স্বর্ণালি ছুটছে…। প্রাণপণে ছুটছে…। ওই তো দেখা যাচ্ছে আকাশকে…। স্বর্ণালি ডাকছে- “…আকাশ…। শোনো…, থামো…,একটু দাঁড়াও…।” আকাশ ওর কথা শুনতেও পাচ্ছে না। সে নদীর বাঁধের ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে আপন খেয়ালে। স্বর্ণালি ও ছুটছে বাঁধের ওপর দিয়ে। সে হাঁপাচ্ছে। আর পারছে না। আকাশ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎই স্বর্ণালি উঠে বসে। সে এতক্ষণ তবে স্বপ্ন দেখছিল? আবার সেই একই স্বপ্ন! স্বর্ণালি বসে হাঁপাচ্ছে। তার চোখের জলে বালিশ ভিজে গেছে। সারাটা শরীর তার ঘামে জবজবে ভেজা। স্বর্ণালি বিছানা থেকে উঠে তোয়ালা দিয়ে ঘাম মোছে। ফ্যানের স্পীডটা আরও একটু বাড়িয়ে দেয়। তারপর টেবিলে রাখা জলের বোতল থেকে ঢক্‌ঢক্‌ করে অনেকটা জল খায়। নাঃ ঘুম আসছে না আর। বাথরুমে গিয়ে মুখ ঘাড় ও গলা ভিজিয়ে হাল্কা করে তোয়ালে দিয়ে মোছে তারপর আবার শুয়ে পড়ে বিছানায়। আজ আবার সেই একই স্বপ্ন দেখল ও। স্বর্ণালি যত আকাশ কে ভুলে থাকার চেষ্টা করে ততই যেন বেশি করে ওকে স্বপ্নে দেখে। আজ সাড়ে চার বছর হয়ে গেল একই স্বপ্ন দেখছে । সেই বাঁধের ওপর দিয়ে আকাশের পেছনে ছোটা, এবং শেষে আকাশের ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাওয়া আর তখনি স্বর্ণালি জেগে ওঠে। ওর চোখের জলে বালিশ ভিজে যায়। স্বর্ণালি আজ ঘরে একাই ছিল। তার স্বামী বিমল চ্যাটার্জী একটা আন্ডারটেকিং কম্পানীতে কাজ করেন এবং অফিসের কাজে বাইরে গেছেন দুদিনের জন্য। স্বর্ণালির বয়স ২৫ বছর।তার স্বামী তার থেকে ১০ বছরের বড়। স্বর্ণালির বিয়ে হয়েছিল সামাজিক ভাবে সম্বন্ধ করে। বিয়ের পর স্বামীর সাথে সে ইউ.পি. তে থাকে কোয়ার্টারে। বাবা মারা যাবার আগেই দিদির বিয়ে হয়েছিল। বাবা মারা যাবার পরে বড়দার বিয়ে হয়।স্বর্ণালির বড়দা একটু ধুর্ত প্রকৃতির মানুষ। ছল চাতুরী করে জমানো সব টাকা পয়সা নিজেই সব হাতিয়ে নিয়ে আলাদা হয়ে যায়। স্বর্ণালিও তার ছোড়দা লক্ষ্মণ এবং মা, এই তিনজনেরই সংসার। লক্ষ্মণের ওপরই ছিল সংসারের সব দায়িত্ব। স্বর্ণালির মা ছিল বড়ই সরল ও সাধা সিধে। যে যা বোঝায় তাই বিশ্বাস করেন উনি। কোন কপটতা ওনার মধ্যে ছিল না। লক্ষ্মণ ছিল স্বর্ণালির থেকে মাত্র দুই বছরের বড়। সে একটা সরকারী চাকরি করত।স্বর্ণালি বিছানায় শুয়ে শুয়ে এপাশ ওপাশ করছিল। ঘুম আর কিছুতেই আসছে না। ও উঠেই লাইট জ্বালাল। দেখল ঘড়িতে রাত তিনটে বাজে। জানালার কাছে এসে দাঁড়াল ও। বাইরে শুধুই অন্ধকার। অনেক দূরে লেবার কোয়ার্টারে কোথাও কোথাও একটু আলো দেখা যাচ্ছে। স্বর্ণালি এমনিতে খুবই ভিতু। ওর ভুতের খুব ভয়। কিন্তু যখনই এই স্বপ্নটা দেখে ও, ওর ভয় ডর বলে মনে কিছুই থাকে না। বড় উদাস হয়ে যায় ও। যখন থেকে আকাশের সাথে ওর সম্পর্কটা ভেঙেছে তখন থেকেই ও এই স্বপ্নটা দেখে আসছে। স্বর্ণালি ফিরে যায় সেই অতীতে। আজ থেকে চার বছর নয় মাস আগে যখন আকাশের সাথে ওর প্রথম পরিচয় হয়েছিল। পাড়ার একজন মহিলা যাকে স্বর্ণালি পিসি বলেই ডাকতো, সেই পিসি ও তার মেয়ে টগরের স্বর্ণালির