দেনপাসার, বালি, ইন্দোনেশিয়া; সকাল ৬:০০

ফ্লাইটটা ল্যান্ড হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্ত থেকে মনটা কেমন একটা হয়ে গেল। এই পর্যন্ত সব ঠিক ছিল। খুব একটা মনে পড়ছিল না ওর কথা। কিন্তু যেই প্লেনের জানালার বাইরে তাকিয়ে সেই ঝকঝকে নীল সমুদ্র আর তাকে গামলায় আটকে রাখার মতো করে ঘিরে থাকা অর্ধগোলাকার সৈকত চোখে পড়ল, সবকিছু কেমন যেন গুলিয়ে গেল। ফোরটীন ইয়ার্স… ওঃ মাই গড! মনে হচ্ছে এই তো সেদিন এখানে এসেছিলাম। আমাদের সেই কত সাধের হনিমুন! বিয়ের এক বছর আগে থেকে প্ল্যান করা… প্রথমে সুইৎজারল্যান্ড যাবার প্ল্যান হচ্ছিল; নিমির খুব ইচ্ছে ছিল সুইৎজারল্যান্ড-এ হনিমুন করতে যাওয়ার। কিন্তু বাজেট শর্ট হওয়ায় সেটা হল না। তারপর আমাদের বাজেট অনুযায়ী জায়গা খুঁজতে খুঁজতে হন্যে হয়ে যেতে যেতে শেষে বিয়ের কিছুদিন আগে বালিটা ফাইনাল করলাম। তবু বিয়ের এত খরচের পর ট্যাঁকে টান পরে গিয়েছিল। কিছু টাকা ধার করে নিয়ে যেতে হয়েছিল। কি অদ্ভুত দিন ছিল সে সব! কত প্ল্যান করে, হিসেব কষে সব কাজ করতে হত। আর এখন ছুটি পেলেই যেখানে ইচ্ছে হয় উড়ে চলে যেতে পারি। বাজেটের কথা চিন্তা করতে হয় না। এতে কোনও আনন্দই নেই। সবই কেমন ক্লিশে মনে হয়। আগের মতো সেই থ্রিলটা আর পাই না। তারপর থেকে কত জায়গা তো ঘুরলাম; কিন্তু সেই অনুভুতি এখনও মনের গভীরে কোথাও একটা চিরন্তন আস্তানা গেঁড়ে বসে আছে।

 

নিমির সঙ্গেও ঘুরেছি আরও বেশ কিছু জায়গায়, বিয়ের পর পর। কিন্তু জিনি-র জন্মের পর থেকে আর সেভাবে ওর সাথে কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয়নি। জিনিটাও দেখতে দেখতে বড় হয়ে গেল। বেচারী বাবা থাকার অনুভূতিটা কোনওদিন সেভাবে পেলই না। তবু প্রতিদিন একবার এখনও কথা হয় জিনির সাথে। কাছে না থাকলেও একটা ভালোবাসার টান যে আছে সেটা বুঝতে পারি। আর যখন কলকাতায় যাই, তখন তো জিনি বাবা বলতে পাগল! সেই দু-তিন দিন আর সে আমার পিছু ছাড়ে না। তবে এখন আর খুব বেশী কলকাতায় যাওয়া হয় না। আগে যে কোনও ছুটি পেলেই চলে যেতাম; এখনও চাইলে যাওয়াই যায়, কিন্তু ইচ্ছে করে না। শুনতে অবাক লাগলেও এটাই সত্যি। এত বছর কেটে যাওয়ায় হয়তো আমারই ওদের প্রতি টানটা একটু কমে গেছে। কিংবা আরেকটু বেশী স্বার্থপর হয়ে গেছি। আবার এমনও হতে পারে যে ওদের জগতের থেকে নিজের জগৎটাকে আলাদা করে ফেলেছি আর নিজের জগৎটাকেই বেশী উপভোগ করছি।
‘দ্য প্লেন হ্যাজ্ ল্যান্ডেড, জিৎ!’ অ্যালিস-এর ডাকে সম্বিৎ ফিরল আমার। একটা অন্য জগতে হারিয়ে গিয়েছিলাম। খুব সম্ভবত ‘ওদের জগতে’!

