কাল রাত্রেও প্রায় এগারোটায় বাড়ি ফিরে আকাশের সেই একই কথা ’আমাকে খেতে দিও না, আমি খেয়ে এসেছি’। শুনে রমা আর চুপ থাকতে না পেরে বলে ওঠে ’হ্যাঁ রে বাবা, তোর কি আমাদের কথা একটুকুও মনে পরে না, নাকি আমাদের সাথে বসে খেতে এতো বিরক্ত লাগে ? আমার রান্না যদি পছন্দ না হয়, অন্তত বাইরে থেকে খাবার কিনে এনেও তো আমাদেরকে সঙ্গ দিতে পারিস। আমি আর তোর বাবা যে দিনের পর দিন তোর পথ চেয়ে বসে থাকি শুধুমাত্র এইটুকু আশায় –   তার কি কোনও দাম নেই তোর কাছে?’ রমার কথা আকাশের হয়তো কানেই যাচ্ছিল না, কারন দুটো কানই তো ইয়ার ফোনে ঢাকা। রমা একটানে কান থেকে ওগুলো খুলে বলতে শুরু করে ’কি ভেবেছিসটা কি তুই ? আমাদেরকে এই ভাবেই অবজ্ঞা করবি?’ বিরক্তিতে আকাশ মুখটা ঘুরিয়ে নেয়, ছুঁড়ে দেয় জামাটা সোফার

dreamparent

ওপর আর গলা ফাটিয়ে বলতে শুরু করে ’আমার জন্য অপেক্ষা করার কি দরকার ? তোমাদের বয়স হয়েছে, তোমরা খেয়ে নাও না কেন?’ ইতিমধ্যে আকাশের মোবাইল বেজে উঠতেই রমা চেঁচিয়ে ওঠে ’ওই শুরু হল, যতক্ষণ বাড়িতে থাকবে হয় একটার পর একটা ফোন, নয় এস এম এস আর নয়তো ওই ফেসবুক। বাবা, মায়ের কথা ভাবার ফুরসত কোথায়?’ কোনও কথা না বলে আকাশ ফোনটা কানে লাগিয়ে এগিয়ে যায় নিজের ঘরের দিকে ’হাইইই, হোয়াটস আপ ? ………………..।

সকালে রান্না চড়িয়ে রমা নিজের মনেই ভাবতে থাকে কেন ওদের একমাত্র ছেলে ক্রমশ: দূরে সরে যাচ্ছে, কেনই বা মা বাবার উপস্থিতিটা ওর কাছে এতটাই বিরক্তির কারন হয়ে দাঁড়াচ্ছে ? ফেলে আসা নিজের জীবনের ওই বয়সটার সাথে তুলনা করে বোঝার চেষ্টা করে যে এমন পরিবর্তন কি এসেছিল ওর জীবনেও?  না, রমা এব্যাপারে নিশ্চিত যে যদিওবা কিছু পরিবর্তন এসেছিল, তা কখনই এমন মাত্রা নেয় নি। হয়তো কিছু ক্ষেত্রে বাবা, মায়ের শাসন ওর অপছন্দের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু তা কখনই ওদেরকে এমন বাঁধনহারা জীবনের দিকে ঠেলে দেয়নি, অথবা বাবা, মাকে কখনও অবজ্ঞা করতেও সাহায্য করে নি।

~~~

আকাশের এই পরিবর্তনটা কলেজে ভর্তি হবার পর থেকেই লক্ষ্য করছে রমা। ব্যাপারটা বিভাসেরও চোখে পরেছে। আজকাল বাড়িতে খুবই কম থাকে, ওদের কোন কথায় কান দেয় না এমনকি কখনও কখনও তর্ক জুড়ে দেয়। সারাক্ষণ কলেজের ছেলেমেয়েদের সাথে হই হুল্লোড় –  এমন কি মাঝেমধ্যে ড্রিঙ্কসও যে চলে তাও বোঝা যায়। সবে তো ইঞ্জিনিয়ারিঙে প্রথম বছর, আর এরই মধ্যে এতটা পরিবর্তন যে বাবা মায়ের মূল্যটা তলানিতে এসে ঠেকেছে ? হয়তো বয়ঃসন্ধিকালে কিছুটা পরিবর্তন আসে, কিন্তু তা কি কখনও মানুষের চরিত্রটাকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে?  কয়েক বছর আগে পর্যন্ত যে ছেলে চলে আসতো মায়ের কাছে আদর খেতে, বাবার সঙ্গে বসে যেত ঘণ্টার পর ঘণ্টা কম্প্যুটারে গেমস খেলতে, আর ভালবাসত বাবা মা’র  সাথে গাড়ি  চড়ে ঘুরে বেড়াতে, আজ তার সাথে বাবা মায়ের সম্পর্ক সারাদিনে কেবল কয়েকটা কথার আদান প্রদান,  নয়তো রাগারাগি। মাত্র এক’বছরের মধ্যে যে ওদের সেই আদরের ছেলে যে এতটাই বদলে যেতে পারে, তা দেখে নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারে না রমা, পারে না কোনও  হিসাব  মেলাতে – ‘কেন হল এমন, তাদের কোন পাপের ফল এইটা ?’

প্রথম যেদিন আকাশ কলেজ থেকে ফিরে মাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল ’মা, তুমি আজ আমাকে খুব বকো, মারো’। ছেলের এমন কথা শুনে রমা কেঁদে বলে ওঠে ’কেন? বকবো কেন তোকে, মারবোই বা  কেন ? তুই জানিস না যে শুধু তোকে ঘিরেই আমাদের জীবন। আমাদের সুখ, দুঃখ, আশা, ভালোবাসা, কল্পনা, স্বপ্ন সব কিছুই তো একমাত্র তোকে কেন্দ্র করে।’ সেদিনও কিন্তু লজ্জায়, অনুতাপে আকাশের মুখটা লাল হয়ে হয়েছিল, দু’চোখ বেয়ে নেমে এসেছিল জলের ধারা। থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে মায়ের পা’দুটো জড়িয়ে ধরে বলেছিল ’আমি খুব অন্যায় করেছি মা। বন্ধুরা আজ জোর করে আমায় বিয়ার খাইয়ে দিয়েছে। আমি আর কখনো এমন করব না মা।’ নিজেকে কোনমতে সামলে রমা বলেছিল ’ঠিক আছে বাবা, তুই যে ভুলটা বুঝতে পেরেছিস এটাই আমার কাছে সবথেকে বড় পাওয়া। চেষ্টা করিস তোর আজকের এই অনুতাপটা সারা জীবন মনে রাখতে, এটাই তোকে জীবনে আদর্শ মানুষ হয়ে উঠতে সাহায্য করবে।’

আকাশের প্রতি রমার দৃঢ় বিশ্বাস এবং পূর্ণ আস্থাই এতদিন রমাকে অবিচল থাকতে সাহায্য করেছিল। রমার স্থির বিশ্বাস ছিল যে সেদিনের ওই ড্রিঙ্ক করার অনুশোচনাই আকাশকে সারা জীবন ছায়ার মতো তাড়া করে ভবিষ্যতে বিপথে যাওয়া থেকে রক্ষা করবে। ওদের শাসন, সৎ শিক্ষা, গুরুজনদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মানুষকে ভালবাসার মূল্যবোধ থেকে যে আকাশ কখনো সরে আসতে পারেনা, তা রমার একান্ত বিশ্বাস। তাই, বিভাস যদি কখনও কিঞ্চিত সংশয় প্রকাশ করে বলতে গেছে ’দেখো বড় হয়ে কতটা মানুষের মত মানুষ হয়, শেষ জীবনে আমাদের কতটা………’। রমা কিন্তু বলতে দেয়নি বিভাসকে, বরং জোর দিয়ে বলেছে ’না, তুমি এমন নেতিবাচক কথা বোলো না। আমাদের ছেলে আমাদের ভাবাদর্শে বড় হয়েছে, ও কখনই অন্যরকম হতে পারে না – এটাই আমার বিশ্বাস, আর এটা নিয়েই আমি বেঁচে থাকতে চাই সারাটা জীবন’ ।

নিজেকে চিন্তামুক্ত রাখার জন্য মস্ত ওই বিশ্বাসের পাহাড় গড়ে তুললেও, নীচে কিন্তু ফাটল ধরতে শুরু করেছিল কিছুদিন ধরে – চিন্তাটা একটু একটু করে দানা বাঁধতে শুরু করেছিল রমার মনের গভীরে। আর ওইদিন মর্নিং ওয়াকের সময় পাশের বাড়ির সবিতার কয়েকটা কথা এক দমকা ঝড়ের মত সব লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল, মনে হয়েছিল হাত দিয়ে কান দুটো চেপে ধরে ছুটে পালাতে ওখান থেকে – কিন্তু তা পারেনি রমা।  সবিতা বলেই চলছে ’তোমার ছেলেকে তো সেদিন পার্ক স্ট্রীটে দেখলাম, দুটো মেয়ের সাথে বেশ বেসামাল অবস্থায় ট্যাক্সির জন্য দাঁড়িয়ে আছে। ওরা কি তোমার ছেলের বন্ধু ? তুমি চেনো ওদের ? কি আর করবে, সবই যুগের হাওয়া……না হলে অত ভাল ছেলে ………।’ কোনোমতে কয়েকটা ‘হ্যাঁ’ আর ‘না’ দিয়ে কথা শেষ করে বাড়ি ফিরে আসে রমা। বিভাসকেও পারেনি সবকিছু বলতে।