বাড়িতে ছিল নিয়মিত যাতায়াত। আকাশ স্বর্ণালিকে কখন দেখেছে, স্বর্ণালি জানেনা। যখন থেকে দেখেছে তখন থেকেই তার নাকি ওকে খুবই ভালোলেগে গেছে। আকাশ টগরকে হাত করেছিল স্বর্ণালির সাথে দেখা করানোর জন্যে। টগরের মা একজন স্বামী পরিত্যক্তা মহিলা। টগর যখন দুইমাসের পেটে তখনই টগরের বাবা ওর মাকে ছেড়ে চলে যায়। টগরের মা বাপের ভিটাতেই থাকতেন এবং একটি বাড়িতে রান্নার কাজ করতেন। টগর স্বর্ণালির মাকে বলে ,”মামী, স্বর্ণালিকে আকাশের সাথেকথা বলতে বল।
ছেলেটার স্বর্ণালিদিকে খুবই পছন্দ এবং কিছু দিনের মধ্যে বিয়ে করতে চায়। ছেলে কন্ট্রাক্টরি করে। তার বাড়ির অবস্থাও ভালো।” বড় ছেলে বিয়ে করে ভিন্নহওয়ার পরে স্বর্ণালির মা খুবই চিন্তিত থাকতেন মেয়ের জন্য। মেয়েকে যেন বিয়ে দিয়ে তিনি যেতে পারেন। কারন তার ধারনা ছিল যে ছোটো ছেলে যদি বিয়ে করে নেয় তবে তার মৃত্যুর পড়ে মেয়ের কি হবে? স্বর্ণালি খুব নম্র স্বভাবের মেয়ে ছিল। সে সুন্দরী ছিল বলে অনেক ছেলে তাকে পছন্দ করত কিন্তু কারো ওর সাথে কথা বলার সাহস হয়নি। আকাশই প্রথম টগরকে দিয়ে স্বর্ণালির মাকে বলায় এবং ওর মাও স্বর্ণালিকে রাজি করায়। স্বর্ণালি প্রথমে কিছুতেই রাজি হয়না। মাকে বলে ,”কেন মা? আমি কি তোমার কাছে ভারী হয়ে গেছি।” মা বলেন,” নারে মা, আমাদের মতো গরিব ঘরের মেয়েকে বেশিদিন রাখতে নেই। আর আমি মরে গেলে তোকে কে দেখবে? টগর তো বলল যে ছেলের বাড়ির অবস্থা ভালো আর তোকে পছন্দও করে। আর কথা বললে কি কেউ খারাপ হয়েযায়?” স্বর্ণালি জানে মায়ের ওকে নিয়ে খুব চিন্তা। রাতের পর রাত মাকে দেখেছে পাশে শুয়ে বড় বড় দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলতে। মায়ের মুখের দিকে চেয়ে ও বাধ্য হয়। প্রথম দিন আকাশের সাথে ওর পরিচয় হয় একটি সিনেমা হলে। আকাশ তিনটে টিকিট কেটেছিল।স্বর্ণালির এখনও মনে আছে সিনেমাটার নাম ছিল “প্রেম প্রতিজ্ঞা”। প্রথমেই আকাশ কথা বলে,” নমস্কার, আমার নাম আকাশ রায়।” স্বর্ণালির মনটা ভালো ছিল না। ও জীবনে কখনো প্রেম করবে না প্রতিজ্ঞা করেছিল। কিন্তু মায়ের চাপে পড়ে আজ সেটা ভাঙতে হল। আকাশের নমস্কারের প্রত্যুত্তরে বলে উঠল, “থাক। আর ফরম্যালিটি করার দরকার নেই।” স্বর্ণালিতো মুখ তুলে আকাশের মুখটাওভালো করে দেখেনি। সারাটা সময় হলের মধ্যে আকাশই কথা বলে যাচ্ছিল,বাড়িতে কে কে আছে , বাবা , মা , দাদা, বউদি, বোন আর নীচের ঘরে থাকে ভাড়াটে এইসব। বইটা নিজেও দেখেনি, স্বর্ণালিকেও দেখতে দেয়নি। টগর মন দিয়ে সিনেমাটাই দেখছিল। ইন্টারভাল এর সময় উঠে শুধু বাইরে থেকে বাদাম ভাজা নিয়ে এসেছিল। বাদাম খেতে খেতেই বলল, “আমি কিন্তু সিনেমা দেখতে আসিনি, বাইরে থাকলে চেনা কেউ দেখে ফেলবে তাই এখানে আসা।” স্বর্ণালির একদম ভালো লাগছিলনা এইসব। তারপর প্রায় প্রতিদিনই চলতে লাগলো ওদের দেখা করা। অনেকটা বাধ্য হয়েই যেতে হত ওকে। আকাশ রোজই বিকেলে স্বর্ণালিদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাবার সময় ইশারায় স্বর্ণালিকে ডাকে। স্বর্ণালি ও মায়ের থেকে অনুমতি নিয়ে ওর সাথে যায়। বসে বসে দুজন কত কথা যে বলত। প্রথম প্রথম স্বর্ণালি বেশ চুপচাপই থাকতো। কারন ও একটু লাজুক স্বভাবের ছিল।