।৫।

গগাবাবুর নিউ ইয়র্কে আগমনের পর সপ্তাহ দুয়েক কেটে গেছে। জীবনটা এখন একটা নতুন রুটিনে পরে গেছে। প্রথম কয়েকদিন খুব ভোরে ঘুম ভেঙ্গে যাচ্ছিলো। এখন ঘুম স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আটটা নাগাদ ওঠেন। উঠে বাথরুম সেরে বেরতে বেরতেই দ্যাখেন যে সমর একনয় বেরিয়ে গেছে অথবা বেরতে উদ্দ্যত হচ্ছে। গগাবাবু ঠিকই অনুমান করেছিলেন। সমরের অফিসের গাড়ি আসে ওর জন্য ঠিক সাড়ে আটটায়। ওদের নিজেদের একটাই গাড়ি, আর তা টিয়া চালায়। টিয়াও ইতিমধ্যে বেরোবার জন্য প্রস্তুত হয়ে নেয়। তবে ও ন’টার কয়েক মিনিট পর বেরোয়। ঠিক ন’টায় জয়এর দ্যাখাশুনা করার একজন ন্যানি আসে। মার্থা। ভদ্রমহিলার বয়েস পঞ্চাশের কাছাকাছি। মুখটাতে বেশ একটা দয়ালু দয়ালু ভাব। প্রথম দিন দেখেই গগাবাবুর তাকে খুব ভালো লেগেছিলো। “উনি বস্‌নিয়ার। ওখানে দাঙ্গার সময় উইথ হার হোল ফ্যামিলি এদেশে চলে আসেন। তুমি শুনে বুঝতে পারোনি যে উনি অ্যামেরিকান না?” টিয়া জিগ্যেশ করেছিলো। গগাবাবু ভ্যাবলার মত তাকিয়েছিলেন কেবল। উনি কিছুই বুঝতে পারেন নি। তা যাইহোক, মার্থার সাথে জয়এর গলায় গলায় ভাব। একমাত্র তার কথাই জয় সব শোনে। এমনকি নিজের মার কথাও সব শোনেনা।

গগাবাবু আসার পর থেকে টিয়া আর গগাবাবু একসাথে বসে সকালের জলখাবারটা খায়। তাদের হাতে মিনিট কুড়ি সময় থাকে। কিন্তু সেই সময়টা গগাবাবুর বেশ লাগে। যত দেখছেন তত এই বউমাকে তার আরো বেশি ভালো লাগছে। রূপ, গুণ, কোনোটার ঘাটতি নেই মেয়েটার। আর অসম্ভব মাথা ঠান্ডা। কখনো রাগ করে না। করলেও কাউকে বুঝতে দেয় না। সমরের ভাগ্যটা সত্যিই ভালো, ভাবেন তিনি। বিশেষ কিছু ওরা খায় না। বেশির ভাগ দিনই দুধ সিরিয়াল, খুব জোর সঙ্গে একটা কলা বা অন্য কোনো ফল। টিয়া কালোজামের মত দেখতে এক ধরনের ফল খায় নিয়মিত সিরিয়ালের সাথে। ব্লুবেরী, জিগ্যেশ করে জেনেছেন। হার্টের পক্ষে নাকি খুব ভালো। কিন্তু গগাবাবুর খেয়ে ভালো লাগেনি। কষটা লেগেছে। উনি কলাতেই আছেন। খাবার সময় গগাবাবু নানান প্রশ্ন করেন, আর টিয়া ধৈর্জ ধরে তার উত্তর দেয়।