ল্যান্সডাউন, কলকাতা, সকাল ৬:০০

‘মা, উঠে পড়ো। তোমার আজ কলেজে অফ ডে বলে সারা সকাল ঘুমোলে চলবে না! তুমি বলেছিলে আজ তুমি নিজে রান্না করে আমার লাঞ্চবক্স প্যাক করে দেবে। রোজ রোজ রানি দিদির রান্না খেয়ে খেয়ে মুখ পচে গেল! ওঠো না, মা!’
জিনির চ্যাঁচামেচিতে আর শুয়ে থাকার উপায় নেই। ঘুম অনেকক্ষণ আগেই ভেঙে গেছে। তবু চুপ করে শুয়ে ছিলাম। এবার বিচ্ছু মেয়েটা গায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল আর কাতুকুতু দিতে শুরু করল। আমার একমাত্র উইক্ পয়েন্ট ওর বাবা ওকে শিখিয়ে দিয়েছে। আর মেয়েও বাবার মতোই যখন তখন এটাকে অস্ত্র হিসেবে আমার ওপর প্রয়োগ করে। অগত্যা উঠে পড়লাম। জিনির ফেভ্রিট পরোটার সাথে জিরা-আলু বানিয়ে ওর লাঞ্চবক্স প্যাক করে দিলাম। জিনি ততক্ষণে স্কুলের জন্যে রেডি। রানি ব্রেকফাস্ট বানিয়ে রেখেছিল। দালিয়া, ডিম সেদ্ধ আর বোর্ণভিটা। মা-মেয়েতে ব্রেকফাস্ট করতে বসে পড়লাম।
‘আচ্ছা মা, তোমার কি মনে হয়? বাবার কি কাল তোমার বার্থডেটা মনে থাকবে? লাস্ট ইয়ার তো ভুলে গেছিল। আই বেট এবার আর ভুলবে না। ইস্… বাবা তোমার বার্থডেতে এলে কি ভালো হত! সারাদিন সবাই একসাথে এন্জয় করতাম। একবারও আসে না।’
‘বাবা তো ছুটি পেলেই আসে, সোনা। নেক্সট মান্থ-এই তো আসবে, পুজোর সময়। তখন এন্জয় কোরো। তার আগে মিড-টার্ম টা ভালো করে দাও। সবসময় এন্জয় করলে হবে?’
‘সরি ম্যাম্… ওঃ না না; সরি ডঃ নিহিতা রায় ম্যাম্!’ জিনির ঠোঁটে দুষ্টুমির হাসি।
‘জিনি, এবার মার খাবি! তাড়াতাড়ি ব্রেকফাস্ট শেষ কর। স্কুলে লেট হয়ে যাবে।’