ওর এইসব ভাল লাগত না। তারপর কখন যে ও আকাশকে ভালবেসে ফেলেছিল ও নিজেও জানে না। আকাশ বাড়ির অনেক কথাই বলেছে ওকে। বাবা রিটায়ার করেছে, বোনের বিয়ে হয়নি বলে চিন্তা, আরও বলত,”জানো আমাদের বাড়িতে ঘোমটা দেওয়ার রেওয়াজ আছে। আমার ও খুব ভালো লাগে। তোমাকে ঘোমটা দিলে খুব সুন্দর দেখাবে কিন্তু”। স্বর্ণালি অন্যমনস্ক ভাবে একটা ঘাস দাঁতে কাটছিল। তাই শুধু একটু মুচকি হাসল। আকাশ কি যেন একটা ভাবে তারপর বলে,” জানো তিনদিন পড়ে আমার একটা ভালো টেন্ডার ভরার আছে।
আগামীকাল আমাকে মনে করিয়ে দিবে তো।” স্বর্ণালির খুব ভালো লাগে কথাটা শুনে। ওদের সম্পর্কের এই নৈকট্যে স্বর্ণালির মনে পুলক জাগে। “বাদাম… বাদাম ভাজা, নেবেন নাকি বাবু” একটা মধ্যবয়সের লোক ছেঁড়া জামা পরনে বাদাম বিক্রি করছিল। আকাশ এক ঠোঙা বাদাম নিয়ে বাদামওয়ালাকে ২০ টাকার একটা নোট দিল।”খুচরো নেই বাবু।” “থাক। ওটা তুমি রাখো।” বাদামওয়ালা হাসি মুখে চলে যায়। স্বর্ণালির এটা খুব ভালো লাগে। গরিব মানুষের উপকার করা তো পুণ্যের কাজ। খুব ভালো করেছো। আকাশ বলে,”জানো সানা, অসীমদা আমার সেই বন্ধু, সেদিন তোমার সাথে সিনেমা হল থেকে বেরোনোর সময় তোমার পরিচয় করিয়ে দিলাম ওর তিন বছর হল বিয়ে হয়েছে। সংসারের অভিজ্ঞতা তো আছে, সেই অসীমদা কে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে দুজন মানুষের মাছ-ভাত খেতে মাসে মোটামুটি কত টাকা লাগবে। ও আমাকে একটা এস্টিমেট দিল। আমার মনে হয় সব ঠিক ম্যানেজ হয়ে যাবে। স্বর্ণালি স্বপ্ন দেখছিল মনে মনে ওদের সংসার হবে। আকাশ আবার বলল,” মা বোধহয় তোমাকে দেখেছে কোথাও।” স্বর্ণালি জিজ্ঞেস করলো,” কখন?” “বোধহয় রাস্তায় কোথাও। আমি ডিটেইলস জানতে চাইনি। জানো মায়ের মুখ দেখে মনে হচ্ছিলো তোমায় পছন্দ হয়েছে। বোনকে নিয়ে সকলে চিন্তিত।বোনের রঙ কালো তার উপর পড়াশুনা বেশিদুর করেনি বলে ভালো সম্বন্ধ পাচ্ছি না।” একদিন ওরা দুজন ঘুরতে বেরিয়েছিল। হঠাৎ পথে ভীষণ ঝড় উঠল সাথে বৃষ্টি। আসেপাশে কোন বাড়ি ছিল না। ওরা ভাবছিল কি করবে। কাছেই একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ ছিল। তার নীচে গিয়ে দাঁড়াল দুজনে। দুজনেই ভিজে গিয়েছিল।ঝড়ের সাথে তখন বিদ্যুৎ ও চমকাচ্ছে। হঠাৎ কড় কড় কড়াৎ……। একটা বাজ পড়ল কাছেই। স্বর্ণালি আকাশের হাতটা খামচে ধরল। মাঝে মাঝে দমকা বাতাস আসছিল।বিদ্যুৎ চমকালেই স্বর্ণালি দু’কান হাত দিয়ে ঢাকছিল। স্বর্ণালির শাড়িটা ভিজে গায়ে সেঁটে গিয়েছিল। ওর লজ্জা করছিল। ভেজা আঁচল দিয়েই গাটা ঢাকল। এমন সময়দূরে একটা খালি রিক্সা যাচ্ছিল। ” এই রিক্সা…। রিক্সা…” আকাশ দৌড়ে রিক্সা ডেকে নিয়ে এলো। স্বর্ণালির পায়ে ভেজা শাড়ী জড়িয়ে যাচ্ছিল। অনেক দেরি করে সেদিন বাড়ি পৌঁছেছিল। এর মধ্যে আকাশ ওর বোনের সঙ্গেও স্বর্ণালির পরিচয় করিয়ে দেয়; এক বন্ধুর বাড়িতে নিয়ে গিয়ে। একদিন গল্প করতে করতে আকাশ বলে তোমার জন্যে দুর্গাপুজোয় বাড়িতে শাড়ী কেনা হয়েছে। স্বর্ণালির বুকের মধ্যে যেন খুশির ঢেউ খেলে যায়। এই ভেবেই যে তবে তো আকাশের বাড়িতে স্বর্ণালিকে মেনে নিয়েছে। ওদের স্বপ্ন সত্যি হতে তো আর দেরি নেই।