~~~

জন্মের পর থেকেই আকাশকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল বিভাস আর রমার জীবন। ওদের প্রতিটা মুহূর্তই জড়িয়েছিল আকাশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আনন্দ ইত্যাদির মধ্যে। স্কুলের সময়টুকু ছাড়া, ওরা সর্বক্ষণই সঙ্গ দিয়েছে আকাশকে ওর একাকীত্ব ঘোচানোর জন্য। একদিকে যেমন ওরা চেষ্টা করেছে সুস্বভাব এবং সৎচরিত্র গঠনে, অন্যদিকে লেখাপড়া শিখিয়ে প্রকৃত মানুষের মত মানুষ করে তুলতে। জীবনের প্রতিটা মুহূর্তই উজাড় করে দিয়েছিল আকাশের চিন্তায়। আকাশও কিন্তু বাবা মাকে কখনও আশাহত করেনি, ওদের প্রত্যাশা পূর্ণমাত্রায় ভরিয়ে দিয়েছে। প্রতি বছর বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন রমা যখন স্কুলের নীচে দাঁড়িয়ে রেজাল্টের চিন্তায় অপেক্ষা করতে করতে ক্রমশ: অধৈর্য হয়ে উঠত, হঠাৎ দূর থেকে আকাশের ডাক  ‘ মা, মা, মা,…..আমি এবারও ফার্স্ট হয়েছি’, শুনে উদগ্রীব মনটা নিমেষে ভরে উঠতো প্রশান্তিতে, ঠিক যেমনটা অনুভব হয় পুজোর পর ঠাকুরমশাই শান্তির জল ছিটোলে।  দৌড়ে এসে মা’র গলা জড়িয়ে ধরে আকাশ যখন বলতো ‘মা, তুমি খুশী হয়েছো তো ?’, চরম আনন্দ আর উত্তেজনায় রমার গলা দিয়ে কোনও আওয়াজ বের হত না, শুধু আদর দিয়ে বুঝিয়ে দিত কতটা খুশী হয়েছে সে। শুধু কি তাই, প্রতি বছর যখন প্যারেন্ট-টিচার্স মিটে ক্লাস টিচার তার প্রশংসার ঝুরি খুলে অনর্গল গুণগান শুরু করতেন আকাশের অধ্যবসায়, স্বভাব, বিনয়, শ্রদ্ধা ইত্যাদি নিয়ে, বিভাস আর রমা খুশী হওয়ার থেকেও বেশী অস্বস্তি বোধ করতো – মনে হতো উনি হয়তো বা একটু বেশীই বলছেন। কিন্তু আত্মীয় স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধু –  এঁদের সকলের শুধু ভালবাসার মধ্যমণিই নয়, এঁরা তাঁদের সন্তানের কাছে আকাশকে তুলে ধরতেন এক আদর্শ প্রতীক হিসাবে।

~~~

একটা একটা করে কেটেছে আকাশের স্কুল জীবনের দীর্ঘ বারোটা বছর। আকাশের পড়াশোনা, স্বভাব ইত্যাদি নিয়ে যদিও কখনও ভাবতে হয় নি, কিন্তু  ওর স্বাস্থ্য নিয়ে উৎকণ্ঠা বিভাস আর রমাকে সারাটা জীবন তাড়া করে বেরিয়েছে। ওর শীর্ণকায় চেহারা এবং রোগ প্রতিরোধের অক্ষমতার দরুন মুহুর্মুহু অসুস্থতা বিভাস আর রমাকে জীবনে কখনও স্বস্তি দেয়নি, কিন্তু আকাশকে বুকে আগলে সমস্ত বিপদ থেকে রক্ষা এতটা পথ চলতে রমা বা বিভাসের এতটুকুও ক্লান্তি আসেনি, বরঞ্চ এতো দুশ্চিন্তার মধ্যেও কিন্তু ওদের প্রতিটা মুহূর্ত কেটেছে এক অনাবিল আনন্দে। ছোট্ট আকাশেরও কিন্তু বাবা, মায়ের প্রতি ভালোবাসা গভীরতা কিছু কম ছিল না – ওরাই ছিল আকাশের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু আর তাই কখনও ওদেরকে কখনও চক্ষে হারাত না। ও যে শুধু বাধ্য ছেলে ছিল তাই নয়, গুরুজনদের অন্তর থেকে শ্রদ্ধা এবং ভক্তি করতো এবং তাঁদের কথা পালন করার চেষ্টা করতো। একবার স্কুলের রেসে বিভাস ওকে চোখ বুজে প্রাণপণে দৌড়তে বলেছিল বলে এমন দৌড় দৌড়েছিল যে ফিনিশ লাইনের দড়ি ভেদ করে এগিয়ে যাওয়ার দরুন গলাটা কেটে গিয়েছিল। বাবা, মায়ের প্রতি ভালবাসা এতটাই গভীর ছিল যে বিভাস বা রমার সাথে অন্য কেউ চেঁচিয়ে কথা বললে, আকাশ বাবা, মাকে ভয়ে জড়িয়ে কেঁদে উঠত। বেড়াতে যাবার সময় দূরপাল্লা ট্রেনের মাঝের কোনও ষ্টেশনে বিভাসকে নামতে দেখলে কেঁদে ভাসিয়ে দিত। একবার লেকের জলে বিভাস আর রমাকে বোটিং করতে দেখে ঠাকুমার কোলে বসে ভয়ে এমন ডুকরে কেঁদেছিল যে তক্ষুনি ওরা বোট ছেড়ে উঠে আসতে বাধ্য হয়। এমনকি বিভাসকে কখনও অসুস্থ হতে দেখলে, খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দিয়ে শেষে নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়ত। বাড়িতে কোন গুরুজন এলে, ঢক করে প্রণাম করে মাথা নিচু করে অপেক্ষা করতো আশীর্বাদের আশায়, আবার রাস্তায় ভিখারি দেখলে তো বাবার পকেট ধরেই টানাটানি করতো পয়সা দেওয়ার জন্য, পুজোর দিনে অঞ্জলি না দেওয়া পর্যন্ত জল-স্পর্শ করতো না।

এত আদর্শে বেড়ে ওঠা আকাশ কিন্তু আজ এক অন্য মানুষ। কলেজে তিন বছর কেটে গেছে, সামনের বছর আকাশের ইঞ্জিনিয়ারিং ফাইনাল। এই  তিনবছরেই সম্পূর্ণ ভাবে বদলে গেছে আকাশের স্বভাব ও আচরণ, মূল্যবোধের কিছু অবশিষ্ট আছে  বলে মনে হয় না। বিভাস আর রমার উপস্থিতিটা ওর কাছে এখন অবাঞ্ছিত – যেন সিনেমার ‘এক্সট্রা’ চরিত্রের মত। কলেজের কিছু ছেলেমেয়েই এখন ওর সবচেয়ে প্রিয় – এদের সাথেই সর্বক্ষণ ওঠা-বসা, হইচই, খাওয়াদাওয়া, সিনেমা দেখা, নেশা করা ইত্যাদিতেই ডুবে রয়েছে। যদিও এরা রমার ছেলেমেয়েরই মত, কিন্তু এদের ঔদ্ধত্য, আচার-আচরণ, চালচলন ইত্যাদি নিয়ে বলতে গেলে রমাকে সবসময়ই অপমানিত হতে হয়েছে আকাশের কাছে। বুক ফাটা কষ্ট সহ্য করেও হার মানে নি, এক মনে প্রার্থনা করে গেছে ’হে ঈশ্বর, আকাশ বন্ধু সঙ্গে পড়ে ভুল পথে চলেছে, তুমি ওকে সুমতি দাও,চৈতন্য দাও – আর কিছু আমি চাই না’।  বিভাসও প্রয়োজন মত রমাকে মানসিক বল জুগিয়ে গেছে, যাতে এই কঠিন মানসিক যুদ্ধে রমা কখনও হার না মানে –  কারণ ওর হার’টা ডেকে আনবে আকাশের জীবনে চরম বিপর্যয়, শেষ করে দেবে ওদের পরিবারকে। তাই কখনও রমাকে ভেঙ্গে পরতে দেখলে বিভাস বোঝানোর চেষ্টা করেছে ’এই বয়সের ছেলেমেয়েরা   অমন একটু অবুঝের মত কাজ করে। তাছাড়া যুগটাও তো অনেকটা এগিয়ে গেছে। আমাদের সময় যারা প্রেম করত, তারা ভয়ে লুকিয়ে বেড়াত। আজকের ছেলেমেয়েরা একসাথে নির্ভয়ে যথেচ্ছ ঘুরে বেরোয়, ডেটিং করে, পাব-এ যায়, নাইট ক্লাবেও যায় আরও হয়ত কত কিছু করে যা আমাদের জানা নেই। এটাই আজকের প্রজন্মের জীবন স্রোতের গতিপথ, এর বিমুখে চলার মতো মানসিক বল কজনের থাকে ? আসলে আজকের দিনে বিনোদনের সবকিছুই এত সহজলভ্য, যে তার আকর্ষণ উপেক্ষা করা খুবই কঠিন। শুধু কি আমার আকাশ, বড়দি’র মেয়ে কি করল? কল সেন্টারে চাকরী করে এক এক দিন একেকটা ছেলের সঙ্গে বাড়ি ফিরত, আর শেষমেশ ওদের ড্রাইভারকে বিয়ে করে একবছরের মধ্যেই ডিভোর্স। আর তোমার ভাইয়ের ছেলেটাই দেখ না। বয়সে আকাশের থেকেও দু’বছরের ছোট, আর এর মধ্যেই তার এমন রণমূর্তি! মাঝে মাঝেই নাকি বাবার পকেট সাবাড় করে দেয়, মায়ের কয়েকটা গয়নাও গেছে। একবার তো বাবার সই জাল করে টাকা তুলতে গিয়ে ধরাই পরেছিল, আর গত সপ্তাহে তো টাকা না পেয়ে মাকে এমন ঠেলে ফেলে দিয়েছে যে বেচারি এখনও উঠে দাঁড়াতেই পারছে না। এছাড়া কাগজ খুললেই তো দেখা যায় রকমের খবর। তাই, এই মুহূর্তে আমাদের উতলা না হয়ে শুধু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা, আর ওকে ঠিক পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা ছাড়া অন্য কিছুই করার নেই।’

রমা আশ্বস্ত হলেও, মেনে নিতে পারে না বিভাসের যুক্তি। যুগের পরিবর্তন মেনে নিলেও আকাশের এই আকস্মিক পরিবর্তন মেনে নেওয়া তার কাছে খুবই কঠিন।  ’যুগ তো বদলাচ্ছে সময়ের সাথে,আর তাকে বদলে দিচ্ছে আজকের মানুষেরা, কিন্তু আকাশ তো আমাদের আদর্শে মানুষ তা হলে আমরা না বদলালে ও কেন বদলাবে?’ বিভাস হেসে বলে ’সত্যিই তুমি যুগের সাথে একটুও বদলাও নি। ’

~~~

আকাশের উচ্চশিক্ষা নিয়ে আজ বিভাস আর রমার সবচেয়ে বেশী চিন্তিত। ওদের সমস্ত ভালোলাগা, ভালবাসা যেমন আকাশকে ঘিরে, তেমনি সমস্ত আশা আর স্বপ্ন আকাশের পড়াশোনাকে ঘিরে।  জন্মের পর বিভাস বলেছিল ’দেখো আমাদের ছেলে লেখাপড়া শিখে এতো বড় হবে, যে ওর খ্যাতি আকাশ ছুঁয়ে যাবে।’ এই শুনে রমা তড়িঘড়ি ওর নাম ঠিক করে ফেলে ‘আকাশ’। আজ সেই আকাশেরই ঈশান কোণে কেমন যেন সিঁদুরে মেঘ দেখতে পাচ্ছে রমা –পারবে তো ও পড়াশোনাটা ঠিকমতো চালিয়ে যেতে ? শুধু তো আর ওদের স্বপ্ন নয়, ছোটবেলা থেকে আকাশকে জিজ্ঞেস করলেই মাকে জড়িয়ে ধরে বলতো ’দেখো, আমি খুব বড় বিজ্ঞানী হব, আর এমন কিছু জিনিষ আবিষ্কার করবো যা নিয়ে এখনও পর্যন্ত কোনও বিজ্ঞানী গবেষণা করেনি।’ হয়তো ওইটুকু ছেলের মুখে শোনা কথাটাকে এতটা গুরুত্ব দেওয়াটা ওদের নিছক বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়, কিন্তু সেই থেকেই বিভাস তিল তিল করে চালিয়ে গেছে অর্থ সঞ্চয় আর রমার স্বপ্নের পাহাড় ছুঁয়ে গেছে আকাশ, যার চুড়ায় পৌঁছতেই  হবে ওদের আকাশকে।