সেই সুত্রেই জানতে পেরেছেন মার্থার কথা। ভদ্রমহিলা খুব ভালো আর বিশ্বাসী। আরো জেনেছেন যে টিয়া গাড়ি নিয়ে কাজে যায় না। ট্রেনে করে যায়। কর্মস্থলে পার্কিংএর অসুবিধা বলে। গগাবাবুর কোনো ধারনাই ছিলো না যে আমেরিকাতেও এসব অসুবিধা আছে। আরো জেনেছেন যে টিয়াকে রোজ ক্লাস পড়াতে হয়না। “তাহলে তুই রোজ যাস কেন?” উনি প্রথম থেকেই নিজের মেয়ের মত টিয়াকে তুই ডাকেন। “ড্যাড্‌, আই হ্যাভ টু ডু রিসার্চ। আমাকে অনেক পেপার লিখতে হয়। আমার সাথে যে গ্যাজুএট স্টুডেন্টরা কাজ করে, ওদের হেল্প করতে হয়”। গগাবাবু খানিকটা বুঝলেন। বাকিটা অবোধ্যই রয়ে গেল। অত বুঝে আর আমি কি করবো? প্রফেসর যখন নিশ্চয়ই ভালো কিছু একটা করছে! এমনি এমনি তো আর ওকে কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি মাইনে দিয়ে পুষে রাখেনি! মার্থা আসার কয়েক মিনিটের মধ্যেই টিয়া বেরিয়ে যায়। ফেরে প্রায় সাতটায়। সমর ফেরে তারও পরে।

টিয়া বেরিয়ে যাবার পর গগাবাবুর সামনে সমস্ত দিনটা পরে থাকে। নাতির কান্ডকারখানা দেখেই তার বেশীর ভাগ সময়টা অতিবাহিত হয়। নাতির সঙ্গে আলাপ করার চেষ্টা করেছেন। তবে সফল হননি। জয় এখনো ভাল করে কথা বলতে পারে না। হাতে গোনা কয়েকটা শব্দ। মার্থা বহু চেষ্টা করেছে তাকে দাদু বা গ্র্যান্ডপা বলাতে। কিন্তু সে তা বলতে অরাজী। আপাতত সে গগাবাবুকে “ডুডা” বলে সম্বোধন করছে। তাতে অবশ্যি গগাবাবু খুশীই হয়েছেন। বেশ মিষ্টি একটা একান্ত আপন ডাক। জয়এর প্রিয় শব্দ হোলো “নো”। গগাবাবু হাসলেও সে চোখ পাকিয়ে বলে “নো!” আবার স্বাভাবিক গলায় কিছু বললেও বলে “নো”। মোটমাট ডুডার কোনো কথা শুনতেই সে রাজী নয়। কিন্তু ডুডা সম্পর্কে তার কৌতুহল প্রচন্ড। গগাবাবু লক্ষ্য করেছেন যে যখন উনি জয় কে পাত্তা না দিয়ে অন্য কিছু করেন, তখন জয় সোফার গায়ে পিঠ ঘষে আর আরচোখে দেখে যে ডুডা কি করছে। তার কৌতুহল ধরা পরে যায় তার চাহনিতে।

ভালোই লাগছে গগাবাবুর নিউ ইয়র্কের এই নতুন জীবন। তবে কষে হাঁটা এখনো তাঁর হচ্ছে না। এই নিয়ে তিনি একটু চিন্তিত। যদিও ফ্ল্যাটটা বেশ বড়, ঘরের ভেতরে আর কতই বা হাঁটা যায়? আর তাছাড়া তাকে দিনরাত চরকীর মত ঘুরতে দেখলে মার্থাই বা কি ভাববে? এই কারনে দুপুর বেলা যখন জয় ঘুমিয়ে পরে আর মার্থা রান্নাঘরে ব্যাস্ত থাকে, গগাবাবু সেই সময়টাতেই একটু পায়চারি করেন। কিন্ত সেই হাঁটা যে পর্জাপ্ত পরিমাণ হচ্ছে না তা তিনি জানেন। ডাক্তার বলেছে অন্ততপক্ষে ৪ কিলোমিটার হাঁটা দরকার রোজ। রোজই ভাবেন যে টিয়াকে বলবেন, কিন্তু বলতে সঙ্কোচ হয়। এমতিনেই মেয়েটার এত কাজ, এত দায়িত্ব। তার মধ্যে আবার এই সামান্য একটা ব্যাপার নিয়ে ওকে ব্যাতিব্যাস্ত করাটা ঠিক হবে বলে মনে করেন না গগাবাবু।