নবমীর দিন ওই শাড়ীটা পরেই আকাশের বাইকের পেছনে বসেই ও ঠাকুর দেখে এসেছিল। কানের কাছে একটা মশা পুঁউউউ……… করে উঠল। ধ্যাৎ… উঠে বসলো বিছানায়, ঘুমের বারোটা বেজে গেছে। এই বাঁধের স্বপ্নটা কি ওকে কোনদিনই ছাড়বে না? স্বর্ণালি উঠে শাড়িটা ঠিক করে পরে। রাতে ও নাইটি পরেই শোয়, আজই আর শাড়িটা বদলায়নি। হঠাৎ স্বর্ণালির নজরে পড়ে ওর পরনে হলুদ শাড়ী। একদিন আকাশ ওকে বলেছিল, “জানো সানা, হলুদ শাড়ীতে তোমাকে খুব মানায়। মনে হয় যেন তিলোত্তমা।” স্বর্ণালির হাতদুটো নিজের হাতে তুলে আকাশ ওর হাতে চুমু খেল। ” জানো তোমার ওই চোখ দুটো খুব সুন্দর।” স্বর্ণালি আগেও স্কুলের বান্ধবীদের কাছে এই কথা বলতে শুনেছে। “স্বর্ণালি, তোর চোখ দুটো খুব সুন্দর, দেখিস, ওই চোখ দেখেই অনেক ছেলে তোর প্রেমে পরে যাবে। তার উপর তোর রঙ আর চেহারা! তোর বাবা মায়ের তোকে বিয়ে দিতে কোনো কষ্টই হবেনা।” স্বর্ণালি উত্তর দিত ” ছাই!, সব ছেলেরাই টাকা দেখে, বুঝলি। রূপের সাথে রূপিয়াও চাই।” তবুও এখন আকাশের মুখে ওর চোখের প্রশংসা শুনে ওর খুব ভালো লাগলো। আকাশ ওর মাথাটা দুই হাত দিয়ে ধরে বলল, “চোখ বন্ধ করো।”। ” কেন?”। ” বাঃরে আমি বলছি তাই।” । স্বর্ণালি চোখ বন্ধ করতেই আকাশ ওর দুচোখে চুম্বন এঁকে দিল। স্বর্ণালি লজ্জায় মুখ ঢাকল দুহাত দিয়ে। স্বর্ণালি ভাবে সেই আকাশ ওর সাথে এমনটা কি করে করলো? আকাশ বলত,” জানো, ওই চোখ দুটো আমি ভুলে থাকতে পারিনা। সারাক্ষণ আমার চোখে ভাসে।” স্বর্ণালির মাকে অনেকেই বলত ,” আকাশ আপনার মেয়ের কাছে কিছুই না। লম্বা হতে পারে, চোখ মুখ ও ঠিকই আছে, কিন্তু এত কালো আপনার মেয়ের পাশে মানায় না।”স্বর্ণালির মা বলেন,” জানেন দিদি, ছেলেদের রূপ নয়, গুণ দেখতে হয়।” আকাশ একদিন স্বর্ণালিকে বলে,” মনে করো, তোমার বাড়ি থেকে যদি অন্য কোথাও বিয়ে ঠিক করে তুমি করবে?” স্বর্ণালি মজা করে উত্তর দেয়, ” না করার কি আছে? তোমার সাথে আমার এমন কি হয়েছে?” আকাশের মুখটা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যায়।বলে, ” আমি জীবনেও করব না,দেখে নিও।” উত্তরে স্বর্ণালি বলে,” ওটা সবাই বলে, কিন্তু করে।” “কিন্তু আমি করব না।”, আকাশ উত্তর দেয়। ” ঠিক আছে দেখা যাবে।” স্বর্ণালি মুখটা ঘুরিয়ে মুচকি হাসে, ভারী মজা লাগে ওর আকাশের মুখটা দেখে। কিন্তু স্বর্ণালি জানতো না ওদের অলক্ষ্যে উপর থেকে বিধাতাও বুঝি স্বর্ণালির কথায় সায় দিয়েছিলেন। ওর বুকের ভিতর হু হু করে কেঁদে ওঠে। চোখ থেকে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে। ঘুম আসছে না আর । টেবিল থেকে জলের বোতলটা হাতে নিল। খানেকটা জল ঢক্‌ ঢক্‌ করে খেল। একটু জল ঘাড়, গলা ও কপালে ঢালল যদি ঘুম আসে। স্বর্ণালি ভাবে ওর স্বামী ওকে এত ভালবাসে তবুও সে ভোলেনা কেন আকাশকে? বিয়ের পর স্বামীকে সব কথা বলেছিল ও। সেদিন ছিল ফুলশয্যার