোয়েশ্চেন।

প্রশান্ত। বাঃ … এগুলো তো তোমার পার্ট অফ পি.এইচ.ডি। তাছাড়া লিটারেচার সার্ভে তো ভালোই করেছ, কাজেই ব্যাপারগুলো তো মোটামুটি জানই।

সৌগত। হ্যাঁ … যতটুকু জানি তা তো বলেছি।

প্রশান্ত। ব্যাস, ব্যাস। তোমার পার্ট তুমি করেছ। ওরা নিশ্চয়ই আরো কিছু ইন্টারভিউ নেবে তারপর কিছু একটা ডিসিশান নেবে। তুমি আর টেনশান নিও না। আজ যাও গিয়ে ভালো কিছু খাওয়া দাওয়া করে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পর। দরকার হলে কালকে বাড়ী চলে যাও। তারপর সোম বা মঙ্গলবার থেকে আবার শুরু করা যাবে।

সৌগত বেশ মস্তিতেই ছিল, মাথা নেড়ে আরো কিছু হাল্কা ধরনের কথা বলে স্যারের বাড়ী থেকে বেরিয়ে এলো, তারপর সোজা বি.সি.রায়. হোস্টেল। আজ কিছু না হোক স্বদেশের দোকান থেকে একটু মাংস তো খাওয়াই যেতে পারে।

********

সৌগত যেটা ভেবেছিল সেটা কিন্তু হোল না। সে আশা করেছিল যে সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই কিছু একটা উত্তর আসবে কিন্তু কোথায় কি…! সপ্তাহ গড়াল, গুটি গুটি করে দশদিনের কোঠা পার … ফিরে আবার একটা উইক এন্ড, তার মানে পরিস্কার দুটি সপ্তাহ আশায় আশায় ঊরে গেল। প্রফেসর পাত্র আর সৌগত দেখা হলেই কেমন বোকার মতো দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকেন। সৌগতকে প্রশান্ত পাত্র পছন্দ করেন, তাঁর কাছে ছেলেটা প্রায় সাড়ে চার বছর রয়েছে, লাইট ওয়েট কম্পোসিট স্ট্রাকচারের ওপর বেশ ভালো কাজও করেছে, কাজেই ওর ভালো কিছু হলে তিনি খুশীই হবেন। মাঝে মাঝে তিনি সান্তনার কথা শোনান … আরে ভাই, এ সব ব্যাপারে একটু সময় লাগে, ওদের ইভ্যালুয়েশান করার সময় তো দেবে … অথবা … আরে তোমার এতো টেনশান কিসের ভাই? দরকার হলে তোমাকে আমি দুবছরের কনট্র্যাক্ট দিয়ে দেব, যেখানে খুশী যত ইচ্ছে অ্যাপ্লাই কর …কিন্তু মুখ গোমরা করে থাকবে না। তবে দুজনেই বোঝে যে যত দেরী ততই খবর খারাপের দিকে। তবে কিনা, এই সব ইন্টারন্যাশানাল চাকরীর ব্যাপারে একটু ধৈর্য লাগে … ওদের দিক থেকে কোন ফরেন ক্যান্ডিডেটকে সিলেক্ট করতে হলে হোম ডিপার্টমেন্ট, লেবার ইউনিয়ন বা ডিপার্টমেন্ট, ফরেন অ্যাফেয়ার্স বা সিকিউরিটি এদের সবার সাথে কথা বলতে হয় বা ক্লিয়ারেন্স নিতে হয়। প্রফেসর পাত্র সৌগতকে এসব কথা বুঝিয়েছেন … সৌগত মোটামুটি ব্যাপারগুলো বোঝে কিন্তু মনে মনে সে আশা ছেড়ে দিয়েছে। ততদিনে ইন্টারভিউয়ের পর তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে … আর কবে আসবে। সে মনে মনে নিজেকে সান্তনা দিয়েছে … এখনই বা সে এমন কি খারাপ আছে, তার একটা স্যালারী আছে, সেটা দরকার হলে হয়তো আরো বছর দের দুই থাকতে পারে… তার মধ্যে সে কিছু একটা পেয়ে যাবে। তাছাড়া হোস্টেলে তার কিছু বন্ধু বান্ধব আছে, বিকালে তার ফুটবল আছে আর শীতে ইন্সটিটিউটের মাঠে ক্রীকেট। আর বিকালের দিকে করার কিছুই না থাকলে আছে স্বদেশের দোকানের সামনে চেয়ারে পা ছড়িয়ে বসে আড্ডা দেওয়া। এই জীবনও মন্দ নয়, হয়তো একটু আরামটা বেশী।