নুসা দুয়া, বালি, ইন্দোনেশিয়া; সকাল ১০:০০

হোটেলটা ফাইভ স্টার। টিকেট্‌স থেকে শুরু করে হোটেল বুকিং কিংবা ট্যুর প্যাকেজিং, কম্পানি থেকেই সব করে দিয়েছে। আসলে যেই প্রোজেক্টটায় আমরা গত দু-বছর ধরে কাজ করছিলাম সেটা সাক্সেস্‌ফুলি শেষ হয়েছে। আমি আর অ্যালিস দুজনেই প্রোজেক্টটা লীড করছিলাম, তাই কম্পানি থেকে এই ট্যুরটা আমাদের প্রাপ্য। আমার ইচ্ছে ছিল অন্য কোথাও যাওয়ার। অ্যালিসই বালির জন্য জোর করল। আমিও বেশী না ভেবে রাজী হয়ে গেলাম। এখন মনে হচ্ছে এখানে না এলেই ভালো হতো। আসার পর থেকে মুডটা কেমন অফ্‌ হয়ে আছে। ঘুরেফিরে খালি পুরনো দিনের কথা মনে পড়ছে। যদিও হোটেলটা জাস্ট্‌ ফাটাফাটি। ফুল্লি ফারনিশ্‌ড স্যুইট, রুম-এ অ্যাটাচ্‌ড স্যুইমিং পুল, পাশে ব্যাল্কনি তে ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে একটু উঠলেই সী ভিউ, পার্সোনাল স্পা, সব মিলিয়ে এলাহি ব্যাপার আর কি! আগেরবার এসে যেই হোটেলটায় ছিলাম ওটা ফোর স্টার ছিল। তখন ওটাই আমাদের কাছে বিরাট ব্যাপার। প্রথম কোনও স্যুইমিং পুল থাকা হোটেলে ছিলাম আমরা। ওই অভিজ্ঞতার কোনও তুলনা হবে না। নিমি সাঁতার জানে না বলে পুল-এ নামতে ইতস্তত বোধ করছিল। পরে আমি টেনে নামানোয় যা মজা পেয়েছিল, পারে তো পুরো হনিমুনটা স্যুইমিং পুল-এই কাটিয়ে দেয়! আর সেই রুমটা – সেই নরম বিছানা, সেই কাউচ, সেই বাথটাব, শাওয়ার, সেই বড় আয়নাটা – সবই এখনও স্পষ্ট হয়ে ভেসে আছে স্মৃতির ধোঁয়াশায়। তার পাশে এই ফাইভ স্টার-ও কিস্‌সু না।
অ্যালিস স্নান করে বেরিয়ে আমায় তাড়া দিল। ওয়াটার স্পোর্টস-এ যেতে হবে। গাড়ি এসে গেছে হয়তো। আমি ফিরেই স্নান করব। ক্যাজুয়াল ড্রেস পরে ঝট করে রেডি হয়ে নিলাম। এবার আমার পালা অ্যালিসকে তাড়া দেওয়ার আর আমার কাছে এখনও দুর্বোধ্য অস্ট্রেলিয়ান অ্যাক্সেন্ট-এ গালাগালি শোনার। অ্যালিস মেয়েটা ভারী মিস্টি। দু-বছর হল আমাদের পরিচয় হয়েছে, ওই প্রোজেক্টে কাজ করার সুত্রেই আলাপ। তখন ওর সদ্য সদ্য ডিভোর্স হয়েছে। ওর এক্স হাজব্যান্ড জনি একটা থার্ড ক্লাস ছেলে। একাধিক মেয়ের সঙ্গে অ্যাফেয়ার ছিল, অ্যালিসকে মানসিক ও শারীরিক ভাবে টর্চার করত। শেষে ওদের তিন বছরের বিয়েটা ভেঙে যায়। তখন অ্যালিস বেশীরভাগ সময়টা কাজের প্রতি নিয়োজিত করে। আমিও একটু কাজপাগলা টাইপের মানুষ। তাই আমাদের দুজনের একটা খুব ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়, যেটা সময়ের সাথে সাথে আজ এতটাই গভীর হয়ে গেছে যে এই দূর দেশে ঘুরতে এসে আমরা একই রুম শেয়ার করছি। এর আগেও বহুবার আমরা একসাথে রাত কাটিয়েছি, কখনও আমার অ্যাপার্টমেন্ট-এ, কখনও ওর, কিংবা কখনও অফিস্‌-এই। ওর সঙ্গে সময় কাটাতে আমার খুব ভালো লাগে, খুব রিল্যাক্সড্‌ ফীল হয়। মনের নানান কথা ওর সাথে শেয়ার করতে পারি। ও কতটা বোঝে জানি না। তবে ও আমার জীবনে একটা বড় সাপোর্ট। জীবনে এমন কাউকে তো প্রয়োজন, কষ্ট হলে যার কাঁধে একটু মাথাটা রাখা যায়!
ওয়াটার স্পোর্টস এর জায়গাটা মোটামুটি একইরকম আছে। কয়েকটা নতুন স্পোর্টস যোগ হয়েছে, এই যা পার্থক্য। আমি প্যারাসেইলিং করলাম। অ্যালিসটা বড্ড ভীতু। কিছুতেই প্যারাসেইলিং করল না। অথচ সেইবার নিমি আমার আগেই দৌড়ে গিয়ে প্যারাসেইলিং করেছিল। সেই কি ফুর্তি! তারপর একাই একটা সী-বাইক নিয়ে চালিয়ে এলো। আমি তো দেখে হাঁ। আমারই সী-বাইকিং করতে একটু একটু ভয় করছিল। সঙ্গে এক্সপার্ট নিয়ে চালিয়েছিলাম। অ্যালিসও আজ তাই করল। আর আমরা দুজনে একটা ব্যানানা বোট চালালাম মোটামুটি শান্ত জলের ওপর। আমি চালাচ্ছিলাম আর অ্যালিস চুপ করে আমার পিঠে মাথা রেখে বসে ছিল। স্কুবা ডাইভিং করার প্রস্তাবে ও এমন ভাবে না করল যেন সিংহ-এর গুহায় ঢুকতে বলেছি। সেই বার স্কুবা ডাইভিং করার সময় জলের তলায় গিয়ে নিমিকে যখন খুঁজে পাচ্ছিলাম না কি টেনশনটাই না হয়েছিল আমার। তারপর দেখি ম্যাডাম হেলতে দুলতে কোত্থেকে একটা সাদা কোরালের ব্রাঞ্চ তুলে এনে আমার হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে! কোরালটা মনে হয় এখনও আমাদের কলকাতার বাড়িতে সাজানো আছে।

 

