কালী পূজোর পর থেকেই গাঢ় ধুসর রঙের ‘ধোঁয়াশা’য়(ধোঁয়া এবং কুয়াশা মিলে  তৈরি হয়)ছেয়ে যায় দিল্লির আকাশ। এই সময় দিল্লি ও তার আশপাশের বেশ কিছু এলাকায় বাতাসে দূষণের মাত্রা এতটাই বেড়ে যায় যে ‘ইন্ডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশান’(ইএমএ) সেই সব অঞ্চলে জারি করে ‘জরুরি স্বাস্থ্য সতর্কতা’। আর এই মাত্রা অতিরিক্ত দূষণের জন্য দায়ী করা হয় হরিয়াণা ও পাঞ্জাবের কৃষকদের! খোদ দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী এই দাবি তুলে বলেন- পাঞ্জাব ও হরিয়াণায় কৃষকরা তাদের মাঠ পরিষ্কারের জন্য ফসল কাটার পরে খরকুটোতে আগুন জ্বালিয়ে দিলে যে ধোঁয়া সৃষ্টি হয়েছে সেই ধোঁয়াই নাকি দিল্লি দূষণের প্রধান কারণ।

তাই দিল্লির পরিবেশকে রক্ষা করতে হরিয়ানা সরকার তাদের কৃষকদের উপর জারি করেছে বিভিন্ন ফরমান, শুধু তাই নয় চাষীদের কাছ থেকে নেওয়া হয় জরিমানাও। সেই রাজ্যে খরকুটো পোড়ানোর অপরাধে এখনও অবধি ১,০১১ কৃষকের কাছ থেকে  মোট ১১ লক্ষ ৮৯ হাজার টাকা জরিমানা করেছে হরিয়াণা সরকার। এর মধ্যে ২২৭ জনের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে এফআইআর। এটাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই যে আমাদের দেশে যখনই কোনো সংকট দেখা দেয় বা সংকট তৈরি হয় তার জন্য সবার আগে দায়ী করা এই গরিব মানুষ গুলোকেই। ডাঃ এ নারায়ণমূর্তির কথায়- It is no surprise that resource-poor farmers become convenient scapegoats for whatever and whenever any crisis hits the country. Whether it is over-exploitation of groundwater or environmental pollution, condemning farmer’s actions has become the norm.

***

১৯৯২ সালের হিসেব অনুযায়ী বায়ু দূষণকারী দেশ গুলির মধ্যে শীর্ষ স্থানে ছিল উন্নত দেশ গুলি, ভারত ও চীন ছিলো সারির অনেক নিচের দিকে কিন্তু ২০১৪ সালে প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড হেল্‌থ অর্গানাইজেশনের’ (WHO) তথ্য অনুযায়ী পৃথিবীর ১৬০০ টি শহরের মধ্যে দিল্লির স্থান একেবারে উপরে। দিল্লি একাই নয় ভারতের আরও দুটি শহর রায়পুর এবং গোয়ালিয়র সমান ভাবে টেক্কা দিয়ে যাচ্ছে বাকি শহর গুলোকে। কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে থাকা পরিবেশ সংক্রান্ত সংস্থা ‘সফর’ System of Air Quality and Weather Forecasting and Research (SAFAR)-এর মতে, দিল্লির বাতাসে গত ৯’ই নভেম্বর ক্ষতিকারক ভাসমান কণা ‘পিএম’ ১০ ও ‘পিএম’ 2.5 এর মান ছিলো সর্বাধিক ৮৭৬ ও ৬৮০ মাইক্রোগ্রাম প্রতি কিউবিক মিটার(এর নিরাপদ মান যথাক্রমে ১০০ ও ৬০ মাইক্রোগ্রাম প্রতি কিউবিক মিটার)। মানবদেহের জন্য যা অত্যাধিক মাত্রায় ক্ষতিকর।

