স্নেহের পাঠকগণ,

সেদিন বিকেলে মেয়েটির সাথে দেখা হয়েছিল| কিছু জিজ্ঞেস করার ইচ্ছে হলো বলেই ওর দিকে এগিয়ে গেলাম| ওর হাতে ছিল কিছু ধূপের বাক্স| আমায় এগিয়ে আসতে দেখে ও বললো একটা ধূপের বাক্স নেবে? আমার কাছে বেশি নেই, এই দশটা বাক্স বিক্রি করে আমি ঘরে চলে যাবো| দু ক্রোন প্রতি বাক্স|

আমি জিজ্ঞেস করলাম এই ধূপ বিক্রি করেই কি তোমার সংসার চলে? ও বললো আমি ধূপ বিক্রি করি মার চিকিৎসা করাবার জন্যে| আমার দাদা ফ্যাক্টরি তে কাজ করে| ওর রোজগারে আমাদের সংসার চলে| মা ভালো করে দেখতে পায়না, উঠতে চলতেও পারে না| আমাকে না দেখতে পেয়ে কাঁদে, আমাকে কিছু বলতে চায় কিন্তু আমি বুঝতে পারি না| আমি যদি তোমার সব বাক্স ধূপ কাঠি কিনে নি তাহলে আমার সাথে যাবে? “কোথায় “ও জিজ্ঞেস করলো| বললাম চলোই না| ও কে আমাদের স্কুল এ নিয়ে এলাম| বললাম এই  ধূপের বাক্স তোমার হাথে মানায় না, এই নাও খাতা আর কলম| মানুষের মতন মানুষ হতে হবে তো|

ও কিছু বললো না কিন্তু ওর চোখের কোন জলে ভোরে গেল| রোজ তোমার সব ধূপ বাক্স আমি বিক্রি করিয়ে দেব কিন্তু তোমায় পড়া চালিয়ে যেতে হবে| পরের দিন ওর সাথে ওর বাড়ি দেখতে গেলাম| শহরের শেষ প্রান্তে একটা বস্তি| তাতে একটা কুড়ে ঘর| ওর দাদার সাথে আলাপ হলো| ওর দাদা ফ্যাক্টরি তে হাড় হিম করা খাটনির কথা বললো| বললো বর্তমান সরকারের অরাজকতা র কথা... বললো নিজের স্বপ্নের কথা| একদিন এই সরকার আর থাকবে না মানুষের সরকার আসবে| মানুষ মানুষে বিভেদ  থাকবে না| সবাই মন খুলে বাঁচতে পারবে| তাই মানুষের সংগ্রাম চলছে| ও বললো ও হৃদয় একটা মূর্তি গড়েছে  সেটাকে নিজের রক্তে বড় করছে, মানুষের গভীর প্রতিকৃতি| ফ্যাক্টরি তে ও গলন্ত লোহার মতো সেদ্দ হয়ে যাচ্ছে কিন্তু সোনালী দিন আসবেই|

সে দিন সারা রাত বৃষ্টি হলো| ওদের ঘরে বৃষ্টি র জল ভোরে গেল| দাদার  খুব জ্বর হলো, ফ্যাক্টরি তে ও যেতে পারে নি ধূপ ও বিক্রি হয়নি| NGO দাদারা যে ওহীল চেয়ার টা দিয়েছিলো তার মধ্যে মা  ঠায় বসে আছে| কিছু দিনের মধ্যে  মা ও দাদা মারা গেলো| আমি বুঝতে পারছিলাম না ও কে নিয়ে কোথায় যাবো| বললাম আমার সাথে চলো আমার দেশ| ও বললো কোথায়| কেন ইন্ডিয়া ও খানে কলকাতা শহরে আমার এক খানি ঘর আছে| সেখানে থাকবে ও বললো আমি নরওয়ে ছেড়ে কোথাও যাবো না| এইটা আমার মাতৃভূমি| আমি এখানে থেকেই লড়বো| একদিন বিপ্লবের জয় হবে| বিপ্লব দীর্ঘজীবি হবে| আমি নরওয়ে তে ছোট খাটো কাজ করি তাই আমার কপালে চিন্তার ভাজ পড়লো| আমি যেখানে থাকি সেখান থেকে lighthouse টি স্পষ্ট দেখা যায়|

জাহাজের আনা গোনা স্পষ্ট দেখা যায় | সূর্যটি  ও সন্ধে গোধূলি লগ্নে আরো সুন্দর লাগে| দেখতে দেখতে ৪৫ বছর কেটে গেছে| নরওয়ে তে একটা সরকার এসেছে একটা গেছে| মানুষের সংগ্রাম রক্তক্ষয়ী হয়েছে| আর আজ আমরা ভারতে ফিরে যাচ্ছি| আমার গল্প টি এখানেই শেষ হয়ে যেত যদি না অসীম কাকু এটি ছাপানোর অনুরোধ নিয়ে আমার কাছে আসতেন| আমরা ভারতে ফিরে যাচ্ছি আরো অনেক গল্প লেখার জন্যে|আপনারা সঙ্গে থাকবেন কিন্তু আর আপনাদের আশীর্বাদ কাম্য| আর একটা কথা বলা হয়নি ওই মেয়েটি এখন আমার স্ত্রী মার্গারেট… আপনাদের সাথে দেখা হবে আবার কোনো সংখ্যায়|

ধূপকাঠি

~ ধূপকাঠি ~

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

*