এই অগাস্ট মাসের শুরুর দিকটা। বৃষ্টির তেজ ও বেশ খানিক কমে গেছে আর গরমটাও তেমন নেই। শ্রাবনের শেষের দিক হলে যা হয় আর কি। কোলকাতায় বেশ কদিন ধরে বৃষ্টি নেই। ওদিকে আবার মুম্বাই তে টানা বৃষ্টি চলছে। এরম দোলাচলে একদল উঠতি তরুন গিয়ে জুটলো গোয়াতে।

গোয়ার নাম শুনলেই বাড়ির লোকজনের চোখ কেমন যেন কপালে উঠে যায়, বন্ধু বান্ধবদের একটা বাঁকা হাসি এসব চলতেই থাকে। যাই হোক সব কিছুর পর্ব মিটিয়ে একদল পোলা গিয়ে। বেশ হাসি মজা আনন্দে কাটিয়ে কটা দিন এবার ফেরার পালা। জটলা বেঁধে দাঁড়িয়ে তারা একটা স্টেশনে। স্টেশনের নাম থিভি। গোয়া রাজ্যের প্রান্তিক একটা স্টেশন। রাজধানী পানাজি থেকে বেশ অনেকটাই দূরে,তবে বেশ নাম করা স্টেশন। গোয়া যাত্রীদের কাছে এই স্টেশনের গুরুত্ব বেশ ভালো ভাবেই বোঝা যায়।

যাই হোক উৎকর্ষতায় যতটা খ্যাতনামা মনে হয় বেশভূষায় ততটা না। খুব বেশি হলে আমাদের সাউথ-ইস্টার্ন রেলওয়ের ওই ফুলেশ্বর কি সাঁকরাইল স্টেশন হবে। দুটো প্ল্যাটফর্ম,একটা প্রতিক্ষালয় আর গুটি কয়েক দোকান, এই নিয়েই সেজেছে থিভি। ছোট হলেও লালমাটির টিলার কোলে বেশ আসর জাঁকিয়ে বসেছে স্টেশনটা।
তখন ওই সকাল ৯টা মত হবে। সকালের দিকের বৃষ্টিভেজা ঠাণ্ডা আমেজটা আস্তে আস্তে কেটে গেলো বেলা বাড়ার সাথে সাথে। মেঘের কোল থেকে মুখ বের করে বেশ কড়কড়ে রোদ উঠেছে। ছেলেগুলোর স্টেশনে পৌছতে একটু দেরিই হয়ে গেছে। ব্যাস,আর দেখে কে। ছোট স্টেশনের সব চেয়ার গুলো তে লোকজন আর মালপত্রের ঠেসাঠেসি। সাথে রোদ। তাই জোর কদমে চলছে ছায়া খোঁজার পালা। কোনও মতে পাওয়া গেলো এক্টুকরো ছাওয়া।

বছর ২৩-২৪ এর জনা পাঁচেক ষণ্ডা মার্কা তরুন ওই টুকু ছাওয়াতেই “একটু জায়গা দাও” এর মতো করে পালাক্রমে দাঁড়াচ্ছে। মুখে বিরক্তির ছাপ স্পস্ট। কেউ বিরক্ত খিদে নিয়ে, কেউ বা বিস্কুটের খোঁজ করছে, কেউ তো আবার ওই সুযোগে ফোনের ইন্টারনেটের সৎব্যবহার করে নিচ্ছে। এতো দিন গোয়াতে নেট পায়নি,অনেক ছবি জমে আছে। হুড় হুড় করে সব আপলোড হচ্ছে ইন্সটাগ্রাম,ফেসবুকে। একজনতো আবার প্রেমে মত্ত,কানে ফোন মুখে হাসি। গোয়া ফেরত ক্লান্ত শরীর গুলো একটু জায়গা যে চাইছে সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না।

ট্রেন ছিল ৯.৩০ থেকে। সবাই প্রস্তুত। কেউ কেউ আবার সেলফির নেশায় মত্ত। খচাখচ মুহুর্তবন্দী হচ্ছে ওই হাতের মুঠোয়। ছেলে গুলোও পিছপা হয়নি অবশ্য। তারাও পাল্লা দিয়ে কাজ সেরে চলেছে। যথারীতি ভারতীয় রেলওয়ের সুনামের প্রতি অবিচার না করে ট্রেন এলো আধ ঘন্টা লেটে। বেশিক্ষন দাঁড়াবে না, টেনে টুনে ২ কি ৩ মিনিট,তাই জলদি জলদি কাজ সারতে হবে; মাল পত্র তোলা গোছানো সব। সময়মত ট্রেন আসতেই নিজেদের বাহুবল কাজে লাগিয়ে কাজ সেরে নিলো তারা।

