।এক।

গৌরীবাবু তাঁর পুরনো পাঞ্জাবীর পকেটের ওপর হাত রেখে খুচরো পয়সাগুলো একটু ফিল করে ফ্ল্যাটের দরজাটা খুললেন। দরজাটা আধখোলা অবস্থাতেই রোজকার মতো একবার পিছনে ফিরে দেওয়ালের ঘড়িটার দিকে তাকালেন … যাচ্চলে, হতচ্ছাড়াটা এর মধ্যেই সোয়া নটা দেখাচ্ছে। মুখটা একটু বেঁকিয়ে বৌ কেয়ার উদ্দেশ্যে একটা বিরক্তিপূর্ণ হাঁক ছাড়লেন …

গৌরী। আরে … কোথায় গেলে গো, একবার এদিকে এসো তো। কি আনবো বলে যাও।

বৌ কেয়াও কম যায় না, তা প্রায় বছর আঠারো তো তারও সংসার করা হয়ে গেলো, সেও রান্না ঘরে বাসনের ঠুং ঠাং এর মধ্যে থেকেই ঝামটা দিয়ে উত্তর দিল …

কেয়া। তোমার মাথায় কি আছে বলত, কাল রাত্রেই পই পই করে বললাম কি কি বাজার করতে হবে, আর আজ সকালেই সব ভুলে গেলে … অ্যাঁ !

কথা বলতে বলতে কেয়া হাত মুছতে মুছতে রান্না ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালেন। মধ্যবিত্ত ঘরের বউরা যেমন হয় … পাঁচ ফুটের একটু নিচে, বেশ মোটার ওপর গড়ন, তাও হয়তো অল্প বয়সে রোগা টোগা ছিলেন … এখন সংসারে ঢুকে দুপুরে নরম বিছানায় চুটিয়ে ঘুম আর সারা সন্ধ্যে টিভির সামনে পা তুলে বসে সিরিয়াল দেখে কোমড়, হাত আর পায়ে বেশ কয়েক কিলো জমিয়েছেন। একসময় মুখটা হয়তো খারাপ ছিলো না, কিন্তু এখন গালে আর চোখের তলায় চর্বি জমে মুখটা কেমন গোল হয়ে গিয়েছে, তার ওপর একটা কায়দার ফ্রেমের চশমা পড়ে অনেকটা বিড়ালের মতো দেখায়। প্রথম যখন সংসারে এলেন, মুখটা বেশ মিস্টি ছিল, গৌরীর সাথে বেশ মিঠে করেই কথা বলতেন, কিন্তু সময়ের সঙ্গে কোথাও বোধহয় তার কেটে গিয়েছে, এখন সামান্যতেই দুজনার মধ্যে ইন্ডিয়া – পাকিস্তান শুরু হয়ে যায়। রোগা চেহারার গৌরীবাবু বিরক্ত মুখে দরজায় দাঁড়িয়ে, তাঁর নাকের তলায় কাঁচা পাকা গোঁফ হাওয়ায় একটু ঝুরু ঝুরু কাপছিল।

গৌরী হেঁড়ে গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন – আরে দূর, রাখো তোমার বুঝিয়ে দেওয়া। ওই তো স্টার জলসা না জি-বাংলায় মেগা সিরিয়াল দেখতে দেখতে হাত মুখ নেরে কি বললে কিচ্ছু বুঝিনি। যা বলেছো আবার বলো, বাজার যেতে দেরি হয়ে যাচ্ছে।

কেয়াও কম যায় না, কাঁসরের মতো গলায় সেও চিৎকার করে উঠলো – কার জন্য দেরী … অ্যাঁ? সকালে খবরের কাগজটা হাতে পেলে তো সময়ের কথা মাথায় থাকে না। দোষ দিচ্ছ কাকে?

খারাপ সকাল, ভালো দিন (প্রথম পর্ব)

গৌরী এবার দেখলেন বিপদ, ঝগড়া বেশীদূর গড়ালে আরো দেরি, তখন সব টাটকা মাছ বেরিয়ে যাবে, ডিফেন্সে গেলেন …

গৌরী। কেয়া, শোন, শোন … এই সব কথা এখন বারিয়ে লাভ কি। তোমাকেই তো রান্না করতে হবে। ঝট করে লিস্টটা বলে দাও, আমি বেরিয়ে যাই। ওদিকে দেরি হলে সব ভালো মাল বিক্রি হয়ে যাবে।