***

দিল্লির দূষণের প্রধান কারণ গুলি হলো অতিরিক্ত যানবাহন চলাচল, তাপবিদ্যুৎ কেন্ত্র, বড়ো বড়ো শিল্পকেন্দ্র এবং গৃহস্থলি বর্জ্য। ‘নির’(National Environmental Engineering Research Institute, NEERI)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী ২০০৭ থেকে ২০১০ এর মধ্যবর্তী সময়ে দিল্লির বাতাসে ভাসমান ক্ষতিকারক কণা ‘পিএম ১০’ দূষণের জন্য মূলত সড়ক ধুলো(৫২%), শিল্প(২২%), উন্মুক্ত জ্বালানি(২২%) ও অতিরিক্ত যানবাহন চলাচলকে(6.6%)দায়ী করা হয়। এরপর ২০১৪ এবং ২০১৫ তে ‘আইআইটি’ দিল্লি এবং ‘আইআইটি’ কানপুর থেকে আরও দুটি রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়, উক্ত রিপোর্ট দুটিতে দিল্লির বায়ু দূষণের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় অতিরিক্ত যানবাহন চলাচলকেই(যা বাতাসে নাইট্রোজেন অক্সাইডের বৃদ্ধি ঘটায়)। Centre for Atmospheric Sciences, IIT Delhi থেকে প্রকাশিত উক্ত রিপোর্টে বলা হয় ‘the largest contributor of air pollutant emissions is found to be vehicles followed by industries, power plants and domestic sources’

অনেকটা একই রকম তথ্য আইআইটি কানপুর থেকে প্রকাশিত রিপোর্টটিতেও উঠে আসে, এই রিপোর্টটিতে বলা হয়- ‘road dust is highest polluter, accounting for 56% of all ‘PM10’ pollution while 38% for all PM2.5 pollution’। এই সমস্ত গবেষণায় ফসলের অবশিষ্টাংশ জ্বালানোকেও দায়ী করা হয়েছে( তাতে এও বলা হয়েছে যে দিল্লির আকাশে শীতকালে যে ‘ধোঁয়াশা’র সৃষ্টি হয় তা খানিকটা হলেও ওই ফসল জ্বালানির ধোঁয়া থেকে সৃষ্টি) কিন্তু কলকারখানা, অতিরিক্ত যান চলাচল, রাস্তার ধুলো এইসব প্রধান বায়ু দূষণ কারি কারণ গুলোর অনেক পরে।

***

দিল্লির বিজ্ঞান ও পরিবেশ কেন্দ্রের(Delhi-based Centre for Science and Environment)প্রধান অনুমিতা রায়চৌধুরি মতে “জ্বালানি দহন একটি অনিয়মিত সমস্যা যা দিল্লির দূষণকে একটি নির্দিষ্ট সময়ে খানিকটা হলেও বৃদ্ধি পেতে সাহায্য করে কিন্তু ডিসেম্বরের শেষের দিকে যখন এই ফসল জ্বালানো সম্পূর্ণ ভাবে বন্ধ হয়ে যায় তারপরেও কিন্তু দিল্লির বাতাসে দূষণের মাত্রা অনেক বেশি থাকে” তিনি  আরও বলেন “দিল্লির দূষণের কারণ দিল্লি নিজেই, দিল্লিতে প্রতিদিন প্রায় ৮.৮ মিলিয়ন যান চলাচল করে, এছাড়াও প্রতিনিয়ত নির্মাণ কাজ(Construction Activity), বড়ো বড়ো শিল্পকেন্দ্র বেড়ে চলেছে যা এই দূষণের প্রধান কারণ”। ফসলের অবশিষ্টাংশ জ্বালানোর ফলে পরিবেশের উপর নিশ্চয়ই ক্ষতিকর প্রভাব পরে শুধু ফসলের অবশিষ্টাংশ নয় যে কোনোরকম জ্বালানিতেই পরিবেশের কিছু না কিছু ক্ষতি হয়, তাই বলে শুধুমাত্র হারিয়াণা ও পাঞ্জাবের ধোঁয়া দিল্লিতে এসে তার বাতাসকে এতোটা দূষিত করছে যে ‘Environmental Hazard’এর সৃষ্টি হয়েছে- এটা মেনে নেওয়া কষ্টকর।