ল্যান্সডাউন, কলকাতা, সকাল ১০:০০

জিনি স্কুলের জন্যে বেরিয়ে যাবার পর স্নান সেরে টিভিটা চালিয়ে দিয়ে সোফায় বসলাম। আজ কলেজ যাওয়া নেই। একটু স্বস্তি। নাহলে একটা সরকারী কলেজের বোটানি ডিপার্টমেন্ট-এর হেড হওয়া যে কতটা অস্বস্তিকর ব্যাপার তা বলার প্রয়োজন হয় না। সারাদিন কিছু না কিছু অফিসিয়াল ওয়ার্ক লেগেই থাকে। হাজারটা সই করতে হয়। একদম ভাল্লাগে না আমার। আমি চিরকাল অ্যাকাডেমিক্স-এ ইন্টারেস্টেড। ছেলে-মেয়েদের পড়াতে আমার খুবই ভালো লাগে। এই রিনাদি ট্রান্সফার হয়ে যাওয়াতে এক জ্বালা হলো। ডিপার্টমেন্ট-এ চার জন টিচারের মধ্যে সবচেয়ে সিনিয়ার আমি বলে আমাকে হেড করে দিল। এসব ঝামেলা পোষায়! দু-বছর হয়ে গেল কোনও নতুন টিচারও রিক্রুট হচ্ছে না। মেয়েটা বড় হচ্ছে, কোথায় ওর পড়াশোনার দিকে একটু খেয়াল করব, তা না সারাদিন এই ঝামেলা। এর পর বাড়ি ফিরে আর একটুও এনার্জি থাকে না। আর ওর বাবা তো আমাদের কথা ভুলেই গেছে বোধহয়। তার কোনও দায়িত্ব নেই। সব দায়িত্ব আমার। দু-বছরের নাম করে অস্ট্রেলিয়া গেছিল। প্রায় আট বছর হয়ে গেল, এখনও অস্ট্রেলিয়াতেই। মাঝে তিনটে প্রোমোশন হয়েছে; মেলবোর্ন থেকে এখন সিডনী তে শিফ্ট করেছে। জিৎ আর ইন্ডিয়ায় ফিরবে না, আমি জানি। আগে বছরে তিন-চারবার আসত। অন্তত এক সপ্তাহ করে থাকত। এখন দু-বার আসে। পুজোয় এক সপ্তাহ আর জিনির ফাইনাল পরীক্ষার পর দু-তিন দিনের জন্য। দু-বারই পুরো সময়টা মেয়ের সাথেই কাটিয়ে চলে যায়। আমার জন্যে একটুও সময় নেই ওর কাছে। না, একেবারেই নেই বললে ভুল বলা হবে। রাতে যেটুকু সময় ঘুমোয়, আমার পাশেই থাকে। একই বিছানায়। একপাশে জিনি, আরেকপাশে জিৎ। দুজনের মাঝে শুয়ে আমার কি আর ঘুম আসে! তখনই তো মনে হয় যে আমি পুরোপুরি ভিনগ্রহে চলে যাই নি; এখনও আমি আমার পৃথিবীতেই আছি। তাই ওই কটা দিন আমি জেগেই কাটাই। একটুও ক্লান্ত লাগে না।
হ্যাঁ, জিৎ আর আমার মধ্যে দূরত্বটা সময়ের সাথে সাথে অনেকটাই বেড়ে গেছে। কে বলবে আমরা দশ বছর প্রেম করে, বাবা-মায়ের সঙ্গে একপ্রকার যুদ্ধ করে বিয়ে করেছিলাম! বিয়ের পরও প্রথম কয়েক বছর খুব ভালো কেটেছিল। যদিও তখন ওর পোস্টিং ছিল ব্যাঙ্গালোরে, তবু যে কোনও ছুটি পেলেই চলে আসত। নাহলে আমি চলে যেতাম ওর কাছে। সেই সময় কত ছোট-বড় ট্যুর যে করেছি! বছরে তিন-চারটে ট্যুর হয়েই যেত। বন্ধুরা সব বলত – কি রে তোরা আর কত ঘুরবি! আসলে ঘোরার নেশাটা আমাদের দুজনেরই প্রচন্ড পরিমাণে ছিল। ও তো এখনও কম্পানি-র কাজে অনেক জায়গায় ঘোরে। আমার আর হয়না। ওই যে বললাম – সব দায়িত্ব তো আমার একার। তবে জিনি আরেকটু বড় হয়ে কোথাও সেটল্ করলে আমিও ঘুরব। কাউকে না পেলে একাই ঘুরব।
জিনির যখন দু-বছর বয়স তখন জিৎ-এর অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার অফারটা এল। আমি আর জিনিও কিছুদিনের জন্যে গিয়েছিলাম মেলবোর্নে। তারপর আমার কলেজ-এর চাপে ফিরে এলাম দু-মাস কাটিয়ে। জিৎ তখন ছুটি নিয়ে আসত মাঝেমধ্যে। দু-বছর পর কম্পানি যখন ওকে প্রোমোশন দিয়ে আরও দু-বছরের প্রোজেক্ট এক্সটেন্ড করল তখন জিৎ বলেছিল আমাকে অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট-ডক্টরাল ফেলোশিপ-এর জন্যে চেষ্টা করতে। জিনিকেও ওখানেই স্কুলে ভর্তি করার প্ল্যান করেছিল জিৎ। কিন্তু আমি রাজি হইনি। ওকেই বলেছিলাম ইন্ডিয়ায় ফিরে আসার চেষ্টা করতে। সেই চেষ্টা জিৎ করেনি। কোনও দিন করবেও না, জানি। ওর ওখানেই ভালো লাগে। কিন্তু আমারও যে এখানেই ভালো লাগে। এখানে আমার একটা জগৎ আছে যেটা আমার কাছে খুব প্রিয়। আমার পক্ষে ওকে ছেড়ে থাকাও যেমন কঠিন, সেরকমই এই জগৎটাকে ছেড়ে থাকাও কঠিন। সেটা তো ওরও বোঝা উচিৎ ছিল। সিদ্ধান্তটা ঠিক ছিল না ভুল আমি জানি না। কিন্তু তার পর থেকেই এই দূরত্বটা তৈরি হয়। হয়তো ওর মনে কোথাও কোনও অভিমান দানা বাঁধে। কলকাতায় আসা আস্তে আস্তে কমিয়ে দেয়। ফোনেও খুব বেশী কথা বলার থাকে না ওর। আমিই খানিকক্ষণ বকবক করি নিজের মনের শান্তির জন্য। তারপর ফোন রেখে দিই। তবে দায়িত্ব নিয়ে দু-বেলা ফোনটা এখনও করে জিৎ। সকালে একবার আর সন্ধ্যায় একবার। আমার সঙ্গে মিনিট পাঁচেক আর জিনির সঙ্গে মিনিট পনেরো কথা হয়। আজ সকালে তো ফোন করল না! ওঃ ওর কোনও মীটিং আছে বলে বলেছিল মনে হয়। ব্যস্ত হয়তো।