কেয়াও একটু সামলে নিল … এই সাত সকালে এক প্রস্থ কথা কাটাকাটি আর ভালো লাগে না। আর তাছাড়া এই লোকের সাথেই তো আঠার বছর হয়ে গেলো, একে বেশী বলেও লাভ নাই, কারণ কালকেই আবার এই এক ব্যাপার নিয়ে ঝগড়া হবে। দরজা খোলা তাই শাড়ীর আঁচলটা সামলে সে এগিয়ে এলো, ফ্রীজের থেকে একটা তরকারি রাখার বাস্কেট বার করে টেবিলে সাজিয়ে রেখে বললো …

কেয়া। মন দিয়ে শোন, বাজারে গিয়ে আবার ভুলে যেও না। আলু, পটল আর করোলা আনতে ভুলবে না। এমনিতেই তোমার ব্লাড সুগার, ডাক্তার বার বার করে করোলার তরকারি খেতে বলেছে, আর আমাকেও। মাছে আলু ছাড়া তো আবার তোমার ভাত খাওয়া হয় না। পটলের একটা তরকারি তো চাই রাত্রে না হলে খাবে কি। আর যদি হয় তাহলে একটু কুমড়ো আর বরবটি এনো। মাছ যা পাও তবে রুই হলেই ভালো। পয়সা থাকলে একটু ভাজা খাওয়ার চুনো মাছ আনতে পারো।

পকেটে তো মোটে তিনশো টাকা আর কিছু খুচরো, এর মধ্যে অতো হবে কি করে। তবে এই সব বোলে গৌরী বহুদিনই আর কেয়াকে বিব্রত করে না, সহজ সমাধান হচ্ছে “ভুলে গিয়েছি” বলা। কেয়া মাঝে মাঝেই ধরতে পারে না … রেগে খানিকটা গজ গজ করে, কিন্তু গৌরী অসহায়, তাঁর যা বাজেট তাতে কেয়ার দেওয়া বিরাট লিস্ট ধরে সব কিছু আনা সম্ভব নয়। আজকেও বোধহয় তাইই হবে, মুখটা একটু ব্যাজার করে দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলেন … কেয়া দুম করে পিছনে দরজাটা দিয়ে দিল। কিন্তু দুই পা গিয়েই আবার ফিরে বেল বাজাতে হোল আর ভিতর থেকে কেয়ার খাম্বাজ চিৎকার – দূর, এই সময় আবার কে? একটু তরকারি কাটার যো নেই দেখছি।

গৌরী একটু রেগেই বললেন – আরে খোল তো। না দেখেই ভিতর থেকে চিৎকার কোরো না।

কেয়া দরজা খুলে গৌরীকে দেখে চোখ কুঁচকে বললেন – আবার কি? এই তো বেরুলে …।

গৌরী একটু ঢোক গিলে উত্তর দিল – আরে দূর, বাজারের ঝোলাটা নিতেই ভুলে গিয়েছি।

কেয়া রান্না ঘর থেকে বেশ পুরনো রঙ চড়ে যাওয়া একটা ঝোলা এনে দিল, তারপর হঠাৎ একটু উৎফুল্ল হয়ে বললো – ফিরে এসেছো ভালোই হয়েছে, এই মনে পরে গেলো … দুটো ভালো সন্দেশ এনো তো, কাল তো আবার লক্ষ্মী পূজো … কে আবার বাজারে যাবে, আজকে এনে রাখাই ভালো।

গৌরী একবার আগুনে দৃষ্টিতে কেয়ার দিকে তাকিয়েই পথে নামলেন। আজকাল তো ছ-টাকার সন্দেশ অনেকটা ছোটোবেলার সেই কাঁচের গুলির সাইজের। একটু বড় আনতে গেলেই দশ টাকা। দুটোর জন্য কুড়ি গেলে সেই কুড়ি টাকা বাজারের বাজেটে সর্ট … ওই টাকায় একটা কুমড়োর ফালি বা করোলা তো হোয়েই যায়।