এই প্রসঙ্গে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে সেটি হলো ভারতের আবহাওয়া বিভাগের(Indian Meteorological Department) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী অক্টোবরের শেষ ও নভেম্বরের প্রথম দিকে যখন দিল্লি ও তার আশপাশের অঞ্চল(National Capital Region)বায়ু দূষণে জর্জরিত তখন বাতাসের অভিমুখ ছিলো পূর্বমুখি(Easterly)। সুতরাং এই তথ্য যদি নির্ভুল হয় তাহলে কোনো অবস্থাতেই পাঞ্জাব ও হারিয়ানার দূষিত বাতাস দিল্লির এই দূষণের এতো বড়ো কারণ হতে পারে না। আবহাওয়া ও পরিবেশ বিজ্ঞানের মার প্যাচ থেকে বেরিয়ে এসে যদি  সহজ ভাবে এটা মেনে নেওয়া হয় যে, পাঞ্জাব ও হরিয়াণার দূষিত বাতাসই দিল্লি দূষণের প্রধান কারণ তাহলে, সবার আগে মনে আরও একটি প্রশ্ন জাগে সেটি হলো, যে রাজ্যে এতো দূষিত বাতাসের সৃষ্টি সেখানে পরিবেশ সংক্রান্ত কোনো সমস্যার কথা  কানে আসছে না কেন!

পাঞ্জাব ও হরিয়াণার এতো দূষিত ‘টক্সিক’ বাতাস নিজের রাজ্যে কোনো ক্ষতি না করে যত রাগ সব উগড়ে দিলো দিল্লির উপর! তবে এইসব বিতর্ক থেকে বেরিয়ে এসে কেন্দ্রীও পরিবেশ মন্ত্রী সুস্পষ্টভাবে একটি যুক্তিপূর্ণ  মতামত প্রদান করেছেন তিনি বলেছেন ইসরো থেকে পাওয়া স্যাটেলাইট ইমেজগুলি প্রমাণ করে যে দিল্লিতে দূষণে প্রতিবেশী রাজ্য মাত্র ২0 শতাংশ দায়ী, অবশিষ্ট ৮০ শতাংশর জন্য দায়ী দিল্লি নিজেই এবং এর মূলত কারণ দিল্লির আবর্জনা সমস্যা। সেন্ট্রাল পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ড এবং আইআইটি কানপুর (2015) এর একটি গবেষণায় এটি অনেক আগেই তুলে ধরা হয়েছিলো কিন্তু সরকারের অবহেলায় এর জন্য তখন কোনো দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনাই করা হয়নি যার ফল ২০১৭ তে দিল্লিবাসীরা ভোগ করছে।

***

২০১২ সালে প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড হেল্‌থ অর্গানাইজেশনের’(WHO) তথ্য অনুযায়ী বেইজিং ছিলো পৃথিবীর সবথেকে দূষিত শহর কিন্তু গতবারের তালিকায় এক নম্বরে থাকা বেইজিং চলে গেছে ৭৭ এ! এছাড়াও, চীনের আরো কিছু শহর বায়ু-দূষণের তালিকায় বেশ শুরুর দিকেই অবস্থান করছিলো ২০১২ সালে। কিন্তু এবার প্রথম ২০’র মধ্যেই নেই চীনের কোনো অস্তিত্ব। এটি অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু ভারতের এ কী হাল!

সেরা ২০ বায়ু-দূষিত শহরের মধ্যে ১৩ টি স্থান কেবল একা ভারতেরই দখলে! চিন তার প্রকৃত সমস্যাকে চিহ্নিত করে বিভিন্ন দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা করে যার ফলে আজ তারা এই সারির অনেকটাই নিচে নামতে পেরেছে কিন্তু ভারতে তা সম্ভব হয়নি। কেন হয়নি সে বিষয় অনেক জটিল, আছে রাজনৈতিক তরজা, আছে পরিবেশ বোধের অভাব, নেই কোনো সুপরিকল্পিত দীর্ঘ মেয়াদী নীতি। আছে শুধু গরীব মানুষের পেটে লাথি মারার প্রবণতা আর রাজনৈতিক সুবিদার্থে এর ওর ঘারে দোষ চাপানোর ব্যাকুলতা যার মাশুল দিতে হয় দেশের গরিব মানুষদের।

————

তথ্যসূত্রঃ

১। Delhi’s smog is Delhi’s doing; A Narayanamoorthy & P Alli; The Hindu; (December 9, 2016)।

২। Stop blaming farmers for Delhi pollution, Mr Arvind Kejriwal. What have you done?; sanjeev Singh; The Times of India; November 7, 2016) ।

৩। তদেব;

৪। Delhi air pollution: Can farmers be blamed?; Sayantan Bera; Live Mint(E-paper);29 November 2017।

 

~ দিল্লি দূষণ ও দুর্ভাগা কৃষক ~

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

*