 

তানাহ লট, বালি, ইন্দোনেশিয়া; বিকেল ৪:০০

 

স্পোর্টস এ ভয় পেলেও সানসেট দেখার ব্যাপারে অত্যন্ত উৎসাহ অ্যালিসের। যেন সমুদ্রে সানসেট দেখেনি কোনওদিন! আমি তো সমুদ্রে সানসেট দেখে দেখে বোর হয়ে গেছি। আর ভালো লাগে না। তবে এই জায়গাটার একটা বিশেষত্ব আছে। বাটু বোলং – কথাটার আক্ষরিক অর্থ পাথরের মাঝে ছিদ্র। সেই প্রকান্ড গোলাকার ছিদ্রের মাঝখান দিয়ে ডুবন্ত সূর্য দেখার মধ্যে একটা অন্যরকম অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাটু বোলং কথাটা খুব মনে ধরেছিল নিমির। খুব মিষ্টি শুনতে লাগে কথাটা। বালি থেকে ফেরার পরও কয়েকদিন মন খুশি থাকলে ‘বাটু বোলং, বাটু বোলং’ বলে লাফাত নিমি। সেই বার নিমির সাথে বাটু বোলং-এর মধ্য দিয়ে সানসেট-এর দৃশ্য দেখা হয়নি। আকাশ সামান্য মেঘলা ছিল। আজ আকাশ একদম পরিষ্কার।
সানসেট হতে এখনও কিছুটা সময় বাকী আছে। এই সুযোগে আমরা পাশের মন্দিরটা দেখতে গেলাম। গুহার ভেতরে ছোট্ট একটা মন্দির। সমুদ্র দেবতার পুজো হয় এখানে। অ্যালিসের সঙ্গে আমিও গুহার ভেতরে ঢুকে প্রণাম করলাম। স্থানীয় পুরোহিত আমাদের কপালে চাল-সিঁদুর-এর ফোঁটা এঁকে কানে একটা করে সাদা কাঠগোলাপ ফুল গুঁজে দিলেন। এই ফুলটা বালির সবচেয়ে প্রচলিত ফুল। মেয়েদের সাজগোজের আনুষঙ্গিক থেকে শুরু করে পুজোর ফুল পর্যন্ত; সর্বত্রই এই ফুলটাই ব্যাবহার করা হয়। নিমির মুখে এই ফুলটার খুব সুন্দর একটা নাম শুনেছিলাম – ফ্রাঞ্জিপানি। নিমি-র কানে ফ্রাঞ্জিপানি গুঁজে ঠিক এই মন্দিরটার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকগুলো ছবি তুলে দিয়েছিলাম আমি। লাল রঙের টপ আর সাদা স্কার্ট পরে কি সুন্দর দেখাচ্ছিল ওকে সেদিন! কি আশ্চর্য! অ্যালিসও আজ একটা সাদা গাউনের ওপর লাল রঙের স্কার্ফ পরে আছে। ওকে দেখে পুরনো স্মৃতিগুলো আরও বেশী করে ঘিরে ধরছে আমাকে। হাতে ক্যামেরা থাকলে নিজেকে বড় ফোটোগ্রাফার মনে হতো আমার। আর সাবজেক্ট বলতে ওই একজন – আমার সবেধন নীলমণি বউ। কতরকম স্টাইলে, কতরকম পোজে ওর ছবি তুলে দিতাম। আমি ছবি তুলে ক্লান্ত হতাম না, ও পোজ দিয়েও ক্লান্ত হত না।
‘জিৎ, ওয়ান ফোটোগ্রাফ্‌, প্লীজ্‌।’ অ্যালিসের অনুরোধে মোবাইলটা বার করে ওর দিকে তাক করলাম। কিন্তু নিজের ভেতরে সেই বড় ফোটোগ্রাফারকে কোথাও দেখতে পেলাম না। সাবজেক্ট না থাকায় বোধহয় সে-ও অবসর নিয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাটু বোলং-এর ভেতর দিয়ে সূর্যটা ঝুপ করে সমুদ্রে ডুবে গেল।

 