কিন্তু আজকের আকাশে ওদের সেই স্বপ্নের আলো অনেকটাই ম্রিয়মাণ। আশা নিরাশার দোলায় রমা আজ মানসিক ভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত, কিন্তু তবুও হার মানতে চায়নি ওর মন – একটাই শুধু  আশা ছিল যে বয়সের সাথে নিশ্চয় শুধরে যাবে আকাশ। কিন্তু আকাশ আর সোনিয়ার ব্যাপারটা জানার পর থেকে রমা সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পরেছে। কিছুদিন ধরেই ও লক্ষ্য করছিল যে বাড়ি থাকলে অধিকাংশ সময়টাই আকাশ কার সাথে ফোনে কথা বলে, এমনকি গভীর  রাত পর্যন্ত চলে ফোনের পর ফোন, চ্যাট ইত্যাদি। সন্দেহটা ওর কথা বলার ধরন দেখেই  মনে হচ্ছিল, কিন্তু জিজ্ঞেস করা সত্ত্বেও আকাশ উত্তর না দিয়ে শুধু বিরক্তি প্রকাশ করে যাচ্ছিল।  তবে ওদের কাজের মেয়েটা কিন্তু অনেকবার বলেছে ’দাদাবাবু আর সোনিয়া দিদিকে তো প্রায় ঘুরে বেড়াতে দেখি। সোনিয়া দিদিকে আগেও ওই বাবুয়ার সাথে ঘুরতে দেখেছি গো। বুঝতে পারছো না,ওই যে বোস বাবুর ছেলেটা যে এক কানে মোটা একটা দুল পরে সব সময়ে ভটভটিতে ঘুরে বেড়ায়। তবে ওকে অন্য আরও ছেলের সাথেও দেখেছি – আমাদের চোখ কি কেউ এড়াতে পারবে?  তা, দাদাবাবু কি সোনিয়া দিদিকে বিয়ে করবে, নাকি এমনি ঘুরে বেড়াচ্ছে? সোনিয়াদিদি তো সংসার করার মেয়ে নয় গো। আর একটা খবর দিই তোমায়, সোনিয়া দিদি মাঝে মাঝে রাত বিরেতে টলতে টলতে বাড়ি ফেরে, বিড়ি সিগারেটও খায়। এমনকি লক্ষ্মীর মা বলছিল যে ওইসবও চলে, ওই যে কি বলে চরস না গাঁজা কিসব – আমি বাবা অতশত জানি না।’ রমা কাজের মেয়েটিকে ধমকে দিয়ে বলে ’চুপ কর, তোর যত সব উল্টোপাল্টা খাস গল্প আর পরনিন্দা পরচর্চা। সারাদিন কি শুধু এই করেই বেড়াস? তোর না একটা মেয়ে আছে ?’

ব্যাপারটা কিন্তু রমাকে ভীষণ ভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। সোনিয়াকে তো অনেক আগের থেকেই চেনে রমা – ছোটো থেকেই বেশ উগ্র প্রকৃতির। আজকাল আবার তার সাজের বহর দেখলে কে বলবে যে কলেজে যাচ্ছে না ফ্যাশন র‍্যাম্পে ক্যাট ওয়াকে। এর ওপর কাজের মেয়েটার সব কথা যদি সত্যি হয়……………।’

কথাটা কি ভাবে যে বিভাসকে জানাবে বুঝতে পারে না রমা। আসলে বিভাস যে অনেক আগে থেকেই মেয়েটার চালচলন একদম পছন্দ করে না। রাস্তায় দেখতে পেলেই হয় বিরক্তিতে বলে ’মেয়েটা কেমন উদ্ধত দেখেছো, ওই একরত্তি মেয়েটা গটমট করে যাবার সময় তোমাকে শুধু হাই আন্টি বলে গেল?’ আবার কখনও মজা করে বলে ’ওই যে চলেছেন ফুলটুসি কোন ছেলের ঘার মটকাতে’।

তাছাড়াও, বিভাসকে এখন অন্য কোন কথাই বলা মুশকিল,  কারণ ও এখন সামনে আকাশের ফাইনাল পরীক্ষা নিয়ে যেমন চিন্তিত, তেমনই ভেবে অস্থির ওর উচ্চশিক্ষা নিয়ে। ওর একটাই স্বপ্ন, আকাশ আমেরিকার কোনও নামি বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা করে গবেষণামূলক কাজে যোগ দেবে। তাই, আজকাল অফিস থেকে ফিরেই সোজা ইন্টারনেটে বসে পড়ে শুরু করে আমেরিকার বিভিন্ন নামি বিশ্ববিদ্যালয়ের খবরাখবর সংগ্রহে,আর সাথে চলে টাকা পয়সার হিসেব। কখনও চেঁচিয়ে ওঠে ’এই যে, ছেলে কি শুধু আমার যে আমি একাই সব ভাববো?’ কখনও বা ’কোথায় যাও বলো তো ? এখুনি এসো, দেখো আকাশ GRE টা একটু ভাল করে দিলে ইউনিভারসিটিতে স্কলারশিপ বা অন্তত কিছুটা এইড পেয়ে যেতে পারে।’ এরপরেই শুরু হয়ে যায় টাকাপয়সার হিসাব ’আচ্ছা আমাদের পোস্ট অফিসে ঠিক কত টাকা রাখা হয়েছিল মনে আছে ? আর আমাদের ওই সোনারপুরের জমিটা বেচে কম করে কুড়ি লাখ নিশ্চয় পাব। তাছাড়া, আমার PF, Gratuity, LIC, ULIP ইত্যাদি নিয়ে আরও পঁচিশ থেকে তিরিশ তো হবেই। এর পর যা কম পরবে,বাড়িটা বন্ধক রেখে লোন নিয়ে নেব। কোন চিন্তা নেই, স্কলারশিপ না পেলেও আমি ওর আমেরিকা যাওয়ার বন্দোবস্ত করে দেব। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। তবে আকাশকেও কিন্তু ফাইনাল ইয়ারের এই একটা বছর চেপে পড়াশোনাটা করতে হবে। তুমি ওকে বলে দিও যে টাকাপয়সার চিন্তা না করে শুধু মন দিয়ে পড়তে।

কিছুক্ষণ অবাক হয়ে শোনার পর রমা বলে ওঠে ’সেকি ? সব টাকা খরচ করে দেবে ? এর ওপর আবার লোন ? আমাদের চলবে কি করে?’ ‘ওসব তোমায় ভাবতে হবে না, আমাদের তো মেডিকাল ইনস্যুরেন্স থাকবে – তা ছাড়া আর টাকার কি দরকার? খাওয়া দাওয়ার খরচ তো সুগার আর কোলেস্টেরলের দয়ায় অনেক কমেই গেছে। জামা কাপড় আমাদের যা আছে, আগামী দশ বছর না কিনলেও চলে যাবে। তেমন প্রয়োজন হলে একতলাটাও বেচে দিয়ে দোতলার ওই ঘরটায় থেকে যাব আমারা। আর তুমি এতো ভাবছ কেন বলতো? কয়েক বছর পর আকাশ যখন নাসায় যোগ দেবে, তখন তো অনেক ডলার মাইনে পাবে, তার থেকে কিছু তো পাঠাবে নিশ্চয় এই বুড়ো-বুড়িকে ?’

টানা এক সপ্তাহ ধরে চেষ্টা করেও রমা জানাতে পারেনি বিভাসকে আকাশ আর সোনিয়ার কথাটা – কি করে বলবে ? বিভাস যে এখন এক স্বপ্নের জগতে বিচরণ করছে। চিন্তায় রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে রমার –বিভাসের সারা জীবনের স্বপ্ন এবং প্রয়াস কি করে পূরণ হবে? তবে রমার স্থির বিশ্বাস যে আকাশের মধ্যে যা প্রতিভা আছে, তার পঞ্চাশ শতাংশও যদি সে দিতে পারে, তাহলে বিভাসের স্বপ্ন পূরণ হওয়া কোনও অসম্ভব নয়। কিন্তু, সাফল্যের চুড়োয় পৌঁছনোর জন্য প্রয়োজন অধ্যবসায়, আর সেইটা নিয়েই যত চিন্তা রমার। দিনের পর দিন বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে হুল্লোড়-বাজি – পড়াশোনার সময়টা পাবে কি করে? তার ওপর জুটল এই সোনিয়াটা, যার জীবন ধারণ সম্পূর্ণ বিপরীত মুখি।

আজ আর কোনও সময় নষ্ট না করে, প্রথমেই কথাটা পেরে বসেছে রমা ’একটু ঠাণ্ডা মাথায় শোনো কথাটা। তোমার ছেলে দাসগুপ্ত বাবুর মেয়ে, মানে ওই সোনিয়ার সাথে………মানে ওদের মধ্যে……………’।’কে দাসগুপ্ত ……… কোন মেয়ে……কি যে বলছ কিছুই বুঝতে পারছি না। তোমার ওইসব আষাঢ়ে গল্প রাখো তো, মেলটা চেক করে দেখি শিকাগোর ওই দুটো ইউনিভারসিটি কোনও উত্তর দিল কিনা’ রমা এবার গলা চরিয়ে বলে ’থামো, আগে আমার কথা শোনো তার পর মেল চেক করবে।  অতি কষ্টে রমা বিভাসকে বোঝায় ওদের সম্পর্কের কথা।  অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর বিভাস বলে ’তার মানে,……তুমি বলছ যে ………আমাদের ছেলে আকাশ……ওই বেশভূষাপ্রি়য় মেয়েটার সাথে…………………………….।’

গতকাল রমা যখন কথাগুলো বলছিল, বিভাস অবোধের মত তাকিয়েছিল রমার দিকে আর তারপর থেকেই একেবারে চুপ মেরে গেছে। যে মানুষটা খবরের কাগজ হাতে না পেলে ঘুম থেকেই ওঠে না,আজ রমা কাগজটা এগিয়ে দিলেও বিভাস তা না নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে যায় বারান্দার দিকে, আর সেই থেকে বসে আছে ওখানেই। সপ্তাহের এই রবিবারটা ওদের কাছে এক বিশেষ দিন। ঘুম থেকে উঠে চা খেতে খেতে কিছুক্ষণ গল্প, তারপর বিভাসের দুহাতে উপচে পড়া বাজার নিয়ে আসা। ইতিমধ্যে রমার জলখাবারের আয়োজন আর তারপর সেই স্পেশাল মেনু -লুচি আর আলুর-দম। প্রতি রবিবার ছেলে আর বাবাকে একসাথে বসে পা দোলাতে দোলাতে খেতে দেখলে রমার উৎসাহের চোটে লুচি ভাজতে ভাজতে বলতে থাকে ’ধ্যাৎ – লুচি গুলো আজ ঠিক ফুলছে না, একটু কষ্ট করে খেয়ে নাও। শোনো, তোমারা কিন্তু কথা বলতে বলতে একটু আস্তে খাও, আমি এখুনি আরো লুচি আনছি। কি হল আকাশ, সবে তো চারটে লুচি দিয়েছি, আজকে কিন্তু তোর জন্য আটটা ধরেছি আমি। এই যে, তোমাকে একটু আলুর-দম দিই? দাঁড়াও, পরের গুলো কচুরি বানাচ্ছি, আকাশ তো কচুরিটা বেশী পছন্দ করে’। আজ কিন্তু রান্না করার মত মানসিক অবস্থাই নেই রমার, তাছাড়া খাবেই বা কে ? আকাশ তো সকালেই বেড়িয়ে গেছে বন্ধুর বাড়ি যাচ্ছে বলে – কে জানে কোথায় গেছে আর এদিকে বিভাস তো কোনও কথাই বলছে না।