বি-২ কামরার ৫০-৫৫ অবধি সিট,৫৩ নম্বরটা বাদ রেখে। সেই মতো সবাই বসেও গেলো। এসি কামরায় ঢুকে বাইরের ওই কাঠফাটা রোদের হাত থেকে নিস্তার। আরামের বাতাবরন বিরাজমান। সবাই যে যার জায়গা মতো বসে গেছে। বিগত কটা দিন গোয়াতে উদ্দাম তারুন্য উপভোগ করার পর এবার সবারই একটু বিশ্রাম চাই। চার জন আপার বার্থ আর মিডিল বার্থ মিলিয়ে আর একজন সাইড লোয়ার বার্থ। সব মোটামুটি সেট, এবার ঘুমের পালা। ট্রেন ছাড়লো, গতি বাড়িয়ে স্টেশন পেরিয়ে গেলো। সবাই এখন ঘুমাচ্ছে।

বেলা ১০.৩০। কিন্তু কামরার অবস্থা দেখে বোঝা দায় যে সেটা সন্ধ্যে ৭টা না বেলা ১০.৩০টা। যাই হোক সাইড লোয়ার বার্থের সানির ঘুম ভেঙ্গে গেলো কিছু মারাঠি বউ এর অন্তর্কলহে। সে উঠে বসেছে, দেখছে বাইরের পরিবেশ। সবুজে মোড়া দিগন্তে পাহাড় ঘেরা ছবি, আহঃ কি মনোরম। তার উপর সানির আবার কবিতা টবিটা লেখার একটু ন্যাক আছে। ব্যাস সে বসে গেছে খাতা খুলে। তবে বউ গুলোর ঝগড়া থামতে থামতে মোটামুটি কোপের বাকিদের ঘুম ভেঙ্গে গেছে সেটা আর বলতে বাকি থাকে না। উপরের বার্থ থেকে বাবু আর গোপালের বিরক্তি ভরা মুখ আর মাঝের বার্থ থেকে রনি আর সোনাই বেড়ালের মত চোখ নিয়ে উঁকি মারছে।

বেশ অনেকক্ষনের যাত্রা,প্রায় ১০ থেকে সাড়ে ১০ ঘন্টাতো হবেই। তাই সবাই ঠিক করলো দুপুর বেলা কুম্ভকর্ন মোড অন করবে। কথায় কথায়,গানে গল্পে ট্রেনের তালে তালে অরাও এগিয়ে চলেছে। হঠাত করে গোপাল খেয়াল করলো পাশের কোপের একটা মেয়ে তাদেরকে লক্ষ্য করছে। ব্যাস আর দেখে কে। ঘুম টুম সব কপালে। এবার শুরু হয়েছে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখার পালা।

আস্তে আস্তে খেয়াল পড়লো যে পাশের কোপে জনা চারেক মেয়ে আর জনা চার ছেলে আছে। কিন্তু ছেলে গুলো সবাই ঘুমের দেশে অস্ত গেছে। মেয়ে গুলোই নিজেদের ভেতরে গল্প করতে ব্যাস্ত। প্রধানত হিন্দি ভাষায় চলছে আলাপ চারিতা। তাই ছেলেগুলোর বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল না। কিছুটা সময় দেখা দেখি করে কাটার পর এটা বুঝতে পারলো তারা যে সব মেয়ে গুলো সব ছেলে গুলো কে দেখেনি। ওই দলের একটা মেয়েই এদের গোপাল কে দেখছিল এবং এখনও দেখছে। বাকি দের ইন্টারেস্টটা অবদমিত হয়ে যাওয়াটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার এরম একটা পরিস্থিতিতে। রনি,সোনাই আর বাবু আবার পিছন ফিরে শুয়ে পড়লো। আর সানি তো তখন অন্য জগতে। না জানি জানলার দিকে চেয়ে কি দেখছে বাইরের ওই দিগন্তটাকে। কেমন যেন গোগ্রাসে গিলছে ওই প্রকৃতির শোভাকে। ভাবছে হয়তো ফেলে আসা কিছু স্মৃতির কথা।