 

।চার।

বাইরে থেকে সব ঠিকঠাকই চলছিল কিন্তু ভেতরে ভেতরে সৌগত একটু ক্ষয়ে গিয়েছিল। সে তো কতই অ্যাপ্লাই করেছে এতো দিনে, কতই তো নেগেটিভ রিপ্লাই এসেছে। সরাসরি না হওয়াটা একরকম, কিন্তু এই ব্যাপারটা … মানে ইন্টারভিউ অবধি যাওয়া সেটা আবার আর এক রকম। এটায় এক্সপেকটেশান অনেকটা বেশী থাকে। এখন জুলাই-য়ের মাঝামাঝি , অর্থাৎ ইন্টারভিউ ডেটের পর প্রায় পাঁচ সপ্তাহ কেটে গেছে, সৌগত ওই ব্যাপারটা পিছনে ফেলে রেখে এগিয়ে এসেছে। তবু মনের কোথাও যেন একটা কাঁটা বিঁধে রয়েছে, মাঝে মাঝে খচ খচ করে। আরে, উত্তরটা নেগেটিভ হলেও সেটা তো ভদ্রতা করে একটা ছোট্ট ইমেলে জানিয়েও দেওয়া যায়, নয়কি? মাঝখানে দিন দুয়েক বাড়ী যাওয়ায় ইমেল চেক করা হয়নি। মঙ্গলবার খড়গপুরে ফেরার পরেই তুমুল বৃষ্টি … কাজেই দুপুরটা ঘরেই কাটলো। বিকালের দিকে বৃষ্টিটা একটু ধরলে স্বদেশের দোকানে জমাটি করে কফি আর ডিমের ওমলেট খেয়ে প্রায় পৌনে ছটা নাগাদ সাইকেলটা নিয়ে একটু বার হোল। আকাশটা বেশ কালো হয়ে আছে, এর মধ্যেই খানিকটা অন্ধকার নেমে এসেছে … রাস্তার ধারে নানা জায়গায় রীতিমত জল জমে আছে আর অবিরত ব্যাঙের ডাক ভেসে আসছে।

সৌগতর বিশেষ কোন কাজ নেই, সে অল্প অল্প সন্ধ্যে নেমে আসা অন্ধকারে ম্লান টিউবের আলোয় চকচক করতে থাকা ভিজে রাস্তা দিয়ে ঝড়ের বেগে সাইকেল চালিয়ে দিল … সিভিলের বিল্ডিংটা ছাড়িয়ে অ্যারোস্পেসের দিকে। ইমেল চেক করেই আবার সে নিজের ঘরে চলে আসবে এটাই প্ল্যান। ঘরে হোস্টেলের লাইব্রেরী থেকে আনা নতুন টিনটিনের কমিক্স বইটা তাকে বিশেষ ভাবে টানছে। নতুন ইমেল আর কি আসবে, হয়তো সেরকম কিছুই নেই, তবু মাঝে মাঝে চেক করা তার স্বভাব। সাইকেল শেডে সাইকেলটা রেখে সে সোজা পি.সি. রুমে চলে গেল। এখন রুমটা প্রায় ফাঁকা … দু একজন খুব পড়ুয়া আন্ডার গ্র্যাডুয়েট কম্পিউটারে কিছু করছে। সে কোনের একটা পিসি খুলে বসে পড়ল। নিজের অ্যাকাউন্টে লগ-ইন করেই সে ইন্সটিটিউটের ইমেল সার্ভারে ধুকে পড়লো। প্রথমেই চোখে পড়ল নানা হাবিজাবি ইমেল … হাজার রকম অ্যাডভার্টাইজমেন্ট, ওপেন ইন্টারনেট জার্নালের বিঞ্জাপন, “মিস. রুবি ওয়ান্টস ইউ” টাইপের কিছু ইমেল, ভিয়াগ্রার মার্কেটিং – “ইউ হ্যাভ টু লাস্ট লং টু স্যাটিস্ফাই ইওর পার্টনার” টাইপের অ্যাড, কিছু লটারীতে টাকা জেতার কন ইমেল – “ইউ হ্যাভ ওন টেন মিলিয়ন ইউ.এস. ডলার”, কনফারেন্সের আর্লি বার্ড কল এইসব। কিন্তু ওই হাবিজাবির মধ্যে ওটা কি? আবার সেই ইমেল হেডিং – ফ্রম দি সেক্রেটারী, অ্যারোস্পেস ইঞ্জীনিয়ারিং, ইম্পিরিয়াল কলেজ লন্ডন। সৌগতর হার্টটা একবার কই মাছের মতো লাফিয়ে উঠেই শান্ত হয়ে গেল। এতোদিন পরে কি আর লিখবে … রিগ্রেট উইথ থ্যঙ্কস বা ঐ রকম কিছু। তবু পড়তে তো হয়। বেশ অনিচ্ছায় সৌগত ইমেলটার ওপর ক্লিক করলো। এক লহমায় ইমেলটা ওপেন হোল। তিন চার লাইনের ইমেল, বেশ চাঁছা ছোলা ইংরেজীতে লেখা। কিন্তু পড়তে পড়তে তার পেটের ভিতরটা কেমন গুড়গুড় করছিল। মোদ্দা কথা … আফটার গোয়িং রিগোরাসলি থ্রু দি সিলেকশান প্রোসেস, দি সিলেকশান কমিটি হ্যাজ দি প্লেজার টু ইনফর্ম ইউ দ্যাট ইয়োর অ্যাপ্লিকেশান ইজ সাকসেসফুল ফর দি জব। ইউ উইল বি ইনভাইটেড টু ওয়ার্ক অ্যাট দি প্রেস্টিজিয়াস ইম্পিরিয়াল কলেজ আফটার অল দি অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ওয়ার্কস আর ডান। তোমার হয়ে ইম্পিরিয়াল কলেজ লেবার ডিপার্টমেন্টে ওয়ার্ক ভিসার অ্যাপ্লিকেশান ফরোয়ার্ড করে দিয়েছে। ইন দি মিন টাইম, তোমাকে অরিজিনাল কনট্র্যাক্ট ফর্ম তোমার ইউনিভার্সিটির ঠিকানায় কুরিয়ারে পাঠানো হয়েছে। যদি কন্ট্র্যাক্ট অ্যাকসেপ্ট কর তাহলে সই করে একটা কপি তোমার কাছে রেখে আর একটা বাই পোস্ট আবার লন্ডনে পাঠিয়ে দিও। বেস্ট অফ লাক ফর দি ফিউচার।