সারাদিন এমন বিমর্ষ হয়েই কেটেছে রমা আর বিভাসের। রমা কিছু বলতে গেলেই বিভাসের সেই এক কথা ’সাঙ্ঘাতিক ভুল পথে চলছে আমাদের ছেলে। ওর এই উৎশৃঙ্খল জীবন, তার ওপর ওই মেয়েটির সাথে অমন সম্পর্ক ওকে জীবনের মুল লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এর জন্য অনেকটা দায়ী আজকের সমাজ ব্যবস্থা, যার শিকার অনেক ছেলেমেয়ে – আর দাসগুপ্ত বাবুর মেয়ে তার জ্বলন্ত উদাহরণ। ছোট থেকে তো মেয়েটি অমন ছিল না, কিন্তু পরিবেশ এবং কিছু অসৎ সঙ্গ এবং সাথে গ্ল্যামার জগতের হাতছানি ওর এই অধঃপতনের কারণ। আসলে ইন্টারনেট, টিভি ইত্যাদির দৌলতে সারা পৃথিবীর কোন তথ্যই তো আজ আর কারোর অনধিগম্য নয়। কিন্তু আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের মানুষেরা পাশ্চাত্যের শুধু মন্দ দিকটাই অনুসরণ করে, কারণ এটাই সহজসাধ্য। তাই যখন দেশের মুমূর্ষু কোম্পানি গুলো বন্ধের মুখে, তখন ফুলে ফেঁপে উঠছে বলিয়ুড, টলিয়ুড এবং হাজারো টিভি চ্যানেলের ব্যবসা, ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা বার, পাব, নাইট ক্লাবের ব্যবসা চলছে রমরমিয়ে, কাজকর্ম-লেখাপড়া ছেড়ে ছেলেমেয়ে থেকে বুড়োবুড়ি ছুটছে রিয়ালিটি শো’তে লাখপতি বা কোটিপতি হবার আশায়। অথচ পাশ্চাত্যের ভাল দিকগুলো আমরা দেখতে পাই না। দিন কে দিন ওরা এগিয়ে চলেছে বিজ্ঞান, ক্রীড়া এবং সবকিছুতে, প্রতি বছর নোবেল পুরস্কারের প্রাপক ওইসব দেশের বিজ্ঞানীরাই আর আমরা এখনও আটকে আছি সেই রবীন্দ্রনাথ, সি ভি রামনে। তাই, আমার নিজের জীবনে যে স্বপ্ন অধরা রয়ে গেছে, তা আমি এতদিন বুকে বেঁধে একটার পর একটা দিন গুনে চলেছি শুধু আকাশের কথা ভেবে। আমার এই স্বপ্নটাই এখন আমার প্রিয় বন্ধু – আকাশ কথা না বললে, আমি ওকে নিয়েই ভাবি, ওর সাথে কথা বলি, এমনকি শুয়ে শুয়েও।’ একটু থেমে আবার ছলছল চোখে রমার হাতটা ধরে বলে ওঠে ’আমি কিন্তু ভুলতে পারব না আমার স্বপ্নকে আর  ছাড়বোও না আমার এতদিনের চেষ্টা – কারণ এত ক্ষমতার অধিকারী আকাশের প্রতিভাকে আমি এভাবে শেষ হতে দিতে পারি না। আমি দেখে যেতে চাই আমার জীবনের অপূর্ণ আশার পূর্ণ বিকাশ ঘটেছে আমাদের ছেলের মধ্য দিয়ে।’

দেখো রমা, সোনিয়া যে আমাদের পছন্দের বিপরীত চরিত্র সেটাই আমাদের আপত্তির কথা নয়, যেটা সবথেকে বেশী করে আমাদের ভাবাচ্ছে সেটা ওর জীবনধারা এবং জীবনের লক্ষ্য যা আমাদের আকাশের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আজ আকাশ আপাত: দৃষ্টিতে যতই উৎশৃঙ্খল হোক, ওর জীবনের পছন্দ এবং লক্ষ্য অনেক আগেই গড়ে গেছে আর আকাশ যদি ভবিষ্যতে ওর লক্ষ্য অর্জনে সফল না হয়, তবে ওর মত অসুখী আর আর কেউ হবে না। জীবনে এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আকাশের এমন অর্বাচীন সিদ্ধান্ত ওর প্রতিভাকে ধূলিসাৎ করে দেবে, যা ভবিষ্যতে ওর উচ্চাশাকে নামিয়ে আনবে ওই মেয়েটির ভালোলাগার দুনিয়ায়, অথবা ওর জীবনটাকে ভরিয়ে দেবে নৈরাশ্যে। ভবিষ্যতে যখন দেখবে যে ওরই বন্ধুরা সকলে পৌঁছে গেছে সাফল্যের চুড়ায় এবং সাথে রয়েছে তাদের সমযোগ্যতা সম্পন্ন জীবন সঙ্গিনীরা, তখন ওর অবস্থাটা কি হবে বুঝতে পারছ?  বাবা, মা হিসেবে আমাদের দায়িত্ব আমাদের ছেলেকে সঠিক পথ দেখানো, আর সেই চেষ্টাই আমাদের আজীবন চালিয়ে যেতে হবে।

~~~

কোনও এক অশুভ শক্তির প্রভাব সব কিছুই বদলে দিয়েছে ওদের জীবনে। একই সুরে বাঁধা ওদের জীবনে সুর, তাল ও ছন্দ সবই কেটে গেছে, গুঁড়িয়ে গিয়েছে একমাত্র সন্তানের কাছে ওদের প্রত্যাশার পাহাড়, আর ভুলিয়ে দিয়েছে ওদের ভবিষ্যতে বেঁচে থাকার অর্থ। একসময় সারা বাড়ি মাত করে খেলে বেরানো আকাশকে আজকাল আর বাড়িতেই দেখাই যায় না, রমারও সেই প্রাণবন্ত হাসিও মিলিয়ে গেছে এক অজানা দুশ্চিন্তায়, আর বিভাসের রসিকতা পরিণত হয়েছে প্রহসনে। যে রমা আকাশের স্কুল জীবনে সারাটা দিন ডুবে থাকত ওর পড়ার চিন্তায়, সেই আকাশকে আজ উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরে বেড়াতে, আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা সোনিয়ার সাথে ফোন বা চ্যাট করতে দেখলে শিউরে ওঠে – এতো কম পড়াশোনা করে তো লক্ষ্যের ধারে কাছেও পৌঁছতে পারবে না আকাশ।  সোনিয়ার কথা মনে পড়লেই একটা অজানা আতঙ্ক জড়িয়ে ধরে ওকে –  অমন একটা অন্তঃসারশূন্য লাস্যময়ী মেয়ের সাথে তাদের ছেলের কি ভাবে ঘটবে পবিত্র মিলন। কিছুদিন পর যখন সোনিয়ার কৃত্রিম রূপের আকর্ষণ যখন কমে আসবে এবং আকাশও বুঝতে পারবে যে ওর সাধের স্বপ্নগুলোকে অবলীলায় দুপায়ে দলিয়ে বেরিয়েছে শুধু সোনিয়ার জন্য, সেদিন কি পারবে আকাশ সোনিয়াকে বা নিজেকে ক্ষমা করতে ?

আজ আকাশের ইঞ্জিনিয়ারিং ফাইনাল পরীক্ষার ফলাফল, তাই বিভাস আর রমা সব দুঃখ ভুলে সকাল থেকেই আনন্দ সংবাদের অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। ঘুম থেকে তাড়াতাড়ি উঠেই শুরু হয়ে গেছে রমার ঠাকুর পুজো। বিভাস আগে থেকেই প্ল্যান করে রেখেছিল যে আজ ওরা তিনজন একসাথে কাটাবে, রেস্তরাঁয় খাবে। আকাশ কিন্তু সকাল থেকেই খুব চিন্তিত। মাঝে মাঝে বাবা, মায়ের কাছে এসে বসছে,এমনকি বহুদিন পর আজ মায়ের কোলে মাথা রেখে বেশ কিছুক্ষণ শুয়েছিল, কিন্তু ফোনটা আসতেই উঠে পড়লো – নিশ্চয় ওই মেয়েটার হবে।

প্রায় তিনঘণ্টা হতে চলল, কোনও খবর নেই আকাশের। বিভাসের পায়চারী বেড়ে চলেছে, রমা ঠাকুরঘরে ঘড়ির দেখে চেয়ে। মনে হচ্ছে এই বোধ হয় ফোনটা বেজে উঠে ভেসে আসবে আকাশের গলা ’মা, মা, আমি এবারও…………।’

না, প্রায় তিন ঘণ্টা হল, কোনও ফোন নেই আকাশের। দরজায় বেল বেজে উঠতেই, রমা তড়িঘড়ি এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দেখে আকাশের সাথে সোনিয়া। আকাশ মাথা নিচু করে ঘরে ঢোকার সময় সোনিয়া বলে ওঠে ’তোমাকে বলেছি না যে তুমি ওইরকম ভাবে থাকবে না? মন খারাপ করার মত কি হয়েছে? ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে গেলে – আর কি চাই? এরপর একটা ভাল চাকরী নিশ্চয় পেয়ে যাবে।’ রমার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে ’দেখুন না, কফি শপে বসে কত বোঝালাম, কিন্তু কেবল একই কথা – বাবা, মা’র স্বপ্ন ফার্স্ট ক্লাস পাব, আমেরিকা যাব, গবেষণা করব, কিন্তু এই রেজাল্ট দিয়ে তো কিছুই হবে না।’ আর আপনাদের অমন আকাশ কুসুম কল্পনা করার কি যে দরকার বুঝি না। কোথায় পাশ করার আনন্দে খুশী হবেন, তা নয় ছেলেকে বুড়ো বয়স পর্যন্ত পড়ানোর পরিকল্পনা। আমি দেখেই বুঝতে পারছি যে আপনাদের ভীষণ ভয় পাচ্ছে, তাই বাধ্য হয়ে আমি ওকে নিয়ে এলাম। আমি ওকে ভালোভাবেই চিনি যে আপনারা যদি এই ব্যাপারে আর কিছু বলেন, ও কিন্তু  ভীষণ কষ্ট পাবে।’

এতক্ষণ দূরে দাঁড়িয়ে ওদের কথোপকথন শোনার পর এগিয়ে বলতে শুরু করে বিভাস ’তুমি তো দাসগুপ্ত বাবুর মেয়ে, মনে আছে তোমার ছোটবেলায় আমরা তোমাদের বাড়ি গেলে তুমি প্রথমে এগিয়ে এসে আমাদের প্রণাম করতে, আর আমি পকেট থেকে চকোলেট বের করে দিলেই আনন্দে নাচতে নাচতে বাবা-মা’কে গিয়ে দেখাতে ? তোমার বাবা-মা আমাদেরকে পেলে  এতই খুশী হতেন যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প চলত আমাদের মধ্যে। এখন তো অনেক বড় হয়ে গিয়েছ তুমি আর সাথে সাথে ওইসব প্রণাম করার রীতি তোমার কাছে হয়তো সেকেলে মনে হয় – তবে আমার ধারনা গুরুজনদের সাথে কথা বলার সময় সৌজন্যবোধ কিন্তু কালের সাথে বদলায় না। একটু আগে তুমি বলছিলে যে তুমি আকাশকে ভালভাবে চেনো, সেটা মেনে নিলেও আমার ধারনা তুমি অবশ্যই জানো না আকাশকে -কারণ দুটোর মধ্যে ফারাক অনেক। সেইজন্য তোমার মতে যেটা আমাদের প্রতি আকাশের ভয়, সেটা আসলে ওর স্বপ্নভঙ্গের জ্বালা বা ব্যর্থতার গ্লানি, যা বোঝার জন্য শুধু একটা মানুষকে চেনাই সব নয়, তাকে ভালভাবে জানার প্রয়োজন অনেক বেশী। তুমি হয়তো জান না যে পড়াশোনার জন্য প্রয়োজন মনের ক্ষুধা এবং তার সাথে বয়সের কোনও সম্পর্ক নেই। শরীরের বয়স বাড়ার সাথে মানুষ বুড়ো হয়ে জৌলুশ হারায়, আর সেটাই হয়তো তোমার বেশী চিন্তার কারণ। তবে ছেলেকে আদর এবং শাসন করা আমাদের কর্তব্য, আর সেটার ভাল-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা বাবা-মা হিসেবে আমাদের আছে। অনেক রাত হয়ে গেছে, তোমার বাবা-মা নিশ্চয় তোমার অপেক্ষায় আছেন – তুমি এখন বাড়ি যাও।’

সেদিন বিভাসের কথায় সোনিয়ার চাপা রাগটা বেড়িয়ে এসেছিল ওর ভঙ্গিমায়, কিন্তু আকাশের ইশারায় বিভাসের মুখের ওপর কোনও কথা বলেনি, তবে শুধু বলতে বলতে বেড়িয়ে যায় ‘এইজন্যই আসতে চাই না এই বাড়িতে, আর আসবও না কখনও।‘