রাত। বিমল বাবু ছিলেন উদার প্রকৃতির । সব শুনে বললেন,” অতীত কে ভুলে যাওয়াই ভালো।” স্বর্ণালি স্বামীকে কিছুই গোপন করেনি। এমনকি চুম্বনের কথাটাও বলেছিল। বিমল বাবু স্বর্ণালিকে খুব ভালবাসেন। তিনি যথেষ্ট শিক্ষিত মানুষ। স্বর্ণালি ভাবে সে নিজেই স্বামীর যোগ্য নয়। কিন্তু বিমল বাবু কখনো স্বর্ণালিকে অযোগ্য ভাবেন না। উনি স্বর্ণালিকে যথেষ্ট স্নেহ করেন। স্বর্ণালি ভাবে, আকাশ শিক্ষাতে ,স্বভাবে কোনোটাতেই তার স্বামীর তুল্য নয়, তবুও স্বর্ণালি তাকে ভুলতে পারেনা কেন? ও নিজে বারো ক্লাস অবধি পড়েছে আর আকাশ তো মাধ্যমিক অবধি। স্বর্ণালি জানেনা চিন্তা ভাবনাতে মানুষের শিক্ষার কতটা প্রভাব থাকে। আকাশ বলত, ” জানো সানা, তোমাকে একদিনও না দেখে থাকতে পারিনা।” সেদিন স্বর্ণালির খুব জ্বর হয়েছিল। সারারাত ওর মা মাথায় জলপট্টি দিয়ে জ্বর কমান, ওকে ধরে ধরে বাথরুমে নিয়ে যান মা। টগরের কাছে খবর পেয়ে আকাশ একব্যাগ ভর্তি ফল পাঠিয়ে দেয় টগরের হাতে। পরের দিনই ওকে ডাক্তার দেখানো হয়। কিন্তু ভীষণ দুর্বল হয়ে গেছিল স্বর্ণালি। ওর ভীষণ হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিলো। মাথাটাও টলছিল। তবুও দরজার কাছে দাঁড়িয়েছিল ও শুধু আকাশকে দেখার জন্য। দুদিন হল দেখা হয়নি। ওর একটুও ভালো লাগছিলনা। হঠাৎ দেখে আকাশ যাচ্ছে। ইশারা পেয়ে স্বর্ণালিও মায়ের কাছে অনুমতি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। আকাশ বলে, “পারবে হাঁটতে?” “হ্যাঁ।” স্বর্ণালি এখনও জানে না যে দুদিন ওর শরীরের ওপর যে ধকল গেছে ভালভাবে চলতে পারছিল না পর্যন্ত, সে কিভাবে অতটা রাস্তা হেঁটে গেল এবং ফিরে এলো। ওর মনে হত আকাশ পাশে থাকলে ও সব কষ্ট সইতে পারে। ও যেন অন্য এক ভাললাগার জগতে থাকে। ওর মনে হত পৃথিবীতে ওর মতো সুখী আর কেউ নেই। স্বর্ণালি জানতো না যে এই সম্পর্কের কথা ওর ছোড়দা জানেনা। একদিন সন্ধ্যেবেলা ওদের দুজনকে গল্প করতে দেখে ছোড়দার এক বন্ধু বলে,” দেখ্‌ লক্ষ্মণ, তোর বোনকে ও পাড়ার আকাশের সাথে দেখলাম।” বাড়িতে ফিরে লক্ষ্মণ ওর মাকে বলে যে, “ছেলেটা ভালো নয়। আমাদের বন্ধুদের অনেকেই বলেছে। ওর সাথে মিশতে মানা কর।” ওর মা চুপ করে ছিলেন, কিছুই বলেননি। পাশের ঘর থেকে স্বর্ণালি শুনছিল এবং ওর বুকের মধ্যে খুব কষ্ট হচ্ছিল। লক্ষ্মণ আরও বলল যে, “কয়েকটা সম্বন্ধের খোঁজ দিয়েছে বন্ধুরা। খুব তাড়াতাড়ি দেখতে আসবে বলে দিয়েছে” স্বর্ণালি ভাবে ওর কি দোষ? ও তো নিজে থেকে এই সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েনি। আর এখন মনের এতটা কাছে এসে ওর এই সব কথা শুনে বুকের মধ্যে একটা কষ্ট হচ্ছিল। পরদিনই আকাশের সাথে দেখা করে স্বর্ণালি বলল যে ,” বাড়িতে সম্বন্ধ দেখছে। আমি এখন কি করব?” আকাশ বলে, “আমি পুরুষ মানুষ। রিক্সা চালিয়েও খাওয়াতে পারব।” স্বর্ণালি বলে যে ,” তুমি অন্তত রেজিস্ট্রি করে রাখো তবে অন্তত বাড়িতে বলতে পারব।” মাকে স্বর্ণালি বুঝিয়েছিল যে ,”মা, যদি রেজিস্ট্রি করে রাখি তবে ছোড়দার কিছু বলার থাকবে না। আর ছেলেটা খারাপ বলছে? আমিও বলছি, ও