ল্যান্সডাউন, কলকাতা, বিকেল ৪:০০

জিনি স্কুল থেকে ফেরার পর আমরা দুজনে একসাথে লাঞ্চ করে যে যার হোম ওয়ার্ক নিয়ে বসে পড়লাম। আমার কলেজের পরীক্ষার খাতা দেখতে হবে আর জিনির ড্রয়িং-এর টাস্ক করতে হবে। দুপুরে ঘুমনোর অভ্যাসটা অনেকদিন হলো ছেড়ে দিয়েছি আমরা। এতে শরীরও ভালো থাকে, রাতে ভালো ঘুমও হয়, আবার সকালে উঠতেও আলস্য লাগে না। জিনি রোজদিন এই সময়ে ওর হোম ওয়ার্ক শেষ করে নেয়। তারপর বিকেলে আমি কলেজ থেকে ফেরার পর ও পায়েল বা আরশিদের ফ্ল্যাটে একটু খেলতে যায়। ওরা জিনির ক্লাসে পড়ে, আমাদের বিল্ডিং-এই থাকে। কোনওদিন আবার ওরাও আসে এখানে। জিৎ-এর ফোন আসার ঠিক আগে জিনি খেলা শেষ করে হাজির হয়ে যায়। বাবার সাথে কথা বলার পর ওর টিউটর্‌ আসে। সে পড়িয়ে চলে গেলে আমরা ডিনার করে রাত দশটা-সাড়ে দশটার মধ্যে শুয়ে পড়ি। এরকমই ডিসিপ্লীন মেনে চলি আমরা! জিনি কিন্তু এখনও এটা নিয়ে কোনও অভিযোগ করেনি। আরেকটু বড় হলে করবে হয়তো। সে তখন দেখা যাবে। এখন তো মেয়েটাকে কিছুটা ডিসিপ্লীন শিখিয়ে রাখি। নাহলে আজকালকার বাচ্চারা তো ছোটবেলা থেকেই যা উচ্ছৃঙ্খল হয়, তা আর বলার নয়। সেই দিক দিয়ে আমার জিনি লক্ষ্মী মেয়ে। পড়াশোনাতেও ভালো, খুব সুন্দর ছবি আঁকার হাতও হয়েছে।
-‘মা, পীকক্‌টা আঁকতে পারছি না। একটু হেল্প করবে?’

-‘পীকক্ আঁকা তো খুব সোজা। তুমি এক কাজ করো। আমার বেডরুমে যাও। আমার যে রেড ট্রলি ব্যাগটা আছে, যাতে আমার পুরনো জিনিস রাখা আছে, ওর মধ্যে আমার ছোটবেলার একটা ড্রয়িং বুক আছে। ওটা নিয়ে এসো। ওতে পীকক্‌ আঁকা আছে। দেখে দেখে আঁকার চেষ্টা করো।’

-‘ও্‌কে্‌!’ বলে ছুটে ওই ঘরে চলে গেল জিনি।
আমি খাতা দেখায় মন দিলাম। আজ অফ ডে তে সব খাতাগুলো দেখে ফেলব বলে ঠিক করেছিলাম। এখনও অনেক বাকী।

-‘এই জিনিসটা কি, মা?’

জিনির হাতে আমার ড্রয়িং বুকটা ছাড়াও রয়েছে একটা স্ল্যাম বুক। ওটা দেখে আমি হেসে ফেললাম।

-‘এটার নাম স্ল্যাম বুক, সোনা। আমাদের ছোটবেলায় এটার খুব চল ছিল। এটা আমি আমাদের কলেজ শেষ হওয়ার আগে কিনেছিলাম। কলেজের সব বন্ধুরা নিজেদের পছন্দ, অপছন্দ লিখে সই করে দিয়েছিল। ওদের সাথে তো অনেকদিন কোনও যোগাযোগ নেই। এটা দেখলে ওদের কথা মনে পড়ে।’

-‘এ মা!’ জিভ বার করল জিনি। ‘প্রথম পেজটা তো বাবার লেখা। এই যে – জিৎ চ্যাটার্জি।’

আমার খুব হাসি পেল। এত বছর আগের জিনিসটা খুঁজে পেয়ে জিনির যেন গুপ্তধন পাওয়ার মত আনন্দ হচ্ছে। ওর বাবার অল্প বয়সে লেখা কিছু বোকাবোকা কথা পড়ে নিজের মনেই একের পর এক প্রশ্ন করে চলেছে।

-‘বাবার ফেভ্‌রীট ফিল্ম ‘বিফোর সানরাইজ’। এটা আবার কোন ফিল্ম! তোমার ফেভ্‌রীট ফিল্ম কি, মা?’

-‘হীরক রাজার দেশে।’

-‘ওটা তো আমি দেখেছি। এই দেখো মা, বাবারও ফেভ্‌রীট কালার রেড। তোমার মতোই! আর ফেভ্‌রীট ফ্লাওয়ার রোজ্‌।

তোমার ফেভ্‌রীট ফ্লাওয়ার কি, মা?’