~~~

শেষ পর্যন্ত আমেরিকার একটা সাধারণ ইউনিভারসিটিতে আকাশের ভর্তির আবেদন গ্রাহ্য হয়েছে, তবে স্কলারশিপ কিছু পায়নি। নামি ইনভারসিটি গুলো সোজা ‘না’ বলে দিয়েছে। টাকার চিন্তায় বিভাসের মাথায় বাজ পড়ার মতো অবস্থা – একে তো এদের পড়ার খরচ খুবই বেশী, তার ওপর ডলারের দাম বেড়েছে হুরহুর করে, এছাড়া যাতায়াত, খাওয়া ইত্যাদির খরচ। নামি ইনভারসিটি নয় বলে একটু মনটা খুঁতখুঁত করলেও বিভাস বলে দিয়েছে ‘আমি কোনোমতেই আকাশের পড়াশোনা এখানেই শেষ হতে দেব না। যেমন করেই হোক, আমি আকাশকে কে মাস্টার্স করতে আমেরিকা পাঠাবোই, আর তারপর Ph.D.।

শুরু হয়ে গেছে টাকা-পয়সার চূড়ান্ত হিসাব। নিরুপায় হয়ে রমার গয়না ছাড়াও ওদের সাধের বাড়িটার মায়াও ছাড়তে হয়েছে। এরই মধ্যে সোনিয়ার বাবা-মা বেঁকে বসেছেন ওদের বিয়েটা আকাশ আমেরিকা যাবার আগেই দেবার জন্য। এত অল্প সময়ে বিয়ের আয়োজন এবং সাথে আরও অনেক টাকার প্রয়োজন বিভাসের চিন্তার মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে আরও কয়েকগুন। একে তো সুগারের অত্যাচার, সাথে একের পর এক বিনিদ্র রজনী বিভাসকে একলাফে অনেকটা বয়স বাড়িয়ে দিয়েছে।

~~~

বিয়েটা যদিও মিটে গেছে, অশান্তির সূত্রপাত কিন্তু তখন থেকেই শুরু। রমার পছন্দ করা বেনারসি, রুপোর মুকুট বা গয়না – কোনোটাই সোনিয়া পরতে রাজি হয় নি, এমন কি বিয়ের চিরাচরিত আচার পালনেও ওর আপত্তি এবং তার জের ধরেই রমাকে অপমানজনক মন্তব্য। এছাড়া রোজই প্রায় চলেছে কিছু না কিছু নিয়ে মতানৈক্য – যেমন বিয়ের পরই প্যান্টশার্ট পরে বেরনো, উগ্র সাজ, বেশী রাত করে বাড়ি ফেরা, ঠাকুর প্রণাম না করা, সারাদিন ফোনের পর ফোনে গল্প করা ইত্যাদি।

~~~

আজ আকাশের আমেরিকা যাত্রা। সব ঠিকমতো চললে, ছ’মাসের মধ্যে সোনিয়াও চলে যাবে আমেরিকায়। রাত্রে ফ্লাইট, কিন্তু বিভাস তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে পরে কেমন অদ্ভুত আচরণ করছে। সুটকেস বারবার খুলছে আর চেঁচিয়ে উঠছে ‘কি গুছিয়েটা কি, কফি মাগটা কোথায় গেল? কালকেই তো নেল কাটার ঢোকালাম………। সেভিং সেটটা আমি আমিতো বড় ব্যাগে রেখেছিলাম, হ্যান্ডব্যাগে কে ঢোকালো ? দেখেছ, আচারটা কেউ এখানে রাখে, ফেটে গিয়ে জামা কাপড় গুলো যাবে তো ? আচ্ছা ভাল চিরুনিটা দেওয়া হয়েছিল? আমি বরং আকাশের জামা-প্যান্টগুলো একটু প্রেস করে দিই।’ রমার অন্যদিকে মন দেবার উপায় নেই, কারণ সকাল থেকেই নানান রান্নায় ব্যস্ত। আকাশ আর সোনিয়া এখনও ঘুমিয়েই চলেছে।

ঘুম থেকে উঠেই সোনিয়া চলে গেল বাপের বাড়ি। রমা আজ আকাশের সমস্ত প্রিয় খাবার রেঁধেছে, কিন্তু ফোন করা সত্ত্বেও সোনিয়া দুপুরে খেতে আসেনি। তাই রমা আজ নিজের হাতে আকাশকে খাইয়ে দিয়েছে, ঠিক যেমন ছোটবেলায় করতো। তারপর অনেকক্ষণ মাথায় হাত বুলিয়ে দুপুরে ঘুম পাড়িয়েছে।

সন্ধ্যে হয়ে গেছে, সোনিয়ার এখনও দেখা নেই। আকাশের বেরনোর সময় হয়ে এল, রমা আর বিভাসও জামাকাপড় পরে রেডি। আকাশ ফোন করেই চলেছে সোনিয়াকে, কিন্তু এখনও দেখা নেই তার। অবশেষে বেল শুনে রমা দরজা খুলতেই সোনিয়া বলে ওঠে ‘মালপত্র নিয়ে বেড়িয়ে এসো, আমি নীচে গাড়িতে অপেক্ষা করছি।’ রমা বুঝতে পেরে বিভাসকে বুঝিয়ে বলে ‘অনেক রাত হয়ে গেছে, আর এয়ারপোর্ট গেলে আমাদের আরও বেশী মন খারাপ হবে।  আমাদের আরও বেড়িয়ে কাজ নেই, আমরা বরং ওকে বাড়ি থেকেই টাটা করে দেব।’

সারারাত ধরে বিভাস আর রমা বসে ভেবেছে ‘সত্যি তাহলে আমাদের ছেলে আমেরিকা পড়তে গেল ? দেখো, ওখানে গিয়ে একদম বদলে যাবে আকাশ। শুধু পড়াশোনার মধ্যেই ডুবে থাকবে যেমন ছিল ছোটবেলায়। এই শোনো না, তোমার মনে পরে ছোটবেলায় ছেলে কেমন বলতো ‘বড় হয়ে আমি যখন মস্ত বিজ্ঞানী হব আর দেশ বিদেশ যাব পুরস্কার নিতে, তোমরা কিন্তু সবসময় আমার সাথে থাকবে। ও যখন খুব ছোট্ট, আমি একদিন আইনস্টাইনের গল্প বলেছিলাম আর তারপর থেকেই ওনার এতটাই পরম ভক্ত যে ছবি দেখলেই কেমন পাগলের মত করতো। তোমার মনে আছে স্কুলের বিজ্ঞান মেলায় একটা পুরষ্কার পাবার পর কেমন পাগলামি করেছিল – আমিও গবেষণা করে আইনস্টাইনের মত হব। এই তো সবে যাচ্ছে আমেরিকায়, কয়েকটা বছর গেলেই তো শুরু হবে ওর Ph.D., তারপর নাসায় ঢুকলে কিন্তু আমরাও যাব ওর কাছে।’ রমা এতক্ষণ উদাস মনে জানালার বাইরে আকাশের দিকে চেয়েছিল। ‘দেখো, আকাশটা কেমন লাগছে, একটাও তারা নেই, এইদিকে কেমন কালো মেঘ আর ওই দিকটা লাল হয়ে গেছে। কে জানে, আকাশের ঠিক কোথা দিয়ে এখন ভেসে চলেছে আমাদের ছেলেটা, জানিনা আবার কবে দেখবো ওকে। আচ্ছা, মানুষ দূরে চলে গেলে মনটাও কি সাথে সাথে দূরে চলে যায় ?’