তেমন নয়।” স্বর্ণালি তো জানে আকাশ চাইলে অনেক কিছু করতে পারত কিন্তু করেনি। স্বর্ণালির বিশ্বাস ছিল যদি ও খারাপও হয়ে থাকে স্বর্ণালি পারবে আকাশকে ভালো করতে। স্বর্ণালিকে ও ভালোবাসে তাই কখনও কোন অশোভন আচরণ করেনি। কিন্তু রেজিস্ট্রির কথা শুনে আকাশ বলে,” আমার মা বলে, যে মেয়ের মুখের কথায় বিশ্বাস নেই তাকে কি বলা যায়? রেজিস্ট্রি করে তো তিন মাসের মধ্যে আবার ডিভোর্সও করা যায়।” স্বর্ণালি খুব অবাক হয়ে যায় ওর কথা শুনে। ভাবে তোমরা বড়লোক বলে অনেক কিছুই ভাবতে পারো, অনেক কিছুই করতে পারো। আকাশ আবার বলল,” জানো এভাবে মিশলে একটা ছেলের বদনাম হয়না, কিন্তু একটা মেয়ের বদনাম হয়।” এই ধরনের মানসিকতা দেখে স্বর্ণালির মনটা খারাপ হয়ে যায়। ও মনে মনে ভাবে তোমার কাছে মেয়েদের কিছু মুল্যই নেই? কিন্তু মুখে কিছু বলেনা। এদিকে ছোড়দা বাড়িতে রোজ মাকে একই কথা বলতে থাকে, “ছেলেটা ভালো নয়। মিশতে মানা করো।” পরদিন আবার আকাশের সাথে দেখা করে বলে ” কাল দেখতে আসবে। আমি কি করব?” ও উত্তর দেয়,” মা বলেছে, তুমি পড়াশুনা করো নয়ত সেলাই স্কুলে ভর্তি হও খরচার কথা চিন্তা করতে হবে না। আকাশের বাড়িতে এটা বোঝেনা যে কোনো মতেই আকাশের সাথে ওর ছোড়দা বিয়েতে মত দেবেনা। স্বর্ণালির মনটা বিক্ষিপ্ত হয়েছিল। এদিকে রাস্তায় একজনের স্বর্ণালিকে দেখে এত পছন্দ হয়ে যায় যে স্বর্ণালির বাড়িতে খবর পাঠায়। ছেলে ইউ.পি তে থাকে আর আন্ডারটেকিং কোম্পানিতে চাকরি করে। মা ও ছোড়দার ছেলে খুব পছন্দ। ছেলের কোন বাজে নেশা নেই। একটা সিগারেট অবধি খায়না। ওরা পাকা দেখা করতে আসবে আগামী রবিবার। ছেলের বাবা স্বর্ণালির মাকে বলেছেন,” আমার ছেলের আপনার মেয়েকে এত পছন্দ হয়েছে যে রেজিস্ট্রি বিয়ে করতেও রাজি আছে। আমাদের কোন ডিম্যান্ড নেই।” স্বর্ণালির মা তো যেন হাতে স্বর্গ পায়। মা স্বর্ণালিকে বলেন,” লক্ষ্মণ যখন চায়না, তখন আকাশের সাথে মেশার দরকার নেই। ও বলছে ছেলেটা ভালো নয়।” স্বর্ণালি অবাক হয়ে যায় মায়ের কথা শুনে। ও ভাবে, তবে তো মায়েরই উচিত ছিল আকাশের সম্বন্ধে ভালো করে খোঁজ নিয়ে তবেই মেয়েকে মিশতে দেওয়া। তখন তো তিনি তা করেন নি। পরের মুখে ঝাল্‌ খেয়েছিলেন, আর এখনও তাই খাচ্ছেন। ওর মা তো ভালো করেই জানতেন যে স্বর্ণালি কেমন ধরনের মেয়ে , পড়াশুনা ছাড়ার পড়ে মাকে ছাড়া যে কখনো ঘর থেকেই বেরোতো না, সে কতটা চালাক্‌ হতে পারে? ওই টগরের সাথেই যা কথা বলা, তাও টগর একটু পেট পাতলা স্বভাবের ছিল তাই স্বর্ণালি ওকে সব মনের কথা বলতও না। ঘরে বসে বসে শুধু গল্পের বই পড়ত। পড়াশুনা ছাড়ার পর কোনো বন্ধুও ছিল না ওর। এটা ওর মায়ের বোঝা উচিত ছিল। কিন্তু স্বর্ণালির মনের কথাটা কেউ বোঝে না। সে তো কোন মেশিন নয়। ও যে একটা মেয়ে, আর ওর মন বলে যে কিছু আছে এটা কেউ বোঝে না। টগর আর টগরের মাও লক্ষ্মণের কোথায় সায় দেয় এখন, “কি দরকার আকাশের সাথে মেশার? ভালো পাত্র পেয়েছো , বিয়ে দিয়ে দাও।” স্বর্ণালি সেদিন অনেক কষ্টে মাকে রাজি করায়, বলে,” মা,এই শেষবারের মতো একবার দেখা করতে দাও।” মা