একদিন সকালে জলখাবার খাওয়ার সময় জিগ্যেশ করলেন “হ্যা রে, সমর কোথায় কাজ করে?” “তুমি জানোনা? ও তো ওয়াল স্ট্রিটে কাজ করে” উত্তর দেয় টিয়া। “ওয়াল স্ট্রিট? তার মানে?” “তুমি নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জএর নাম শুনেছো?” শুনেছেন বৈকি গগাবাবু! কলকাতায় ওনার অনেক বন্ধু যারা স্টকে টাকা ফাকা খাটায়, তারা মাঝেমধ্যেই নিউ ইয়র্কের বাজারে কি হচ্ছে তা নিয়ে মাতামাতি করে। ওনার অবশ্যি এসবে আগ্রহ নেই। উনি ব্যাঙ্কেই টাকা পুষে রেখে নিশ্চিন্ত থাকা পছন্দ করেন। কি দরকার ওসবে? যদি সবেধন নীলমনি উবে যায়? তখন রাস্তায় ভিক্ষা করতে হবে! যাইহোক, টিয়ার প্রশ্নে ঘাড় নেরে সম্মতি জানালেন। “সমর ওইখানে কাজ করে” জানালো টিয়া। “কিন্তু ওইখানে ও করেটা কি?” গগাবাবু বিগ্যানের ছাত্র। সবকিছু খুঁটিয়ে জানাটা তাঁর স্বভাব। “ও একটা হেজ্‌ ফান্ড ম্যানেজার” বলে টিয়া। “হেজ ফান্ড? সে আবার কি?”

টিয়া একটু সময় নেয়, তারপর বলে “ওরা ইনভেস্টরদের কাছ থেকে টাকা কালেক্ট করে হাই রিস্ক ভেঞ্চার্সে ইনভেস্ট করে যাতে…যাতে টাকাটা কুইকলি গ্রো করে”। গগাবাবু কি বুঝলেন ভগবানই জানেন। তবে হাই রিস্ক ব্যাপারটা ওনার মোটেই ভালো লাগলো না। অনেকটা জুয়া খেলার মত মনে হোলো ওনার কাছে। “কিন্তু যদি টাকা গ্রো না করে?” প্রশ্ন করলেন তিনি। টিয়া গগাবাবুর উদবিঘ্নতাটা ধরে ফেলেছে। সামান্য হেসে বলল “আরে না না, তুমি চিন্তা কোরো না, এর পেছনে অনেক ক্যাল্কুলেশান আছে। অ্যান্ড সমর ইস রিয়ালি গুড অ্যাট দিস স্টাফফ্‌”। সমর যত চালাকই হোক আর যতই এর ভেতরে অঙ্ক থাকুক, গগাবাবুর মনের খুঁতখুতানি গেল না। “কিন্তু তুই তো বললি হাই রিস্ক? যদি খারাপ কিছু হয়, তখন এই সব বাড়ি ঘর…” টিয়ার উত্তরের অপেক্ষা না করে তারপর নিজেই বললেন “অবশ্যি তুইও চাকরি করিস!”

“আমার স্যালারিতে এই অ্যাপার্টমেন্ট রাখা যাবে না। সমর আররন্স আ লট মোর” বলল টিয়া। লট মোর? একটা ইউনিভার্সিটি প্রফেসরের থেকেও লট মোর? মানে কতটা মোর? কিন্তু এ প্রশ্ন সোজাসুজি বৌমাকে করা যায় না। তবে কি সেই জন্যই টিয়া সমরকে আঁকরে রয়েছে? আর্থিক কারণে? পরক্ষনেই সেই চিন্তা বাতিল করলেন। না না, ছিঃ, তা কেন হতে যাবে? এই কদিনে তো নিজের চোখে দেখলেন মেয়েটা সমরকে সত্যিই খুব ভালবাসে। নানান চিন্তা গগাবাবুর মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকলো। এরি মধ্যে কখন যে মার্থা এসে গেছে খেয়ালও করেননি। “ড্যাড্‌, আমি তাহলে বেরোচ্ছি। ঠিক আছে?” টিয়ার গলার স্বরে গগাবাবুর চিন্তায় ছেদ হোলো। “হ্যাঁ, আয় মা। সাবধানে যাবি” বলে আবার আনমনা হয়ে গেলেন। ভেবেছিলেন হাঁটা প্রসঙ্গটা টিয়ার সঙ্গে আজ আলোচনা করবেন। তা আর হোলো না।

To be continued…

~ ফিট্‌বিট্‌ (পঞ্চম পর্ব) ~

LEAVE A REPLY