এতক্ষণে নিশ্চয় পৌঁছে গেছে আকাশ, কিন্তু এখনও কোনও খবর নেই। বিভাস আর রমা চিন্তায় ছটফট করতে করতে শেষে দাসগুপ্তবাবুকে ফোন করে জানতে পারে যে আকাশ ঠিক সময়েই পৌঁছেছে। অনেকটা নিশ্চিন্ত বোধ করলেও অভিমানে ভেঙ্গে পরে রমা ‘ও বাড়িতে খবর দিতে পারলো, আর নিজের বাবা-মা এতটাই পর হয়ে গেল ওর কাছে?’

~~~

প্রথম দিকে তবুও সপ্তাহে একবার ফোন পাওয়া যেত আকাশের কাছ থেকে আর শুরু হয়ে যেত ওদের প্রশ্নের পর প্রশ্ন ‘হ্যাঁরে, রান্না ঠিকমতো করছিস তো? ভাতটা গলে যাচ্ছে নাতো – তুই তো গলা ভাত খেতেই পারিস না। কি কি মাছ পাচ্ছিস ওখানে ? রুটি বেলতে পারছিস এখন? বেশী রাত করে পড়বি না কিন্তু, শরীরটা ঠিক রাখতে হবে। সোয়েটার, মাফলার সব পড়ছিস তো, অতো ঠাণ্ডা তোর কিন্তু অভ্যাস নেই। রাস্তাঘাট দেখেশুনে চলবি, ওখানে যা স্পিডে গাড়ি চলে। সন্ধে বেলায় বাড়ি থেকে বেরোবি না, শুনেছি ছিনতাই হয় ওখানে।’ শেষপর্যন্ত ফোনের বিলের কথা ভেবে আকাশই ফোনটা ছাড়তে বলে।

আজ প্রায় একমাস হতে চলল সোনিয়া চলে গেছে আকাশের ওখানে। আকাশই ওর জন্য একটা ফ্যাশন ডিজাইনের কোর্সের ব্যবস্থা করেছে। সোনিয়া পৌঁছনোর পর সেই একবারই ফোন করেছিল আকাশ – তারপর আর কোন খবর নেই। রমা ফোন করে আকাশ এবং সোনিয়ার মোবাইলে, কিন্তু কখনই পাওয়া যায় না – হয়তো দুজনেই ভীষণ ব্যস্ত, তাছাড়া সময়ের পার্থক্য তো আছেই। আজকাল ঘণ্টার পর ঘণ্টা জানলায় দিয়ে আকাশের তারা গুলোর দিকে চেয়ে ভাবে এখন তো সকাল ওদের, যদি একবার আমাদেরকে মনে পরে একটা ফোনে করে – কতদিন শুনিনি ওর গলাটা।

এখন তো ওদের রবিবারের সকাল, যেভাবেই হোক কথা আজ বলতেই হবে আকাশের সাথে। ‘দেখো, আজ আমি ফোন করেই যাব যতক্ষণ না ও ধরছে’ বোলে একের পর এক ডায়াল করতে থাকে রমা, শেষমেশ ওপাশ থেকে ভেসে আসে ‘হ্যালো, কি ব্যাপার এতবার ফোন করছ কেন ?’ রমা একটু চুপ থেকে বলে ওঠে ‘তোদের খুব কি অসুবিধে করলাম বাবা? আসলে দিনের পর দিন কোন খবর না পেয়ে আমি আর তোর বাবা যে চিন্তায় আধমরা হয়ে যাচ্ছি সেটা কি একটুও  ভেবে দেখেছিস? ফোনের পর ফোন করছি, কিন্তু তোরা ফোনে ধরিস না, বেশী ফোন করলেও বিরক্ত হচ্ছিস, তোদের কি ইচ্ছে করে না আমাদের খবর নিতে? জানিস কি চিন্তায় চিন্তায় বাবার সুগারটা ভীষণ বেড়ে গেছে, আর বাতের ব্যথাটা ক্রমশই বেড়ে চলেছে……………।’ আকাশ উত্তর দেয় ‘ও তাই, ডাক্তার দেখিয়েছ? ঠিকমত ওষুধ খেয়ো। আমাদের খবর ভালই। সোনিয়ার ফ্যাশন ডিজাইনের ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। ওর টিচাররা বলেছে ওর নাকি ফ্যাশনে দারুণ কনসেপ্ট………………।’ রমা একটুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলে ‘আমাদের তো বয়স হচ্ছে আর শরীরটাও ভাল যাচ্ছে না, তাই তোর সাথে একটু কথা বলতে পেলে মনে একটু জোর পাই – মনে হয় আমাদের পাশে তুই আছিস। তাছাড়া, তোদের জন্য তো ভীষণ চিন্তা হয় – এতো দূরে রয়েছিস।  সপ্তাহে অন্তত একবার যদি একটু সময় করে ফোন করিস ………।’ শুনে আকাশের তড়িঘড়ি বলে ওঠে ‘না না, তোমাদের এতো চিন্তা করার দরকার নেই – আমরা ভালই আছি। এখানে এতো ব্যস্ততায় দিন কাটে আমাদের –  এরপর দুজনের রান্না-খাওয়ার ব্যবস্থা, ঘর সামলানো – আসলে সোনিয়া তো একদমই সময় পায় না। তুমি যদি আমাদেরকে ফোনে না পাও সোনিয়ার বাড়িতে ফোন করলেও আমাদের খবর পেয়ে যাবে।’ শুনে রমার মনে হচ্ছিল যে গলা দিয়ে বোধ হয় আর আওয়াজই বেরবে না। কোনোমতে বলে ‘আচ্ছা বাবা, ভালো থাকিস, সাবধানে থাকিস আর সোনিয়াকে আমাদের ভালবাসা দিস’।

~~~

ক্রমশ একটা প্রকাণ্ড শূন্যতা ঘিরে ধরেছে রমাকে। একটা হাহাকার যেন সারাক্ষণ তাড়িয়ে বেরায় ওকে। কোন কাজেই আর উৎসাহ পায় না। সাধের রান্না ঘর, যেখানে একসময় একের পর এক মুখরোচক রান্না করে তাক লাগিয়ে দিত বিভাসকে সেটা আজ শ্মশানের সমান। ভোরবেলায় উঠে স্নান সেরে প্রদীপ জ্বালিয়ে ঠাকুরের পুজো আর তারপর সারা বাড়িতে ধুপ দেখানো আজ আর ভাল লাগে না রমার। তেমনি ভাল লাগে টিভি দেখতে, ভাল শাড়ি পরতে, কারও বাড়ি যেতে। অনেকভাবে চেষ্টা করে মনকে বোঝানোর, কিন্তু মানতে চায় না ওর মন। সারাটাদিন সে জানালার পাশে বিবশ হয়ে বসে থাকে, ধীরে ধীরে দুচোখ বেয়ে নেমে আসে জলের ধারা। রমাকে এই অবস্থায় দেখলে, বিভাস বলে ওঠে ‘আজ আবার তোমার চোখে জল? কেন বল তো, কসের এতো দুঃখ তোমার? আমাদের ছেলে তো ভালই আছে, গুণবতী সুন্দরী বউকে নিয়ে তো আনন্দেই আছে – ছেলে জখন ভাল আছে, তা’হলে তোমার এতো দুঃখ কিসের? এমন ভেঙ্গে পড়লে বাকি জীবনটা কাটবে কিভাবে আমাদের?’ রমা আর সামলাতে না পেরে বিভাসকে ধরে ফুঁপিয়ে ওঠে। ‘না, তোমাকে নিয়ে যে কি করি? চল আমরা বরং ছবি দেখি।’ বিভাস বের করে আনে তার এ্যালবামের বাণ্ডিল যা ওদের বিয়ের পর থেকে ক্রমানুযায়ী সযত্নে সাজিয়ে রেখেছে বিভাস। একটা পর একটা ছবি উল্টোয়, আর মনে পরে যায় নানান ঘটনা। এ্যালবাম গুলোর ভাঁজে ভাঁজে যেন লুকিয়ে আছে ওদের পেরিয়ে আসা এক একটা সোনালি দিন, আর এক একটা ছবি যেন এক একটা ঘটনার সাক্ষ্য। ছবিগুলো দেখতে দেখতে রমার মনটা শরতের মেঘে মত ভাসতে ভাসতে চলে যায় ওই আনন্দঘন দিনগুলোতে, মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় ছবির সাথে আর শুরু হয়ে নানান মজার কথা ‘এই দেখো তোমার কোলে চেপে কেমন হাসছে। এখানে দেখেছ কি সুন্দর লাগছে কৃষ্ণ-ঠাকুরের ড্রেসটা পরে। এইটা দেখো, পুলিসের ড্রেস পরে কেমন গম্ভীর স্টাইলে দাঁড়িয়েছে। এমা, সমুদ্র দেখে কেমন ভয়ে কাঁদছে দেখো। এটা তো সেই জন্মদিনের ছবি, সাত বছর, না না আট হবে মনে হয়।……………………।’ কলিং বেলটা বেজে উঠতেই খেয়াল হয়, ‘সেকি বিকেল চারটে? আমাদের তো খাওয়াই হয় নি। লক্ষ্মীর মা এস গেল মনে হয়। রবিবার তো আসা মাত্র যাবার জন্য লাফালাফি করবে।’

~~~

দেখতে দেখতে বিভাসের চাকরি জীবনের অন্তিম দিন আজ। গত একমাস ধরেই বিভাসকে ভীষণ বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। মুখে যদিও বলছে যে আর কাজ করতে ভাল লাগে না, কিন্তু দেখে বেশ অস্থির মনে হচ্ছে। আসলে কাজ ছাড়া সারাটাদিন কাটানো ওর মত লোকের কাছে শাস্তির সমান। রমা বলেছে ‘দেখো, চেষ্টা করলে নিশ্চয় কোন পার্ট টাইম কাজ পেয়ে যাবে’।

আজ তো সোমবার সকাল, মানে আকাশের রবিবার সন্ধ্যে। গত সপ্তাহেই রমা আকাশকে জানিয়েছে যে আজ বিভাসের চাকরী থেকে অবসর গ্রহনের শেষ দিন। তাই সকাল থেকেই রমা আশায় আছে যে আজকের দিনটায় আকাশ নিশ্চয় নিজে থেকে ফোন করবে। সকাল থেকেই বিভাস একটু অন্যমনস্ক। স্নান করে জামা প্যান্ট রেডি অফিস যাবার জন্য, আজকের দিনটা অফিসে দেরী করতে চায় না। এদিকে রমা চেষ্টা করে আরেকটু অপেক্ষা করতে, কারণ আকাশের  ফোনটা পেলে যদি বিভাসের মনটা একটু ভাল হয়।

না, এমন একটা বিষাদের দিনেও ফোনটা আসে নি আকাশের কাছ থেকে। বিকেলে অফিসের সমস্ত স্টাফেরা মিলে বিভাসকে নিয়ে আসে বাড়িতে। এক এক করে প্রত্যেকেই প্রশংসা করেছেন বিভাসের কাজের, ওর সততার এবং একনিষ্ঠতার। ওনারা সকলেই আশ্বাস দিয়েছেন যে কোন রকম প্রয়োজনে ওনাদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য।

অবসরের সাথে সাথে শুরু হয়ে গেছে শরীরের নানাপ্রকার জটিলতা – একটা রোগ সারার আগে আরও দুটো চেপে ধরে। টাকাপয়সার অভাবটাও ক্রমশ চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। জীবনটাকে বয়ে নিয়ে বেরানোর আজ আর কোন উদ্দেশ্যই নেই। আকাশের খবর বলতে মাসে ওই বড়জোর একটা ফোন, আর বেশীরভাগটাই সোনিয়ার ফ্যাশন ডিজাইনের কথা। জীবনটা যেন গতিহীন ডোবায় ভেসে বেরানো পরিত্যক্ত এক মূল্যহীন পদার্থ।