একটু নরম হয়ে বলে ,”যা। তাড়াতাড়ি ফিরবি।” আকাশ রোজই বিকেলে ওদের বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে যায়। স্বর্ণালি অপেক্ষা করছিল। ওকে দেখতে পেয়েই ওর সাথে যায় সেই বাঁধের ধারে। ওরা দুজন ঘাসের উপর বসেছিল। স্বর্ণালির মনের মধ্যে ঝড় চলছিল। হয়তো আজ ওর শেষ দেখা। আকাশ দুই একটা কথা বলার পরেই স্বর্ণালি ওর একটা হাত ধরে বলে,” তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না। আমি কি করব?” ওর বুকের ভেতর অসহ্য কষ্ট হচ্ছিল। গলাটা কান্নায় বুজে আসছিল। আকাশ স্বর্ণালির হাতটা এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে বলে,” আমার পক্ষে এখন বিয়ে করা সম্ভব নয়। আর একদম কাঁদবে না । চোখের জলকে আমি ঘৃণা করি।” ব্যস এই টুকু কথা। লজ্জা আর অপমানে স্বর্ণালি ভয়ংকর ভাবে চুপ হয়ে গিয়েছিল। প্রত্যাখানের অপমানে ও এতটা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল যে ওর মনে হচ্ছিল যে ধরণী দ্বিধা হয়ে যাক্‌ এখনি। ওর মধ্যে ও ঢুকে যাবে। এই মুখ আর কাউকে দেখাবে না । ওর গলার কাছে যন্ত্রণা হচ্ছিল। কান্নাটা অনেক কষ্টে চেপে রেখেছিল। এই রকম রূঢ় ব্যবহার যে আকাশ করবে তা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি ও। কিচ্ছুক্ষণ পর আকাশ রোজকার মতো ওকে বাড়ির অনেক কাছে এগিয়ে দিয়ে অন্য পথে চলে যায়। সারাটা পথ স্বর্ণালি একটা কথাও বলেনি, শুধু কান্নাটা চেপেছিল, যাতে রাস্তার কেউ কিছু বুঝতে না পারে। রাস্তার উজ্জ্বল পথবাতি গুলো অস্পষ্ট দেখাচ্ছিল। ঘরে এসে বিছানার উপর উপুড় হয়ে সেদিন সে ভীষণ কেঁদেছিল।প্রিয়জনের বিয়োগ ব্যথায় মানুষ যেমন কাঁদে ঠিক তেমনি। মৃত্যু তো হয়েছিলই সেটা তার ভালবাসার। এখনও স্বর্ণালি ভাবে সেদিন তার জীবনের এক ভয়ংকর রাত ছিল। সারারাত সে ছটফট করেছিল আর কেঁদে বালিশ ভিজিয়েছিল। তারপর কতরাত কত দিন যে ভালো করে না পেরেছে খেতে, না পেরেছে ঘুমোতে। তখন থেকেই এই দুঃস্বপ্ন দেখা। তারপর বাড়ি থেকে বিমল চ্যাটার্জীর সাথে সম্বন্ধ করে বিয়ে এবং ইউ.পি. তে নিজের কোয়ার্টারে নিয়ে আসা। এখানে সব কিছুই ঠিক আছে শুধু ওর মনটাই ভালো থাকে না। নাহঃ আর ঘুম হবে না।”

উঠে পড়ে স্বর্ণালি। আয়নার সামনে দাঁড়ায় । চোখ দুটো ফোলা ফোলা দেখাচ্ছে। ওর স্বামী ও বলে, “জানো স্বর্ণালি, তোমার চোখ দুটো খুব সুন্দর। এই চোখ দুটো দেখেই তোমাকে আমার এত পছন্দ হয়েছিল।” স্বর্ণালির আবার আরেকজনের কথা মনে পড়ে যায়। সেও তো এই চোখ দুটির কথা প্রায়ই বলত। নাঃ কিছুতেই ভুলতে পারেনা কেন ও ?, বারেবারে মনে পড়ে তাকে। আজ সকাল দশটার বাসে ফিরবে ওর স্বামী বিমল বাবু। এখন সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে। এখনই সকালের কাজগুলো সেরে রাখলে পড়ে হাল্কা লাগবে।ঘরের সমস্ত কাজ নিজের হাতেই করে স্বর্ণালি।