-‘ফ্রাঞ্জিপানি।’

-‘সেটা আবার কি ফুল?’

-‘অত কিছু জানতে হবে না। এবার ওটা রেখে পীকক্‌টা আঁকো।’

স্ল্যাম বুকটা জিনির হাত থেকে নিয়ে আমি উল্টেপাল্টে দেখতে লাগলাম। জিনি ময়ুর আঁকাতে মন দিল।

নুসা দুয়া, বালি, ইন্দোনেশিয়া; রাত ১২:০০

ঘুম আসছে না। অ্যালিসের মাথাটা আমার কাঁধের ওপর আর তুলোর মতো সাদা নরম হাতটা আমার বুকের ওপর রাখা। ও গভীর ঘুমে মগ্ন। আমার হাতের আঙুলগুলো যন্ত্রচালিতের মতো অ্যালিসের সোনালি ঢেউ খেলানো চুল নিয়ে খেলে বেড়াচ্ছে। এটা অবিশ্যি আমার অভ্যাস না, নিমির অভ্যাস। এখনও যখন কলকাতায় যাই, রাতে ঘুমের মধ্যে অনুভব করতে পারি নিমির আঙুলগুলো আমার মাথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি যে কদিন থাকি নিমি মনে হয় সারা রাত জেগেই থাকে। ও কি এখনও আমাকে কাছে পেতে চায়? এতটা দূরত্ব সৃষ্টি করার পরও! হ্যাঁ, এই দূরত্ব তো নিমিই সৃষ্টি করেছে। ও যদি তখন অস্ট্রেলিয়ায় আসার চেষ্টা করত হয়তো আমাদের জীবনটাই অন্যরকম হতে পারত। ও তো জানত যে আমার পক্ষে তখন ইন্ডিয়ায় ফেরা সম্ভব ছিল না। ওর যা অ্যাকাডেমিক কেরিয়ার, তাতে ও চাইলেই অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট-ডক্টরাল পোজিশন্‌ পেয়ে যেত। আমাকেও এতগুলো বছর ওদেরকে ছেড়ে কাটাতে হতো না। আর আজ হয়তো আমার কাঁধে অ্যালিসের নয়, নিমির মাথাটাই থাকত।
এসব কি ভাবছি আমি! তাহলে কি আমার কাঁধে নিমির মাথাটা থাকুক, তা আমি নিজেই চাই না! তার মানে তো দূরত্বটা আমিই তৈরি করেছি। গত কয়েক বছর ওর সাথে আমার একটাও মনের কথা শেয়ার পর্যন্ত করিনি। ও তো নানান কথা এখনও শেয়ার করে আমার সাথে। আমিই শুনে না শোনার ভান করে থাকি। বাড়ি গিয়েও পুরো সময়টা জিনির সাথেই কাটিয়ে ফিরে আসি। নিমিকে একবারের জন্যেও কাছে পেতে ইচ্ছে করে না আমার। এতটা স্বার্থপর আমি! ভাবতে খুব কষ্ট হচ্ছে। এত বছরে এই প্রথমবার কষ্ট হচ্ছে।
অ্যালিসের মাথাটা কাঁধ থেকে নামিয়ে রেখে বিছানা ছেড়ে উঠলাম। অ্যালিস সামান্য ঘেমে আছে। এ্‌সি্‌-র কুলিংটা বাড়িয়ে দিয়ে, ব্যাল্কনিতে বেরিয়ে ঘোরানো সিঁড়িটা বেয়ে ওপরে উঠে এলাম। সামনেই আদিগন্ত সমুদ্র চাঁদের আলোয় ঝলমল করছে। বিশাল বড় বড় ঢেউ। বীচ-এ এখন কেউ নেই। নাহ্‌; অনেক দূরে যেন দুজনকে দেখা যাচ্ছে। অল্পবয়সী ছেলে-মেয়ে। বোধহয় হনিমুন কাপল্‌। সমুদ্রের ধারে দৌড়োদৌড়ি, হুটোপুটি করছে। কি খুশি ওরা দু-জন। জীবনের কোনও বোঝাই যেন ওদের খুশির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। ওরা এখন এদিকেই ছুটে আসছে। একে অপরের হাত ধরে। ছেলেটা হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। মেয়েটাকে আর দেখতে পাচ্ছি না। ছেলেটা ঠায় তাকিয়ে আছে আমারই দিকে। এ কি, ওকে দেখতে তো অবিকল চোদ্দ বছর আগের আমার মতো! ছেলেটার চোখে চোখ রাখতে পারছিলাম না। কিছুক্ষন ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলাম। দেখতে দেখতে ছেলেটা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। রাত অনেক হলো। এবার ঘুমোতে হবে। হাতের ঘড়িটায় সময় দেখতে গিয়ে নজর পড়ে গেল আজকের তারিখ-এ। আরে, আজ তো নিমির জন্মদিন। তাই জিনি আজ ফোনে বলছিল, ‘বাবা, কিছু ভুলে যেও না যেন!’ ইস্‌, এবারও ভুলে গেছিলাম। মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল। তারপর খেয়াল হলো, ইন্ডিয়ায় তো এখনও বারোটা বাজতে প্রায় ঘন্টা দুয়েক বাকী আছে।