~~~

আজ একবছর পূর্ণ হল বিভাসের অবসর জীবনের। কাজ ছাড়াও যে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে, তা আর বিশ্বাস করতে অসুবিধে নেই বিভাসের। এই একবছর বাড়িতে বসে রমার মুখে ওই একটা কথাই শুনে চলেছে বিভাস ’কেন এমন হল বল তো আমাদের?’ দিনের পর দিন এই একই আলোচনার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বিভাস আজ বাড়িতে ছোট্ট একটা ঘরোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে – না জন্মদিন বা বিবাহ বার্ষিকী নয়, আজকের অনুষ্ঠান হচ্ছে তার অবসরের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে। নিমন্ত্রিত কেবল বিভাস আর রমার দাদা, বৌদি, দিদি, জামাইবাবুরা। সকালে উঠে রমা করুণ মুখে ওই একই কথা পারতেই বিভাস তৎক্ষণাৎ বলে ওঠে ’আজ আর ওই সব কোনও কথা নয়, আজ আমরা জমিয়ে আড্ডা মারব দাদা, বউদিদের সাথে। তুমি তাড়াতাড়ি ঘরদোর গুলো একটু ঠিকঠাক করে নিও, ওদেরকে বলা আছে তাড়াতাড়ি চলে আসতে। লক্ষ্মীর মাকে বল তোমাকে একটু সাহায্য করার জন্য। আমি বেড়িয়ে মিষ্টি আর কোল্ড ড্রিঙ্কটা নিয়ে আসব। মলয় বলেছে সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ খাবার সাপ্লাই করে দেবে।’

অনেকদিন পর মনে হচ্ছে বাড়ির আবহাওয়াটা একটু যেন বদলেছে। কতদিন পর বিভাস আর রমা আজ একটু গলা ছেড়ে কথা বলছে দাদাদের সাথে, মজার কথা হলে হাসতেও দেখা যাচ্ছে রমাকে। না, তাহলে ওরা এখনও কথা বলতে ভুলে যায় নি। একটা শেষ হতে না হতে আরেকটার শুরু – কখনও দিদির মেয়ে কিভাবে কিভাবে বরের পকেট থেকে টাকা সরিয়ে গয়না কেনা,  কখনও দাদা কিভাবে বাড়ির কেয়ারটেকারের চুরি ধরে ফেলে, কখনও বৌদি কিভাবে গড়িয়াহাটের দোকানে দরাদরি করে, অথবা সুগারের রুগী জামাইবাবু কি করে লুকিয়ে মিষ্টি খায় ইত্যাদি। গল্প যেন আর শেষই হয় না, আর সাথে চলে হাসির ফোয়ারা। রমার এক রাউন্ড কোল্ড ড্রিঙ্কের পর দু’রাউন্ড চা হয়ে গেছে, আর সাথে সিঙ্গারা, কুচো নিমকি, নোনতা বিস্কুট।

এবার রমার দাদা শুরু করে ছেলে, বউয়ের কথা। ছেলে কেমন বাবা, মার জন্য সবচেয়ে দামি মেডিকাল ইন্স্যুরান্স করে দিয়েছে, বউমা কেমন মাত্র তিন বছরের মধ্যে ডক্টরেট শেষ করে ফেলেছে। বিভাসের দিদিও শুরু করে কেমন ভাবে ছেলেমেয়ের বিয়ের জন্য পাত্র পাত্রী পছন্দ করেছিলেন, ছেলের বউ তাকে কতটা মান্য করে। আর বিভাসের দাদা তো ছেলে বলতে অজ্ঞান –অস্ট্রেলিয়ার ভাল চাকরীটা পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছে তাদের কথা ভেবে। শুনতে শুনতে রমা একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল, মনে পরে যাচ্ছিল আকাশের স্কুলে পড়ার সময়ের দিনগুলো। হয়তো একটু বেশীই শাসন করেছিল, কিন্তু সেটা তো ওর ভালোর জন্যই করেছিল। কখনও যদি পড়তে বসে পিঠে দু’এক ঘা চরিয়েছে, তার আঘাতের একশো গুন কষ্ট নিজে পেয়েছে রমা।

হঠাৎ দাদার কথায় রমার মুখটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে যায় ’হ্যাঁরে, বিভাস যে বলল আকাশ আর সোনাই তোদেরকে আমেরিকা নিয়ে যাওয়ার জন্য পাগল করে মারছে, তা কবে যাবি ঠিক করলি? দেরী করছিস কেন, ওরা যখন এতই চাইছে তাড়াতাড়ি গিয়ে ঘুরে আয়।’ কথা গুলো যেন শুলের মত বেঁধে রমার গলায়। কি জবাব দেবে ভেবে পায় না। সমস্ত রাগটা গিয়ে পরে বিভাসের ওপর, কি দরকার অযথা মিথ্যে করে এসব বলে বেরোনোর ? কোনরকমে নিজেকে সামলে বলে ’হ্যাঁ, দেখি কি হয়। আসলের ওর শরীরটাও তো ভাল নেই, তাই ঠিক সাহস হয় না অতটা দূরে যেতে’।

~~~

প্রত্যেক রবিবারের মত, আজ সকাল থেকে বিভাস আর রমা অপেক্ষা করে আছে যদি একটা ফোন আসে। এবার প্রায় দুমাসের ওপর হলো ওর গলাটাও শুনতে পায়নি। যদিও ফেসবুকে দু’একবার  কিছু লেখালেখি হয়েছে বা ওদের কিছু ছবিও দেখা গেছে, কিন্তু কথা বলার সাধ কি আর তাতে মেটে ? হতে পারে খুবই ব্যস্ত, কিন্তু অন্য সবকিছুই তো নিয়ম মাফিক চলছে – শুধু কটা কথা বলতেই এত ব্যস্ততা? আর সোনাই বা কি করে সারাদিন যে একবারও ফোন করতে পারে না, অথচ নিজের বাড়িতে তো ঠিকই ফোন চলছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাজগোজ, ঘুরে বেরানো, – কোন কিছুই তো থেমে নেই ?’

বিভাস আবার বোঝায় রমাকে ’দেখো, ওদের চিন্তাধারা, জীবন যাপন, ভালোলাগা এবং ভালবাসা আমাদের থেকে থেকে অনেক তফাৎ। আর জেনারেশন গ্যাপটা তো মানতেই হবে, তাছাড়া ওরা থাকেও এমন এক দেশে যেখানে মানুষ নিজেকে ছাড়া বোধহয় আর কাউকেই ভালবাসে না।’

তুমি যতই অজুহাত দেখাও, আমি কিন্তু এটা কিছুতেই মানতে পারিনা। যে আকাশকে আমরা সমস্ত ভালবাসা উজাড় করে দিয়েছি, যার জন্য আমরা জীবনে হয়তো অনেক সুখ, বিলাস ত্যাগ করেছি, তার কাছেই আজ আমাদের কোনও মূল্য নেই ? বলতে পার, কেন আমি সারাটা জীবন নিজে কিছু না করে শুধুমাত্র ওকে মানুষ করে কাটালাম ? কেনই বা আমারা ওর পড়াশোনার জন্য বছরে দুবার করে বেড়াতে যেতে পারলাম না ? বাড়িতে কাউকে ডাকতে ভয় পেতাম, যদি আকাশের পড়ার ক্ষতি হয় ?  আশপাশে সবাই যখন আনন্দ করত, আমি ডুবে থাকতাম আকাশের পড়ার চিন্তায়। বিয়ের পর থেকে সারা জীবনে কটা সিনেমা দেখেছি তা আমি হাতে গুনে বলতে পারি। কেন করলে সারা জীবন ধরে তিল তিল করে সঞ্চয়? আমাদের কি ক্ষমতা ছিলনা সপ্তাহে একদিন করে পার্ক স্ট্রীটের রেস্তরাঁয় খাওয়া, পুজোয় দামি শাড়ি-গয়না কেনার বা দামি কোন গাড়ি কেনার ?

ঠিক মনে করে দিয়েছ। এই, চল আমরা একটা সিনেমা দেখে আসি। টিভিতে একটু দেখাচ্ছিল একটা দারুণ হাসির ছবি এসেছে – আমারা ওটাই দেখতে যাব। হাঁসি ছাড়া অন্য কোন রকম সিনেমা আর ভাল লাগে না। কতবছর যে হল বসে সিনেমা দেখিনি, আর মন খুলে হাসিনি……  এই শোনো, এক ঠোঙ্গা চীনেবাদাম নিয়ে যাব কিন্তু। থামো তো  – যত আলতু ফালতু কথা, বুড়ো বয়সে এখন শখ হল সিনেমা দেখার। আচ্ছা, এইসব নিয়ে আলোচনা করলে তোমার কোনও প্রতিক্রিয়া হয় না ? মনে হয় না, আমরা জীবনে যা কিছু করেছি সব ভুল, নয়তো বোকামি?

না রমা, আমার মনে হয় না আমরা কোনও ভুল করেছি। ছেলেকে মানুষ করে যে আমরা শুধু যে আমাদের দায়িত্ব পালন করেছি তাই নয়, এর থেকে যে সুখানুভূতি আমরা পেয়েছি তা কি অন্য কোন ভাবে সম্ভব ছিল ? ভেবে দেখো তো বছরের শেষে আকাশ ক্লাসে ফার্স্ট হওয়ার রেজাল্টটা নিয়ে আসতো, তখন কে বেশী খুশী – আমরা না আকাশ ?  সবাই যখন আকাশকে নিয়ে প্রশংসা করত, কে বেশী খুশী হত ? তোমার কথা আমি অস্বীকার করছি না, তবে আমার প্রশ্ন একটাই – ‘ আমরা কি পেরেছি ওকে ঠিকমতো মানুষ করতে? যদি না পেরে থাকি, তবে কারণটা হয় আমাদের অক্ষমতা নয়তো ওর ঔদ্ধত্য।’

হয়তো বা কোনটাই নয় – স্রেফ জেনারেশন গ্যাপ, আর এইটা মেনে নিতে না পারাটাই এই মুহূর্তে আমাদের সবথেকে বড় অক্ষমতা। ভেবে দেখো কিভাবে কেটেছে আমাদের ছোটবেলাটা – বাড়ির কাছে বাংলা মাধ্যম স্কুলে পড়া, স্কুলের সময়টুকু ছাড়া বাকি সময়টা বাড়িতে বাবা, মায়ের কাছে থাকা আর ভাই বোনেদের সাথে খেলাধুলো – হইচই করা, সোম থেকে শনিবার পর্যন্ত সকাল, বিকেল ভাত, রুটি, ডাল, মাছের ঝোল খাওয়ার পর রবিবারে এক বাটি মাংসের বরাত, পুজোর আগে পাড়ার দোকান থেকে কেনা আর পাওয়া মিলিয়ে চার থেকে পাঁচ সেট জামা প্যান্ট যা কিনা সারা বছরের বরাদ্দ, বিনোদন বলতে রেডিওতে বাংলা গান শোনা, নয়তো বাঁটুল টি গ্রেট পড়া, মুখরোচক খাওয়া বলতে ঝালমুড়ি, ফুচকা বা কাঠি আইসক্রিম, আর বেড়াতে যাওয়া বলতে ওই কাকু পিসীদের বাড়ি। মাত্র একটা প্রজন্মে চিত্রটা যে এতটাই বদলে গেছে যে এসব গল্প ওদেরকে করতে যাওয়া মানে নিজেদের হাসির খোরাক করে তোলা, কারণ এখনকার ছেলেরা ঘুম থেকে উঠে এক হাতে ব্রাশ নিয়ে অন্য অন্যহাতে মোবাইলে অথবা আইপ্যাডে ফেসবুক চালিয়ে দিন শুরু করে – সারাটা দিনই চোখদুটোকে সহ্য করতে হয় স্ক্রিনের আলর ঝলসানি আর কানগুলোকে হেডফোনের গর্জন, ফলঃস্বরুপ স্বাভাবিক কথাবার্তার কোনও সুযোগই নেই।  খাবার মেনুতে বেশীরভাগটাই বার্গার, পিজা, পাস্তা ইত্যাদি জাঙ্ক ফুড। বছরে এক-দু’বার প্লেনে চেপে বেড়াতে গিয়ে পাঁচতারা হোটেলে থাকা। এর সাথে আছে সমস্ত দামি ব্র্যান্ডের পোশাক, দামি গাড়ি চেপে স্কুলে যাওয়া ইত্যাদি। এইভাবে চললে শরীরের ইন্দ্রিয়গুলোর বিকাশ ঘটবে কি করে ? কি করে কাজ করবে সূক্ষ্ম অনুভূতি গুলো ? কি করেই বা বুঝবে অন্যের ভালবাসার গভীরতা, বা তাদের সুখ, দুঃখ। অনেকক্ষেত্রেই ওদের ব্যাবহারের সাথে চরিত্রের সামঞ্জস্য পাওয়া যায় না – কারণ ওদের সূক্ষ্ম অনুভূতি গুলোর ঠিকমতো বিকাশ হয় নি, তাই ওরা অন্যের ভাবানুবেগ অনুধাবনে অক্ষম।