গোপালের উতসাহের অন্ত নেই, দাঁত গুলো যেন মুখের বাইরে বেরিয়ে আস্তে পারলেই বেঁচে যায়। নতুন রসে রসনা তৃপ্তির জন্যে আবার সে মাথা ঘুরিয়ে নিয়ে অন্যভাবে শুলো। আগে মাথাটা ভেতরের দিকে ছিলো,এখন সেটাকে বাইরের দিকে করে নিলো যাতে করে পাশের কোপের সাইড বার্থ গুলো কে দেখা যায়। মুখের হাসি তো আর থামেই না।

বাকিরা ঘুমাচ্ছে। সানি আর গোপাল জেগে। সানি মজে নিজের ক্যামেরায়, গোপাল মেয়েটার চোখে। মেয়েটা রয়েছে পাশের কোপের সাইড আপার বার্থে। আমাদের কোপের দিকে মুখ করে। গোপাল মাঝে মাঝে চোখ তুলে দেখছে ওই দিকে। সানি বেশ কিছুক্ষন ধরে এই ব্যাপারটা লক্ষ্য করছে। কিচ্ছু বলেনি। এবার সে গলা তুলে একবার ডাক দিল। ততক্ষন ট্রেন কঙ্কণ রেলওয়ের মজা নিতে শুরু করেছে। একের পর এক সুড়ঙ্গ দিয়ে ঢুকছে আর বেরচ্ছে, খানিকটা সেই ছোটবেলার সাপ-লুডো খেলার মতো। গোপাল নিচে নেমে এলো। সানির সিটে বসলো। বেশ কিছুক্ষন গল্প করলো।

ওই দিকে মেয়েটিও ততক্ষনে নিচে নেমে এসেছে। মেয়েটির নাম গোত্র কিছুই জানা নেই। তবে কথায় কান পেতে বুঝলাম, মেয়েটা বাঙালি। কারন সে ফোনে বাংলায় কথা বলছিলো এবং খুব স্পস্ট বাংলা বলছিল। তাতেই বুঝতে অসুবিধা হয় না মেয়েটি বাঙালি। ইতিমধ্যে সানি একটু বাইরে গেছে, তার ভেতরেই গোপাল  কাজের কাজ গুছিয়েছে । সানি ফিরে এসে দেখে গোপাল ফিরে গেছে আবার নিজের জায়গায়, মেয়েটি ও। দুজনের মধ্যে কেমন যেন নিস্পলক চাওয়া চাওয়ই চলছে। সানি সব দেখলো,বুঝলো তারপর আবার নিজের কাজে ফিরে গেলো। এর মধ্যেই মাঝে মাঝে চলছে কিছু টিপ্পনির আদান প্রদান। ট্রেন চলছে নিজের মতো,আর সবাই সবার মতো। কেউ জেগে,কেউ ঘুমিয়ে,কেউ বা চোখের দিকে চেয়ে।

বেলা বেড়েছে, খিদেও জানান দিচ্ছে। দুপুরের খাওয়ার সময়। পেটের টানে সবার ঘুমে টান পড়েছে। নড়ে চড়ে বসেছে সবাই। খাওয়া দাওয়া চলছে। বেশ বেলাই হয়ে গেছে,তাই খিদের প্রকোপটাও বেশ ভালো করে অনুভূত হচ্ছে। একপ্রকার হা-ঘরের মত খাওয়া দাওয়া চলছে। এর মধ্যে রনির আবার গুলাব জামুন খিদে পেলো। কিন্তু খাওয়ার শেষ, তাই পেলো না। বিরক্তি ঘিরে আসাটা তাই খুব স্বাভাবিক। একেই আগুডা ফোর্ট যাওয়া হয় নি বলে আফসোস রয়েই গেছিলো। তার ওপর যোগ দিলো এই গুলাব জামুন। যাই হোক জলদি হাতে খাওয়া শেষ করে সবাই বাইরে এলো। কোন একটা স্টেশনে ট্রেন থামার জন্যে একচোট ফোটোশেসান করে নিলো তারা।