রাস্তায় নেমে গৌরী হন হন করে এগোতে এগোতে এই কেয়ার পূজোর কথা ভাবছিলেন। বাঙালী মধ্যবিত্ত সমাজের বৌ ঝিদের সবার সেই একই পোঁ … লক্ষ্মী পূজো, সরস্বতী পূজো আর সত্যনারায়ণ পূজো, এছাড়াও আছে নানান বার ব্রত। তাঁর মা এই প্রায় সাতাত্তর বছর বয়সেও নানান বারব্রত নিয়ে ব্যাস্ত, আর কেয়াও সেই একই রকম। আসে পাশে পাড়ার মা মাসীমা কাকিমা-রা সবাই প্রায় একই রকম … বারব্রত পূজোয় কোন অনীহা নেই। কিন্তু বাংলার মেয়েরা এতো ভক্তির বিনিময়ে কি পায়? সেই শাক, ডাল আর ভাত, পোনা কি তেলাপিয়া মাছ। মাসে কোনক্রমে একবার মাংস, তাও পাঁঠার দিকে তো তাকাবার উপায় নেই, সাড়ে চারশো টাকা কিলো। যারা মুরগির মাংস খায় না তাদের তো হয়েই গেলো। মা মাসীমারা সারা জীবন ঈশ্বরের কাছে নিজের সন্তান বা স্বামীর মঙ্গল কামনা করে যা পান তা হোল একটা কেরানীর চাকরী বা স্কুল মাস্টার … মাসে সব মিলিয়ে হাজার পঁচিশেক মাইনে। কেউ যদি ব্যাঙ্কে ট্যাঙ্কে পেয়ে গেলো তো বাজার গরম, বাড়ীতে হরির লুট চলে। গৌরী তাঁর জীবনে বাঙালী মধ্যবিত্ত সমাজে এর থেকে বেশী ক্যারিয়ার সেরকম দেখেন নি। দু একজন অবশ্য হঠাৎ হঠাৎ পড়াশুনোয় খুব ভালো হয়ে দারুণ কিছু করে ফেলে কিন্তু তারাও শেষে আর নিজের বাবা মাকে সেরকম দেখতে চায় না, নিজের বৌ বাচ্চা নিয়ে আলাদা হয়ে যায়। ফলে সেই দারুণ চাকরী করা তুখোর ছেলের বাবা মার বুড়ো বয়সেও মধ্যবিত্ত থেকে যান আর তার ফলে রোজ যেটা জোটে তা হোল লইট্যা মাছের ঝাল আর উচ্ছে ভাজা।

।দুই।

এই সব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে গৌরী বড় রাস্তার দিকে যাচ্ছিলেন … জয় গুরু বলে আর একটু নিশ্চিন্তে পার হোয়ে গেলেই বড় রাস্তা, সেখানে আটকায় কে। ও বাবা … সে গুড়ে বালি … কোন একটা জানলা দিয়ে এক মহিলা কন্ঠ শোনা গেলো – কেরে, বাবা গৌরী যাচ্ছিস নাকি …?

সেরেছে … গৌরী ভাবলেন, আজকে এমনিতেই দেরী হয়ে গেছে, অফিসে দেরি হলেই অফিসের নতুন বস গোল গোল চোখ করে তাকাবেন। ডান দিকে তাকাতেই দেখলেন যা ভেবেছেন ঠিক তাই, একতলা বাড়ীর জানলায় জয়শ্রী মাসিমা বসে আছেন। ভদ্রমহিলার বয়স প্রায় আশি পেরিয়েছে। রাস্তায় এখন একটু আধটু বার হন, কিন্তু বেশীর ভাগ সময়ই জানলায় বসে থাকেন। রিটায়ারমেন্টের পর হাতে ভালোই টাকা আছে কাজেই এমনিতে কোন ঝামেলা নেই। কলকাতায় আত্মীয় স্বজনও আছে কিন্তু কেউই নিয়ে নিজের কাছে রাখতে চায় না। অনেকেই মাঝে সাঝে ফোন করে বা নমাসে ছমাসে একবার ঘুরে যায় যদি বুড়ি উইলে কিছু টাকা দিয়ে যায়। মহিলা জানলায় বসে বসে সবার সাথেই একটু কথা বলতে চান , এ পাড়ায় অনেকদিন আছেন কাজেই প্রায় সবাইকেই চেনেন।

গৌরী একটু দেঁতো হেসে দাঁড়ালেন – কি মাসিমা, আজকে শরীর কেমন? ভালো তো?

জয়শ্রী। আর বাবা, ভালো কই। কালকেই যা মাথা দপদপ করছিল, ভাবলাম ডাক্তার ডাকি। তা, কেয়া কেমন আছে? বাতটা একটু কোমলো কি?