কাজের মাসির কাজ পছন্দ হয়না ওর। সারাদিনের কাজের মধ্যেও শুধু আকাশের মুখটা ভাসে তার চোখে। হঠাৎ করে কখনো কখনো ঘুম ভাঙ্গা রাতে তার স্বামী বিমলবাবুর মুখটা কেন আকাশের মুখ হয়ে যায়? ও নিজের গায়ে চিমটি কেটে দেখে স্বপ্ন দেখছে কিনা। তবে কি ওর মাথাটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে? না ,স্বর্ণালি আর ভাববে না ওর কথা। যে কখনো ওকে ভালোইবাসেনি। ভালোবাসলে কি সবচেয়ে বিপদের সময়, যখন ওকেই সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল তখন হাত ছাড়িয়ে সরে যেতে পারত? স্বর্ণালি ভাবে আকাশের চরিত্রটা বড় বিচিত্র! যার মধ্যে বিবেক, অনুভূতি বা সিম্প্যাথি বলে কিছুই ছিল না। ছিল কেবল ছলনা। আসলে কিছু ছেলেই আছে যারা ভালবাসার অর্থ বোঝেনা। হয়তো ভালোবাসা ওদের কাছে একটা খেলা বা টাইম পাস। এরা গুরুজনের কাছে পারমিশন নিয়ে প্রেম করেনা, শুধু বিয়ে করে। আর দায়িত্ব নেওয়ার সময় এলেই এরা কেটে পড়ে। এরা কি? ভীরু না কাপুরুষ? আকাশ ও তো তাই করেছে! স্বর্ণালিকে ভালবাসার ছলে ভুলিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। আর যখন দেখল বিয়ে করতে চাপ দিচ্ছে, তখনই বাড়ির কথামত হাত ছাড়িয়ে স্বর্ণালির ভালবাসাকে পা দিয়ে মাড়িয়ে, ছুঁড়ে ফেলে দিতে এতটুকু দ্বিধা হয়নি তার। এতকিছু বুঝেও স্বর্ণালি কেন ভুলতে পারেনা তাকে? স্বর্ণালি শুধু এটুকু বুঝেছে হয়তো আকাশের ভালোবাসা মিথ্যে ছিল কিন্তু তার ভালোবাসা তো মিথ্যে নয়। তাইতো সেই ক্ষতের যন্ত্রণা সে আজও বয়ে বেড়ায়। আর সেই বাঁধের উপর দিয়ে দৌড়নোর স্বপ্ন দেখে। পুরনো স্মৃতি গুলো ওকে শুধু বেদনা দেয়। ভুলতে চেষ্টা করেছে অনেক ,পারেনা। স্বর্ণালির মন ও তাই ভালো থাকে না। স্বপ্নটা দেখলেই বুকের যন্ত্রণাটা ওর আরও বেড়ে যায়। এই দুঃস্বপ্নের থেকে কি ওর মুক্তি নেই? সেই নিষ্ঠুর মানুষটা যে স্বর্ণালির মনের অনেকটা অংশ জুড়ে বসে আছে সেই জায়গাটা কি স্বর্ণালি ওর স্বামীকে কথনও দিতে পারবে না নাকি এই দুঃস্বপ্ন ওকে সারা জীবনই তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াবে? স্বর্ণালির মা মেয়ের মুখ দেখে বুঝেছিলেন যে মেয়ে আকাশকে ভুলতে পারেনি। তাই তিনি স্বর্ণালিকে একই কথা বারেবারে বলেন, ” একটা বাচ্চা হলেই দেখবি সব ভালোবাসা তার উপর এসে যাবে।” স্বর্ণালি শুনেছে যে আকাশ ধনী ঘরের মেয়েকে বিয়ে করেছে।স্বর্ণালি ভাবে, হয়তো আকাশ এখন তার বউয়ের পাশে শুয়ে সুখের ঘুম দিচ্ছে। দেওয়াল ঘড়িতে ঢং ঢং করে ছ’টার ঘণ্টা বাজলো। হঠাৎ স্বর্ণালির গা কেমন গুলিয়ে উঠল। কদিন থেকেই এমন হচ্ছে। বিমলবাবু বলেন,” ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করো।” কিন্তু স্বর্ণালি জানে এটা অন্য ব্যাপার।”নাঃ উঠতে হবে, সকাল হয়ে গেছে।” বাথরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে বেরোলো ও। স্বর্ণালি আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায়। বোধ হয় ও কন্‌সিভ করেছে।পরম মমতায় নিজের পেটে হাত বোলায় আলতো করে।এই সন্তানই পারে তাকে বাঁচার প্রেরণা দিতে। একে ও এমন ভাবে মানুষ করবে যেন সকলের কাছে তার মাথা উঁচু হয়।স্বর্ণালি নুতন উদ্যমে সংসারের কাজে লেগে পড়ল।

~ নীরব বেদনা ~
Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

*