সৌগত কিছুক্ষণ কেমন থ মেরে বসে রইল। এর মানে কি? তাহলে কি তার পোস্ট ডক হয়ে গেলো? মাই গড, সে তো আশা ছেড়েই দিয়েছিল। কিন্তু কোথায় যেন একটা হতাশার কালো পর্দা মনের গভীরে একটু একটু করে হাওয়ায় নড়ছে। সৌগত এর মধ্যেও যেন একটু অবাক হোল, আনএক্সপেক্টেড এমন একটা ভালো ইমেল এসেছে কিন্তু তার তেমন কোন বিরাট আনন্দের ফিলিংস হচ্ছে না। এই রকমই কি সবার হয়? একটা জিনিস জীবনে ভীষণ ভাবে চাইতে চাইতে যখন মনে হয় আর পাব না, যখন মনের ইচ্ছাটা অনেকটাই মড়ে যায় … ঠিক তখনই যদি সেটা হাতে এসে যায় তাহলে কি আনন্দ একটু ম্যাদা মেরে যায়? কোথাও কি মনে হয় যে এই একটা কম্পিটিশানের লাইভ ওয়ারই ভালো ছিল … এই হাই এক্সপেকটেশান আর ফেলিওর যেন পাশাপাশি যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ পাওয়াটা হয়ে গেলে মনের সেই ড্রাইভিং ফোর্সটাই যেন কোথায় হারিয়ে গেল।