~~~

জীবনটা সেই একই ভাবে এগিয়ে চলেছে বিভাস আর রমার। বাঁচার আর কোনও অর্থই খুঁজে পায় না ওরা। এতো দুঃখের মধ্যে কেবল একটাই শান্তি যে ওরা ওরা এখনও দুজনে একে অপরের পাশে রয়েছে, আর তাই দুঃখটা এখনও ভাগ করে নিতে পারছে। কিন্তু এতো দুঃখের মধ্যে এইটুকুও সুখও কি বেশীদিন থাকবে ? একেকটা দিন যাওয়ার সাথে উল্টে যায় জীবনের একেকটা পৃষ্ঠা – হয়তো বা ফাঁকা কোনও রুল টানা খাতার পৃষ্ঠা, যার ওই সমান্তরাল সরলরেখার মতোই বয়ে চলেছে ওদের জীবন, যতদিন না শেষের ওই পৃষ্ঠার আবির্ভাব হচ্ছে।

বিভাসের অবসর জীবনের প্রায় বারো বছর হল, আর এই সুদীর্ঘ সময়ের প্রতিটা মুহূর্ত বিভাস আর রমা একে অন্যের সাথে ছায়ার মত রয়েছে। বয়সের ভারে কমে এসেছে শরীরের ক্ষমতা, বেড়ে চলেছে অসুস্থতা – হাই প্রেশার, সুগার,বাত বা হাঁপানির কষ্ট ছাড়াও ধরা পরেছে বিভাসের হার্টের সমস্যা। চিন্তায় চিন্তায় রমাও আজ মানসিক ভাবে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত। সারাদিন বিভাসের শরীরের যত্ন নেওয়া, সময় মেনে ওষুধ খাওয়ানো,  ঠিকমতো পথ্যের ব্যবস্থা করতেই দিনের অধিকাংশ সময় চলে যায়, আর বাকি সময়টা কাটে ঠাকুর ঘরে। নিজের শরীরটা যে ক্রমশ ভেঙ্গে পরছে তা ভাবার আর কোনও অবকাশ নেই।

বিকেলের ওষুধগুলো বিভাসকে খাইয়ে রমা এসে বসে বারান্দায়। এক বছর আগে পর্যন্তও ঠিক এইসময় প্রতিদিন বারান্দায় বসে চা খাওয়াটা ওদের কাছে ছিল একধরনের সূক্ষ্ম বিলাসিতা। পাঁচটার মধ্যে চা নিয়ে হাজির হতে না পারলেই শুরু হয়ে যেত হাঁকডাক ’কি হল, আজ দেরী কেন? এতো বাজে সার্ভিস হলে চাফেটারিয়ার খদ্দের পালাবে’। রমা কোনরকমে  চায়ের চিনিটা গুলিয়ে দৌড়ে যায় ’আসছি রে বাবা এতো তারা দাও কেন বল তো?’  কিন্তু গত বছর এই সময় সেই যে ভীষণ শরীর খারাপ হোল বিভাসের, তার পর থেকেই চলেছে নানান সমস্যা। ফলে ওদের সবচেয়ে প্রিয় ওই বারান্দার চায়ের আসর আজ শুধু স্মৃতি মাত্র।

যদিও রমা একদমই ভাবতে চায় না, কিন্তু একটু অবসর পেলেই সেই একি কথা ঘুরে ফিরে আসে ওর মাথায় আর পুরনো অভ্যাস মত লিখতে শুরু করে নিজের মনের কথা। ‘আজ প্রায় একমাস হল আকাশের কোনও খবর পায় নি, আচ্ছা ওর কি একবারও মনে পরে না আমাদের কথা ? গতমাসে ওই পাঁচ মিনিটের জন্য যেটুকু কথা হয়েছিল, তাও আমি ফোন করেছিলাম বলে। নিজে থেকে তো কখনই ফোন করে না। গত সপ্তাহে দু’বার চেষ্টা করেছিল রমা, কিন্তু ফোন বেজেই গেছে – যদি ব্যাস্তই হয়, পড়ে তো মিস কল দেখে ফোন করতে পারত। আমি বুঝি যে ওইসব দেশে কত ব্যস্ততায় জীবন কাটে ওদের, কিন্তু সপ্তাহে একবারও কি ওর সময় হয় না আমাদের খবর নেওয়ার? এখানে বিভাসকে নিয়ে যে কিভাবে দিন কাটাচ্ছি, তা কেবল আমি আর ঈশ্বরই জানেন। একবারও কি আকাশের মনে হয় না যে ওকে ছাড়া আমরা কতটা অসহায় ? যে কোনও সময় আমাদের জীবনে কিছু একটা অঘটন হয়ে যেতে পারে ?’ না, ডায়েরির পাতাও শেষ – এটা তো দু’বছর আগে ওই ওষুধের দোকান থেকে দিয়েছিল। সেই থেকে রমাই এটাই ব্যাবহার করে – আকাশ যদি কখনও একটু ভালো করে কথা বলে, রমা সেগুলোকে নিজের মনের ভাবনার সাথে জড়িয়ে আরও সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলে তার ডায়েরীতে, আর মন খুব খারাপ হলে হয় হিজিবিজি কেটে ভরিয়ে দেয় পাতা অথবা তার ভাষায় ভরিয়ে দেয় তার অস্ফুট বেদনার ছবি।

পিছন থেকে একটা আওয়াজ পেয়ে তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়ায় রমা ’একি ? তুমি এখানে উঠে এসেছ কেন ? কি মুশকিল, দাঁড়াও আমি ধরছি তোমাকে।’ বলতে বলতে বিভাস এক হাতে বুকটা চেপে ধরে, আর অন্য হাতে কোনওমতে চেয়ারটা ধরে বসে পরে। বিভাসের মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাসে আর অসহায় লাগছে। কেমন যেন ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে রমার দিকে। বিভাসের বুকে হাত বোলাতে বোলাতে রমা জিজ্ঞেস করে চলেছে  ’কি কষ্ট হচ্ছে বল ? আমি এখুনি ডাক্তারকে ডাকছি। কথা বলছ না কেন ?‘  বিভাসের মুখে কোনও কথা নেই, শুধু শক্ত করে ধরে আছে রমার হাতটা, আর করুন মুখে চেয়ে আছে রমার দিকে। ইশারায় বোঝানোর চেষ্টা করে তার কষ্টের কথা।

হঠাত মোবাইলটা বেজে ওঠে। কেন যে বিভাস এমন একটা করুন রিং টোন লাগিয়েছিল – সহ্য করতে না পেরে রমা কাজের মেয়েটাকে বলে ’ফোন টা বন্ধ কর তো’। কিন্তু ফোনটা নিয়ে এসে কাজের মেয়ে বলে ’এই নাও দাদার ফোন।’ ভয়, উত্তেজনায় রমার সারা শরীর কাঁপছে। কোনমতে বিভাসকে সামলাতে সামলাতে এক হাতে ফোনটা ধরে। কিন্তু একি, বিভাসের চোখ দুটো অমন উলটে যাচ্ছে কেন? শরীরটা কেমন যেন বেঁকে যাচ্ছে। ওপাশ থেকে তখন আকাশের কথা ভেসে আসছে ’মা তুমি গত সপ্তাহে ফোন করেছিলে, কিন্তু এর মধ্যে আর ফোন করে উঠতে পারিনি। আসলে সোনাইয়ের একটা ফ্যাশন ডিজাইন ওয়ার্কশপ চলছিল, তাই আমরা ওই নিয়ে খুব ব্যস্ত ছিলাম। সোনাইয়ের এখানে ফ্যাশন ডিজাইনে খুব নাম ……………।’ আকাশের কোন কথাই মাথায় ঢোকে না রমার।

ক্রমশ বিভাসের চেপে ধরে থাকা হাতটা শিথিল হয়ে আসছে, শক্ত হয়ে যাচ্ছে শরীরটা।  রমা চেয়ে আছে বিভাসের দিকে। অসংখ্য  সুখস্মৃতির ছবি এলোমেলো ভেসে বেড়াচ্ছে ওর মনে। মন চাইছে ওইগুলো আঁকরে ধরে ভেসে বেড়াতে আনন্দের দিনগুলোতে। কিন্তু ওর চোখগুলো কেমন উলটে যাচ্ছে, অনিয়মিত শ্বাস-প্রশ্বাস আর শরীরটা শক্ত হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে রমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। রমা নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে আর্তনাদ করে ওঠে ’না, বিভাস না – তুমি যেতে পার না এভাবে। সারাটা জীবন তোমার সাথে সমস্ত সুখ-দুঃখ ভাগ করে এসেছি, একে অপরের একাকীত্ব ঘোচানোর চেষ্টা করেছি। আর আজ তুমি আমাকে এভাবে সঙ্গীহীন করে চলে যেতে পারবে না।’

~~~ সমাপ্ত ~~~

 

Print Friendly, PDF & Email
SHARE
Previous articleIntense Firework War
Next articleরঙ
Dilip Ghosh
Born and brought up in Kolkata and settled in Singapore where he currently works as a Project Manager . He has a great affection for Bengali literature. This writing is the fruit of his love and affection for literature .

LEAVE A REPLY

*