গৌরী। আর মাসিমা, বাতের আর ঠিক কি, একদিন কমে তো পরের দিন বারে। আজকে তো মনে হচ্ছে ঠিক আছে। তা আপনার নাতির কি খবর, গত সপ্তাহে আসবার কথা ছিল না।

জয়শ্রী মুখটা একটু বিক্রিত করলেন – ওদের বয়স কম, ঠাকুমার জন্য সময় কোথায়। ফোন করেছিল, সামনেই কবে যেন বকখালি যাচ্ছে কয়েকজন বন্ধু মিলে তাই একটু ব্যাস্ত, পরে আসবে।

গৌরী শুধু “অ” ছাড়া আর কিছু বললেন না। এরকম অনেকই দেখা, আজকে বকখালি, পরের মাসে পেট খারাপ, তারপর অফিসের ট্যুর … চলতেই থাকবে। গৌরী এসব বোঝেন, তিনি নিজেও অল্প বয়সে কম করেননি। তখন কেয়ার সাথে সবে বিয়ে হয়েছে … ঘরে ডবকা বৌকে ফেলে কে আর বুড়ো মা বাবাকে দেখতে যায়। মা ফোন করলেই হাজার ওজর … মা, এই সপ্তাহটা বাদ দাও, পরের সপ্তাহে নিশ্চয়ই আসছি। আর পরের সপ্তাহ, শনিবারের সকালে আবার সেই … মা, আজকে কেয়ার পেটটা একটু খারাপ, প্রমিস, নেক্সট উইকে আসছি। কয়েক সপ্তাহ পরে মা সবই বুঝতে পারতেন, তিনি আর ফোন করতেন না। কাজেই লজ্জায় পরে একবার যেতেই হোত।

এই মুহুর্তে তিনি একটু চিন্তিত, কোনভাবে কথা থামিয়ে বাজারে যেতে হবে। ওদিকে মাসিমা কোথা থেকে একটা ট্যাবলেটের স্ট্রীপ বার করে জানলা দিয়ে এগিয়ে দিয়েছেন – বাবা, একটু দেখত এটা ঠিক অসুধ কিনা। কালকে পিন্টুকে দিয়ে আনালাম কিন্তু কেমন যেন অন্য রকম লাগছে। প্যাকেটের রঙটা পালটে গেল নাকি।

গৌরী একবার আর চোখে ঘড়ির দিকে তাকালেন, নটা কুড়ি …। মাই গড, আর হাঁটলে চলবে না, রীতিমতো হান্ড্রেড মিটার ড্যাস দিতে হবে। তবুও মাসিমা কাকিমা বলে কথা, স্ট্রীপটা নিয়ে বুক পকেটের ওপর একবার হাত বোলালেন। ছ্যাঃ … এটাও ভুল, চশমা আনতে ভুলে গেছেন। ওটা বোধহয় খাটের ওপর খবরের কাগজের পাশেই পরে আছে, সাত সকালে কেয়ার সাথে একচোট চিল্লামিল্লি হওয়ায় বেরনোর সময় নিতে ভুলে গেছেন। কি আর করা, রোদের কাছে নিয়ে গিয়ে নানান ভঙ্গিতে ট্যাবলেটের স্ট্রীপটাকে ধরে চোখ থেকে একটু দূরে নিয়ে গিয়ে খালি চোখেই পড়ার চেস্টা করলেন। আজকাল এই রুপোলী স্ট্রীপগুলো রোদে এত চকচক করে যে চশমা থাকলেও কিছু বোঝা যায় না। ওষুধের নামটা গৌরী জানেন কিন্তু একটা অক্ষর পি না বি সেটাই বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে, খালি চোখে সব অক্ষরগুলোই কেমন দুটো দুটো, একটু ঝাপসা।

জয়শ্রী মাসিমা একটু অধৈর্য হয়ে বললেন – কি রে, পড়তে পারলি না? এতো দেরি কেন?

গৌরী কেমন লজ্জিত হয়ে পরছিল, এমন সময় কোথাথেকে পিন্টু নিজেই এসে বাঁচিয়ে দিল। বোধহয় সাত সকালেই কোথাও বাজারে গিয়েছিল, মাসিমা ওকে দেখেই নানা অভিযোগের তির ছুরতে শুরু করে দিলেন, গৌরী এই তালে ট্যাবলেটটা ফেরত দিয়ে একটু গাঁই গুঁই করে “যাই মাসিমা” বা ঐ জাতিয় কিছু বলে ওয়াকিং রেসের ছন্দে বড় রাস্তার দিকে পালালেন।

(To continue)

LEAVE A REPLY