দ্যোর ত্যেরিকা … সৌগত কম্পিউটারের সামনে বসে বসে ঠিক এই কথাই ভাবছিল। বাইরে তখন বোধহয় আবার বৃষ্টির তোড়জোড় চলছে। বেশ মেঘের ডাক শোনা যাচ্ছে আর ঘন ঘন বিদ্যুতের চমকানি। সৌগতর অবশ্য তাতে বিশেষ কিছু যায় আসে না কারণ তার সামনেই স্ক্রীনটা খোলা আর তাতে ইমেলটা এখনও ঝকমক করছে, কিন্তু সৌগত সেই দিকে কেমন একটা বীতরাগের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এর মধ্যে বোধহয় মিনিট পনের কেটে গেছে। একটু আগে সে স্বাতীলেখার কথাও ভাবছিল … অন্য অনেকের কাছ থেকে খবর যে স্বাতীর দুটো পোস্ট ডক প্রায় হতে হতে কেটে গেছে, কোন কারণ শেষ মুহূর্তে ফান্ডিং পাওয়া যায় নি। মেয়েটা একটু হতাশ বোধহয় কিন্তু এই মুহুর্তে সৌগত সেদিকে চিন্তাই করছে না। স্বাতীর প্রবলেম স্বাতীকেই সলভ করতে হবে। সে উঠে পাশের প্রিন্টারটা দেখল, মাত্র দুটো পাতা রয়েছে, তাতেই হয়ে যাবে। সে ইমেলের একটা প্রিন্ট নিয়ে লগ আউট করে ডিপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে এলো। হঠাৎ মনে হোল সে যেন একটু লম্বা হয়ে গেছে, নাকি ইমেলটা পেয়ে তার কনফিডেন্সটা বেড়ে যাওয়ায় সে আবার শিরদাঁড়া সোজা করে হাঁটছে …। যেটাই হোক, বেশ তাজা একটা ভাব মনের মধ্যে। বাইরে কিন্তু আবহাওয়ার অবস্থা আবার খারাপ হয়ে এসেছে, অন্ধকারের মধ্যে মনে হচ্ছে ওপরের কালো নিথর আকাশ প্রায় কাঁধের ওপর ঝুলে এসেছে … ভিজে হাওয়া বেশ জোরে বইছে আর তাতে কেমন শিসের মতো শোঁ শোঁ করে একটা শব্দ হচ্ছে, আশে পাশের গাছের ডাল পালা আর পাতা কেমন দুমরে মুছরে যাচ্ছে। বৃষ্টি আসতে আর কয়েক লহমাই বাঁকি। সে সাইকেল শেডের কাছে আসতেই … যাক বাবা, এবার সত্যি সত্যিই স্বাতীলেখা। মেয়েটার কি হয়েছে কে জানে, এমনি তে তো একই সঙ্গে পয়সাওয়ালা ফ্যামিলী এবং ইনটেলিজেন্ট হওয়ায় কাউকেই খুব একটা পাত্তা দেয় না কিন্তু আজ হাসি মুখে এগিয়ে এলো …

স্বাতীলেখা। কি রে … কেমন আছিস? খুব বিজি নাকি?

সৌগত। না, সেরকম নয় তবে একটা কাজ আছে তাই এবার হোস্টেলে যাব।

স্বাতীলেখা। বাইরে থেকে কিছু কল পেলি …?

সৌগত। চেস্টা তো চালাচ্ছি … দেখা যাক। তোর কি খবর? শুনেছিলাম তোর গাইড তোকে ভার্জিনিয়া টেক-এ পাঠাচ্ছে?

স্বাতীলেখা। চেস্টা করেছিলাম … কিন্তু ওরা টেক্সাস এ.এম. থেকে একটা ক্যান্ডিডেট পেয়ে গেছে তাই আমাকে বাদ দিয়েছে।

সৌগত। সে রকম ভাবিস না, তোর গাইডের তো আমেরিকায় প্রচুর চেনাশোনা, কোথাও একটা ঠিক হয়ে যাবে।

স্বাতীলেখা। কি হবে কে জানে … দেখা যাক।

সৌগত আর দেরি করলো না, সাইকেলটা টেনে বার করে, একটা আলতো করে … “আচ্ছা আসিরে” বলে বেরিয়ে এলো। যার সাথে গত সাড়ে চার বছরে বিরাট কিছু বন্ধুত্ব হয়নি এখন এই লাস্ট তিন মাসে তার সাথে নতুন করে কি আর হবে। সৌগত সোজা হোস্টেলে এলো, সাইকেলটা পার্ক করলো তারপর ঘরে এসে ইমেলের প্রিন্ট আউটটা রুক স্যাকের পকেটে রেখে টিনিটিনের বইটা টেনে নিয়ে বসলো। ঝামেলা চুকে গেছে, পোস্ট ডক পাকা, এখন শুধু কখন কুরিয়ারে তার অফার লেটারটা আসে তার অপেক্ষা। এর মধ্যে কাল বুধবার বা পরশু বৃহস্পতিবার প্রোফেসার পাত্রর সাথে এই ব্যাপার নিয়ে একটু আলোচনা সেরে নিতে হবে। আজ রাত্রে শুধু টিনটিনের বই আর রাত সাড়ে আটটা বা নটার দিকে স্বদেশের দোকানে মাংস।

 

… to be continued

~ মোনালিসা , শুধু তোমার জন্য (প্রথম পর্ব)  ~

LEAVE A REPLY