ল্যান্সডাউন, কলকাতা, রাত ১২:০০

হঠাৎ কাতুকুতু লাগায় চমকে ঘুম থেকে উঠে পড়লাম। দেখি জিনি ওর সব কটা দাঁত বার করে হি হি করে হাসছে।
‘হ্যাপি বার্থডে, মা! আই লভ্ ইউ…’
‘আই লভ্ ইউ টু, সুইট্হার্ট!’
জিনিকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। এই প্রথম জিনি মাঝ রাতে ঘুম থেকে জাগিয়ে আমায় উইশ করল। কি যে আনন্দ হচ্ছে কি বলব! মেয়েটা আমার বড় হয়ে গেল। আর আমার জন্য কি সুন্দর একটা বার্থডে কার্ড বানিয়েছে। একটা বড় ময়ুর একটা ছোট ময়ুরকে আদর করছে। আরও একটা বড় ময়ুর রাগী-রাগী মুখ করে দূরে দাঁড়িয়ে দেখছে। কি সুন্দর এঁকেছে ছবিটা। ওর বয়সে আমি এত সুন্দর আঁকতে পারতাম না।
‘তুমি খুশি হয়েছ, মা?’
‘খুব খুশি হয়েছি, সোনা!’ জিনিকে আরও অনেক আদর করলাম। চোখের কোলটা কখন যেন ভিজে উঠেছে। জিনিকে বললাম, কাল আর স্কুল যেতে হবে না। আমিও কাল আবার অফ ডে নিয়ে নেব। কাল আমরা সারাদিন ঘুরব, বেড়াব, এন্জয় করব। অনেকদিন কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয় না। জিনি খুশিতে লাফিয়ে উঠল। আর তখনই ডোরবেলটা বেজে উঠল।
এত রাতে আবার কে এল! দরজাটা খুলে দেখি একটি ছেলে হাতে একটা পার্সেল নিয়ে দাঁড়িয়ে। সই করে পার্সেলটা নিয়ে সোফায় এসে বসলাম। জিনিও আমার পাশে এসে কৌতূহলী দৃষ্টি নিয়ে দাঁড়াল। পার্সেলের ওপর কারও নাম লেখা নেই। শুধু লেখা গিফ্ট ইয়োর উইশ ডট কম। প্যাকেটটা খুলতে প্রথমেই পেলাম প্রিন্ট করা একটি মেসেজ কার্ড।

তাতে লেখা,
‘এবার আর তোমার জন্মদিনটা ভুলিনি আমি। খুব ইচ্ছে করছিল আজকের দিনটায় তোমার কাছে যেতে। কিন্তু সেটা সম্ভব হল না। তাই এভাবেই গিফ্ট পাঠালাম। সামনের মাসে তো আমি আসছি। জিনির পরীক্ষাও তখন শেষ হয়ে যাবে। চলো না চোদ্দ বছর আগের অপূর্ণ ইচ্ছেটা এবার পূরণ করেই ফেলি। বেটার লেট দ্যান নেভার!’
বাক্সের ভেতর আরও রয়েছে তিনটে সুইৎজারল্যান্ড-এর রাউন্ড এয়ার টিকেট আর একটা ফুলের ব্যুকে।

-‘মা, এই ফুলটার নামই কি ফ্রাঞ্জিপানি?’

সাদা ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে আমি যেন দুটো জগৎকে এক হতে দেখতে পেলাম। জিনির কার্ডের তৃতীয় ময়ূরটার মুখটাও যেন হাসি হাসি।

।। সমাপ্ত ।।

~ ফ্রাঞ্জিপানি ~

1 COMMENT

  1. লেখাটি পড়ে ভাল লাগল। ফ্রাঞ্জিপানি দিয়ে গুগলে খুঁজতে গিয়ে এটি পেলাম। আসলে এই এক-ই নামের গল্প বোধহয় সুনীল গঙ্গোপাধ্য়ায়য়ের লেখা বছর ৫৫-৬০ আগে কোনও এক শারদীয় পত্রিকায় পড়েছিলাম। গল্পের পটভূমি পলিনেশিয়ার কোনও এক দ্বীপ এবং বিষয়বস্তু ত্রিকোন প্রেমে এক নারীর সমস্য়া। ঐটি আমার পড়া প্রথম প্রেমের গল্প। শারদীয় পত্রিকাটি হারিয়ে ফেলেছি। কোনও লেখকের রচনা সংগ্রহে গল্পটি যদি চোখে পড়ে দয়া করে ই-মেলে জানাবেন। saktinath_m@yahoo.com

LEAVE A REPLY

*