ওই ৩.৩০ কি ৪ টে মতো বাজে। রনি আবার ঘুমাতে গেলো। বাকি সবাই মোটামুটি জেগে আছে। বাবু আর সানি গল্প করছে তাদের সেই পুরনো ফেলে আসা দিন গুলো নিয়ে। সোনাই আবার অরুন্ধুতি কে নিয়ে কতো না গল্প বলে যাচ্ছে। সেই ভালোলাগা, ভালোবাসার গল্প। রনি ঘুমের মাঝে মাঝে আবার ফোন নিয়ে একটু গল্প করে নিচ্ছে ওই পারের মানুষটার সাথে। সেদিকে কারো হুঁশ নেই। সবার চোখ এখন গোপালের দিকে। মুখে আওয়াজ নেই,কিন্তু কতো কথাই না চালাচালি হচ্ছে এই বাঙ্ক থেকে ওই বাঙ্ক। মেয়েটাও হাসছে মুচকি মুচকি,গোপালও। একটা ভালোলাগার বাতাবরন যে আছে সেটা বুঝে নিতে নেহাত অসুবিধা হয় না।

কিছুক্ষন পর গোপাল বাইরে গেল। সাথে সাথে মেয়েটিও বাইরে চলে গেলো। বেশ কিছুক্ষন পরে বাইরে গিয়ে দেখা গেলো চোখের কথা গুলো শেষমেশ ভাষা পেয়েছে। জায়গা পেয়েছে একে অন্যের কানে। সেই নিঃশব্দ হাসি গুলো শব্দ পেয়েছে।  গোপাল আর মেয়েটি বেশ হেসে হেসে গল্প করছে। সবাই দেখলো, হাসলও কিন্তু কেউ কিছু বললো না। সবাই শুধু উপভোগ করছে। যাই হোক বেশ অনেক ক্ষন কথা বলার পর যখন গোপাল ফিরলো তখন সবাই মিলে এক প্রকার হামলে পড়লো। খোঁচা মেরে জানা গেলো মেয়েটি মাস্টার ডিগ্রি করছে কোনো এক কলেজ থেকে,কলকাতার বালিগঞ্জ এলাকায় বাড়ি, নাম মধুপর্না। ব্যাস এই শুনেই বাবু তো একটা আওয়াজ দিয়েই দিলো,” ও মধু,ও মধু, আই লাভ ইউ, আই লাভ ইউ…” অমনি বাকিরাও লাফিয়ে পড়লো সেই দিকেই।

এতোটাই বাড়াবাড়ি করতে শুরু করলো যে মেয়েটা রীতিমতো অপ্রস্তুত হয়ে নিচের বাঙ্কে নেমে এলো। ব্যাস আর কি। এই ভাবেই চল্লো ট্রেনের বাকি সময়টা। মাঝে মাঝে বাইরে বেরিয়ে গল্প আর বাকিদের টিপ্পনি এই সব কিছু মিলিয়েই বাকি সময়টা কাটালো। এবার নামার পালা, সবাই থানে স্টেশানে নামবে। আর ওই দল যাবে আরও আগে,কোনো স্টেশনে। সবাই ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছে। থানে আসছে সামনেই। গোপালের মনটা আটকে ওই কামরাতেই। থানে এসে গেলো। সবাই নেমেও গেলো। নামার আগে একবার গোপাল বলে এলো, “আসছি,ভালো থাকিস। পরে যোগাযোগ হবে আবার। “
ব্যাস ওই টুকুই। তার পর সবাই যে যার নিজের মতো। আবার একটা ভালো লাগা রয়ে গেলো ওই ঠান্ডাঘরের জানলার ওপারে। গোপাল সাথে নিয়ে এলো ওই বিদায়ি হাসি আর একটা ছোট্ট টাটা। হয়তো কেউ কাউকে আর কখন দেখবে না, কেউ হয়তো কাউকে ভালোবাসবে না। তবুও ওই ক্ষনিকের ভাললাগাটা থেকে যাবে সারাজীবন। নাহয় থাকলো ওই কাঁচবন্দী জানলার ভেতরে,কিন্তু মনটাতে একটা ছাপ রেখে গেলো। যদি গোপাল কখনো এই লেখা পড়ে তখন হয়তো আবার নতুন করে অনুভব করবে সেই দিনটা, সেই হাসি,সেই হাতের ছাপ। সেই অনুভূতি বাকিদের কাছে কখনও ধরা দেবে না, বাকি দের কাছে এটা শুধু কামরাবন্দী ভালোলাগা…

 

~ কামরাবন্দী ~

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

*